ফি চা র
সোনালী ঘোষ
বটতলার দর্প
উনিশ শতকের গোড়ার কথা। শহর কলকাতার নগরায়নের কাজ প্রায় সম্পন্ন। উত্তর কলকাতার শোভাবাজার-চিৎপুর এলাকার কালাখানা অঞ্চলে ছিল একটি বড়ো বটগাছ। তার তলাটি শানবাঁধানো। পথ চলতি ক্লান্ত পথিক খানিক জিরিয়ে নিতেন সেখানে। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি বেকার যুবকদের দেদার আড্ডা। তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজও চলত সেই শানবাঁধানো গাছ তলায়। ক্রমে জম-জমাট হতে শুরু করল বটতলা। বসত গানবাজনার আসর। সুযোগ বুঝে ছোটো ব্যবসায়ীরা তাদের হরেক কিসিমের পসরা সাজিয়ে নিয়ে বসা শুরু করল সেখানে। তার মধ্যে ছিল বইও। অনুমান করা হয় সেই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা। তিনিই বটতলা এলাকায় প্রথম ছাপাখানা খোলেন। তার দেখাদেখি ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠে আরও অসংখ্য ছোটো বড়ো মাঝারি সস্তার প্রেস। আর অন্যান্য পসরা ছাপিয়ে ক্রমে পুরবাসীর অন্দরমহলে ঢুকে পড়ে একটি নতুন শব্দবন্ধ ‘বটতলার বই’।
ড. সুকুমার সেন তাঁর ‘বটতলার বই’ শীর্ষক প্রবন্ধে উপরিউক্ত বক্তব্যের সমর্থনে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি জানিয়েছেন এই বটতলার ছাপাখানাগুলির চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট থেকে উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট পর্যন্ত এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট থেকে পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড পর্যন্ত।
এখন কথা হল ‘বটতলার বই’ বলতে ঠিক কী বোঝায় বা কোন বইগুলি ছিল এর অন্তর্ভুক্ত? কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু বলে নেই— এই ‘বটতলার বই’ শব্দবন্ধটি সেই প্রাচীন কাল থেকে অদ্যাবধি কিছুটা হীনার্থেই ঘুরে আসছে মানুষের মুখে। কোনো বই প্রসঙ্গে অবজ্ঞা প্রকাশ করতে আমরা আজও এই শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করে থাকি। ‘বটতলার বই’— এই শব্দবন্ধটি আজও আমাদের মনে উদ্রেক করে এক অশ্লীল ইঙ্গিত বহনকারী আদিম রিপুগন্ধওয়ালা বাতাবরণ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) উপন্যাসে এক জায়গায় বটতলার দেবীর কাছে লেখনীশক্তির বৃদ্ধি কামনা করা হয়েছে, যাতে লেখার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ লাভ করা সম্ভব হয়। বুঝতে অসুবিধা হয় না এর মধ্যে ‘বটতলার বই’-এর প্রতি লুকিয়ে ছিল সাহিত্য সম্রাটের প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ। আবার এই কথাও সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, ‘বটতলার বই’ ঘিরে জড়িয়ে ছিল অর্থনৈতিক লাভের একটা সহজ সমীকরণ। তাহলে কেন এই ব্যঙ্গ? কেন ‘বটতলার বই’ ঘিরে আজও এক ঋণাত্মক বাতাবরণ?
তবে সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আবারও একটু অতীতে ফিরে যাওয়া যাক। ড. সুকুমার সেন তাঁর ‘বটতলার বই’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখছেন, ‘অনুমান করা হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা। ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন। বহুকাল পর্যন্ত এই “বান্ধা বটতলা” উত্তর কলকাতার পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা ছিল।’ হ্যাঁ, ১৮১৮ সাল নাগাদ বিশ্বনাথ দেবের ছাপাখানাই বটতলার প্রথম ছাপাখানা। তখন কলকাতায় বাংলা ছাপার জন্য আরও পাঁচটা প্রেস ছিল— মিশন রো-এ গভর্নমেন্ট গেজেট প্রেস, বৌবাজারে ফেরিস কোম্পানির প্রেস, লালবাজারে হিন্দুস্থানী প্রেস, চোরবাগানে হরচন্দ্র রায়ের বাঙালি প্রেস এবং পটলডাঙায় লঙ্গু লালের সংস্কৃত প্রেস। লং সাহেব লিখেছেন, ‘১৮২১ সালে কলকাতায় চারটে প্রেস ছিল যা দেশীয় লোকের হাতে বাংলা ছাপা হত— হিন্দুস্থানী প্রেস, বাঙালি প্রেস, সংস্কৃত প্রেস ও বিশ্বনাথ দেবের প্রেস।’ বটতলার বিশ্বনাথ দেব নানা ধরনের বই ছাপতেন— বিদ্যালয়ের পাঠ্য গণিত (১৮১৮) থেকে শুরু করে রামজয় বিদ্যাসাগর সম্পাদিত ‘কবিকঙ্কণের চণ্ডী’ (১৮২৩)।
ক্রমে বিশ্বনাথ দেবের দেখাদেখি বটতলার চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোটো-বড়-মাঝারি সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে। শুধু গড়েই ওঠে না রমরমিয়ে চলতে থাকে সেই বাজার। বটতলা কেন্দ্রিক কলকাতার এই সস্তা ছাপাখানার স্বর্ণযুগ ছিল ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ পর্যন্ত। ১৮৩০ সালের ‘সমাচার দর্পণ’ লিখছে, ‘এতদ্দেশীয় লোকের মধ্যে বিক্রয়ার্থে বাংলা পুস্তক মুদ্রিতকরণের প্রথমোদ্যোগ কেবল ষোল বৎসরাধিক হইয়াছে দেখিয়া আমাদের আশ্চর্য বোধ হয়, যে অল্পকালের মধ্যে এতদ্দেশীয় ছাপার কার্যের এমন উন্নতি হইয়াছে।’ এই সময়ে একটা জিনিস লক্ষ্য যায়, গুটিকয় অভিজাত শিক্ষিত ও রুচিবান পরিবার বা তাঁদের পাঠ-গ্রহণের ইচ্ছার গণ্ডী ছাড়িয়ে ক্রমে আপামর সাধারণ মানুষের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। আর এই বই পড়ার প্রবণতা ও বটতলার বই-এর বাজারের রমরমা— ছিল একে অপরের পরিপূরক। বটতলার ছাপাখানাগুলিতে সস্তায় ছাপা হওয়া বই যেমন সহজলভ্য ছিল আপামর সাধারণ মানুষের কাছে, যা উসকে দিয়েছিল বই-এর প্রতি সর্বশ্রেণীর মানুষের আগ্রহকে তেমনই বই পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উপচে পড়েছিল বটতলার প্রকাশকদের পকেট। তাঁরা বটতলাতেই সাজিয়ে বসতেন তাঁদের বই-এর পসরা।
শুধুমাত্র সহজলভ্যতাই যে আপামর সাধারণ মানুষকে বই-এর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল তা কিন্তু নয়— বটতলার ছাপাখানাগুলিতে ছাপা বইগুলি যেমন ছিল সস্তা অর্থাৎ এখনকার ভাষায় যাকে বলে ‘পকেট ফ্রেন্ডলি’ একই সঙ্গে ছিল বিষয় বৈচিত্রে ভরপুর— যা সহজেই আকৃষ্ট করেছিল আপামর সাধারণ পাঠককে। তবে এ কথা ঠিক অভিজাত, শিক্ষিত ও রুচিবান পাঠকরা সেই সময়েও নাক কুঁচকেই রাখতেন বটতলার ছাপাখানাগুলি থেকে প্রকাশিত বইগুলির প্রতি। তাঁদের কাছে বটতলার বই মানেই ছিল অচ্ছুত ও নিম্নরুচি সম্পন্ন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) উপন্যাসেও সেই ব্যঙ্গের কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। একটু দেখে নেওয়া যাক কী ধরণের বই ছাপা হত বটতলার ছাপাখানাগুলিতে। রামায়ণ-মহাভারত সহ বিভিন্ন পুঁথি, পাঁচালী, পঞ্জিকা, ধর্মগ্রন্থ যেমন ছাপা হত তেমনই সমাজের কেচ্ছা কাহিনী, উচ্চবিত্তের কেলেঙ্কারি, মানুষের মনের গভীরে খেলা করা বিভিন্ন রিপুজ চেতনার খোরাককেও বই বা পুঁথির আকারে প্রকাশ করতেন বটতলার প্রকাশকরা। সেই সময়কার অভিজাত, শিক্ষিত ও রুচিবান পাঠক ও লেখকরা একে ব্যাঙ্গার্থে ‘বটতলার সাহিত্য’ নামে দাগিয়ে দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু আপামর সাধারণ মানুষের চাহিদাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয় নয়। আর সেই চাহিদা বা আগ্ৰহই বটতলার প্রকাশকদের লক্ষ্মীলাভের উপজীব্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বাংলা প্রকাশনা জগতেরও যে প্রসার ঘটে তাও অস্বীকার করার উপায় নেই।
বটতলার প্রকাশকদেরই বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন প্রকাশক বলা যায়। বাংলা বই মানুষের কাছে সহজলভ্য ও জনপ্রিয় হয়। বটতলার প্রকাশকদের নিজস্ব ক্যানভাসার ছিল। বই বিক্রির জন্য তারা তাদের উপরেই নির্ভর করত। ক্যানভাসাররাই ছিলেন বই-এর মূল প্রচারক। লং সাহেবের লেখা থেকে জানা যায়, একজন ক্যানভাসারের মাসিক আয় ছিল শতাধিক। ক্যানভাসারদের আবার একটা অন্য ভূমিকাও ছিল। ক্যানভাসাররা পুরোনো পুঁথির বিনিময়ে নতুন বই বিক্রি করত। বটতলার প্রকাশকরা ও তাদের ক্যানভাসাররা না থাকলে বহু মূল্যবান ও পুরোনো পুঁথি অধরাই থেকে যেত আমাদের কাছে। অবহেলায় অনাদরে তা হয়ত নষ্ট হয়ে যেত কালের গর্ভে। এই বটতলার প্রকাশকরা নিজেদের পরিচয় নিজেরাই ছন্দে জাহির করতেন—
গ্রহন্ত গ্রাহক কারি যে জন হইবে
বটতলা আসিয়া সেই তল্লাস করিবে।
তিনশো পঁয়ত্রিশ নম্বর দোকান মাঝার
তালাস করিলে পাবে আবশ্বক জার।
এক্ষণ মালেক জেই হৈল কেতাবের
তাহারই নামেতে পুঁথি হৈল জাহের।
(মফিজদ্দিন আহম্মদ)
অনেক সমালোচক মনে করেন বিকৃত রুচির জন্যই বটতলার সাহিত্য ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়েছে তবে তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে ব্যাঙের ছাতা গজাতেও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন হয়। একটু পিছনে ফিরলে দেখা যাবে এসময় নিধুবাবু রোজ রাতে শোভাবাজার নিকটস্থ আটচালায় সংগীত নিয়ে বসতেন। শ্রী নারায়ণ চন্দ্র মিত্র ‘পক্ষীরদল’ নিয়ে মত্ত থাকতেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে বটতলা একটি কৃষ্টিচক্রের আখড়া হয়ে উঠছিল। এখানে ফুলবাবু-হাফবাবু যেমন থাকতেন, তেমন থাকতেন হরু ঠাকুর কবিয়ালরা। বিখ্যাত সাহিত্যিক ও বটতলার অন্যতম প্রকাশক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘নববাবুবিলাস’ গ্রন্থে কলকাতার বাবুদের সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘মনিয়া বুলবুল আখড়াই গান, খোষ পোষাকী যশমী দান, আড়ি-ঘুড়ি কানন ভোজন, এই নবধা বাবুর লক্ষণ!’ এছাড়া তিনি বলেছেন যে পাশা, পায়রা, পরদার, পোশাক, খানা, বারাঙ্গনা— এসবও বাবুর গুণ। বাবুদের এইসব গুণ ও লক্ষণের সমন্বয়েই বাবু-কালচারের সৃষ্টি। এই কালচার আবাদ করে বটতলা এককালে যুগধর্ম পালন করেছিল। বটতলার সাহিত্যিক ও কবিরা (এবং প্রকাশকরাও) সমাজের প্রধান শ্রেণির সাংস্কৃতিক রুচির খোরাক জুগিয়ে লোকপ্রিয় হয়েছিলেন।’
নিরপেক্ষ ভাবে বটতলার প্রকাশকদের জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে মূলত দুটি দিকের উপর আলোকপাত করা প্রয়োজন— একটি হল ‘চিরাচরিত বিষয়’ আর অপরটি হল ‘সমসাময়িক বিষয়’। বটতলার প্রকাশকরা দুটি বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বলা ভালো দুটি বিষয়েই সুচারুভাবে ‘ব্যালেন্স’ রক্ষা করে চলতেন। প্রথমটির উদাহরণ হিসেবে বলা যায় অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, রামায়ণ, মহাভারত আবার অন্যদিকে নকশা, প্রহসন, মদ্যপান, বেশ্যাশক্তি, যৌনতা, ফিরিঙ্গিপ্রীতি, আশ্বিনের ঝড়, অকাল, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি বিষয়ও তুলে ধরতেন তাদের প্রাকশিত বইতে। কখনও কখনও এমন হয়েছে একজনকে ভুল প্রমাণিত করতে আরেকজন উদগ্রীব হয়ে কলম ধরেছেন। অনেকটা এখনকার বিভিন্ন বিভিন্ন মিডিয়া হাউসগুলির মতো। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তা লেখনীর স্বাভাবিক ক্রমকে বহুমাত্রিক উন্নতির দিকে নিয়ে গিয়েছে। আবার লেখা নিয়ে যথেষ্ট পরীক্ষা-নীরিক্ষাও যে হয়েছে তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এসবই হল বটতলার দর্প।
বিশিষ্ট লেখক শ্রীপান্থের মতে, ‘সত্যি বলতে কী বিষয় বৈচিত্র্যে বটতলার কোনও তুলনা নেই। ধর্ম পুরাণ মহাকাব্য, কাব্য, সংগীত, নাটক, কাহিনি, যাত্রার বই (পরে থিয়েটারও), পঞ্জিকা, সাময়িকপত, শিশুপাঠ্য, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতিষ, অভিধান, ভাষা শিক্ষা, কারিগরি বিদ্যা— এমন কোনও বিষয় নেই যা ছিল বটতলার কাছে অজানা। সংস্কৃত, ফরাসি, উর্দু, ইংরেজি— নানা উৎস থেকে কাহিনি সংগ্ৰহ করেছেন বটতলার লেখক ও প্রকাশকরা।… বটতলা সেদিক থেকে সাধারণ বাঙালির কাছে যেন এক খোলামেলা বিশ্ববিদ্যালয়, আজকের ভাষায় যাকে বলে “ওপেন ইউনিভার্সিটি”।’
আর এই বিষয়বৈচিত্র নিয়ে নিতান্তই উদাসীন ছিলেন উচ্চরুচির ও উচ্চবর্গের ছাপাখানার প্রকাশকরা। তাঁদের কাছে এসব ছিল হীন ব্যাপার। এদিকে বটতলা কেন্দ্রিক প্রকাশকদের লক্ষ্মীলাভ ও রমরমা ক্রমে তাঁদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। শুরু হয় ব্যঙ্গবিদ্রূপ। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তির্যক মন্তব্যটি এরই পরিচায়ক। হয়ত তিনি কিছুটা হয়ে পড়েছিলেন ঈর্ষাকাতরও।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ওয়াকিবহাল ছিলেন এই বটতলার বই ও বটতলার প্রকাশকদের প্রসঙ্গে। তিনি ‘আকাশপ্রদীপ’-এ তাঁর ‘যাত্রাপথ’ কবিতায় লেখেন,
কৃত্তিবাসী রামায়ণ সে বটতলাতে ছাপা
দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা
আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট
দিদিমায়ের মতোই যে বলি-পড়া ললাট।
মায়ের ঘরের চৌকাঠেতে বারান্দর এক কোণে
দিন-ফুরানো ক্ষীণ আলোতে পড়েছি এক মনে।
আর তিনি তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন ‘চাকরদের মহলে যে সকল বই প্রচলিত ছিল তাহা লইয়াই আমার সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত হয়। তাহার মধ্যে চাণক্যশ্লোকের বাংলা অনুবাদ এবং কৃত্তিবাস-রামায়ণই প্রধান।’ এই ‘রামায়ণ’ যে বটতলায় ছাপা, তার প্রমাণ আছে ‘যাত্রাপথ’ কবিতায়। ‘চাকরদের মহলে যে সকল বই প্রচলিত ছিল’— এই উক্তির মাধ্যমে বটতলার অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করা, নস্যাৎ করা, অসম্মান করার মধ্যেই শ্রেণি অবস্থান ধরা পড়বে— আমরা বাবু, তোমরা অধঃস্তন। তোমরা ‘বটতলা’ পড়। আমরা পড়ি না। পড়লেও ঠাকুমা বালিশ চাপা দিয়ে পড়েন। আর তিনি মায়ের ঘরের বারান্দার এক কোণে গিয়ে দিনের ফুরনো আলোয়, নাকি প্রায় অন্ধকারে এই বই পড়েন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ‘চাকর মহলের বই’, ‘বালিশ চাপা দেওয়া বই’, ‘অল্প আলোয় কোণে গিয়ে পড়ার বই’ বটতলার বই, তার সূচনালগ্ন থেকেই শ্রেণি বৈষম্যের অসম্মান অর্জন করে এসেছিল।
আবার লক্ষ্য করুন এই ‘বটতলার বই’ কিন্তু পৌঁছে গেছে চাকর মহল থেকে শুরু করে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, এমনকি বিশ্বকবি নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেও। সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবর্গের মানুষ অবধি ‘বটতলার বই’-এর এই প্রসার ও বিস্তারকে কিন্তু কুর্নিশ জানাতেই হয়। আপামর মানুষের কাছে বই-এর প্রসার ঘটাতে যে বটতলার প্রাকশকরাই সমর্থ হয়েছিলেন সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ১৮৫৫ সালে জেমস লং সাহেব বাংলা বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে ১৪০০টি বইয়ের মধ্যে অধিকাংশই ছিল বটতলার বই।














