দু টি ক বি তা
রা ধা ব ল্ল ভ   চ ক্র ব র্ত্তী
দেওয়াল
এসো আজ, একান্তে — যেখানে অজস্র ফুল, কেশর, পরাগ
ছড়ানো। এসো আজ… মর্মভেদী কোনও কাহিনী শোনাই —
দ্যাখো — দূর প্রাঙ্গণে ঐ বৃষ্টি ঝাপসা হ’য়ে আসে। কাহিনী
শোনাবো তোমাকে, পৃথিবীর কোনও এক জাগরূক, চির জীবন্ত
কাহিনী। ভরাট হয়নি কিছু ফাটল যদিও বা, তবু কেটে গেছে,
তবু সয়ে গেছে অনেক বছর। এখন অধিকার চেয়ে নিতে
পারে ওইসব ফুল, যারা হাওয়ায় খুব দুলে উঠেছিল। করুণা
যেন বা কোনও তীর্থের কাক; করুণা যেন বা কোনও পথের শিশু;
এই নিরলসভাব আমাকে কোথায় নিয়ে চলে যেতে থাকে? যেখানে
বহুকাল বৃষ্টি আসেনি? ভিজে যায়নি, আড়ষ্ট অক্ষর? এমনই
একান্তে আসো আজ। শোনাবো কোনও জটিল সন্দর্ভ বরং,
হারানো বহু শব্দের বিনিময়ে। এই মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে দেখো,
তুমি-আমি কেউ এক নই। মিলিয়ে যাবে জন্মস্বাক্ষর। আবলুশ
গাছের ন্যায় দীর্ঘ অন্ধকার ছেয়ে যাবে — ছুঁড়ে ফেলবে আমার
জীবন, অস্তিত্ব, অবশেষ অর্থ না বুঝেই। অথবা শুধুই ধূসর
আলোয় ঢেকে যাবে চারদিক। ‘পুণ্যবান, হে পুণ্যবান, পরমপুরুষ’
ভেবে ঘিরে ধরবে কিছুক্ষণ, তারপর পুনরায় শূন্য হ’য়ে যাবে।
এই কি আমার শ্লেষ? শ্লাঘা? আত্মজিজ্ঞাসা বা বাস্তব, বেদনার?
ছিলাম — রয়েছি এক আবর্তনে। জাল ছিঁড়ে কখনওই বেরিয়ে আসতে
পারিনি কোনওদিন। আমার অথবা আমাদের আর্তনাদ কান পেতে
শোনে, আমাদের মাঝে গড়ে ওঠা কর্তব্যরত দেওয়াল। মন্ত্রণা?
সন্দর্ভ? নাকি অন্যকিছু? অতএব, তুমি-আমি আর কেউ নই,
শুধু এক মাঝের দেওয়াল দ্বারা চিহ্নিত হই। দাঁড়াই
একে অপরের মুখোমুখি — আমাদের আর কোনও পথ নেই
যেন। এসো আজ, একান্তে — হত্যা করি নিজেদেরই, নিজেরা।
যেমন ক’রে সময় নিকেশ করে সুযোগ বুঝে, তার বিরোধী-কে!
কীর্তি
বহু কথা ব্যয় করা হ’ল। বহু ব্যথা করা হ’ল গোপনে সঞ্চয়।
এখন বসেছি আমি। মুক্ত হইনি আমি। প্রয়োজন পরিমার্জন।
নিকটে সমুদ্র নেই কোনও। তাই আজ গভীরতা লাভের আশায়
আসি তোমার কাছে। এখানে ফুল নেই, সুবাস নেই, শুধু
বসন্ত বন্ধ্যা রমণীর মতো একা পড়ে আছে। পোশাক
খুলে রাখি কোথায়? মিথ্যেয় ঢেকে আছি। অন্তরে যেন
পচন চালু। তুমি-আমি উভয়েই পরে আছি বিরল মুখোশ—
এটুকু কথা ব্যয় করতে পারি আমি। ভাতের গন্ধ, গল্প ছড়ায়
বহুদূর— কারা সুখ-অনুভূতি পায়? কাদের মুখ উজ্জ্বল
হ’য়ে ওঠে? ঠোঁটে হাসি ফোটে? শিশুর মতন— তাদেরও
দগ্ধ শরীর— বিস্তীর্ণ; ওই দূরে পড়ে থাকা জমি-র মতো।
অন্তরে, তাদের অন্তরে জমে আছে দীর্ঘকালীন এক বেদনার
কাব্য, কথা। জলসত্রে যাও— দ্যাখো, আয়েশ ক’রে বসে
আছে কেমন আর্দ্র কলসি। আর এক নারী… কোনও এক নারী।
তবু যেন সেই নারী নয়… তবু যেন সেই নারী নয়।
ভেবেছি তোমার কথা— মনে হয়, ক্ষমা করা সাজে আমাকে। শুধু
ক্ষমা, তাতেই মানায় আমায়। বিশ্রাম নাও, এসো, এই কোলাহল
যন্ত্রণার মাঝে। ভিজে শরীর নিয়ে, নিজের ভেতরে এক পালিত
স্তব্ধতা নিয়ে। দিন নেই, গিয়েছে চলে— সব আলো মুছে যাবে;
মুছে যায়। আদুড় তুমি আজ। খসিয়ে দিচ্ছ নিজের পালক।
পাখিরা ফিরে আসে ঘরে নিয়ে হাজার দীপজ্বলা নয়, বরং
সন্ধ্যাবাতি ছাড়া নিকষ কালো রাত। সত্যি ভাবতে আমি
পারিনি কিছুতে। কীর্তিমান কিছু নই। তবু কীর্তিই পড়ে থাকে
এদিক-ওদিক, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। লাশ যেন। হিসেবের বাইরের লাশ।