বি শে ষ র চ না
কৌশিক ব্যানার্জী
শ্যামা সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট পান্নালাল ভট্টাচার্য
বাংলা গানের জগতে মনি-মুক্তোর অভাব কোনোকালেই ছিল না। যুগে যুগে বিভিন্ন শিল্পী তাদের কন্ঠের জাদু দিয়ে আপামর বাঙালিকে মুগ্ধ করেছেন। সে আধুনিক বাংলা গানই হোক অথবা ভক্তিগীতি অথবা রবীন্দ্রসংগীত-নজরুলগীতি-অতুলপ্রসাসী বা লোকগীতি… কিন্তু শ্যামা সংগীতের কথা উঠলে প্রত্যেক শ্রোতাই মনে করেন ‘পান্নালালের গান’ আর ‘জবা ফুল’ ব্যতীত মায়ের পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হ্যাঁ, শ্যামা সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া পান্নালাল মৃত্যুর অর্ধশতবর্ষ পরেও যেভাবে শ্যামাসংগীতের জগতে শ্রোতাদের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তেমনটা সম্ভবতঃ আর কোনো শিল্পীই পারেননি। ১৯৬৬ সালের ২৬ শে মার্চ জীবন বিসর্জন দিয়ে এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ফিরে যান মায়ের কাছে।
শাক্ত ধর্মাবলম্বী বারেন্দ্র ভাদুড়ী বংশের সন্তান যোগাচার্য নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী যৌবনেই সন্ন্যাস নেন। যোগ, পুরাণ, উপনিষদ এবং সংগীতের মাধ্যমে তিনি সাধনা করতেন। স্বয়ং রামকৃষ্ণদেবও যোগী নগেন্দ্রনাথের গান শুনে তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। এই যোগী নগেন্দ্রনাথের ভাইপো ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে সুরেন্দ্রনাথ আদি বাড়ি হাওড়া জেলার পটুয়াটুঙ্গি গ্রাম ছেড়ে চলে যান কুলগুরুর আবাস সাঁতরাগাছিতে। এই সাঁতরাগাছিতেই তার সঙ্গে বিবাহ হয় অন্নপূর্ণা দেবীর। সুরেন্দ্রনাথ ও অন্নপূর্ণা দেবীর ছিল ছয় ছেলে ও সাত মেয়ে। ১৯৩০ সালের ১৮ই জানুয়ারি যখন প্রয়াত হন সুরেন্দ্রনাথ তখন অন্নপূর্ণা দেবীর এক সন্তান আট মাসের গর্ভে। আর এই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় ১৯৩০ সালের ৫ই মার্চ বুধবার, নাম রাখা হয় পান্নালাল ভট্টাচার্য। পান্নালালের জন্মের পরই অন্নপূর্ণা দেবীর ভাই ভবরাম লাহিড়ী তাকে নিয়ে আসেন বালিতে। পান্নালালের ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা পালন করেন মেজদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। যিনি নিজে ছিলেন সে যুগের অগ্রগণ্য শিল্পীদের অন্যতম।
পান্নালালের নিজের ইচ্ছে ছিল মেজদা ধনঞ্জয়ের মতো আধুনিক গানের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি সে যুগে বাংলা আধুনিক গানের জগতে প্রখ্যাত শিল্পীদের অর্থাৎ শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখার্জী, জগন্ময় মিত্র প্রমুখের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বড় একটা সহজ কাজ ছিল না। তাই শ্যামা সংগীতের জগতে পান্নালালকে নিয়ে যান ধনঞ্জয়বাবু আর পান্নালালের বন্ধু সনৎ সিংহকে গাইতে বলেন ছড়ার গান। ধনঞ্জয়বাবুর এই সিদ্ধান্ত যে কতখানি সঠিক ছিল তা এখন আর কাউকে বলে দিতে হবে না। যদিও পান্নালালের প্রথম রেকর্ড কিন্তু আধুনিক গানের। এই রেকর্ডের এক প্রান্তে মেগাফোন কোম্পানী থেকে বেরোয় রামকৃষ্ণ চন্দের কথায় ‘শিল্পের বেলা খেলার ছলে’ এবং অন্য প্রান্তে অমিত ভট্টাচার্য মহাশয়ের কথায় ‘সেদিনের সেই গানখানি’। এরপর ধনঞ্জয়বাবু এক দিন পান্নালালকে নিয়ে হাজির হন এইচ এম ভি স্টুডিওতে এবং কর্তৃপক্ষকে বলেন যে ‘আজ থেকে এখানে ভক্তিগীতির দায়িত্ব দিন পান্নাকে। পান্না আপনাদের হতাশ করবে না’। আর এভাবেই আধুনিক গান, সিনেমায় প্লে ব্যাকের মোহ ত্যাগ করে পান্নালাল হয়ে ওঠেন কে মল্লিক (মুন্সী মহম্মদ মল্লিক), মৃনাল কান্তি ঘোষ এবং ভবানী চরণ ঘোষের যোগ্য উত্তরসূরী।
অনেকেরই অজানা যে পান্নালালবাবু ছিলেন আদ্যন্ত এক ফুটবল প্রেমী মানুষ; আপাদমস্তক মোহনবাগানী। মোহনবাগান হেরে গেলে পান্নালাল বাবু সমস্ত গানের অনুষ্ঠান বাতিল করে দিতেন। ১৯ বছর বয়সে বালির বারেন্দ্র পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার বল লাগে পান্নালালবাবুর চোখে। স্থানীয় ডাক্তারবাবুর কাছে নিয়ে গেলে তারা পরামর্শ দেন মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যেতে। মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের চেষ্টায় এবং ধনঞ্জয়বাবু ও তার স্ত্রীর পরিচর্যায় সে যাত্রায় চোখ বেঁচে গেলেও চোখের মণি সামান্য সরে যায়। এই ঘটনার পরে পান্নালালবাবু আরো বেশী করে তার মেজদা ও মেজবৌদিকে আঁকড়ে ধরেন। এক কথায় ধনঞ্জয়বাবু ছিলেন পান্নালালবাবুর কাছে আইডল। দাদাকে অনুসরণ করে হাঁটতেন, ধুতি পড়তেন এমনকি হাতের লেখার ভঙ্গিতেও পান্নালাল বাবু তার মেজদাকে অনুসরণ করতেন। আর গান গাওয়ার ক্ষেত্রে যে আইডল মেজদাকে পান্নালাল বাবু অনুসরণ করবেন এ আর আশ্চর্যের কি? পান্নালাল বাবুর মতে তার মেজদার মতো ভক্তিগীতি গাওয়া কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়।
জীবদ্দশায় তিনি ৩৬টি আধুনিক গান, ৩টি বাংলা ছায়াছবির গান এবং ৪০টি শ্যামা সংগীতের রেকর্ড করেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। ‘শ্রী অভয়’ ছদ্মনামে তাঁর লেখা ও সুর করা বহু গান সে সময় জনপ্রিয় হয়। যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে ধনঞ্জয়বাবু আসার আগেই গান গেয়ে চলে আসতেন তিনি। আবার ধনঞ্জয়বাবুর মতে বহু শ্যামা সংগীত গাইলেও ‘এমন নাড়ি ছেড়া মা ডাক’ তিনি কখনও দিতে পারেননি। একবার বিখ্যাত শ্যামা সংগীত শিল্পী কে মল্লিকের পাড়ায় একদল শিল্পী অনুষ্ঠান করতে গেলে দেখা যায় এক পক্ককেশ বৃদ্ধ কাউকে যেন খুঁজছেন। শিল্পীরা প্রশ্ন করলে জানান যে তিনিই সেই কে মল্লিক, আর খুঁজছেন পান্নালালকে। পান্নালালবাবু সামনে দাঁড়াতেই তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধ পান্নালালকে প্রশ্ন করেন ‘কী করে অমন করে মা কে ডাকতে পারিস?’ সত্যিই এ যেন এক উত্তরসুরীর প্রতি এক পূর্বসূরীর সরব শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।
সত্যি কথা বলতে কি যত দিন গেছে এই ‘মা’ নামের প্রতি পান্নালালের আকুলতা তীব্রতর হয়েছে। প্রায়শই শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন আর শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে মাকে ডাকতেন— যেন মা, না আসলে তিনিই মায়ের কাছে যাবেন। আর এই আকুলতাই ঝরে পড়ছে তাঁর বিভিন্ন গানে। আস্তে আস্তে ঘোরতর সংসারী পান্নালাল যিনি স্ত্রীর জন্য নিজ হাতে পছন্দ করে শাড়ি কিনে আনতেন অথবা নিজের তিন কন্যার চুল বেঁধে দিতেন সেই তিনিই সংসার থেকে সরতে শুরু করেন। আবার এ কথা খুব সত্যি যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারীও ছিলেন পান্নালালবাবু। একবার সহ শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করে ফেরার পথে সহ শিল্পীদের বলেন যে দক্ষিণেশ্বরে মাকে তুঁতে রঙের বেনারসী শাড়ি পড়ানো হয়েছে। পান্নালালবাবুর এহেন কথায় অবাক হলেও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ প্রমুখ শিল্পীরা মন্দিরে গিয়ে দেখলেন যে ভবতারিনী দাঁড়িয়ে আছেন তুঁতে রঙের বেনারসী পড়ে।
১৯৩৬ সালে ধনঞ্জয় বাবুর সুরে পান্নালাল বাবু রেকর্ড করেন, ‘অপার সংসার নাহি পারাবার, মা গো আমার ভরসা শ্রীপদ সঙ্গের সম্পদ বিপদে তারিনি করো গো নিস্তার…’। শেষ রেকর্ডিং পান্নালালবাবু করেন অসিত কুমার বসুর লেখা একটি গানে, ‘ওদের মতো বলবো না মা আমায় তুমি করো পার/ ভবের সকল কাজেই যদি মানতে হয় গো আমায় হার…’। এই গানেরই একটা জায়গায় পান্নালাল গেয়েছিলেন, ‘আমার মা তোর মালায় রবে/ দু-হাত হবে কটি বাস/ সেই মুখেতে বলবো মা মা/ সেই হাতে তুই অর্ঘ্য চাস…’। এই গানেই সম্ভবতঃ ইঙ্গিত মেলে তাঁর অন্তিম দিনের। আত্মহননের পথ বেছে নেন। ১৯৬৬ সালে ২৬ শে মার্চ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অকালে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে মায়ের কাছেই ফিরে যান শ্যামা সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট পান্নালাল ভট্টাচার্য। কিন্তু একথা আজ হলফ করে বলা যায়, যতদিন শ্যামা সংগীত থাকবে ততদিন পান্নালাল ভট্টাচার্য বেঁচে থাকবেন আপামর বাঙালীর হৃদয়ে।
তথ্যসূত্র:
১. আনন্দবাজার পত্রিকা/ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য (১৬ই অক্টোবর, ২০১৪)
২. সুখী গৃহকোন/ শ্যমলাল ভট্টাচার্য (জানুয়ারি, ২০০৮)