ভাঙা ভাঙা মানুষের গান
এক
কৃপামুষ্ঠি ঢেলে দিচ্ছো গমভাঙা বিকেলের রোদে
নরম আদুরে মাটি পদভার ধরে আছে অনন্তকাল
খরা ও বন্যার দেশে — এত ঠাসাঠাসি ভিড়
পদপিষ্টে ধন্য হওয়া ক্ষুধিত প্রেতাত্মারা
ধোঁয়া ও ধুলোর সহবাসে জীবনের কাছাকাছি শ্বাস নেয়।
আদরের রঙিন মলাট তুলির আঁচড়ে ওঠে ফুটে
প্রেমে ও অপ্রেমে, রাগে ও বিরাগে
চৌষট্টি বিলাস সম্ভবের বেদনারা নাটকীয় আলো বিক্ষেপে
আচমকা হানা দেয় স্নায়ুর ভেতরে।
দুই
কান্নাধোয়া তণ্ডুলের স্বাদ পেতে ছুটে আসছেন
পরমাত্মীয়গণ… হে কালবেলা কোল পেতে আপ্যায়ন করো
রাজস্ব চুরি উৎসবের জয়ঢাক বেজে উঠছে প্রহরে প্রহরে
কর্ণ বিকর্ণ করো বৈতালিকগণ
ভালোবাসার হাটখোলা দুয়ারে
ঢেউ আছড়ে পড়ছে উচ্ছিষ্টভোগীদের
তিন
নদীর কাছে যাই
জলের গভীরে খুঁজি
জীবনের ছায়া
ভাঙাচোরা যাপনের স্বাদ পাই
ভাঙা ভাঙা মানুষের গান পাই
বুকের গভীরে
চার
পরমব্রহ্ম জ্যাঠামশাই চোখের জলে
স্নান করাতেন শালগ্রাম শিলা
হৃদয়ের সুরভিত সচন্দন গন্ধ-পুষ্প নিবেদনে
নিজেকে উজাড় করে দিতেন কুলদেবতার থানে
খোড়োচালের সংসারে
নরম মাটির ঘ্রাণে সারাক্ষণ জেগে থাকতো খিদে
পাঁচ
ফিরবো ফিরবো করেও বহুদিন ফেরা হয়নি
তমাল সেতু বুক পেতে ডেকেছিল
আশ্রমের হরিতকী ছায়া পথনির্দেশ স্পষ্ট করেছিল
চৈত্র শেষের ঝাঁ-ঝাঁ মাঠ
ইশারায় কাঁপিয়েছিল চোখের পাতা
শত শত প্রহর কাটিয়ে গেলাম যাবতীয় সাংসারিক বিভ্রমে
শূন্যের ভেতর বড্ড ধাঁধায় পড়ে আছি
তবু ফেরা হল না তোমার কাছে
ছয়
এক সমুদ্র আশা নিয়ে জেগে আছি
এপ্রিলের মধ্যরাতে,
প্ল্যাটফর্মময় চোরাশিকারির মতো ছুটোছুটি।
ভাঙাচোরা গলায় অদ্ভুত প্রলাপের মতো বেজে চলেছে
ভারতীয় রেলের মাইক্রোফোন…
একটি নতুন ভোর দেখবার প্রবল বাসনায়
ছুটে চলেছে ঘড়ির কাঁটা…
সাত
কাঁচা লঙ্কার মতন দুপুর
বিধবা চোখের কোণে জেগে আছে খদ্দেরের অপেক্ষায়
ধেয়ে আসা চাকার পেষণে ছিটকে পড়া নুড়িপাথরের কথা
লিখে রাখে ড্রেনের জীবাণু
হামাগুড়ি দেওয়া যাপনের ভেতর
স্পন্দমান প্রাণকণা ও কারুকার্যময় দু’চারা আনা
ভূমিজ ইশারা
সমগ্র একাগ্রতা মহৎ আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়
বহুমুখী বিরোধের ভেতর আর জেগে ওঠা নুড়ি পাথরের ভেতর
খুঁজে পাই সঙ্গহীন আত্মউন্মোচন
আট
রাস্তা হাঁটিয়ে নেয়
একে একে খুলে দেয় জট
তবেই আশ্চর্য অন্ধকার পেরিয়ে যাই
ঝঞ্ঝা এলে রাস্তা ঠিক মানুষকে চিনতে পারে
মানুষও ঠিক রাস্তা চিনে নেয়
ভেতর থেকে শুদ্ধ হলে রাস্তা আপনমনে কত কিছু নতুন শেখায়
নয়
প্রতিটি স্বর প্রক্ষেপণে বুঝতে পারি
এই দুঃসময়েও গভীর টান বাঁচিয়ে রেখেছো…
ভাদ্রসংক্রান্তির ভোরে মাটির ঘরের পান্তাহাঁড়িতে
ছিটেবেড়ার ফাঁক গলে উঁকি দিয়ে যেতো জবাকুসুমসঙ্কাশ
যেটুকু গান অবশিষ্ট ছিল তা মুড়ি দিয়ে
হাড়কাঁপানো শীতকাল কাটাতাম সরষের খেতে
দশ
শ্মশানপুকুর আর কলসিদের জলচুম্বনের স্বর
ফুটে ওঠে পাকুড়ের ডালে
সন্ধ্যার তরল অন্ধকারে
অন্ত্যজ টিলার দেবী
শরীরের বসন সরিয়ে
নেমে আসে রাতের শিশিরে
এগারো
আরতির মায়াচ্ছন্ন সন্ধ্যায় তিনি নেমে এলেন
একহাতে কর্পূরদানি ও বামহাতে ঘন্টার দোদুল ঢং ছাপিয়ে
দেওয়াল চাপা পড়া শিশুদের আর্তনাদ কাঁপিয়ে দিচ্ছে
ফুল্ল কুসুমিত বেদী
তিনি এলেন দেখলেন মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন
বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দু’চোখের কোণ বেয়ে
গড়িয়ে পড়লো স্ফটিক কণা
বারো
একটি কবিতা লেখার চাইতে
জীবনভোর মর্যাদা ধারণ করে থাকা অনেক কঠিন।
ক্ষমতাবানেরা সময়কে দোষ দেন না
বরং সময়কে গুণান্বিত করেন।
ভোরগুলো আঁধার আড়াল করতে করতেই
সকাল দুপুর সেজে ওঠে
তাঁর জলভেজা আঙুলের স্নেহ-পরশ যেন
শতদল পদ্মের আভা
তেরো
কয়েকটি ম্যাগাজিনের সাথে লম্বা শুয়ে
ছুটি কাটালাম
পশ্চিমের জানালা সহায়
কস্তুরি পাতার ছায়া মায়ামেঘ আমলকী আভা
জলজ আগাছা বাদাড় আর নীল শালুক
তোমাকে প্রণাম
হাভাতেরা কংশালে তাল ঠুকে
নরনারায়ণ সেবার প্রহরে ঢেকুর তুলেছে
দু’পয়সার খামচাখামচি জীবনের কান ছুঁয়ে বয়ে যায়
ধনং দেহি সদা গৃহে…