ফি চা র
কৌশিক ব্যানার্জী
প্যারোডি সম্রাট মিন্টু দাসগুপ্ত ও কিছু কথা
বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে ‘প্যারোডি’ হলো এক বহু পুরোনো ধারা। ‘প্যারোডি’ একটি ইংরেজি শব্দ যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘মিথ্যা অভিনয়’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘লালিকা’ বা প্যারোডি যে অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দ মাধ্যম সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীর জাদুস্পর্শে শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো রচনাকে অনুকরন করাকেই প্রকৃতপক্ষে প্যারোডি বলা হয়।
বিশ্বসাহিত্যের রথী মহারথীরা সেই হোমারের সময় থেকেই নিজেরা প্যারোডি রচনা করেছেন বা প্যারোডির শিকার হয়েছেন। স্বয়ং শেক্সপিয়ার তার বিখ্যাত নাটক ‘হ্যামলেট’-এর একটি দৃশ্যে ক্রিস্টোফার মার্লোকে প্যারোডি করেছেন। শেক্সপিয়ার ছাড়াও ‘প্যারাডাইস লস্ট’ খ্যাত জন মিল্টন, ‘ইউরেকা’ খ্যাত এডগার এলেন পো প্রমুখদের লেখাও পরবর্তীকালে প্যারোডি হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্যারোডির সম্ভার কিন্তু যথেষ্ট সমৃদ্ধ। অবাক করার মতো বিষয় বাংলা সাহিত্যের দুই মহান দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের লেখাই কিন্তু সবচেয়ে বেশী প্যারোডির শিকার হয়েছে। নজরুল নিজেও কিন্তু বেশ কিছু প্যারোডি রচনা করে গিয়েছেন। কিন্তু এই প্যারোডি কবিতা ও গানের ক্ষেত্রে বাংলায় যাকে পথিকৃৎ বলা হয় তিনি হলেন সজনীকান্ত দাস। নিজে একজন প্রথমসারির কবি ও গীতিকার হলেও সজনীবাবুর প্যারোডির হাত থেকে রক্ষা পাননি তৎকালীন কোনো কবি ও গীতিকার। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে এই সমস্ত প্যারোডির সাহিত্য মূল্য কোনো অংশেই কম নয়। সজনীকান্ত দাসের পরবর্তী যুগে দাদা ঠাকুর সরৎপন্ডিতের বহু প্যারোডি রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সজনী বাবু ও দাদা ঠাকুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বাংলা গানের ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেন যতীন্দ্রজিৎ ওরফে মিন্টু দাসগুপ্ত।
স্বাধীনোত্তর যুগে বিপুল জনপ্রিয় জলসা বা আসর জমাতে মিন্টু বাবু ছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম। বাংলা গানের স্বর্ণ যুগে প্যারোডি গানের মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে হাসির হুল্লোড় সৃষ্টিকারী মিন্টুবাবুর জন্ম ১৯৩১সালের ২৫ শে নভেম্বর কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে। ডাক্তার জীবনকৃষ্ণ দাসগুপ্ত এবং লাবণ্যময়ী দেবীর অষ্টম সন্তান ছিলেন মিন্টুবাবু। মাত্র দশ মাস বয়সে মাতৃবিয়োগের পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জীবনকৃষ্ণ বাবু মাতৃস্নেহে মানুষ করেন সন্তানদের। ছোটো থেকেই বাড়িতে ছিল সঙ্গীতমুখর পরিবেশ।
তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে পড়াকালীন একবার এক নিকট আত্মীয়র হারমোনিয়াম সারিয়ে নিয়ে আসেন বাজিয়ে গান গাইবেন বলে, কিন্তু বিনিময়ে জোটে বেদম প্রহার। হারমোনিয়ামটাও কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এতেও তাকে দমানো যায় নি। এক বন্ধুর মাধ্যমে এক যাত্রা দলে কাজ করতে রাজি হয়ে যান, শর্ত ছিল পালা না থাকলে যাত্রা দলের হারমনিয়ামটা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন। পরবর্তী কালে সুযোগ ঘটে কিংবদন্তী ভি বালসারার কাছে হারমোনিয়াম, অর্গান এবং পিয়ানো শিক্ষা করার। হারমোনিয়াম পরবর্তী কালে এতটাই ভালো বাজাতেন একবার দূর থেকে হারমোনিয়াম বাজনা শুনে প্রবাদপ্রতিম লোকসংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী জিজ্ঞাসা করেন, ‘কে বাজাচ্ছে ? মিন্টু না? হতেই হবে কারণ এত ভালো হারমোনিয়াম বাজানোর শিল্পী কলকাতায় মিন্টু ছাড়া আর কেউ নেই।’
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে বেঙ্গল এনামেলের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি IPTA-তেও যোগ দেন। সেখানেই মিন্টুবাবু নজরে পড়েন প্রখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীর। এদিকে বাংলা গানের জগতে তখন রথী মহারথীদের, আর মুখে মুখে মজার ছড়া বেঁধে তৎক্ষণাৎ সুর দেবার ক্ষমতা দেখে সলিল চৌধুরী মিন্টু বাবুকে পরামর্শ দেন প্যারোডি গানে মনোনিবেশ করার জন্য।
অবশেষে ১৯৫২ সালে সুধীরলাল চক্রবর্তীর উদ্যোগে হিন্দুস্তান পার্কের এক জলসায় পূর্ব নির্ধারিত এক শিল্পী না আসায় সুযোগ পান মিন্টু বাবু। তারপর থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। শুরু হলো বাংলা প্যারোডি গানের জগতে এক অবিসংবাদী নায়কের জয়যাত্রা।
পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে বেশ কয়েক হাজার গানের প্যারোডি করলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের লড়াইকে জনসমক্ষে হাজির করতে মিন্টুবাবুর লড়াই ছিল অপরিসীম।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠের জনপ্রিয় গান—
‘এমন মধুর সন্ধ্যায়/ একা কী থাকা যায়?/ খুঁজে নাও, বেছে নাও তোমার সাথীকে/ আলোতে আঁধারে প্রেমেরই খেলাতে মন জানতে চায়।’
প্যারোডি করে মিন্টু বাবু পরিবেশন করেন—
‘এমন তেঁতো সন্ধ্যায়, দুজনে থাকা দায়!/ দেখে যাও দেখে যাও মোর সাথীকে/ কখনো বাঘিনী, কখনো ডাকিনি ঘরে কি টেকা যায়?/ সাত পাক যে ঘূর্ণিপাক, আগে তা কে জানতো?/ সাধ করে কে বা হায় খাল কেটে কুমীর আনতো?/ সেদিনের সে লগন, রঙিন সে স্বপন হায় রে পালিয়ে বেড়া।’
লতা মঙ্গেশকরের বিখ্যাত গান—
‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝি বা পথ ভুলে যায়/ কুলায় যেতে যেতে কি যেন কাকলি আমায় দিয়ে যেতে চায়।’
প্যারোডি করে মিন্টুবাবু লেখেন—
‘আজি এ সন্ধ্যায় এসেছে কুটুমেরা ঘরে সব বাড়ন্ত হায়!/ কি তাদের দেব খেতে, সর্ষে ফুল দেখি চোখে/ হয়েছে বিষম দায়।’
আশা ভোঁসলের আরেকটি বিখ্যাত গান—
‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে, তাকে মন দিতে যে চাই কেমন বাধে/ ও সয়না সয়না সয়না সয়না ওগো এত জ্বালা সয়না/ ঘরেতে আমার এ মন রয়না কেন রয়না রয়না।’
এই গানটির প্যারোডি মিন্টুবাবুকে জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়—
‘সংসারে পড়ে কলির কৃষ্ণ কাঁদে, রাধা তার রান্নাঘরে শুক্তো রাঁধে/ ও সয়না সয়না সয়না সয়না এমন পরিহাস সয়না/ হায় রে ব্রজের গোপাল ছিটেফোঁটাও ননী পায়না/ ছেড়ে বৃন্দাবন,ছেড়ে গোপীগণ/ কেষ্ট বাছা মরছে টেনে কেরানীর জীবন/ ও রয়না রয়না রয়না রয়না কপাল পোড়া দিন রয়না/ নুন আনতে পান্তা ফুরোয় রাতের বেলা ঘুম হয় না।’
লতা মঙ্গেশকরের আরেকটি জনপ্রিয় গান—
‘হতাম যদি তোতা পাখি/ তোমায় গান শোনাতাম/ হতাম যদি বন ময়ূরী/ তোমায় নাচ দেখতাম।’
প্যারোডি করে মিন্টুবাবু লেখেন—
‘হতাম যদি পুজোর ঢাকি রাতভর বাজাতাম/ হতাম যদি মাইক আমি সবার ঘুম ভাঙাতাম/ হতাম যদি শেয়াল কাঁটা সর্ষের তেলে মিশিতাম/ খাইয়ে ভেজাল সবাইকে তাই নানা রোগে ভোগাতাম।’
১৯৬৯ সালে রিলিজ হওয়া কিশোর কুমার আর লতা মঙ্গেশকরের ‘আরাধনা’ ছায়াছবির একটি গান আসমুদ্র হিমাচলকে দুলিয়ে দেয়—
‘কোরা কাগজ থা ইয়ে দিল মেরা/ লিখ লিয়া নাম ইসপে তেরা…’
মিন্টুবাবুর তৈরি করা এই গানটির প্যারোডিটিও অসম্ভব জনপ্রিয় হয়—
‘মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই হলাম সারা/ ভাবে না তা ঘরে থাকে যারা/ কি যে মজা লাগে, ভাই লাগে কলম হাতে/ দিনে দিনে হচ্ছি শুধু ট্যারা, বোঝে না তা ঘরে থাকে যারা/ আপিসে যখন শুধু কলম পিষে মরি, গিন্নি তখন মাছের মুড়ো চিবোয় মজা করি/ মনে মনে ভাবেন হয়তো স্বামীর ট্যাকশাল আছে,/ নয়তো টাকার বান্ডিল দোল খায় গাছে।’
কিশোর কুমারের গাওয়া ‘গাইড’ সিনেমার বিখ্যাত গান—
‘গাতা রহে মেরা দিল, তুহি মেরি মঞ্জিল হায়/ কাহি বিতে না এ রাতে, কাহি বিতে না যে এ দিন’
এই গানের প্যারোডি করে মিন্টুবাবু শহুরে প্রেমিকের অব্যক্ত বেদনার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন—
‘তুমি যেন সেই চিল, কাছে পাওয়া মুশকিল/ থাকো তিনতলার ছাতে আমি দেখি রাতদিন।’
অনেকে আজও ভুলতে পারেন নি কিশোর কুমারের কণ্ঠে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ ছায়াছবির বিখ্যাত গান—
‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও/ আমি চিরদিন তোমারই তো থাকবো/ তুমি আমার আমি তোমার/ এ মনে কি আছে পারো যদি খুঁজে নাও।’
এই গানটির প্যারোডি করে মিন্টুবাবু লেখেন—
‘আমি সুযোগ পেলেই গুল মারবো /নাম নিয়েছি রাজকুমার, বাঁচতে গেলে আজ শুধু গুল মেরে যাও/ তোমার আদরের বধূ সদাই পকেটটি মারে, সুধালেই তারে যায় খেপে/ দোষ দেয় অপরের ঘাড়ে/ ভালোবাসার নামে খেসারত শুধু দাও।’
প্যারোডি গাওয়ার পাশাপাশি মিন্টু বাবু ‘কাঞ্চনমূল্য’, ’নতুন ফসল’, ‘কেরি সাহেবের মুন্সী’ প্রভৃতি চলচিত্রে প্লে ব্যাক করেন; অভিনয় করেন ‘সপ্তপদী’ সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকে বাঙালি সংগীতপ্রেমীদের মাতিয়ে রাখেন মিন্টুবাবু। জলসার আসরে কিশোর কুমার সংগীত পরিবেশন করার পরে কোনো প্রথিতযশা শিল্পীই মঞ্চে উঠতে চাইতেন না, ব্যতিক্রম শুধু মিন্টু দাশগুপ্ত। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একের পর এক প্যারোডি গেয়ে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে করে রাখার এক বিরল ক্ষমতা ছিল মিন্টুবাবুর। দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে জোটেনি কোনো সরকারী সম্মান, বরঞ্চ জুটেছে অবহেলা। যদিও প্যারোডি হলেও এই সব গানের অবদান বাঙালীর সমাজ জীবনে কিছু মাত্র কম নয়। একবুক অভিমান নিয়ে বিরল প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী ২০০৬ সালের ২৩ শে নভেম্বর পরলোক গমন করেন। আরেকটু সম্মান কি মিন্টু বাবুর মতো শিল্পীর প্রাপ্য ছিল না?