ভ্র ম ণ
ফাল্গুনী ঘোষ
ভূ-স্বর্গের ডাকে । পর্ব ৩ । স্বর্গীয় উপত্যকা
স্বর্গীয় উপত্যকা ১
এ এক অদ্ভূত মনের টানাটানি। আট/দশ ঘন্টা পেট্রলচালিত চারচাকার সর্পিলাকার দুলুনি— ভাবলেই পেট মোচড়। কিন্তু জম্মু, শ্রীনগরের যোগসূত্রে উড়ানসঙ্গী হওয়ার রাস্তাও নেই। নানা মুনির নানা মতে প্রকৃতির তালে মুক্ত জীবনানন্দ হওয়ার আগ্রহই ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেছিল। সে লোভ যে আমারও ছিল না তা নয়! সুতরাং ভোর পাঁচটার হালকা ঠান্ডায় কড়া কফি গলায় ঢেলে দুগগা দুগগা বললাম। গাড়িতে আসন অধিকার করে দেখি ‘সব শেয়ালের এক রা’— হাতব্যাগ হাতড়ে হাতের পাঁচ ‘আভোমিন’-কে হাতের মুঠোয় রাখছে। কে জানে বাবা আট/দশ ঘন্টা জার্নি হলে ভোর পাঁচটা থেকে ঘুম চটকানোর কি দরকার! এমন সময় বিরক্তিভরা আমাদের মুখগুলির উপর গাইডকাকুর জোরালো দেঁতো হাসির ব্যোম— “তাড়াতাড়ি করুন সব! শ্রীনগর ঢোকার মুখে যা জ্যাম হয়!” বুঝলুম, সেই জ্যামে ফেঁসে গেলে মাখনের মত গাড়ির শিটের র্যাপারে জমে থাকব বহুঘন্টা ধরে। উফ! এর নাম নাকি কাশ্মীর ভ্রমণ!
দু-দিকে কাটরার মত উচ্চতার পাহাড়, কিন্তু ন্যাড়া ন্যাড়া। দুপাশে ধুলো উড়ছে, প্রকৃতিকে গুঁড়িয়ে রাস্তা, রেলপথ— ঘটাং, ঘিটিং— সৌজন্যে জেসিবি মেশিন। এদিকে আবার জম্মু-কাশ্মীর পোস্টপেড, উপরি পাহাড়ি এলাকা হওয়ার দৌলতে নিত্য নৈমিত্তিক খবর নেই। “কাশ্মীরের উগ্রপন্থার অবস্থার খোঁজ খবরটা কেউ একবার নাও হে! সেখানে গিয়ে আবার চারদিন থাকতে হবে!”—সহযাত্রীর ব্যাজার কন্ঠ মন গুমরে দেয়। বেশ ‘খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে’—এ যাত্রায় কি যে অপেক্ষা করছে। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনা নামছে। পাহাড়ের বুকে খাঁজে খাঁজে ফুটে আছে লাল, নীল, হলুদ স্বপ্নের ফুল। এইসব স্বপ্ন তাহলে মিথ্যে হয়ে যাবে! সব স্বপ্ন মুছে শুধু রুক্ষ পাথর আর ধুলোবালি চোখ জ্বালাচ্ছে। দেড়-দু ঘন্টা চলছি তো, কিন্তু সব আশায় জল ঢালা। এদিকে বিরক্তিতে খিদে ঘুম সব পেয়ে যাচ্ছে।
বিরক্তিতেই হবে! না হলে বাসের গন্ধেই তো পেটের নাড়িভুঁড়ি বিদ্রোহী প্ল্যাকার্ড হাতে ধরে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। ঘ্রাণেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠেছে। মনে মশলা মুড়ির ডাক। নারকেল, শসা, পেঁয়াজ, ছোলা, চানাচুর, আচারের তেল—আহ কি সুবাস! যেন চোখ খুললেই একঠোঙা হাতে পাবো। আর কি আশ্চর্য, হুডিনি, পি সি সরকার ধারে পাশে না থাকলেও পেয়ে গেলাম হাতে গরম এক ঠোঙা মুড়ি। তখন গাইড কাকুকে পি সি সরকারের তাজ পড়িয়ে দিতে দুবার ভাবিনি। চা পানের জন্য মুড়ির ঠোঙা হাতে ঝুলন্ত এক চা পট্টিতে ঝাঁপিয়ে পড়তেই কলঘরের লম্বা লাইনের হুড়ো। সবাই প্রথম হবে। ভাবলাম আমিই তাহলে শেষ থেকে প্রথম হই। পার্শ্ববর্তী আখরোট গাছের আইডেন্টিটির পরীক্ষা নিরীক্ষা চলতে না চলতেই খবর এল সেই ঝুলন্ত বাড়ির নড়বড়ন্ত লোহার সিঁড়ি বেয়ে ট্রেক করতে পারলেই ছাতে নাকি আরেকটি কলঘরের সুবিধা আছে। পবনপুত্রকে পেন্নাম ঠুকে পবনের বেগে ছাতে উঠেই মনে এল বহু প্রচলিত এক প্রবাদ- ‘কষ্ট না করলে সত্যিই কেষ্ট মেলে না।’
স্তরে স্তরে পাহাড়গুলো এ-ওর গায়ে মিলিয়ে গেছে যে শেষ বিন্দুর রেশটি রেখে সেখান থেকে সবুজের বুকে চেরা সিঁথির মতো নুড়ি বিছানো জলপথ রেখার এক পথ। কোথাও কোথাও বুঝি এক আধ খাবলা সবুজ কেউ ছিঁড়ে নিয়ে পাথরের রুক্ষতাকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে। বিনুনি পাকানো কয়েক গাছি সবুজ নিপুণ পারিপাট্যে সিঁথির অপর প্রান্তে বিছানো। পাহাড়ের খাঁজে ভাঁজে পাহাড়িয়া জীবনের টুকরো ইতিউতি ছড়িয়ে। এবার তো তাহলে চারধারে চোখ চালাতে হচ্ছে। জ্ঞানচক্ষুর উদয় হল।
স্বর্গীয় উপত্যকা ২
সেই মেলে রাখা চোখে উজাড় করে নিজের ঘন সবুজ শ্যামলিমা দিয়ে ভরিয়ে দিল পাটনিটপ হিলের নেশাধরানো সৌন্দর্য। এন এইচ ৪৪ এখানে ঘন সবুজ দেবদারু ও পাইনকে সাত পাকে বেঁধেছে। তখনও মোদিজী চেন্নাই-নাসরি টানেল উদ্বোধন করেননি সেও আমার কপাল। তাই শুভদৃষ্টি হল উধমপুর জেলার শিবালিক পর্বতমালার হিল অঞ্চলটির সঙ্গে। রাত্রিবাসের রোমাঞ্চ না লাগলেও গা ঘেঁষাঘেঁষির ছোঁয়ায় রাজত্বসহ ‘পাহাড়ের রানি’র হালফিলের ধারণায় হৃদয়ের উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটল বলাই বাহুল্য। পাটনিটপ হিলকে আদর করে ঐ নামেই ডাকা হয় যে। কিন্তু কালচে সবুজের মধ্যে কোন ভুলে যাওয়া প্রেমিকের বিরহে রানীর হৃদয় টুকটুকে রাঙা হয়ে উঠেছে আনমনে, তা আমাদের মতো হ্যাংলাপনা দৃষ্টিতে ধরা পড়তে কি বাকি থাকে! সুতরাং গাড়ির জানালার কাঁচ ভেদ করে নিষিদ্ধ হৃদয়(পড়ুন বেদানা)হস্তগত হল। আশ তো আর মেটে না!
“এই যে ড্রাইভার দাদা, একটু আস্তে চালান না!”—সমবেত দরখাস্তের চোটে ড্রাইভারের টিকি না টললেও দয়ালু ঈশ্বরের আসন টলে উঠল। ঠিক ঐ জায়গাতেই গাড়ির ছোটোখাটো সমস্যা সেরে উঠতে পনের- বিশ মিনিট তো লেগেই ছিল। প্রেম গভীরতর নাই হলো, অল্প সময়ের মোহই সই। আবার যে মোহ দূর থেকে হাতছানি দেয়, তার সাথে সংসার করা তো চলেই না। তাছাড়া মানুষের মন বড় বেইমান! এমন সবুজ পশমি চাদরের ফাঁকে ফাঁকে সোনালি জরির ঝলকানি, নির্মল- নিদাগ আকাশের ত্বক—সে মোহময়ী সৌন্দর্যও বেশিক্ষণ মনকে বশে রাখতে পারে না। ধুর বাপু! একটাও নদী, ঝরনা কিচ্ছু নেই। শুধুই সবুজ বন আর পাহাড়। এসবের সাথে দুরন্ত নদী চাই, চাই ছুটন্ত ঝরনা আর রাশি রাশি চাপধরানো বরফ! নেই রাজ্যের বাসিন্দা ভিখিরি মানুষগুলোর প্রকৃতির কাছে কত কিছু চাই। আপাতত একটা নদী পাঠাও হে ভগবান!
তেতোমুখে দুই ভ্রু যখন নিজেদের ব্যবধান কমিয়ে প্রায় মাসতুতো ভাই টাইপ হয়ে গেছে ঠিক তখনই হেডফোনের সাউন্ডকে তুচ্ছ করে আলোড়নের ঢেউ উঠল চারচাকার চৌখুপিতে। ঘিয়া জমির ভাঁজে সবুজ সুতোর কল্কাপেড়ে শাড়িতে যুবতী চঞ্চলা চেনাব’কে দেখলাম। অধরা মাধুরী ছন্দোবন্ধনে ধরা দিয়ে সঙ্গী হলো। আহা এ যে পাশে পাশে চলে। যেন পাশের পাড়ার রকবাজ ছেলেটিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিপথে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। আমরা কোন মহামুনি যে পর্দার আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে চোরের মত লাস্যময়ী রূপের স্বাদ নেবো না! স্বয়ং বিশ্বামিত্রও টলেছিলেন। কিন্তু এইসব ভালো কাজে কুদৃষ্টি পড়বেই—
“চেনাবকো দেখ রাহে হো সবলোগ। জারাসা অউর ঝুঁককে বাহার দেখো!”—ড্রাইভারের খ্যাসখ্যাসে গলা সব রোমান্সে জল ঢালার জন্য যথেষ্ট। কি ব্যাপার! গাড়িও আবার কখন থেমে গেছে? কেনই বা থামল? হাঁকেডাকে বোঝা গেল পাহাড়ের যে সংকীর্ণ খাঁজে যতটা দৈর্ঘ্য- প্রস্থের যান চলাচল সম্ভব, সেখানে কেউ অন্যমাপের গাড়ি ঢুকিয়েই ছেড়েছে। এর উৎস ও কারণ সম্বন্ধে পরে জ্ঞানলাভ করেছিলাম আপনাদের তা যথাস্থানেই বলব। আপাতত আমাদের গাড়িটিকে পাহাড়ের প্যাঁচাকোণার বাঁকে একটু ঠেলে পিছোতে হবে যাতে সামনের রাজপথ উন্মুক্ত হয়! কিন্তু কোথায় আর কিকরে পিছোবে গাড়ি! গাড়ির চাকা যেখানে পিছোতে চাইছে তার পাঁচসাত আঙুল দূরত্বে অন্ধকার কালো করাল গ্রাস নিয়ে হাঁ করে আছে। কোনও লোহার বেড়া নেই, পিচরাস্তার কিছুটা ভাঙাচোরা অংশ দাঁত বের করে হাসছে। শুধু সেই গহন অন্ধকারে একবিদ্যা পরিমাণ চেনাব কোন আনন্দে নেচে চলেছে কে জানে!
“দেখ লিয়া না! আব আরামসে বৈঠ যাইয়ে সবলোগ”—কি নির্লিপ্ত ঠান্ডা গলা, শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দিল যেন। ডাকাবুকো কেউ একটা জিজ্ঞেস করেই বসল বিরাট দুঃসাহসে—“গাড়িটা পিছোতে গিয়ে কোনও ভুল হলে কিকরে আবার গাড়িটা ঠিকভাবে চালাবেন?”
“ইধার মিসটেক কারেকশন নেহি হোতা! ফার্স্ট মিসটেক লাস্ট মিসটেক হোতা হ্যায় সাব।“
কখন যে দুপুরের খাবারের জন্য ধাবার সামনে এসে দাঁড়ালাম, আর কখনই বা অভিমানী চেনাব মুখ ঘুরিয়ে নিল, অসাড় মন সেসবের খেয়াল রাখেনি।
স্বর্গীয় উপত্যকা ৩
শর্মা ধাবা, রামবন—এই যাত্রাপথের পেট পুজোর মিশনে এটুকু দিয়েই প্রথম পরিচয়। ফটাফট সিট রেডি সটাসট পরিবেশন। ধোঁয়া ওঠা ফর্সা পানা চাউল, সঙ্গতে আছে গোবি-আলু, পেঁয়াজ, হরি মির্চ(প্রায় খোটোখাটো ঢ্যাঁড়সের সাইজ), টকদই, খাট্টা আনারদানা চাটনি, যা খেয়ে আপনার টাগড়া আর জিভের টকাটক সংঘর্ষ অনিবার্য। সাথে খুব ইস্পেশাল ‘রাজমা’—পিওর দেশী ঘি-এর বিজ্ঞাপন। ট্রেলরটা মোটামুটি এরকম— ‘একবার খায়েগা তো আঙ্গুলকে খুশবুসে শ্রীনগর পৌহুঁছ যাওগে!’ তার একপাশে পাঞ্জাবি হাত (হাত তো নয় হাথোড়া) একদলা করে ঠাসা ময়দা দু হাতের তালুতে ‘তিনতালি’ বাজিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নির্বিকার ছুঁড়ে দিচ্ছে। সেই নির্মম নিষ্ঠুরতার পোড়া গন্ধে বাতাস ম ম। রাজমা কারি সহযোগে সেই ঝলসানো রুটি মুখে চালান করলেই যা লালায়িত হয়ে চেনাবের গতিতে মোহনায়(থুড়ি পাকস্থলীতে) মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। আর গাড়িতে উঠে আপনার মনে রয়ে যাবে এক অনবুঝ হাহাকার।
তবুও থোড় বড়ি খাড়া’য় ঝুলতে পছন্দ করা অনেক বাঙালি কিডনি, লিভারের চিন্তায় মাখোমাখো স্নেহে কিডনি বীনের হাতছানি এড়িয়ে পাতের পাশে শোভাবর্ধন কারি হিসেবেই ‘রাজমা’কে রেখে দিলেন। আবার যাত্রা শুরুতে দৃশ্যপট বদল শুরু হয়! সবুজের ভাগে যেন টানাটানি লেখেছে, খাড়া ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের বক্ররেখায় খুব সুনিপুণ হাতে পরপর সাজানো গাড়িগুলোকে দূর থেকে দেখে ছোটোবেলার একটা খেলার কথা মনে পড়ছিল। দেশলাই কাঠির ফাঁকা বাক্সগুলোকে আধখোলা করে এগিয়ে পিছিয়ে দু-তিনটি পরপর জোড়া লাগিয়ে গাড়ি গাড়ি খেলতাম। তাতে দুষ্টুমি করে কেউ আঙুলের টোকা দিলেই গাড়ির দফারফা, খেলারও। এখানেও সেই ‘অদৃশ্য আঙুলের টোকা’ সব খেলার ইতি টেনে দিতে পারে এক লহমায়। পাহাড়ের এই অংশগুলি এতটাই খাড়া যে উপর থেকে পড়লে ধরিত্রী মা ঠিক নিজের বুকে টেনে নেবেন। কোথাও আটকে পড়ার নো চান্স! হরষে- বিষাদে গানা-বাজানা, খানা-খাজানা চলতে থাকল।
ন্যাড়া পাহাড়ের একঘেঁয়েমিতেই হবে হয়ত, ঝিম ধরা চোখ সজাগ হল জওহর টানেলের মুখে চায়ের টানে। টানেলে পাশে অনবরত খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। নিত্যদিন সাত হাজার গাড়ির চাপ নেওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয় সুতরাং ওয়ান লেন, টু-লেন, ফোর-লেন গরিমা বৃদ্ধি চলছেই। আর জেকে পুলিশ তো ইংরেজ আমলের সুদখোর মহাজনকেও লজ্জা দেবে বাস থামিয়ে টাকা আদায়ের পদ্ধতিতে। এনাদের পকেটে মোটা কড়কড়ে কিছু ফেলে দিলেই আপনি যান নিয়ে যে রাস্তায় খুশি উড়ে চলুন। তবে পাতাল প্রবেশ বা স্বর্গবাস হলে ‘কোং দায়ী নহে’ সে নোটিশ ঝোলাতে তেনারা ভোলেননি।
বানিহাল পাস পেরোতেই ভূস্বর্গ তার প্রবেশদ্বার উন্মোচন করল। ন্যাড়া পাহাড়ের শুঁয়োপোকা গুটি ছেড়ে প্রজাপতির রূপ নেওয়া শুরু হল। ঘন সবুজে ঢাকা ছোটো ছোটো টিলা। তার সানুদেশে নুড়িপাথর বিছানো পথে ক্ষীণকায়া জলধারা কুলকুল স্বরে কত কথাই না বলে চলেছে, যেন গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ালেই হাত বাড়িয়ে আপন করে নেবে। মনটা ফুরফুরিয়ে উড়তে যাবে, হঠাতই বাস হাইওয়ে ছেড়ে পাহাড়ী গ্রামের রাস্তায় নেমে পড়ল। কেনরে বাবা! যাবো মহারাজের রাজদরবারে, তাহলে রাজপথে নয় কেন! দুপাশে ধান, গমের ক্ষেত। বাড়ির দরজায় দরজায় মাধবীলতার মত গোলাপের ঝোপ। উইলো, দেবদারু আরও কত অচিন গাছের অভিবাদন। রাস্তার পাশে ছোটো ক্যানেলে কলকলে জল। যেন এই হাসিম শেখ বা রামা কৈবর্তের দল লাঙল হাতে বেরিয়ে এসে কইবে— “আসেন কত্তা! একটু জল বাতাসা মুখে দেন!” কিন্তু লাল টুকটুকে গালওয়ালা সাড়ে পাঁচ-ছ ফুটের দীর্ঘদেহী নারী, পুরুষ আর দিগন্তরেখার দূর আকাশে পাহাড়রেখার সাথে মেঘের আলাপচারিতায় চমক ভাঙে।
এদিকে গাড়ির ভেতরে চাপা গুঞ্জন কিসের! দলের পুং-সর্বস্ব দের গম্ভীর মুখ– “আরে আগের গাড়িটা থেকেই খবর এসেছে! তাই আর ওদিকে নিয়ে গেলো না!” দু-পাঁচ মিনিটের মধ্যে ক্রমে ক্রমে বার্তা গেল রটি। খবরে প্রকাশ— অনন্তনাগ, অবন্তীপোরার মধ্যবর্তী কোনও এক স্থানে জঙ্গির সঙ্গে জওয়ানদের খন্ড যুদ্ধে এক জঙ্গি নাকি নিহত আর দুই জওয়ান আহত!” তাই এত ভায়া মিডিয়া হয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে গাড়ির ঢিমেতালে চলা। সে সব সাবওয়ের নাম আমার এখনও অজানা। সাবওয়ে ছেড়ে গাড়ি রাজপথে ওঠার আগে ভিতরের আলো নিভিয়ে সারিবেঁধে দাঁড়ানো অসংখ্য গাড়ির ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে নিল। গাড়ির ভিতর সে সময় ছুঁচ পড়ার নিস্তব্ধতা। সামনেই চকমিলানো লাল-নীলের খেলা। শ্রীনগরের সর্বাধিক স্পর্শকাতর এলাকা লালচক বাজার! কোনও এক রাগী মাষ্টারমশাই পড়া না পারার অপরাধে গোটা ক্লাসকে শাস্তি দিলে যেমন প্রাণবন্ত শ্রেণী নিঃসাড় হয়ে পড়ে। সেরকম ঘুটঘুটে শাস্তি বুকে বেঁধে আলো আঁধারি পথ পেরিয়ে হোটেলে পা রাখলাম।
সুতরাং বুঝতেই পারছেন শ্রীনগরের সাথে শুভদৃষ্টি হওয়ার আগেই কালরাত্তির শুরু হয়ে গেল। এখন ঢিপঢিপে বুকে রাত্রি পার করে দিনের আলোর অপেক্ষা।