গ ল্প
সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়
দৌড়
ঝপ করে ভেঙে গেল রাকিবের ঘুম। ট্রেনের শব্দ আসছে দূরে। এতটা ভোরে উঠবে সেটাও ভাবেনি রাকিব, তবে ভোরে ওকে উঠতেই হত আজ। এবার রাজ্য লেবেলের স্পোর্টসে নিজের দক্ষতা দেখাতেই হবে। স্কুলের টিচারেরা ওর ওপরে অনেকটা ভরসা করে আছে। খেলার টিচার জাহিরুল স্যার বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ওকে আলাদা করে প্র্যাকটিস করাচ্ছেন। রাকিব দৌড়ে খুব ভালো। ওদের স্কুলে আগে শুধু চারশ মিটারে ছেলেরা অংশ নিত। এবার প্রথমবার ম্যারাথনে নামবে। শুধুমাত্র রাকিবের জন্য স্যার একটা নতুন খেলার ইউনিয়ফর্ম অ্যারেঞ্জ করেছে কোথা থেকে। তিনি রাকিবকে এর থেকে বেশি কিছু বলেননি। রাকিব জানতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ‘তোর এত কিসের কৌতুহল? তোকে দেওয়া হচ্ছে, তুই মন দিয়ে প্র্যাকটিস কর। বাকি বিষয়টা আমাকে বুঝে নিতে দে।’ কথাগুলো বলে স্যার হাসিমুখে রাকিবের পিঠ চাপরে দিয়ে মাথার চুলটা একটু নেড়ে দিয়েছিলেন।
স্যারের এই আদরগুলো রাকিবের খুব ভালো লাগে। রাকিবের তো নিজের আব্বা নেই, জন্মের সময় আম্মিও মারা গেছে। মা-বাপ মরা ছেলেটা খালার সংসারেই বড়ো হয়েছে। খালার দুই ছেলেমেয়ে আর খালু। রাকিব ট্রাঙ্ক তৈরির কাজ করে। যা রোজগার হয় সেই দিয়ে নিজের দরকার নিজে মেটায়। রাকিব এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। জাহিরুল স্যার বলেছেন খেলাধুলায় ভালো করতে পারলে বড়ো হয়ে চাকরি আছে। রাকিবের মধ্যে নাকি সে দক্ষতা আছে। একটু ভালো করে খাটলে সে অনেক কিছু করতে পারবে। কিন্তু কতটুকু। একটা মা-বাপ মারা ছেলে একা একা নিজের জন্য আর কতটুকুই বা করতে পারে। তাও রাকিব চেষ্টা করে নিজের মতো করে। সকালে ট্রাঙ্ক তৈরি করতে সিট পেটায়, তারপর স্কুলে যায়। যেদিন সকালে কাজে যেতে পারে না সেদিন বিকেলে কাজ করে। তার মাঝেই বাড়ি ফিরে নিজের পড়া নিজে করে। যা কিছু আটকায় পাশের ঘরের আমিনাআপা ওকে সেগুলো বুঝিয়ে দেয়।
ঘুম যখন ভেঙে গেছে রাকিব উঠে পড়ল। মনে মনে ভাবল আর দেরি করে কী লাভ। তার চেয়ে মাঠে প্র্যাকটিস করতে যাওয়া অনেক ভালো। রাকিব খাটিয়া থেকে উঠে ঘরের বাইরে গেল মুখ ধুতে। ঘর বলতে কাঁচা ঘর। মাথায় টালির ছাদ। বাইরে একটা জালাতে খালা পানি ভরে রাখে। মাটির সরা চাপা থাকে। তার ওপরে একটা ছোটো মগ রাখা। রাকিব দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে ঠিক করে জামা কাপড় পরে নিল। মাঠটা বাড়ি থেকে বেশ অনেকটা দূরে। ওদের স্কুলের সব প্র্যাকটিসও ওই মাঠেই হয়। স্কুলে নিজেদের কোন মাঠ নেই। বাঁধানো চাতাল আছে। তাই স্কুল থেকে সবাই বড়ো মাঠে যায় প্র্যাকটিস করতে। সেই জন্য খেলার ক্লাস সব সময় শেষে রাখা হয়। কারণ লাইন করে যেতে আসতে অনেক সময় লেগে যায়। রাকিব ছুটতে শুরু করল।
ম্যারাথনে সে কখনো নাম দেয়নি। কিন্তু স্যার এবারে ওকে ম্যারাথনেও নাম দিতে বলেছেন। একেকরকম দৌড়ের জন্য একেক রকম ভাবে প্র্যাকটিস করতে হয়। কোন অ্যাঙ্গেলে পা ফেলে বডির ওপর ঠিকঠাক ব্যালেন্স রেখে ভালোভাবে স্পিড তুলে দৌড়ানো যাবে পুরোটাই তুমুল অভ্যাসের বিষয়। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হয় অনেক বেশি। স্যার বলেন লক্ষ্য সবসময় স্থির রাখতে হবে। লক্ষ্য সরে গেলেই আর গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। জাহিরুল স্যার বারবার ওকে চোখ বন্ধ করে বুঝতে বলে যে ওর সামনে লক্ষ্য কী। রাকিব অত কিছু বোঝেনা। চোখ বন্ধ করলেই ও সামনে ভাতের হাঁড়ি দেখতে পায়। ভাত ফুটছে। অ্যালুমিনিয়ামের খালি থালা সামনে রাখা। ভাত হলে তবে খালা বেড়ে দেবে। খিদের চোটে রাকিবের পেটে ব্যথা করে। সারাদিন কাজ করেছে, সকালে কিছু খাওয়াও হয়নি। ভরদুপুর হয়ে গেছে তখনও খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আম্মি থাকলেও কি এরকম হত। আব্বু পাঁচ বছর হল মারা গেছে। তারপর থেকে রাকিবের নাওয়া খাওয়ার সময়ের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। স্কুল থাকলে অন্তত এই খাওয়াটুকু জোটে ভালো করে। রাকিব সেজন্য স্কুল কামাই করতে চায় না। রাকিব চোখ বন্ধ করল। আম্মির ঝাপসা মুখ দেখতে পায় ঠিক ছবিতে যেমন দেখেছে। আব্বুকে দেখতে পায় দু-হাতে জড়িয়ে রাকিবকে আদর করছে। কিন্তু এসব কথা রাকিব জাহিরুল স্যারকে বলতে পারেনি। জাহিরুল স্যার জানতে চাইলে উত্তরে চুপ করে মাথা নামিয়ে রেখেছিল।
এতক্ষণ দৌড়ে দৌড়ে সবকিছু মনে পড়ছিল রাকিবের। শেষ ছবিটা চোখে ভাসতেই হঠাৎ থেমে গেল। পায়ে একটা কাঁটা ফুটেছে। রাস্তায় তখনও খুব একটা আলো ফোটেনি। রাকিব খেয়াল করতে পারেনি। তাছাড়া ওর জুতোর অবস্থাও খুব ভালো নয়। আগেই স্যার ওকে পই পই করে বলেছেন একটা ভালো স্পোটর্স সু কিনতে হবে। রাকিব সেজন্য টাকাও জমাচ্ছিল একটু একটু করে। এখনও কিনে ওঠা হয়নি। বাড়িতে আরও দুজন ভাই-বোন আছে। চাইলেই নিজের জন্য দুম করে কিছু কেনা যায় না। খালা ভীষণ রাগ করবে। রাকিবের দরকারের কথা কারো মাথায় থাকবে না তখন। এমনিতেই ওর স্কুলে যাওয়া আর খেলাধুলা নিয়ে অযথা খাটাখাটনি বাড়ির কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু রাকিব নিজের জন্য দৌড়ায়। জীবনটাই এখন ওর কাছে একটা দৌড়। দৌড়ালে আম্মি-আব্বু ওর কাছে আসে। ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে। লক্ষ্য যদি বলে তাহলে এটাই ওর লক্ষ্য, আম্মি আর আব্বুকে কাছে পাওয়া।
রাকিব নিজের পা থেকে কাঁটাটা টেনে বের করল। সামান্য একটু রক্ত বেরিয়েছে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতা দিয়ে ওই জায়গাটা ভালো করে মুছে নিল। জুতোর তলাটা আসলে বেশ ফেটে গেছে। ওখান দিয়েই বড়োসড়ো একটা কাঁটা পায়ে ঢুকল। জুতোটা আবার ঝেরেঝুরে ঠিক করে পায়ে গলিয়ে নিল রাকিব। এখান থেকে মাঠে যাওয়ার জন্য অন্তত এখনও তিরিশ মিনিট দৌড়াতে হবে টানা। একটা লম্বা শ্বাস নিল রাকিব। নীচু হয়ে মাটিটা হাতে করে ছুঁলো। মনে মনে বলল আমি পারবই। তারপর নিজের পা বাড়িয়ে লম্বা টানা ছুট দিল মাঠের দিকে। কতক্ষণ দৌড়েছে কে জানে একেবারে মাঠে এসে থামল রাকিব। এখন চারদিকটা বেশ আলো-আলো ভাব। এইরকম ভোরবেলার আকাশ দেখতে রাকিবের খুব ভালো লাগে। চার দিকটা ভালো করে দেখে রাকিব মাঠের ভেতর ঢুকল। ঘাসে তখন শিশির জমে আছে। শিশির হাত দিয়ে ছুঁতে রাকিবের খুব ভালো লাগে। ভিজে হাতটা নিজের গালে লাগালো। সূর্যটা কেমন চকচক করছে। একটু দেরি করলেই রোদ উঠে যাবে। আর এতটুকু সময় নষ্ট না করে রাকিব প্র্যাকটিসের জন্য তৈরি হল। জাহিরুল স্যার যা যা বলেছেন সেই ভাবে ধাপে ধাপে এসে সমস্ত প্র্যাকটিস করল। ফ্রি হ্যান্ড থেকে শুরু করে, মাঠটাকে পাঁচ বার পুরোটা চক্কর লাগানো, হাইজাম্পের প্র্যাকটিস করা সবই করল। শুধু শর্ট পাটের বলটা ছিল না বলে সেটা হল না এখন। সবকিছু করার পর রাকিব ভাবল আরও দু-বার মাঠটা চক্কর দেওয়া যাক। শেষবার দৌড়ানোর সময় রাকিবের বারবার মনে হচ্ছিল আদপে ও দৌড়চ্ছে কেন, ওর কী চাই। কথাগুলো যখনই মনে আসে তখনই রাকিব অস্থির হয়ে ওঠে। ওর কাছে কোন স্টপ ওয়াচও নেই যে নিজের টাইমিংটা ভালো করে দেখবে। তাহলে এরকম লক্ষ্যহীনভাবে দৌড়ে ওর লাভ কী হল। তার থেকে স্যারকে বলে একটা ঘড়ির ব্যবস্থা করতে হবে আগে। রাকিব ভাবল এমন কথা তো আগে কখনো মনে হয়নি। শেষ পাকটা দৌড়ানোর সময় ওর বড্ড খিদে পাচ্ছিল। তারপরে কথাটা মাথাতে এল। তাহলে কি মানুষের সবটাই পেটের সাথে যুক্ত? ও কি ছুটছে এই পেটের জন্যই। এটাই কি তবে ওর ভবিষ্যতের লক্ষ্য নিজেকে একটা জায়গায় দাঁড় করানো, অর্থ উপার্জন করা? খালা যে বলে টাকাই সব। টাকা থাকলে পৃথিবীতে সব কিছু করা যায়। কিন্তু টাকা থাকলে আম্মি-আব্বুকে তো আর বাড়িতে ফেরাতে পারবে না রাকিব। মনটা আবার কেমন মুষড়ে পড়ছে। আর কিছুতেই দৌড়ানো সম্ভব নয়। গায়ে একটুও শক্তি নেই। এখনও অতটা পথ ওকে বাড়ি ফিরতে হবে। কিছু খেতে পাবে কিনা তাও ঠিক নেই। রাকিব নিজের পকেটে হাত দিল। অল্প কিছু পয়সা পড়ে আছে। যাওয়ার সময় বরঞ্চ মইদুল চাচার দোকান থেকে একটা বাপুজি কেক কিনে নেবে। বাপুজি কেক খেতে রাকিবের খুব ভালো লাগে। স্কুলে যখন কোন অনুষ্ঠান হয় তখন টিফিনে ওদের কেক, মিষ্টিরুটি আর ফল দেয়। রাকিবের বড্ড লোভ হল। ফেরার সময় রাকিবের আর দৌড়াতে ইচ্ছে করছিল না। তাই ও জোরে জোরে পা চালাল। দোকানের সামনে গিয়ে দেখে মইদুল চাচা কিছুক্ষণ হল দোকান সবে খুলেছে। তখনও ঠিক করে গোছানো হয়নি। রাকিব ডাকল,
— চাচা একটা কেক দেবে?
— পয়সা আছে?
— হ্যাঁ আছে তো
— আচ্ছা, কে দিল খালা?
— না
— তবে?
— আমার টাকা, নিজের।
আব্দুল চাচা সজোরে হাসল। তারপর বলল,
— ভালো ভালো। ব্যাটা আমার, এখন থেকে স্বাবলম্বী হয়ে গেছে। তা বেশ। দে দে…
রাকিব টাকাটা এগিয়ে দিতেই মইদুল চাচা ওর হাতে একটা কেক তুলে দিল। সামনের ছোট্ট বেঞ্চিটায় বসে রাকিব এক নিমেষে কেকটা খেয়ে ফেলল। চাচার কাছে একটু পানি চেয়ে পানি খেল। তারপর চাচাকে জিজ্ঞাসা করল,
— চাচা, এই যে তুমি বললে স্বাবলম্বী, এর মানে কী?
— স্বাবলম্বী মানে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। নিজে রোজগার করা। তুই যেমন করছিস এখন ট্রাঙ্ক বানিয়ে।
— সে আর কতটুক। অল্প তো…
— আজ অল্প, কাল আর থাকবে না। লেখাপড়া শিখছিস কী জন্যে?
— লেখাপড়া শিখলে বুঝি চাকরি পাওয়া যায়?
— তো পাওয়া যায় না?
— তাহলে করিমচাচার ছেলে যে চাকরি পাচ্ছে না? করিম চাচা যে খালাকে বলে কোনো পরীক্ষা হচ্ছে না…
— আরে চাকরি তো কত রকমের আছে। ও যে পরীক্ষার জন্য খাটছে সে পরীক্ষা হয়ত দেরি হচ্ছে হতে। তাহলে কি চাকরি পাবে না? লেখাপড়া করলে কিছু না কিছু করতে পারবেই। শহরে গেলেই দেখবে কত রকমের চাকরি আছে। ও বেটা ভীতু, শহরে যেতে ভয় পায়। আমি কতবার বলেছি ছেলেকে ছাড়ো। তবে দেখবে ওখানে অনেক চাকরি পাবে। তুই যেন আবার ওরকম ভয় টয় পাস না। নিজের পায়ে নিজেকে দাঁড়াতে হবে।
রাকিব চুপ করে থাকে। মইদুল চাচা বলল,
— কি হল চুপ করে গেলি যে? তোকে একটা কথা বলি শোন, তোর আব্বু কিন্তু খুব ভালো মানুষ ছিল। খুব পরিশ্রম করতে পারত। অনেক ছোটো থেকে তোর আব্বুকে চিনি। আমাকে অনেকবার বলেছে রাকিবকে আমি শহরে পড়তে পাঠাব। অনেক বড়ো অফিসে ও চাকরি করবে। নিজের যত্ন নে রাকিব। আব্বুর স্বপ্ন পূরণ করবি না?
রাকিবের চোখ ছলছল করে উঠল। বুকটা কেমন টাইট হয়ে আসছে। কে যেন একটা চাপ দিচ্ছে বুকের ভেতর। কষ্ট হলে রাকিব কোনো কথা মুখ দিয়ে আর বলতে পারে না। তবে মনে হচ্ছে যেন আব্বুকে দেখতে পাচ্ছে ওর সামনে। আব্বু দুহাত বাড়িয়ে মুখে হাসি নিয়ে রাকিবকে ডাকছে। রাকিবকে ছুটে যেতে হবে আব্বুর দিকে। চারপাশে আর কোনো কিছু রাকিব দেখতে পাচ্ছে না। মইদুল চাচার কথাগুলো বারবার কানের ভেতর বাজছে। আব্বুর ইচ্ছে ছিল রাকিব অনেক বড়ো অফিসে চাকরি করবে। জাহিরুল স্যার বলেন খেলাধুলায় ভালো করতে পারলে বড়ো চাকরি আছে। রাকিব দৌড়ায়। আবার দৌড়াতে শুরু করে। পায়ের জুতোটা রাস্তায় ঘষা খাচ্ছে যেন মনে হয় বারবার। রাকিব কোনো কিছু গ্রাহ্য করে না। সামনে তার লক্ষ্য রাজ্য লেবেলের স্পোর্টস। সেখানে রাকিব নিজের স্কুলকে রিপ্রেজেন্ট করবে। অনেক বড়ো দায়িত্ব ওর কাঁধে। সেখানে ভালো কিছু করতে পারলে তবেই জাহিরুল স্যার বলেছেন হেডমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে তিনি রাকিবের নিয়মিত খেলাধুলার তালিমের ব্যবস্থা করবেন। রাকিব কি হাঁপিয়ে যাচ্ছে? হাঁপালে তো চলবে না।
রাকিব দৌড়ায় আরো জোরে দৌড়ায়। বাড়িতে গিয়ে তৈরি হয়ে স্কুল যেতে হবে। ফিরে এসে কাজে যাবে। তারপর রাতে পড়াশোনা। সামনে অনেক বড়ো দৌড় ওর এখনও বাকি…