ভ্র ম ণ
ফাল্গুনী ঘোষ
ভূ-স্বর্গের ডাকে । পর্ব ১ । পঞ্চনদের দেশ
খুব ছোটো থেকেই ঘুরে বেড়ানোর সখ আমার প্রবল। কোনোমতে দু-একদিন বা এক আধটা বিকেলও যদি ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মত জুটত, মন ফুরফুরে পাখী হয়ে যেত। এ হেন আমি ফেবুর ওয়ালে লোকের ঘুরতে যাওয়ার ছবি ও বর্ণনা দেখি এবং মুখ নামিয়ে বসে থাকি। কারণ ঘুরতে যাওয়ার দুটো প্রধান প্রয়োজন— সময় ও সঙ্গ। সময় যদি বা মেলে সঙ্গী’র বড় অভাব। কিন্তু আমি হাল ছাড়ার পাত্রী নই তাই বছরের (২০১৬ সালে) শুরু থেকেই আঠঘাঁট বাঁধতে শুরু করি। চেষ্টায় কি না হয়! আমিও আমার এই ছোট্টো মফস্বল শহরে খুঁজে পেয়ে গেলাম ততোধিক ছোটো অচেনা বা আধাচেনা একটি ট্যুর গ্রুপ। মাকে সঙ্গী করে থোড়-বড়ি-খাড়ার জীবনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বোঁচকা বেঁধে গ্রীষ্মের ছুটিতে বেরিয়ে পড়ার প্ল্যান রেডি হয়ে গেল। জম্মু-কাশ্মীর ভ্রমণ আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। তাই মে মাসে গ্রীষ্মের ছুটির সময়টা না বেছে উপায়ও ছিল না। উত্তর-পশ্চিম ভারতে সেসময় চাঁদিজ্বলা গরম হলেও যাত্রা পথে অমৃতসর আমাদের তালিকায় ঢুকে পড়েছিল। হাতের কাছে স্বর্ণমন্দিরটা কিছুতেই ছাড়া যায় না। তাই আমদের প্রথম গন্তব্য ঠিক হল ‘পঞ্চ নদের দেশ’।
গরমের ছুটি পড়লে রোদ গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল আমার উত্তেজনার পারদ। ধীরে ধীরে এল সেই নির্ধারিত দিন। দুটি মানুষ ততোধিক লোটাকম্বল (৩টে) নিয়ে বর্ধমানগামী শহীদ এক্সপ্রেসে চেপে বসা গেল। সহযাত্রী ভ্রমণসঙ্গী এক দাদা বৌদির সঙ্গে আলাপ দিয়ে যাত্রা শুরু হল এবং বর্ধমান পৌঁছোতে পৌঁছোতে গরম চা আর ঝালমুড়ির সঙ্গে তাদের ৭-৮ বছরের কন্যারত্ন আমার মায়ের নাতনীর পদ অধিকার করে বসল। এরপর বর্ধমানে রাত্রি আটটায় অমৃতসর মেল এক্সপ্রেসের নির্দিষ্ট এসি কুপেতে সংসার পেতে বসলাম আয়েস করে। ছত্রিশ ঘন্টা যেতে হবে, সে তো সোজা নয়। আর ‘বিশ্বজোড়া আমার আপনজন’ মনোভাবেই সেই কুপেতে কলকাতার আরেকটি অচেনা পরিবারের সাথে আমাদের জবরদস্ত আলাপ হয়ে গেল। পরের দিন কাশীর ঘাট পেরিয়ে লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত রেল গাড়ির তালে তালে সেই কুপেতে যেন বিশ্ববাংলার আসর বসে গেল। কিন্তু হায়! সুখ মানুষের কপালে বেশিক্ষণ জোটে না। লক্ষ্ণৌ স্টেশনে সেই বাঙালি পরিবারের স্থান অধিকার করল দশাসই পাঞ্জাবি, মাঝবয়সী ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা! যাদের সঙ্গে শুধু কৌতুহলী দৃষ্টি বিনিময় ছাড়া সেই রাতের মতো আর কিছুই হল না। তাছাড়া পরের দিন সকালেই আবার আমাদের নামতে হবে। তাই রুটি চিকেন খেয়ে রাতের মতো চোখ বোজা গেল।
পঞ্চনদের দেশে প্রথম দিন
‘এলাইচি চায়েএএএ…’ হাঁকে পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখি ট্রেন লুধিয়ানা স্টেশনে দাঁড়িয়ে। জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাতে সূর্যের রোদ পড়ে ঝিকমিক করছে। প্ল্যাটফর্ম চত্বরে পশমি পোশাকের পসরা। তাহলে তো পঞ্চনদের দেশে পা রেখেছি! কিন্তু নদীগুলো কই? মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে কানে এল ‘অমৃতসর পৌঁহুছনেসে প্যাহেলে বিয়াস আয়েগা।’ দেখি গতকালের সেই পাঞ্জাবী মহিলা। সে নাকি কলকাতায় গেছে, কালীঘাট দেখেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাঙালি আর যাই হোক আড্ডা জমাতে ওস্তাদ। হলই বা একজন হিন্দিভাষী আরেকজন বাঙালি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। সুতরাং দুই অসমভাষী গৃহবধূর আলাপচারীতা জমে উঠল। এদিকে দু-পাশের চলন্ত দৃশ্য থেকে উঠে আসছে একটি বা দুটি ক্ষেতের মধ্যে একটি করে বাড়ি। যে ক্ষেতের যে মালিক সে নাকি সেখানেই বাড়ি করে থাকে, এটাই দস্তুর। আর গমের পলুইগুলি সব শিবলিঙ্গাকৃতি। গম, যব, মকাই-এর হরিয়ালি ক্ষেত! হঠাৎ চোখে পড়ল চকচকে সাদা জলের রাশি। দু-চোখ ভরে শুষে নিলাম বিপাশাকে। অবশেষে হাঁকডাক, হৈ চৈ-এর মাধ্যমে নেমে পড়া গেল অমৃতসর স্টেশনে।
আমাদের ট্যুর গ্রুপের গাইড কাকুর পূর্ব পরিকল্পনামাফিক টাটা সুমোতে করে হোটেল সীতা নিবাস-এ পৌঁছোলাম। আগের রাতে প্রবল ঝড় বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া খানিক আরামদায়ক ছিল। শুনলাম যে হোটেল থেকে মাত্র দু-মিনিটের হাঁটা পথে অমৃতসরের অন্যতম আকর্ষণ ‘স্বর্ণমন্দির’। শুনেই প্রায় দুদিনের জার্নির ধকল কোথায় উধাও হয়ে গেল! এখন শুধু স্নান খাওয়া করে বিকেল হওয়ার অপেক্ষা। বিকেল ছ’টায় (এখানে আটটায় সন্ধ্যে লাগে) ছোটো ছোটো দলে নিজেদের মনের মতো করে বেড়িয়ে পড়া গেল। ছোটোখাটো বাজারের গলিপথ ধরে কয়েক পা হাঁটতেই সামনে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণমন্দিরের দরজা। পূর্ব দিকের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে এর বিশালত্ব মালুম পড়ল। মন্দিরে ঢোকার মুখেই সারি সারি জুতো রাখার জায়গায় টোকেন নিয়ে খালি পায়ে প্রবেশ। শীতকালে গরম আর গরমকালে শীতল স্বচ্ছ্ব একটি জলধারা আপনার পা ধুইয়ে দেবে। এরপর মাথায় কাপড় দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশ। যাদের কাপড় বা ওড়না নেই তাদের জন্য মন্দিরে প্রবেশের মুখে বিভিন্ন রঙের টুকরো রুমাল পাওয়া যাচ্ছিল। যাই হোক নারী পুরুষ নির্বিশেষে মাথার কাপড় যেন না সরে এরজন্য হাট্টাকাট্টা শিখ পালোয়ানেরা লাঠি ঠকঠকিয়ে নজরদারি করে বেড়াচ্ছে।
সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরে মোড়া, মধ্যে স্বচ্ছ্ব সুন্দর বিরাট জলাধার। পূর্বদিকে ঢুকে পশ্চিম পর্যন্ত যাতায়াতের পথ কার্পেট মোড়া। পশ্চিম প্রান্ত থেকে আবার সরোবরের মধ্যে পূর্ব পর্যন্ত একটি সেতুর মধ্যে দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশের রাস্তা। সেই মন্দির যার চূড়াটি সুদৃশ্য সোনার পাতে মোড়া। চারদিকে চারটি দরজা – জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সাদর আমন্ত্রণ সেখানে। মূল মন্দিরের বাঁধানো বেদির মধ্যে রয়েছেন ‘গ্রন্থসাহিব’। হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ। কিন্তু কি অদ্ভুত শান্ত কোলাহলহীন স্থান! গোটা এলাকা জুড়ে শুধু মধুর স্বরে অনুরণিত হচ্ছে নানক ও কবীরের দোঁহা। শিখদের সব থেকে বড়ো এই ধর্মস্থান হরমন্দির সাহিব বা ভগবানের দরবার। শিখগুরু পঞ্চম অর্জুন ১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এই মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন পরে ১৬০৪ সালে আদি গ্রন্থকে এখানে স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে দশজন শিখ গুরুর বাণী সম্বলিত এই আদি গ্রন্থই ‘গ্রন্থসাহিব’ নামে খ্যাত হয়।
অমৃত সরোবর থেকে ‘অমৃতসর’। এই সরোবরের জল শিখদের কাছে পরম পবিত্র। তাঁরা মাথায় ছোঁয়াচ্ছেন দেখলাম। আর আমার মতো দর্শন পিপাসুর কাছে শান্ত, স্বচ্ছ্ব, শীতল, গভীর এই জলে লাল, কমলা, সাদা, ঘন শ্যাওলা রঙের নাম জানা ও না-জানা মাছের খেলা আর জলের উপরের স্তরে স্বর্ণমন্দির ও সূর্যের গোধূলিবেলার ছটার যে লুকোচুরি— তা এক পরম প্রাপ্তি।
মন্দিরের দোতলায় অকাল তখত— গুরু গ্রন্থসাহিবের রাত্রিকালীন আবাস। প্রতিরাত্রে সোনার পাল্কিতে করে বাদ্য সহকারে তাঁকে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার সেভাবেই ভোর রাত্রে নামিয়ে আনা হয়। এখানে প্রহরের পর প্রহর কেটে গেলেও স্থানমাহাত্ম্য আপনাকে সমাহিত করে রাখবে। তাছাড়া ভুখা পেটে থাকারও প্রশ্ন নেই। লঙ্গরখানায় পাত পেড়ে উৎকৃষ্ট মানের খাবার খান। এছাড়াও কয়েকহাত অন্তর জলদান ও সুজির হালুয়া বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। দু-হাত জোড় করে ভক্তিভরে সেই হালুয়া মুখে দিলেই হুশশশ করে কোথায় যে মিলিয়ে যাবে আর অপূর্ব স্বাদের জোয়ারে আপনার মন পুলকিত হয়ে উঠবেই।
চারিদিকে এইসব দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা নেমে এল। নক্ষত্রখচিত পরিষ্কার আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে ঝিকমিকে আলো মেখে স্বর্ণমন্দির এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করল। কি অনাবিল দৃশ্য সুখ! কি অপরিমিত শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশ। হাজার হাজার শিখ সম্প্রদায়ের শৃঙ্খলাপরায়নতা, ত্যাগ, ধৈর্য, সেবাদানের মনোবৃত্তি—শিক্ষনীয় বিষয় যে কোনো মানুষের কাছে। তিন-চার ঘন্টা ওখানে সময় কাটানোর পর দলের ডাকে ফিরতে ফিরতে এক ভাবগম্ভীর আধ্যাত্মিকতায় সবার মন ভরে ছিল।
হরমন্দির সাহিব দেখে আসার পুলকে পরের দিন সকালে আরও পালক জুড়তে চলেছে— রাত্রে হোটেলের ডাইনিং হলে এই সংবাদটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। স্বর্ণমন্দিরের পাশের বাজারের ভিতর দিয়ে মিনিট দশেকের হাঁটাপথেই ইতিহাস বিজড়িত বহুশ্রুত ঘটনার আবাসস্থল জালিয়ানওয়ালাবাগ। আর অমৃতসর শহর থেকে পশ্চিমে ২৮ কিমি গেলেই ভারত পাকিস্থানের সীমান্তরেখা ওয়াঘা বর্ডার। ভারতীয় হিসেবে গর্ব বোধ করার মতো দুটি জায়গা। রাত্রি থেকেই পরের সারাদিনের কথা ভেবে শিরায় শিরায় দ্বিগুন বেগে রক্তের প্রবাহ শুরু হয়ে গেল।
পঞ্চনদের দেশে দ্বিতীয় দিন
রাত পুইয়ে সকালের রোদ উঠল যেন দেশভক্তির রঙে রাঙিয়ে। ভাবগম্ভীর মুখ নিয়ে সবাই জলখাবারের পর্ব সেরে গুটি গুটি পায়ে জালিয়ানওয়ালাবাগের দিকে এগোতে থাকলাম। সবার মুখের ভূগোল বলে দিচ্ছিল তারা ইতিহাসের পাতায় বিচরণ করতে শুরু করেছে। হোটেল থেকে হরমন্দির সাহিবের পথে গুরু মান্ডি বা গুরু বাজার— সেই বাজারের পাশ দিয়ে গেলেও কেউ দেখলাম মার্কেটিং-এ মন দিল না। পায়ে পায়ে দোকান বাজার পেরিয়ে চৌমাথার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফেরাতেই ইতিহাস বই-এর পাতা থেকে যেন উঠে এল সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ। ‘বাগ’ তো বাগান কিন্তু আমার চোখ ততক্ষণে সেই ভয়ানক ইতিহাসের সাক্ষ্য খুঁজে চলেছে। প্রাচীর ঘেরা উদ্যানের প্রতিটি ইঁটে সেই সাক্ষী, গুলির দাগ, নম্বরের খতিয়ান! তা দেখতে দেখতে কোথাও যেন হৃদয় ক্ষরিত হচ্ছিল। এই যে গুলির গভীর গর্ত ইঁটের গায়ে স্পর্শ করার আগে তা কত হৃদয়, পাঁজরা ভেদ করে মায়ের কোল শূণ্য করেছে সে ভাবতে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।
কুয়োর মুখে জালবাঁধা গর্তের অন্ধকারে ঢিল আর গুলির আঘাতের দীর্ঘশ্বাস বুঝি এখনও কান পাতলে শোনা যায়। সে কারণেই হয়ত এই বাগের গাছ গাছালির মধ্যেও কাটছাঁট করে সেই ঘটনার দৃশ্য ফুটে ওঠে বন্দুকধারী বৃটিশ সৈনিকের আদলে। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিলকে বুকে ধারণ করে শহীদ স্মরণে সবসময় অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেই আগুনে বাগের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে সর্বক্ষণ। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছিলাম এখানে ঘুরতে ঘুরতে কমবেশি বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই কথা বলার স্রোত হারিয়ে যাচ্ছিল। সুদূর পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়েও কেমন যেন একটা নাড়ির টান অনুভব করলাম। আমাদের দলের সকলে বাগের ঘাস, ইঁট পাথরে মগ্ন হয়ে কোথাও না কোথাও বসে ছিল। দেখার পালা শেষ হয়ে গেলেও ইতিহাস অনুভবের পালা সহজে শেষ হয়নি।
তবুও শেষ হতে হয়। ভাগ্যক্রমে সঙ্গীদের মধ্যে দু-চারটে বালক বালিকা, কিশোর কিশোরী ছিল। তাদের আইসক্রিম আর চকোলেট তৃষ্ণা আমাদের বাজারমুখী করল। জালিয়ানওয়ালাবাগ আর হরমন্দির সাহিবের মাঝামাঝি এলাকায় ‘হল’ বাজার, গুরু বাজারে রাস্তার উপরে খুব সহজলভ্য জিনিসের পসরা। কি পাওয়া যায় না সেখানে! শিখদের ধর্মশাস্ত্রীয় নিশান— কৃপাণ, বালার বড়ো এবং ক্ষুদ্র সংস্করণ বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পাঞ্জাবি নান-কুলচার গন্ধ ভেসে আসছে! প্রাণ জুড়াতে আছে ‘কুলফা’। এই কুলচা আর কুলফার গল্পটি আপনাদের যথাসময়ে বলব। এখন মার্কেটিং-এর সময়। পাঞ্জাবি জুতি, পাতিয়ালা, জাদাউ (Jadau) এসব কিনে ব্যাগ ভর্তি না করলেই তো নয়! কথায় আছে ‘সখের প্রাণ গড়ের মাঠ’। পকেট না হয় গড়ের মাঠ হল, সখ তো হেলাফেলার নয়।
সে ধরুন কলকাতা বা ছোটোখাটো মফস্বলেও আজকাল ‘পাতিয়ালি’ সেটের ছড়াছড়ি। কিন্তু না, না, ওই কতগুলি ভাঁজবিশিষ্ট ঢোলা পা হলেই পাতিয়ালি নয়। পাতিয়ালার সেলাই শৈলীতে আপনার মনে হবে কাছা দিয়ে ধুতি পড়ে আছেন। আর পাঞ্জাবি ‘জুতি’, আহা সে যেন মাখন। এই ফুলকাটা, চুমকুড়ি কাজের জুতো পায়ে দিলে আর হাঁটতে ইচ্ছে করবে না! তাছাড়া পাঞ্জাবিরা শুকতলা ছাড়াই জুতো পড়ে। ওদের জুতোর শুকতলা খুইয়ে কিছু পেতে হয় না বোধহয়। জুতো কিনলেন কি ফাঁসলেন। তাল মিলিয়ে পোশাক-আশাক, গয়না বাকি রাখলে এক্কেবারে বেমানান। তাছাড়া মেয়েরা গয়না, শাড়ি কিনবে না— এমন উলটো পুরান ভারতীয় সংস্কৃতিতে হওয়া ঘোরতর অন্যায়। অসংখ্য, অজস্র মীনাকারী, ফুলকারি, পোলকি আর জাদাউ-এর সম্ভার। আসলি, নকলি চিনে নেওয়ার ভার আপনার। মীনাকারী, ফুলকারি, পোলকি সম্পর্কে কমবেশি অনেকেই জানেন, তবে জাদাউ হল সবগুলি শিল্পের একত্রীকরণ। জাদাউ-এর মূল জায়গা শুনলাম রাজস্থান। মোগল আমল থেকে এই শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ। সে গয়নার চমকে দমকে আপনি পকেট ফাঁকা না করে পারবেন না।
হোটেলে ফেরা, স্নান, খাওয়া এই পরবর্তী পর্বগুলি খুব দ্রুত সারতে হল কারণ ওয়াঘা বর্ডারের বিশেষ ‘শো’-টি বিকেল ৫.৩০/৬ টায় অনুষ্ঠিত হলেও বসে দেখবার স্থান দখলদারির জন্য ৩.০০/৩.৩০-এর মধ্যেই রওয়ানা দিতে হল। চুয়াল্লিশ ডিগ্রির হলকা উপেক্ষা করে আমাদের টাটাসুমো ছুটলো দেশভক্তির জোয়ারে। সেই বর্ডার লাইন যত কাছে আসতে থাকল ততই চেকিং-এর কড়াকড়ি নজর করার মতো। মূল বর্ডারের বেশ কিছুক্ষণ আগে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল আর আমরাও জলের বোতল, ব্যাগব্যাগেজ গাড়িতে রেখে ছাতা বগলে পয়সাকড়ি হাতে নিয়ে চরণবাবুর ট্যক্সি ভরসা করলাম। অনবরত দ্বিভাষিক (ইংরাজি, হিন্দি) ঘোষণা চলছে সেই স্থানের নিষেধাজ্ঞা আর আচার-আচরণ সম্পর্কে। পিলপিলে কালো মাথার ভিড়ে নজর কেড়ে নেয় খাকি পোশাক ও মাথায় লাল মোরগঝুঁটির টুপি পরা মিলিটারিরা। কখনও বা ঘোড়ায় চড়ে দুলকি চালে চলেছে। আবার কৌতূহলী জনতার সাথে হাত মিলিয়ে সেলফিও তুলছে ঘোড়াসমেত।
নাহ, অত আগে বেরিয়ে এসেও ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’। অগত্যা ইতিউতি চেয়ে দু-চার কদম আগিয়ে পিছিয়ে মার্চ ফাস্ট করে তাল মেলাতে থাকলাম। হঠাৎ ‘বর্ডারকে উস পার সে সেনা আ রহা হ্যায়’ সমবেত জনতার বুককাঁপানো আওয়াজে চোখ মেলে দেখলাম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি আসন্ন প্রায়। চোখ গোল্লা পাকিয়ে দেখলাম দু-দেশের সৈন্যদের কৌশল, লম্ফঝম্ফ… যা শেষ হল উভয় দেশের পতাকাকে সম্মান জানিয়ে। মনটা কিসের যেন এক বেদনায় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। একটা দেশকে কেমন ভাবে টুকরো করে ফেলা হল। না কাঁটা তারের ওপাড়ের ভূখণ্ডে আমাদের আর প্রবেশের অধিকার নেই। অথচ একদিন তো এই কাঁটাতার ছিল না। ওই ভূখণ্ডও ছিল আমারই দেশ। আমাদের ভারতবর্ষ।
গরমে জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রাণে হিমের পরশ ছোয়াতে হাজির পাঞ্জাবি ‘কুলফা’। কুলফির উপর ফলকুচির সাথে সেদ্ধ নুডলস জড়িয়ে হ্রস্ব-ই-কার বিদায় নিয়েছেন আর আ-কার এসে আদর জমিয়ে কুলফা বানিয়ে তুলেছে। গরমে আরও একটু এনার্জি শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকা। আরও আছে রাস্তার দু-পাশে বাহারি হাতপাখার মেলা। আমাদের দেশ ঘরের তালপাতা পাখার মতো দেখতে হলেও তারের উপর পুরোটাই বাহারি উল দিয়ে হস্তশিল্প। হস্তশিল্প হস্তগত হল। গাড়িতে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, এই যে দু-দশদিনের জন্য বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়েছি, সে ফাঁকেই পাঞ্জাবের খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণ পরিবেশ প্রকৃতির সঙ্গে মনে মনে মাপ করে নিচ্ছি জন্মস্থানের। অথচ এই জওয়ানরা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা উপেক্ষা করে আমাদেরকে অবিরত নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে নিজেদের বাড়ি-ঘরের মায়া দূরে সরিয়ে রেখে। ভাবলে চোখে জ্বালা ধরে। আপাতত পঞ্চনদের পালা সাঙ্গ হল। রাতের ট্রেনে এবার আমরা পাড়ি দেব জম্মুর উদ্দেশ্যে। অধীর আগ্রহে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে যে ‘ভূ-স্বর্গ’। কাশ্মীরকে প্রথম ‘ভূ-স্বর্গ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর।