গ ল্প

সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়

sabarna

একটি শিশির বিন্দু

‘তোর আজ ছুটি?’

গলায় বেশ ঝাঁঝ নিয়ে কথাটা জিজ্ঞাসা করল বর্ণা। অনির নিস্তব্ধতা সবটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। তবুও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে বর্ণার। নিজের মনকে শান্ত করে আবার রিপিট করল প্রশ্নটা। অনি এবার ঢোঁক গিলে উত্তর দিল,

‘হ্যাঁ’

‘বলিস নি তো।’

বেশ আমতা আমতা করে অনি বলল, ‘ভুলে গেছি।’

‘ভুলে গেছিস নাকি লুকিয়ে যেতে চেয়েছিস! পাছে তোকে দেখা করতে বলি! হয়তো অন্য প্ল্যান আছে। নিজের বউ, বন্ধু, বেড়ানো… সব প্রায়োরিটি লিস্ট শেষ হলে তারপর তো আমি… তোর ইচ্ছেপুতুল!’

গলাটা একটু চড়িয়ে অনি বলল, ‘ন্যাগ করিস না তো।’

‘একটানা তিনমাস আমার সাথে কনটিনিউ মিস বিহেভ করে গেলি। যা নয় তাই বলেছিস। তবুও আমি ধৈর্য ধরেছি। চেষ্টা করে গেছি সবটা ঠিক করার। ভেবেছি অফিসে এত চাপ, রিনার সাথে তোর ম্যারেড লাইফের ক্রাইসিস, নিজের ফ্রাসটেশনটা প্রকাশ করারও তো একটা মানুষ চাই। প্রয়োজনে বন্ধু হব, ভালোবাসব অথচ প্রবলেমে সেটা ফেস করব না তা হয় না। তোর কথাগুলো মারাত্মক হার্ট করলেও, পাশে ছিলাম। রোজ খবর নিয়েছি। আর তুই? তোর একবারও মনে হল না তিনমাস পরও আমার সাথে একবার দেখা করা দরকার যেখানে তুই জানিস তোর ভার্বাল অ্যাবিউজে আমার মনের ঠিক কী অবস্থা!’

‘ওসবকে আমি প্রশ্রয় দিই না।’

কথাটা শোনামাত্রই শক্ত হয়ে উঠল বর্ণার দুটো চোখ।

 

গত দু-বছরে অনিকে এতটা অচেনা মনে হয়নি। কথাগুলো শুনে মাথাটা জ্বলে উঠতেই বর্ণা বলল, ‘বিশ্বাসঘাতক। আমারই ভুল, একবার সবটা স্পয়েল করার পরও আবার বিশ্বাস করেছি তোকে। এতগুলো বছর আমার অপচয় হয়েছে আজ বুঝতে পারছি পরিষ্কার। তোর মতো বিশ্বাসঘাতকরা কোনোদিন ভরসার যোগ্যই নয়। আর তোকে ভালোবাসি বলে আমি দিনের পর দিন আমার পরিবারের মানুষগুলোর সাথে অন্যায় করে গেছি। আজকের পর আর কোনোদিন আমি তোর মুখও দেখতে চাই না।’

ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে ফোন রাখল বর্ণা। হোয়াটসঅ্যাপ আর কনট্যাক্টে আগে ব্লক করল নাম্বারটা। অনির মিষ্টি কথার ফাঁদে আর কোনোভাবেই নিজেকে জড়াবে না বর্ণা। ফোনটা খাটের একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে বেশ কটা থাপ্পর মারল। কেন যে বারবার বিশ্বাস করে ফেলে অনিকে! সেই কোন ছোটবেলায় ক্লাস নাইনে ওদের পরিচয়। বর্ণার দিক থেকে ছিল লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। তারপর স্কুলের শেষটা, কলেজ, হায়ার স্টাডি অনিই ওর সব। বেস্ট ফ্রেন্ডই হোক বা ভালোবাসার মানুষ। এই মানুষটার জন্য কত রিস্ক নিয়েছে, কী না করেছে, তারপর হঠাৎ বারোবছর পর একটা সামান্য ঝগড়া ভুলবোঝাবুঝিতে আলাদা হতে চাইল অনি। বর্ণা টের পাচ্ছিল অনি তখন নতুন শহরে, নতুন চাকরি, নতুন জীবনের হাতছানি। আর বর্ণা তখনও চাকরির চেষ্টা করছে। কোথাও বদলে গেছে অনি। অনেক কান্নাকাটি করেও কোন লাভ হয়নি। অনি ফেরেনি। বর্ণা তখন পুরোপুরি ডিপ্রেশনে। কী করছে কী হচ্ছে সব কেমন ঘোলাটে হয়ে আসছে ওর। না নিজের কথা কাউকে বলতে পারে, না বোঝাতে পারে। মনে হয় নিজেকে শেষ করে দেবে, তাও পারে না। সম্পর্কটা যেতে যেতে বর্ণার শিরদাঁড়াটাই ভেঙে দিয়ে গেছে যেন।

কিন্তু মেয়েমানুষ বলে কথা। কতদিনই বা ঘরে ফেলে রাখা যায়। মেয়ের মনের অবস্থা না জেনেই রাজীবের সাথে বিয়ের ঠিক করলেন বর্ণার মা-বাবা। বর্ণা তখনও কিছু বলতে পারল না৷ 

ওর অতীত জেনেও এগিয়ে এল রজীব। নতুন শহরে গেলে যদি অনিকে ভোলা সহজ হয়, সেই চেষ্টায় রোজ নিজের সাথে লড়াইটা শুরু হল বর্ণার। কিন্তু বর্ণা বুঝতে পারেনি লড়াইটা এতটা কঠিন। রাজীবের স্পর্শগুলো ছ্যাঁকার মতো সারা শরীর পুড়িয়ে দিত ওর৷ মুখ টিপে চোখ বুজে কাঠ হয়ে পড়ে থাকত বর্ণা। নিজেকে বোঝাত, রাজীবের কী দোষ! ওটা সম্পূর্ণ ওর নিজের সমস্যা যে অনির স্পর্শ ছাড়া ওর শরীর মন কোনটাই জাগে না। অগত্যা জীবনটাকে একটা অভ্যাস করে তোলার চেষ্টা চলল পুরোদমে। যন্ত্রের মতো সংসার সামলায় সবাইকে ভালো রাখে, আর একা হলেই অনির জন্য চোখের জল ফেলে। কোথাও বিশ্বাস করে অনি একদিন ঠিক নিজের ভুল বুঝতে পারবেই সেদিন ক্ষমা চাইবে অনি। মনের ভেতর যার অন্যবসন্তের হাতছানি সে বাইরে নিজেকে খাপ খাওয়াবে কী করে!

ফলে রাজীবের সাথেও নানান সমস্যা দেখা দিতে থাকল। রাজীবের ভালোবাসাটা বুঝেও সেখানে পৌঁছোতে পারেনি বর্ণা কখনও। মাঝে কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে থাকত অদৃশ্য অনি। কতবার ঝগড়ার সময় নিজের অজান্তেই বর্ণা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছে অনিকে ছাড়া আর কাউকে মনে জায়গা দিতে পারবে না। রাজীব এত সবের পরও একটা মুহূর্তের জন্য বর্ণাকে নিজের জীবন থেকে আলাদা করে দেওয়ার কথা ভাবেনি। কিন্তু বর্ণা ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠছিল নিজের সত্যিটাকে আড়াল করে দিনের পর দিন যন্ত্রের মতো সংসারটা করতে। মাঝে অনির সাথে কিছু বছর কোনো যোগাযোগ না রেখেও প্রতিটা মুহূর্ত অনির উপস্থিতি! উফ, কী দুর্বিষহ! বিয়ের দুটোবছর কাটতে না কাটতেই হঠাৎ একদিন অনির ফোন। প্রথমে ধরেনি বর্ণা। তারপর আর থাকতে পারে নি। ওভাবে কান্নায় ভেঙে পড়া, ক্ষমা চাওয়া, বর্ণাকে আবার একবার দেখতে চাওয়া, কোনকিছুকেই অগ্রাহ্য করতে পারেনি বর্ণা। তখন অনির রিনার সাথেও সম্পর্ক তলানিতে। অফিসেও চরম টালমাটাল অবস্থা। মায়া হল বর্ণার। অনি তো একমাত্র বর্ণার কাছেই নিজেকে ওপেন করতে পারে। অনি নিজের ভুল বুঝেছে এটুকু ভেবে বর্ণা মনে মনে খুশি ছিল কোথাও। এভাবে নিয়তির আবার ওদের কাছে আনবে কে জানত!

 

সন্দেহটা দানা বাঁধল সেদিন যেদিন রিনার অপারেশনের জন্য অনি দোষারোপ করল বর্ণাকে। রিনার হিসটেরেক্টমি হবে। বর্ণা ওর এক ডাক্তার বন্ধুর কনট্যাক্ট দিল সেকেন্ড অপিনিয়নের জন্য। কিন্তু অনি মেসেজে লিখল, ‘তুই চাস যাতে রিনার ক্ষতি হয়।’ প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারেনি বর্ণা। বর্ণা নিজেও তখন ফুল বেডরেস্টে, স্লিপডিস্কের ব্যথায় কাতর। কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না অনির। আঘাত পেয়ে কথা বন্ধ করল বর্ণা। আবার যথারীতি পাঁচদিন পর অনি একইভাবে ক্ষমা চাইল অনি। তবে মনটা কোথাও একটু শক্ত হয়ে গেছিল বর্ণার। সেদিন ও বলেছিল, ‘যদি আমায় ভালোবাসিস আজও, তবেই আমি এই সম্পর্কে এভাবে থাকব। কারণ তোর সাথে সম্পর্কে থাকার অর্থ রাজীবকে ঠকানো। কিন্তু যদি আমার এই ভালোবাসা একতরফা হয় তাহলে আমি সরে যাব পুরোপুরি।’ বিশ্বাস এমন এক বস্তু ভাঙা দাগে হাতুড়ির আঘাত এলে আরও চির বাড়ে। মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছিলই অনির নানান আচরণে। দিনে পাঁচটা মিনিটও কথা বলা সম্ভব হয়না, বর্ণা যাই বলে তাই সম্ভব নয়, সবেতেই অজুহাত রেডি অনির। যখন অনির মনে হত তখনই দেখা করতে আসত, বছরে হয়তো হাতে গোনা পাঁচদিন, এর মাঝে বর্ণার হাজারও বিপদ এলেও খবরটুকু নেওয়ার প্রয়োজন মনে করত না অনি। বর্ণা পরিষ্কার টের পাচ্ছিল অনি কোথাও মিথ্যে বলে আটকে রাখতে চাইছে। কোনো টান আর নেই ওর প্রতি। অবহেলা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াল এবছর অনির জন্মদিনটা একসাথে কাটাবে বলেছিল বলে তুমুল ঝগড়া করল। বারবার বলতে শুরু করল, ‘তুই আসলে চাস সব ছেড়ে তোর সাথে থাকি। আমার ক্ষতি করতে চাস।’ সেই থেকে টানা তিনমাস যা নয় তাই কথা। অথচ কোনদিনও বর্ণা কী করেছে তা চোখেও পড়েনি অনির। সবটা কেমন পরিষ্কার হয়ে উঠছিল বর্ণার সামনে। আগে কখনও যা মনে হয়নি এই কটা মাস পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে পৃথক করে দিয়ে গেল অনি আর রাজীবের পার্থক্য।

 

আজ পয়লা জানুয়ারি। একটা নতুন বছর শুরু। বর্ণা ঘুম থেকে উঠল একটু দেরি করে। কাল অনিকে কথাগুলো বলতে পেরে মনটা কেমন হালকা, ফুরফুরে লাগছে। এতবছরের চাপ ভাবটা আর নেই। মিথ্যের ভ্রম ভেঙে গেলে বোধহয় মানুষ এভাবেই মুক্ত হয়ে যায়। যে দরজা একবার বন্ধ করে সেটা আর খোলে না কখনও। এতগুলো বছর এত চেষ্টা করেও যেগুলো চোখে পড়েনি রাজীবের অনুপস্থিতি আর গতকালের ঘটনা সবটা আয়নার মতো ঝলকে উঠল বর্ণার সামনে। দুদিনের জন্য বাইরে গেছে রাজীব। অথচ যাওয়ার আগে বর্ণার প্রেসার থেকে শুরু হয়ে অ্যাংজাইটির ওষুধও কিনে রেখে গেছে ঠিকমতো। জানে বর্ণা ভুলে যায়, মোবাইলে এলার্ম সেট করে দিয়ে গেছে। আর বর্ণা, এই মানুষটাকে এতগুলো বছর নিজের মনের কাছে আসতেই দিল না! একটা মেয়ে সম্পর্কে আর কী চায়! সম্মান। এই বয়সে পৌঁছে একটু যত্ন, খেয়াল রাখা, পরস্পরকে বোঝা। কেমন বুকটা ভারি লাগছে বর্ণার। রাজীবের মুখটা মনে পড়লেই কান্না ঠেলে আসছে চোখে। ফোনটা হাতে নিল বর্ণা। হোয়াটসঅ্যাপে রাজীবের নামটা সার্চ করে লিখল, ‘নতুন বছরে কথা দিলাম এতবছর যা থেকে বঞ্চিত রেখেছি, তা আজ থেকে সম্পূর্ণ তোমার।’

পাঁচমিনিটও হয়নি বেজে উঠল ফোন। রাজীব ফোন করেছে। বর্ণা ফোন তুলতেই রাজীব বলল,

‘কী হয়েছে তোমার? ঠিক আছো?’

লাজুক মুখে বর্ণা চুপ রইল খানিকক্ষণ বিছানার দিকে। তারপর বলল, ‘রবি ঠাকুরের সেই লেখাটা পড়েছ, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিসের ওপর একটি শিশির বিন্দু’!

‘মানে কী? আর ইউ ওকে?’

‘এত কাছে ছিলে, চিনতে চিনতে আর নিজেকে পার করতে পাঁচটা বছর লেগে গেল। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। ভালো লাগে না তোমায় ছাড়া!’

কেউ আর কোনও কথা বলতে পারছে না। ছেলেরা কাঁদলে কেমন লাগে বর্ণা তা জানেনা, তবে বুঝতে পারছে রাজীবের গলা কাঁপছে, ধরে আসছে, জলে। বর্ণা টের পাচ্ছে ওর চারপাশটা কেমন ম ম করছে রজনীগন্ধা ফুলে।