অ নু বা দ
ভাষান্তর: বাসুদেব দাস
প্রণব কুমার বর্মণের কবিতা: মূল অসমিয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ
অসমের নলবারি জেলার ককিলাবারিতে ১৯৭৮ সনে জন্ম। জনপ্রিয় কবি এবং ঔপন্যাসিক। উল্লেখযোগ্য কাব্য সংকলন ‘তুমি সাগরিকা বরদলৈ’, ‘ভোক আরু ভালপোৱার টোকাবহী’, ‘নতুন শতিকা নতুন কবিতা’ইত্যাদি। জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কটন কলেজর হাজার সন্ধিয়া’, ‘ভগ্ননীড়’।
যদি অপেক্ষা কর
যদি অপেক্ষা কর
শীত বসন্তের জন্য অপেক্ষা করার মতো
আমার জন্য অপেক্ষা করবে
যদি অপেক্ষা কর
মাটি মেঘের কাছে বৃষ্টি চেয়ে অপেক্ষা করার মতো
যদি অপেক্ষা কর
অপরাহ্ণের আকাশ তারা ভরা রাতের জন্য অপেক্ষা করার মতো
যদি অপেক্ষা কর
ঝরা পাতাগুলি পুনরায় সবুজ হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখার মতো
ঘাট নিঃসঙ্গতা মুছে একটি নৌকার জন্য অপেক্ষা করার মতো
তোমার চুল বাতাসের জন্য অপেক্ষা করার মতো
স্তব্ধতা একটা গানের জন্য অপেক্ষা করার মতো
প্রতিদিন সকালের ফুলদানি নতুন ফুলের জন্য অপেক্ষা করার মতো
যদি অপেক্ষা কর
আমার জন্য অপেক্ষা করবে
তোমার উপেক্ষা তুচ্ছ করে
আমি একদিন না একদিন আসব!
তুমি কীই বা করতে না পার
অনেক মৃত্যুর পরেও
তোমার জন্য বেঁচে থাকা
এটা কি সহজ কথা!
বাতাসকে তুমি নিঃশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পার
আকাশকে নামিয়ে আনতে পার আমার হৃদয়ে
সবুজ অরণ্যকে মাখিয়ে দিতে পার দৃষ্টিতে
পাথরে পাথরে কেটে দিতে পার প্রাচীন ভাস্কর্যের মতো উড়ন্ত পদক্ষেপ
তুমি কীয়েইবা করতে না পার
অনুর্বর এই ভূমিতে গড়তে পার ভূমার অলকানন্দা
ফোঁটাতে পার বৃষ্টিহীন ঋতুতে অনন্য গোলাপ
বধ্যভূমিতে রক্ত মুছে ঘাসের মতো অঙ্কুর মেলতে পার
তুফানে ঘুড়ি উড়িয়ে মেঘকে চুমু খেতে পার
প্রেমের নামে সাগরের ঢেউকে পোষ মানাতে পার
তুমি কর্ষিত চেতনার আবেগ বিহ্বল পতাকা
আলোক স্তম্ভের মতো তুমি
আমি জয় অথবা পরাজয়ে কুর্নিশ করি
নাবিকের মতো অন্ধকারেও তোমার দিকে এগিয়ে যাই
রাতের সাগর গর্জন করে তোমার ঘুম ভাঙানোর জন্য!
বদনামি হয়ে যাই চল
অল্প বদনামি হয়ে যাই চল
নিয়মের বাইরে দাঁড়াই আকাশ ছোঁয়ার জন্য
চল একটু পালিয়ে যাই দুঃসহ জীবন থেকে
স্রোতস্বিনী নদীটাতে একটা সেতু তৈরি করি ওপারের অরণ্যে চলে যাবার জন্য
অল্প বদনামি হয়ে যাই চল
ভেঙ্গে ছিঁড়ে এই একঘেয়ে বন্ধ্যা সময়
বেশ কিছু অন্ধ কুঠুরির দিন যাপনের ক্ষণকে আঘাত করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিই
চল— মোছার জন্য দুঃখের সমস্ত রং
সবুজ গুলোকে কুড়িয়ে আনি
হাতটা দাও, হাতে ধরে তোমাকে নিয়ে যাই বদনামি ভালোবাসায়
বদলে নেবে সেখানে জীর্ণ হওয়া পুরোনো পোশাক
বদলে নেবে দীর্ঘশ্বাস
বদলে নেবে মৃত্যুকে
অল্প বদনামি হয়ে যাই চল পাখির মতো ভূগোলের সীমা ভেঙ্গে
অল্প বদনামি হয়ে যাই চল শীতের রাতগুলিতে বুকের উত্তাপের খোঁজে
বেদনা যে দুই ঠোঁটের নাম
চুমুর বিনিময় হাসি ছড়িয়ে
বদনামি হয়ে যাই চল
নতুন করে বেঁচে ওঠার জন্য!
ডলি মেম
ডলিমেম একদিন রাস্তায় না বেরোনোর জন্য অন্ধকারে ডুবে ছিল মহানগর
যুবকেরা সিগারেটে টান দিয়ে আকাশ কুয়াশাময় করেনি কমার্স পয়েন্টে
ওরা ভেবেছিল এভাবে মেঘলা হয়ে থাকবে আকাশ এবং হয়ত বিদ্যুৎ গর্জনের সঙ্গে নেমে আসবে মুষলধারে বৃষ্টি
ডলিমেম সেদিন ব্যস্ত ছিলেন নিজের রান্নাঘরে
নানাবিধ খাদ্য ব্যঞ্জনে তিনি মাখছিলেন মশলা
কিন্তু তিনি তো জানতেন না
সেদিন মহানগরটা উপবাসে ছিল
কেউ খেতে চাইছিল না উদর পূর্ণ করে
ডলি মেম সেদিন ব্যস্ত ছিলেন জিম খানায়
সঠিক রাখার জন্য শরীরের ওজন,কমানোর জন্য থাইরয়েড, পায়ের গোড়ালির ব্যথা
কিন্তু সমস্ত মহানগরবাসীর সেদিন কমে গিয়েছিল শরীরের ওজন
বেড়ে গিয়েছিল থাইরয়েড, না হেঁটেও বেড়ে গিয়েছিল পায়ের ব্যথা
ডলি মেম একদিন রাস্তায় না বেরোনোর জন্য
প্রদূষণ বেড়ে গিয়েছিল,নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পেয়েছিল নাগরিকরা
শ্বাস রোগে ভুগে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিল নাগরিক সমাজ
চোখে ছানি পড়েছিল প্রত্যেকের
কেউ দেখতে পাচ্ছিল না পাহাড়গুলি, নদীর ফেরিগুলি
আকাশটা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, অন্ধ হয়ে গিয়েছিল একটি মহানগর
ডলি মেম ঘরের ভেতরে ব্যস্ত ছিলেন নখে নেইল পালিশ লাগানোয়
তাঁর নখগুলি হয়ে উঠেছিল নক্ষত্র মন্ডলী
একজন রহস্য সাহিত্যিক কল্পনা করেছিল
ডলি মেমের নখগুলি দীর্ঘ হয়ে বেড়ে চলেছে
আর তাঁর বুক ভেদ করে ঢুকে গেছে
আর বের করে এনেছে হৃদয়
এই ধরনের রহস্য কল্পনায় রহস্য সাহিত্যিক নিজেই কেঁপে উঠেছিলেন
ডলি মেম একদিন রাস্তায় না বেরোনোর জন্য
মিছিলগুলি স্থগিত রেখেছিল বিদ্রোহীরা
বলেছিল–সৌন্দর্য নির্মাণের নামই বিপ্লব
যদি সৌন্দর্য থাকে গৃহবন্দী হয়ে তাহলে বিপ্লবের প্রস্তাবনা স্থগিত থাকুক
সেই সৌন্দর্য, দরিদ্রের দারিদ্র্য মোচন,
শোষকের শোষণ বন্ধ, লুণ্ঠন বন্ধ
অপ্রয়োজনীয় হত্যাবন্ধ, বলাৎকার বন্ধ
সেই সৌন্দর্যের নাম যুদ্ধ বন্ধ, মিসাইল বন্ধ, ধর্মযুদ্ধ বন্ধ
ডলি মেম একদিন ঘরের বাইরে না বেরোনোর জন্য
পৃথিবী থমকে দাঁড়াল উদ্দীপনাহীনতায়
কবির কলম থমকে দাঁড়াল প্রেমহীনতায়
টিভি চ্যানেলগুলি চাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ল
সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় খবরের পরিবর্তে প্রকাশ পেল বিজ্ঞাপন
ডলিমেম একদিন রাস্তায় না বেরোনোর জন্য
মুখ্যমন্ত্রী বাতিল করল সাংবাদিক বৈঠক
বাতিল করল দুঃখীদের জন্য ঘোষনা করা পরিকল্পনা
আধাারশিলা নির্মাণের বিশেষ আয়োজন
এমনকি আরক্ষীরাও চোর ধরার সমস্ত পরিকল্পনা বাদ দিল
সেদিন কমে গেল ফুচকার বিক্রি, চানাচুর ওয়ালার উপার্জন
ভাইরেল খাবার জন্য কেউ বেরিয়ে এল না দীঘলিপুকুরের পারে
এভাবে যদি ডলি মেম ঘরের ভেতরে ঢুকে থাকে
একদিন মহানগরটি বেদনায় মরে থাকবে
মহানগরবাসী অনাহারে মরে থাকবে
বেপারিরা বেপারহীনতায় মরে থাকবে
সরকার ভেঙে থাকবে, কোথাও আর কোনোদিনই বিপ্লব সংঘটিত হবে না
ডলি মেম ডলি মেম
মানুষের হাসি আর বিজয়ের স্বপ্নের জন্য
আপনি প্রতিদিন একবার রাস্তায় বেরিয়ে আসবেন
আপনি প্রতিদিন একবার রাস্তায় বেরিয়ে আসবেন
রাস্তাই যে মানুষের অতীত,বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ!
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে)
বৃষ্টি পুরোনো হয় না হে হয় না
বুকের ঘা গুলি পুরোনো হয়
শহরটা পুরোনো হয় দালানগুলি পুরোনো হয়
পোশাকগুলি পুরোনো হয়
পুরনো হয় পাহাড়টির স্মৃতি
পুরোনো হয় অরণ্যটির ঝরা পাতায় ঢাকা পথ
পুরোনো হয় নদীটি, রূপ বর্ণ ঘাট
পুরনো হলেই গভীর হয়ে আসে দুঃখের আসা যাওয়া
পুরোনো দুঃখ এত গভীর!
পুরোনো হলেই কমে আসে দালান গুলির আকর্ষণ তাতে বসবাস করার ইচ্ছা
পুরনো হলেইই ভূতে পাওয়া হয়ে পড়ে অরণ্য
পুরোনো হলেই শরীর থেকে নির্বাসিত হয় পোশাক
সমস্ত নতুনেরই পুরোনো হওয়া নিয়তির পরিহাস
সমস্ত পুরোনো হয় জন্মদানের জন্য ফোঁপানোর
বৃষ্টি পুরোনো হয় না হে হয় না
প্রেমকে নতুন করে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য
বৃষ্টি পুরোনো হয় না!