ভ্র ম ণ
পল্লবী মজুমদার
একফোঁটা ইয়ুকসম । পর্ব ৩
পরদিন গন্তব্য পেলিং। আমাদের খুব ইচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে সূর্যোদয় দেখা। পেলিংয়ে সেই সুযোগ মিলতে পারে, যদি ইয়ুকসম থেকে খুব ভোর ভোর বেরনো যায়। মানে প্রায় বাঙালির টাইগার হিল যাবার মতো ব্যাপার আর কী। তবে আমরা রাজি। আমাদের এদিনের চালক দিলু। ফরসা ফুটফুটে সিকিমি তরুণ। দেখলে মনে হয় বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। তাকে ফোন করে জানলুম সূর্যোদয় দেখতে গেলে ভোর চারটেয় বেরতে হবে। উরিশশাবাস। সবাই একপ্রস্ত জামাকাপড় গায়ে চড়িয়েই কম্বলের তলায় ঢুকলুম। সারারাত মোমবাতির আলোতেই কাটল বেশ গা ছমছমে পরিবেশে। ভোর চারটেতেও মোমবাতির আলোতে জ্যাকেট কমফর্টার জড়িয়ে বেরনো গেল। কলকাতা তখন ৪২ ডিগ্রিতে ফুটছে, এ কথা ভেবেও কুলকুল করে সুখ হচ্ছিল। দিলু আমাদের নিয়ে চলল পেলিংয়ের রাস্তায়। এবারও রাস্তার হাল ভালো নয়। আলো ফুটতে দেখতে পেলাম, আকাশ অন্ধকার নয় বটে, কিন্তু কেমন যেন দুধের পাতলা সরের মতো আস্তর ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। সেটা কুয়াশা না ধোঁয়াশা না মেঘের পালক, বোঝা শক্ত। কিন্তু সওয়া পাঁচটায় পেলিং-এ পৌঁছে বুঝলাম, সূর্যোদয় কপালে নেই। ওই সাদা সর-পড়া পাহাড়ের পিছনে সূর্যদেব উঁকি দিলেও আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছেন না। এদিকে ভোর সাড়ে পাঁচটা ছটায় পেলিংয়ের অন্য কোনও দ্রষ্টব্যস্থানের দরজা খোলে না। রাতভর পাওয়ারকাট ছিল পেলিংয়েও। ফলে সব হোটেলে পর্যটক আর ম্যানেজরাররা ত্রাহি ত্রাহি রবে প্রাতঃকৃত্য আর প্রাতঃরাশ নিয়ে ব্যস্ত। বাইরে থেকে আসা পর্যটককে কফি খাওয়াতে, বসতে দিতে, বাথরুম ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে কেহই রাজি নহেন। হোটেলে হোটেলে ফিরতে লাগলাম আমরা ত্রিমূর্তি— দাদা কফি হবে? তাহলে চা? দাদা একটু টয়লেটে… একজায়গায় এসে শিকে ছিঁড়ল। বালুরঘাটের বাঙালি তরুণ অলোকের দয়া হল আমাদের উপর। বললে, দু কাপ কফি আর বিস্কুট হলেই হবে তো? আসুন, ডাইনিং হলে বসুন।
ডাইনিং হলে ঢুকে আমাদের মুখের কথা বন্ধ। বিরাট বড় হলঘরে ছিমছাম সাজানো চেয়ার সোফা। আর একদিকের গোটা দেয়ালটাই কাচের! আর সেই কাচ দিয়ে দৃশ্যমান স্বয়ং কাঞ্চনজঙ্ঘা। ঝকঝকে নয়, সেই সর-পড়া আস্তরের ভেতর দিয়েই তাকে আবছায়াতে দেখতে হচ্ছে। মোবাইলের ক্যামেরাতে ধরা দিচ্ছেন না। কিন্তু চোখের লেন্স তার দিক থেকে সরানো মুশকিল। ধবধবে আইসক্রিমের মতো হিমলচূড়ায় হালকা সোনালি আভা, আর তার সামনে তিন সারি সবুজ পাহাড়— বাকরহিত হয়ে কফি-তেষ্টা ভুলে বসে রইলুম তিনজনে। অলোক ভারি লক্ষ্মী ছেলে। কথামতো দু কাপ কফি, বিস্কুট সব এনে দিলে। ঝকঝকে বাথরুমের ব্যবস্থাও হল। আরাম করে আটটা নাগাদ বেরলুম অলোককে অনেক ধন্যবাদ টাদ জানিয়ে। এবার যাব পেলিংয়ের নতুন আকর্ষণ স্কাইওয়াক দেখতে। স্কাইওয়াক ব্যাপারটা কী, আগে ইন্সটায় দেখা ছিল। অনেক উঁচুতে কাচের তৈরি একটা সেতু, যার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় নীচে দেখা যায়। এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়ে যাচ্ছে এই সেতু। আর এর ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে হয়। আর স্কাইওয়াকে হেঁটে যে চত্বরে পৌঁছনো যাবে, তার সামনে খাড়া উঠে গেছে দুশো সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষে পাহাড়ের মাথায় বসে রয়েছেন ১৩৭ ফুট উঁচু অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব (তিব্বতি ভাষায় চেনরেজিগ)। নীচে গুমফাও রয়েছে উপাসনার জন্য। সম্ভবত এটাই পৃথিবীর উচ্চতম অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি। অমিভাভ বুদ্ধের ১০৮ অবতারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন এই অবলোকিতেশ্বর। ‘অব’ অর্থে নীচে। ‘লোকিত’ অর্থে দয়ার চোখে দেখা। ঈশ্বর অর্থ সকলেরই জানা। অর্থাৎ, অবলোকিতেশ্বর হলেন এমন এক মহাপুরুষ যিনি দয়ার চোখে নীচের দিকে চেয়ে দেখছেন। মূর্তি দেখলেই মানেটা একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে, বসার ভঙ্গিতে, হাতের মুদ্রায় শান্তি ও সংবেদনা ফুটে বেরুচ্ছে যেন। এই জায়গায় দেখলাম একটা খুব ভালো জিনিস। স্কাইওয়াক এবং গুমফায় উঠতে সিঁড়ির পাশাপাশি হুইলচেয়ার যাবার জন্য ramp তৈরি করা। আমার মতো যাঁদের সিঁড়ি উঠতে কষ্ট হয়, তাঁরা দিব্যি গোটাটাই বেশ সুন্দর ramp বেয়ে ফুল দেখতে দেখতে, প্রার্থনাচক্কর ঘোরাতে ঘোরাতে উঠতে পারবেন। পাহাড়ের দৃশ্য তো আছেই।
অ্যামফিথিয়েটারের মতো গোলাকার চত্বর ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ে থাকতে হবে মূর্তির দিকে। আকাশ, মানে আমাদের হোটেলের ম্যানেজারের কাছে শুনেছিলাম, আকাশ পরিষ্কার থাকলে ইয়ুকসম থেকেও পেলিংয়ের এই মূর্তি দেখা যায়। এত সুন্দর দেবমূর্তি আমি কমই দেখেছি। নিমীলিত চোখ, চার হাতের মধ্যে দু’হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে বুকের কাছে জড়ো করা। বাঁ হাতে জপের মালা আর ডান হাতে সম্ভবত পদ্মফুল, কারণ অবলোকিতেশ্বরের আর একটি বিখ্যাত রূপ ‘পদ্মপাণি’। মেরুন আর সোনালিতে কারুকার্য করা মূর্তি পদ্মফুলের আকারের উঁচু বেদিতে বসানো। ওঠবার সিঁড়ির দুধারে সোনালি রঙের অজস্র প্রার্থনাচক্রের সারি। কেউ কেউ ঘোরাতে ঘোরাতে উঠছেন সিঁড়ি বেয়ে। এখানকার উচ্চতা প্রায় সাত হাজার ফুট, কাজেই কারও কারও হাঁফ ধরতে পারে। জিরিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে ওঠাই বুদ্ধিমানের কাজ। মূর্তির নীচে ছোট গুমফা। ভিতরে অমিতাভ বুদ্ধের অন্য কোনও এক অবতার। ইনিও করুণামূর্তি। তবে পাঁচখানা মাথা এবং বত্রিশখানা হাত সম্বলিত। মাথায় যমন্তক ঘুরছিল। কিন্তু অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী আর কারো কাছে প্রকাশ করতে সাহস হল না। মূর্তি যত না সুন্দর, তার চেয়েও সুন্দর তার পশ্চাদপট। গোটা দেয়ালের গায়ে ছোট ছোট কাঠের খোপে ধাতুর বুদ্ধমূর্তি। এক একজনের এক এক রূপ। কোনওটা ভয়াল, কোনওটা বা শান্ত। সেখান থেকে বেরিয়ে খালি পায়ে চললুম স্কাইওয়াকে হাঁটতে। ভালোই লাগল। তবে রিল-শিকারি আর সেলফিপাগল পাবলিকের দৌলতে খুব বেশিক্ষণ উপভোগ করা গেল না পাহাড়ের দৃশ্য।
স্কাই-তে যখন ওয়াকই করলুম, এবার শখ জাগল একটু ফ্লাই করার! হতে পারে চেহারা আমার উটপাখির মতো, তাবলে কি পাখনার সদ্ব্যবহার কখনও করতে নেই? ঠিক করলুম আকাশে আজ উড়বই। পেলিং থেকে প্যারাগ্লাইডিং করা যায়, একথা এখন অনেকেই জানেন। যে সংস্থা এটির আয়োজক, তাদের দপ্তরও স্কাইওয়ক থেকে বিশেষ দূর নয়। দিলু আমাদের সেখানে নিয়ে চলল। এখানে খেয়াল রাখতে হবে দুটো কথা। এক) শরীরের ওজন দুই) মাধ্যাকর্ষণের মায়া কাটাতে গেলে আপনার শরীর বেগড়বাঁই করে কিনা। অর্থাৎ প্লেনে বা নাগরদোলায় কি আপনার ভয় লাগে? বমি পায়? ভার্টিগোর সমস্যা আছে? তাহলে এ খেল আপনার জন্য নয়। আমার উচ্চতার ভয় নেই, আছে ওজনের ভয়। তাই গোড়াতেই ওজন মাপিয়ে দেখে নিলুম উটপাখির ওড়ার চান্স আছে কিনা! অভয় দিলেন তিন নারী, যাঁরা প্রায় হাতে তরবারি নিয়েই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবসা চালাচ্ছেন পাহাড়চুড়োয় বসে। এবার নিয়মাবলির পালা। প্রথমেই কাগজপত্তরে সই— অর্থাৎ উড়তে গিয়ে সোজা স্বর্গের রাস্তা ধরলে ওঁদের কোনও দায় নেই। তারপর পাঁচ মিনিটের ট্রেনিং সেশন আর ভোকাল টনিক। অতঃপর উড়ি উড়ি! ট্রেনিং সেশনে বাচ্চাদের কার সিটের মতো একটা চেয়ারে বসিয়ে আপনাকে শেখানো হবে কীভাবে গো-প্রো ক্যামেরার হাতল সামলে (এই ক্যামেরাটি ওঁরাই দেন গোটা প্রক্রিয়ার ভিডিও তোলার জন্য) হাত এবং পা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রয়োজনে কোন্ দড়িদড়া হাত দিয়ে ধরে থাকতে হবে, পায়ের পজিশন ওড়া ও নামার সময় কেমন হবে ইত্যাদি। এদিকে বিশাল এক প্যারাস্যুট বা গ্লাইডার ততক্ষণে পাহাড়ের ঢালে পেতে ফেলা হয়েছে। তার দড়িদড়া লাগাচ্ছেন প্যারাগ্লাইডিং কর্মীরা। আমি যাঁর সঙ্গে উড়ব, তাঁর নাম লি। জানালেন, পাহাড়ের একেবারে নীচে গিয়ে ল্যান্ডিং করার পর খানিকটা চড়াই বেয়ে উঠে ওদেরই গাড়িতে করে মালপত্রশুদ্ধু আমাকে ফের এই পাহাড়চুড়োয় পৌঁছে দেওয়া হবে— ‘সহি সলামত আপকে পতি অর বচ্চেকে পাস’!
অবশেষে উপস্থিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। চেয়ারে বসিয়ে দড়িদড়া বেঁধে হাতে ক্যামেরার লাঠি ধরে আমি আর লি রেডি হয়ে দাঁড়ালাম ঢালের গায়ে। আরও দুই তরুণ দুদিকে প্যারাশুটের দড়ি ধরে দণ্ডায়মান। ১…২…৩… ওই দু’জন দড়ি ধরে টেনে আমাদের নামাতে লাগল ঢাল বেয়ে। আমার মুখ দিয়ে মাতৃভাষায় মাতৃসম্বোধন বেরিয়ে এল… কিন্তু আর তো থামার জো নাই! হুড়হুড় করে নামতে নামতে নামতে নামতে একেবারে খাদের কিনারে এনে বোঁ করে দিল এক ধাক্কা! পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যেতেই মুখ দিয়ে মাঝারি গোছের একটা আর্তনাদ বেরল… আর পেটের মধ্যে খালি হয়ে গিয়ে কেমন প্রজাপতি উড়তে লাগল! হুহু করে নেমে যাচ্ছি নীচে… ক সেকেন্ড জানি না… হঠাৎ পতন বন্ধ। দেখলুম আস্তে আস্তে উড়ছি… অনেক নীচে খেলনাবাটির মতো বাড়ি, রাস্তা, গাড়ি, মানুষ। আর সামনে আকাশের গায়ে পাহাড়ের সারি। মাথার ওপর সূর্য আর নীল আকাশের গায়ে ফুলের মতো ফুটে থাকা আমাদের কমলাফুলির প্যারাশুট! ক্রমে উড়তে উড়তে বুঝলাম জ়িগজ়্যাগ করে চলেছি আমরা। একবার পাহাড়ের একেবারে ডাইনে, তারপরেই একেবারে বাঁয়ে। দশ মিনিট সময়সীমা, তাই যেন বোধ হয় অনেকখানি! নীচে তাকালে দেখা যায় পাহাড় কেটে ধাপ করে কেমন ঝুমচাষ হয়েছে। আর অধিকাংশ বাড়িরই ছাতের রং লাল টুকটুক। মাথায় হেলমেট থাকলেও শনশন হাওয়ার শব্দ বড় ভালো লাগে! কেমন নেশা নেশা। যাঁরা নেশা করেন, অনেকের কাছেই শুনেছি, নেশার পর শূন্যে ওড়ার অনুভূতি হয়। আমায় ওড়ার নেশায় পেয়ে বসল। চোখ বুঁজে আসছে আবেশে… হাত দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে উড়ুক্কু উটপাখি হয়ে বসে রইলুম। সবুজ আর নীল যে জায়গাটায় মিশে গিয়েছে, সে জায়গাটার দিকে চোখ ফেললে কেমন চোখে ঝিলমিল লেগে যায়। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ওপরের ওই কমলাপানা প্যারাশুটটা বুঝি আমারই পাখনা। হাতে গো-প্রো ক্যামেরার সেলফি স্টিক বাগিয়ে হাত পা মেলে উড়তে থাকি। গান গাইতে ভারী ইচ্ছে হয়, কিন্তু সাহস হয় না। লি যদি ঘাবড়ে যান! পনেরো মিনিটের মাথায় লি জানালেন, এবার ল্যান্ডিং। একটু সতর্ক হয়ে বসুন আর আমি বলামাত্র পা দুটোকে উঁচুবাগে সোজা করে তুলে রাখবেন।
এবার পেটের ভেতর ধড়ফড়ানি, লক্ষ প্রজাপতির পাখা ঝাপটানো… নামছি। জিগজ্যাগ করে নীচে নামছি। কাছে আসছে ঝুমচাষ, পিচের রাস্তা, বাড়ির জানলা, গাছের ফুল… বলতে বলতে মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে একেবারে প্যারাশ্যুটশুদ্ধু হুমড়ি খেয়ে পড়লুম মাটিতে। আমার উপর লি। প্রথমে মনে হল নির্ঘাত মরে গিয়েছি। কানে ফিঁ ফিঁ শব্দ হচ্ছে কেমন যেন। চোখে অন্ধকার। পুটুনকে কি আর দেখতে পাব? এমন করে অন্তত ত্রিশ সেকেন্ড কাটল। কানে এল লি-এর গলার আওয়াজ। ‘ম্যাডাম ইউ ওকে?’ ‘ম্যাডাম ইউ ওকে?’ ‘নো প্যানিক, ম্যাম, অল ওকে!’ চেতনায় ফিরলুম… ও লি সাহেব, পাগুলো দুমড়ে মুচড়ে কেমন হয়ে গেছে যে… সোজা কি আর হবে? মনে মনে বলি। লি একনাগাড়ে ঘ্যানঘেনে সুরে কানের কাছে ‘অল ওকে অল ওকে’ বলেই চলেছে। অতিকষ্টে আমার দড়িদড়া খুলল সে এবার। দু’হাতের চেটোয় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম! আহা, মাটির উপর দুপায়ে দাঁড়ানোতে যে এত আরাম আর শান্তি, কে জানত! মাটিতে মৃত ড্রাগনের মতো ছেতরে পড়ে রয়েছে কমলা প্যারাশুটখানা। আমাকে কোনওক্রমে তুলেই লি লেগে পড়েছে সেই বিশালদেহী প্যারাশুট ভাঁজ করবার কাজে। এবার তো গাড়িতে উঠে সেই সেখানে ফিরব, নাকি? পা তো তিনমণি হয়েছে। লি কে জিজ্ঞাসা করলুম, গাড়ি কই? ভারি সরল হাসি হেসে লি একটা উঁচু রাস্তা দেখিয়ে বললে, উঁয়াহা! মানে? বলে কী? এই অবস্থায় অতটা চড়াই ভেঙে যেতে হবে? আবার জিজ্ঞাসা করি। লি-এর একই জবাব। এবার বোধহয় সে খানিকটা বুঝতে পারে আমার হাল। হাতে একখানা কঞ্চি ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘ধীরে ধীরে পয়দল চলিয়ে, ইয়ে লিজিয়ে মেরা ওয়াটার বটল। আপ উঠো ম্যায় প্যারাশুট লেকে আতা হুঁ।’
এতক্ষণ ওড়ার চেয়েও এ কাজটা আমার কাছে অনেক অনেক বেশি দুঃসাধ্য তখন। হাতে লি-এর জলের বোতল আর কঞ্চি। পাঁচ পা উঠেই কুকুরের মতো জিভ বের করে হাঁফাতে লাগলুম। মাথা ঘুরছে। লি-এর জলের বোতল থেকে জল গলায় ঢালতেই নাক কুঁচকে গেল? এটা কেমন জল? ভালো করে তাকিয়ে দেখি বোতলের নীচে পাঁচ টুকরো অতিকায় দারুচিনি ফেলা। জলের স্বাদগন্ধ তাই কেমন যেন। কিন্তু উপায় কী? ওই দারুব্রহ্ম প্রসাদবারি এক দু চুমুক খেতে খেতেই উঠতে লাগলাম। লি তখনও নীচে প্যারাশুটের খিদমতে লেগে আছে। কোনওক্রমে চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে গাড়ির কাছে পৌঁছে দেখি পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে লি গাড়ির পিছনের সিটে আসীন! ওকি ও! কখন কোথা দিয়ে এলে? হাসিমাখা লি-মুখ জবাব দেয়, ‘আপনার পাশ দিয়েই, ওই রাস্তার বদলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।’ গাড়ি এবার রওনা দেয় আবার সেই শুরুর জায়গার উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের ওপর। আমি ততক্ষণে গাড়ির সিটে আধমরা। দারুপানি আর ঢুকছে না। এবার জল চাই। উপরে পৌঁছে পরিবারের হাসিমুখগুলো দেখে প্রাণে ধড় এবং ধড়ে প্রাণ এল। জল পেলুম, অ্যালো ভেরা জুস পেলুম। আর পেলুম অনেক সাধুবাদ! বেশ একটা তেনজিং তেনজিং ভাব জাগতে লাগল মনে। ইয়াহু! চাহে কোই মুঝে জংলি কহে… তো ভারি বয়েই গিয়া! এবার দিলুর গাড়ি চড়ে পেমিয়াংচি যাবার পালা।
ক্রমশ