Hello Testing

ক্যা ন ভা স

সৌ মে ন &nbspপা ল

soumen_paul

ইম্প্রেশনিজম : আধুনিক চিত্রকলার সূচনা

এই পর্বে ছবি আঁকার প্রথাগত একখানা ধারা নিয়ে কথা বলব। অর্থাৎ একখানা বিশেষ আর্ট ফর্ম; যার শুরুয়াত মোটামুটি উনিশ শতকের ষাটের দশকে। অবশ্য প্রথাগত ধারা যাকে বলছি, তা আদতে ছিল সেই সময়কার ছবি আঁকার প্রথাগত ধারাকে নস্যাৎ করে এক নতুন পথের সন্ধান। চিত্রশিল্পের আঙিনায় পুরোদস্তুর একখানা বিপ্লব। যা গতানুগতিক শিল্পচর্চার আঙ্গিক ভেঙ্গে একখানা মৌলিক ধারার জন্ম দেয়। এবং একটা সময়ের পর সেই ধারাটি প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে শিল্পী সমাজের কাছে। আর অচিরেই তা মূল ধারায় পরিণত হয়। তবে আমার মতে একে মৌলিক ধারা না বলে ভিন্ন ধারা বলাই বাঞ্ছনীয়। ছবি আঁকবার নতুন একখানা কৌশল, যার পোশাকি নাম— ইম্প্রেশনিজম। যার বাংলা তর্জমা করলে মোটামুটি দাঁড়ায় প্রভাববাদ বা প্রতীতিবাদ অথবা প্রতিচ্ছায়াবাদ। আমরা এই আর্ট ফর্মকে সংকেতধর্মী চিত্রাঙ্কনও বলতে পারি।

ইম্প্রেশনিজমের ধাত্রীভূমি ফ্রান্স। উনিশ শতকের শেষের দিকে শিল্প-সাহিত্যের পীঠস্থান ফ্রান্সে উদ্ভূত এক শিল্প আন্দোলন, যা মূলত আলো, রং আর মুহূর্তের স্বাভাবিক ছন্দকে ছবিতে ধরে রাখার উপরে গুরুত্ব দেয়। প্রচলিত একাডেমিক শিল্পের বিরোধিতা করেই এর পন্থা নির্ণয়। বলা যেতে পারে ফ্রান্সের তৎকালীন কয়েকজন তরুণ শিল্পীর সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে চিত্রকলায় এক নতুন যুগের সূচনা। ইম্প্রেশনিজমের বিস্তার মোটামুটি ১৮৬০ থেকে শুরু হয়ে ১৮৯০ পর্যন্ত। তবে এই শিল্প আন্দোলনকে একখানা নির্দিষ্ট কালখণ্ডে বেঁধে রাখা যাবে না। এর নির্যাস ছড়িয়ে পড়েছে ভাবীকালের গর্ভে। সৃষ্টি হয়েছে নানান ধারার।

ক্লদ মোনে ও অগাস্ত রেনোয়া  (ছবি: গুগল)

ইম্প্রেশনিজম কী? ছবি আঁকার জগতে শুধুই তোলপাড় ফেলে দেওয়া এক আন্দোলন? তারুণ্যে ভরপুর কতিপয় ফরাসী ছবিআঁকিয়ের অচলায়তন ভাঙবার প্রয়াস? না, এ-এক নতুন ভাষার জন্ম। ছবি আঁকার পদ্ধতিগত পরিবর্তন। শিল্পীমনের ভাবনা ও তার প্রয়োগশৈলীর নব্য পন্থা। ইম্প্রেশনিজমের মূল বৈশিষ্ট্য ছবির বিষয় আর আলোর প্রভাব। ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা তাঁদের আঁকায় দ্রুত লয়ে তুলির ব্যবহার চালু করলেন। ছোট ছোট তুলির আঁচড়, যা গতিময় করে তুলল ছবিকে। উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার, আর তাতে সুস্পষ্টভাবে আলো-ছায়ার খেলা। এতদিনের ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বদলে সমসাময়িক প্রকৃতি, পারিপার্শ্বিক, নগরজীবন, প্রাত্যহিক সমাজ, বিনোদন সর্বোপরি সাধারণ মানুষ ছবির বিষয় হয়ে মূর্ত হল ক্যানভাসে। এতদিন যা ছিল স্থাপত্য, বা অন্দরমহলের ঘেরাটোপে, সেই স্থবিরতা ভেঙে খোলা আকাশের নীচে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জনজীবন হয়ে উঠল আঁকার বিষয়। এই প্রসঙ্গে হাংরি আন্দোলনের কথা মনে পড়ে যায়। কবিতার অন্যরকম আঙ্গিক নিয়ে পাগলপারা এক খরস্রোতে যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেকদূর। যে কোনও নতুন কিছুতেই আমাদের কৌলিন্য হারানোর ভয়। তাই প্রথমদিকে তীব্র সমালোচিত হলেও, ইম্প্রেশনিজম পরবর্তীতে পাশ্চাত্য চিত্রকলার এক অনন্য প্রভাবশালী আন্দোলন হয়ে ওঠে। আর তা থেকেই জন্ম নেয় পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমসহ আধুনিক চিত্রকলার সুদীর্ঘ ঝলমলে ইতিহাস। ছবি আঁকার সেই ঐতিহাসিক পথে জন্ম নেয় নতুন নতুন আর্ট ফর্ম, যেমন– ফভিজম, কিউবিজম, এক্সপ্রেসনিজম বা আরও খানিক এগিয়ে বিমূর্ত শিল্পকলা। আর একাডেমিক শিল্পের নিয়মকানুন ভেঙে ছবিতে ইম্প্রেশনিজম নিয়ে আসার ভগীরথ — ক্লদ মোনে, অগাস্ত রেনোয়া, এডগার দেগা, কামিল পিসারো প্রমুখ পরবর্তীকালের স্বনামধন্য শিল্পীরা।

LUNCHEON OF THE BOATING PARTY, শিল্পী: অগাস্ত রেনোয়া  (ছবি: গুগল)

ইম্প্রেশনিজম মূলত প্রচলিত বাস্তবধর্মী চিত্রকলার বিরোধিতা করে গড়ে ওঠে। শিল্পকলার এক নতুন ধারার সূচনা করে। দেব-দেবীর ছবি, মন্দির, গীর্জা এই সব বিষয় থেকে ছবিকে চার দেয়ালের বাইরে এনে ফেলা। ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা জরুরি প্রশ্ন তোলে, ছবিতে মানুষ কোথায়? কোথায় প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, শহর, গ্রাম? কোথায় আমাদের দৈনন্দিন জীবন? কোথায় আলো-ছায়ার দোলাচল? কোথায় প্রাণের ছোঁয়া? কেন এসব ব্রাত্য হয়ে থাকবে রঙে-রেখায়-ক্যানভাসে? ছবি আঁকার এত দিনকার নিয়ম-কানুনের খবরদারি মানতে না-চাওয়া এই তরুণ শিল্পীগোষ্ঠী ১৮৭৪ সালে প্যারিসে একখানা অন্যরকম প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। সেখানে শিল্পী ক্লদ মোনের আঁকা Impression, Sunrise শিরোনামের একটি ছবি প্রদর্শিত হয়। চিত্র সমালোচক লুই লোয়ার খানিক ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ওই চিত্রশৈলীকে ”ইম্প্রেশনিজম” আখ্যা দেন। আর এই নামটাই পরবর্তীতে গোটা আন্দোলনের পরিচয় হয়ে ওঠে।

ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা ছবিতে আলো ও তার প্রভাবকে বাস্তবসম্মতভাবে ধরতে চেয়েছিলেন। প্রকৃতির মধ্যে বসে সরাসরি প্রকৃতিকে আঁকা। প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে আলোর তারতম্যকে ফুটিয়ে তোলা। তুলির দৃপ্ত আঁচড়, যা ছবিকে আরও বেগবান আর প্রাণবন্ত করে তুলল। বিশুদ্ধ রঙের প্রয়োগ, যা ছবিকে করে তুলল আরও উজ্জ্বল। নগরজীবন, নাচের আসর, ঘোড়দৌড়, কফি হাউস, উদ্যান… এইসব বিষয়বস্তু শিল্পকলাকে করে তুলল গণমুখী, আকর্ষণীয়। ছবির মধ্যে এ-যেন নিজেকে খোঁজার প্রয়াস। যা এতদিন প্রচলিত একাডেমিক শিল্পকর্মে এতখানি দৃশ্যমান ছিল না। ইম্প্রেশনিজম, শিল্পের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। চিত্রকলাকে বাস্তববাদ আর ঐতিহ্যের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করে ছবিতে এনেছিল এক মায়াবী অনুভূতি। এক স্বতস্ফূর্ত টাটকা আবেগের সংযত প্রকাশ। এ-প্রসঙ্গে চিত্রশিল্পী এবং সমালোচক রবীন্দ্রভবনের প্রাক্তন কিউরেটর শ্রী সুশোভন অধিকারীর একখানা মন্তব্য মনে পড়ে যায়। তিনি আমারই একখানা ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধনে এসে বলেছিলেন— ছবি, আমরা যা দেখছি, শুধুমাত্র তার বিবরণ নয়। আমরা যা দেখছি না, অথচ অনুভব করছি, তারও বিবরণ।

ওয়াটার লিলি সিরিজ, শিল্পী: ক্লদ মোনে  (ছবি: গুগল)

ইম্প্রেশনিজমের নবধারায় সম্পৃক্ত হয়েই পরবর্তীতে ছবি আঁকার নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যায়। যেমন– পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম (১৮৮৫-১৯১০), ফভিজম (১৯০৫-১৯১০), কিউবিজম (১৯০৭-১৯১৫), এক্সপ্রেশনিজম(১৯০৫-১৯৩০)। এইসব ধারায় উঠে আসেন ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, পল সেজান, পল গগ্যাঁ বা আরও পরে অঁরি মাতিস, পাবলো পিকাসোর মতো কালজয়ী শিল্পীরা। এদের সম্পর্কে অন্য কোনও পর্বে নিশ্চয়ই আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

ইম্প্রেশনিজমের অগ্রগণ্য শিল্পী ক্লদ মোনে। তাঁর আঁকা Water Lilies, Rouen Cathedral ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের এক অনন্য চিত্রায়ন। যেমন শিল্পী এডগার দেগার আঁকা The Ballet Class বা Dancers at the Barre। দেগা শুধুমাত্র একজন চিত্রকর নন। তিনি একজন বিখ্যাত ইম্প্রেশনিস্ট ভাস্করও বটে। তাঁর একটি অনন্য ভাস্কর্য– Little Dancer Of Fourteen Years। এক তরুণ ব্যালে নৃত্যশিল্পীর প্রাণবন্ত ব্রোঞ্জমূর্তি। এছাড়া শিল্পী রেনোয়ার আঁকা Luncheon of the Boating Party, কামিল পিসারোর The Harvest, Spring Series ছবিগুলো ইম্প্রেশনিজম আন্দোলনের দিকচিহ্ন হয়ে রয়েছে। নারী ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের মধ্যে বার্থ মেরিসোর নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর আঁকা The Crafle ছবিটি মাতৃত্ব আর নারীত্বের এক সংবেদনশীল মিশেল।

ইম্প্রেশনিজমের প্রভাব শুধুমাত্র চিত্রকলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তা ছড়িয়ে পড়েছিল সঙ্গীত, সাহিত্য, ভাস্কর্য এমনকি চলচ্চিত্রের জগতেও। মার্সেল প্রুস্ত, ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসে ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়— বাস্তবকে সরাসরি বর্ণনা না করে অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ।

এক কথায় এটা বিপ্লব। চিত্রকলায় নতুন প্রযুক্তি, নতুন ভাবনা, আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর বিষয়বস্তু নিয়ে হাজির হল পৃথিবীর তাবৎ শিল্পরসিকদের সামনে। যা পরবর্তী সমস্ত শিল্প আন্দোলনের মঞ্চ তৈরি করে দেয়। ছবিতে প্রচলিত নিখুঁত ড্রইং, মসৃণ টেক্সচার, ধর্মীয় পৌরাণিক প্রেক্ষাপটকে নস্যাৎ করে আলো-ছায়ার ব্যবহার। কালো রঙের বদলে গাঢ় সবুজ, বেগুনি, নীল রঙ। রাজা-রাণী, দেবতার পরিবর্তে শিল্পীর ক্যানভাসে সাধারণ মানুষের উত্থান, দৈনন্দিনের আনন্দময় প্রকাশ, এটাই ইম্প্রেশনিজমের সারমর্ম। যেমন, শিল্পী গুস্তাভ কাইবোটের আঁকা Paris Street অথবা Rainy Day। যেখানে প্যারিস শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অঝোর বৃষ্টির দৃশ্য। এমনটা আগে দেখা যেত না। ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের সময় থেকে টিউব রঙের প্রচলন শুরু হয়। ফলে প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে নিসর্গ দৃশ্যকে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে ক্যানভাসে তুলে আনা আরও সহজ হয়।

১৮৬০ থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই আন্দোলন ১৮৮০-র সময়ে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এবং ১৮৯০-র দশকে ধীরে ধীরে পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমে সার্থক রূপান্তর ঘটে। ছবি আরও বেশি করে মানুষের কথা, তার আনন্দ-নিরানন্দের কথা বলতে শুরু করে। আরও বেশি করে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকে মিলিয়ে দেয়। অনন্য অনুভূতির রঙে রাঙিয়ে দেয় আবেগের অন্তরমহল। যা তুমি দেখতে পাচ্ছ না, কিন্তু অনুভব করছ, তাই ফুটিয়ে তোলা ছবিতে, ভাস্কর্যে। আরও বেশি করে মূর্ত হয়ে ওঠা রবি ঠাকুরের গানে— চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে!

ক্রমশ