বি শে ষ  র চ না

শু ভ ঙ্ক র &nbspদে

suvankar

বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার: নির্মাণ পদ্ধতি

বাদল সরকার নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে থার্ড থিয়েটার। তাঁর এই থার্ড থিয়েটার নিয়ে বহু আলোচনা, সমালোচনা হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। এবছর তাঁর জন্ম শতবর্ষ। সেই উপলক্ষে তাঁর থার্ড থিয়েটার নিয়ে আলোচনা আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে। কিন্তু আমি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি কেউ সেভাবে থার্ড থিয়েটার নাটকগুলি কীভাবে নির্মাণ করতেন তার বর্ণনা বা আলোচনা করেননি এবং করছেননা। তাই আমি সেই দিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। তাঁর থার্ড থিয়েটার নির্মাণ পদ্ধতি খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু দিক খুঁজে পেয়েছি, সেগুলিই ক্রমান্বয়ে আলোচনা করলাম।

 

ওয়ার্কশপ:

থার্ড থিয়েটারের এক একটা নাটক তৈরি করা হত মূলত ওয়ার্কশপকে ভিত্তি করে। থার্ড থিয়েটার আন্দোলন জোরালো করার প্রয়াসে এবং এক একটা নাটকের চরিত্রকে সজীব করে তোলার জন্য অভিনেতাদের নিজেদের মধ্যে যে অনুভব করার ক্ষমতা অর্জন করতে হয় তার প্রাথমিক ধাপ ওয়ার্কশপ। এক একটা নাটক তৈরি করার সময় এই ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে নিজেদের উপলব্ধি করতে হয় চরিত্রের যন্ত্রণা, সুখ, দুঃখ। ওয়ার্কশপ হল পরস্পর নির্ভর স্বতঃস্ফূর্ত নাট্য টিম-ওয়ার্ক এর অভ্যাস ও প্রশিক্ষণ, স্পেস ব্যবহার করার ট্রেনিং, শারীরিক ও মানসিক বিশ্বাস, অন্যকে বিশ্বাস করার বিশ্বাস, শরীরের প্রকৃত ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। বাদল সরকার এই ওয়ার্কশপের প্রসেসটা শিখেছিলেন রিচার্ড শেখনারের গ্রুপের রিহার্সাল প্রসেস দেখে। ১৯৭২ সালে তিনি মার্কিন যুক্তিরাষ্ট্রের যাত্রা ও রিচার্ড শেখনার ও শেখনার পরিচালিত ‘দ্য পারফর্মান্স গ্রুপ’ এর ওয়ার্কশপ প্রক্রিয়ায় তিনি দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং শেখনার এর থিয়েটার পদ্ধতি ক্রমাগত ভেঙে বাদল সরকার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করছিলেন।

এই ওয়ার্কশপ অনেক ভাবে করা হয়ে থাকে। সমাজে আমরা প্রত্যেকেই মুখোশ পরে বড়ো হয়, সেই মুখোশ নিয়েই জীবনযাপন করি। কিন্তু নাটকের সময় সেই মুখোশ টেনে খুলে ফেলার ট্রেনিং দেওয়া হয়। পুরুষ মানুষ কাঁদবে না, লোকে কী বলবে ভেবে অনেক কাজ আমরা প্রকাশ্যে করতে লজ্জা পাই। থিয়েটারের সেই জিনিসগুলো ফুটিয়ে তোলার জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সমাজ থেকে পাওয়া মুখোশকে ছিঁড়ে ফেলার শিক্ষা দেওয়া হয়। মানসিকভাবে তাদের প্রস্তুত করানো হয়। একজন না খেতে পাওয়া লোকের চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য সারাদিন না খেয়ে সেই খিদের জ্বালা অনুভব করে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা হয় ওয়ার্কশপের মধ্যে। ওয়ার্কশপের বেশ কিছু ধরণ রয়েছে। সেগুলি হল—

১। যাদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করা হচ্ছে, তারা প্রত্যেকে গোল হয়ে বসে সবাই সবার হাত ধরে চোখ বুজে থাকে। সেইসময় কেউ একজন অন্যের হাতে চাপ দেবে, সেই চাপ অনুভব করা মাত্রই সেও পরেরজনের হাতে চাপ দেবে। এভাবে বসে থাকা প্রত্যেকের হাতে সেই চাপ ঘুরে ফিরে আসবে প্রথম জনের কাছে। এটার মাধ্যমে বোঝানো হয় দলের প্রত্যেকের প্রত্যেকের প্রতি ঐক্যবদ্ধতা কতখানি শক্তিশালী হয়েছে।

২। বিশ্বাসের জায়গাটা খুব শক্ত হতে হবে। এখানে শরীরের কাজ বেশি হয়। তাই একজনের শরীরে কোনো ক্ষতি যেন না হয় সে ব্যাপারে প্রত্যেকের নজর থাকবে। প্রত্যেকে প্রত্যেককে সেই বিশ্বাসী করে তুলবে।

এছাড়াও বিভিন্ন গেম খেলা হয়। যার মাধ্যমে এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় করা হয়। কারণ শরীর ও মন দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। বাদল সরকার বলেছেন—

“…মনটা বেশী important, content যেটা বলছি। content হলো মন, যে নাটক লিখবে মন থেকে লিখবে। প্রকাশ হচ্ছে body থেকে। তাহলে mind body relation টা খুব important, যেই content আনলাম সাথে সাথে কিন্তু procesটা সার্কাস থেকে থিয়েটার চলে গেল। একটা word এ চলে গেল। সেইরকম খেলা হচ্ছে mind-body relationship, আমাদের উত্তরণ নিয়ে।…”

যে সমস্ত গেমকে অনুসরণ করে ওয়ার্কশপ করানো হয়, সেগুলিকে ‘psychophysical’ বলে। একই সঙ্গে শরীর ও মনের উপর ক্রিয়া করে। দুটি গেমের কথা আলোচনা করা হল—

১। Space-covering: (পরিসরকে চেনা)

যে কোনো থিয়েটারের ক্ষেত্রে স্পেস-এর ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। এই থিয়েটারের ক্ষেত্রে সেটা আরো প্রয়োজনীয়। একটা মহড়াকক্ষে সদস্যরা দুদিকে ভাগ করে দাঁড়াবে। তারপর তারা ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করবে। পরিচালকের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই হাঁটার গতি বাড়ানো হয়, সেই সময় যেন কেউ কাউকে ধাক্কা না মারে সেব্যাপারে সচেতন থাকা। এটা করলে মন সতর্ক হয়, শরীর-মন সুর-ছন্দ-তালে বাঁধা পড়ে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে, গড়ে ওঠে অন্য জগৎ। অংশগ্রহণকারীকে করে তোলে একমুখী, নমনীয় ও সক্রিয়।

২। মূর্তি গড়ার খেলা:

এই গেমের সময় একটা বৃত্তে একদল থিয়েটারকর্মী স্থির হয়ে দাঁড়াবে। মাঝখানে বেরিয়ে থাকে একটি গোলাকৃতি পরিসর। নির্দেশ পাওয়া মাত্র যে কোনো একজন দাঁড়িয়ে থাকা বৃত্তের থেকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় বেরিয়ে এসে পরিসরকে পরিক্রমা করবে। চলার ভঙ্গি ক্রমশ বদলাবে। একটু সময় পরে সে একটা ভঙ্গিমায় স্থির হয়ে দাঁড়াবে গোলাকৃতি পরিসরে। এভাবেই এক একজন করে এই এক খেলা খেলবে। শেষে একযোগে তৈরি হবে একটা সুন্দর ভাস্কর্য, প্রত্যেকের মধ্যে থাকবে নিজস্ব ছন্দ। তারপর প্রত্যেকে মনে মনে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা গণনার পর পূর্বের অবস্থান বদলে আবার নতুন ভাস্কর্য গড়ে তুলবে। এভাবেই প্রতিবারেই নতুন ভাস্কর্যের মান আরো উন্নত হচ্ছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। এই ভাস্কর্য নাটকের সময় জীবন্ত দর্শন গড়ে তোলে।

এছাড়াও আরও অন্যান্য গেম খেলা হয়। বিভিন্ন ধরণের Imagination, Realization game খেলা হয়, যার মাধ্যমে একজন অভিনেতার কল্পনাশক্তিকে, অনুভূতির দক্ষতাকে বাড়িয়ে তোলে। এই ওয়ার্কশপ তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্কশপ শুধু মাত্র একটা নাটক তৈরির সময়তে করা হয় তা নয়, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেখানেও ওয়ার্কশপ করানো হয়। কেউ কোনোদিন থিয়েটার করতে চায় না, অথচ ওয়ার্কশপে যোগ দিতে পারে। এই ওয়ার্কশপের জন্যই আস্তে আস্তে অনেক থার্ড থিয়েটার দল তৈরি হয়েছে যা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করেছি।

ওয়ার্কশপ ছাড়াও থার্ড থিয়েটারের আরও দু’ তিনটে বিষয় রয়েছে যেগুলি আলোচনাযোগ্য। সেগুলিকে না দেখালে এই থিয়েটারের বিষয়টা সম্পূর্ণ হয়না। সেগুলি হল— অভিনয় পদ্ধতি, গ্রাম পরিক্রমা, নাট্য উৎসব।

 

অভিনয় পদ্ধতি:

থার্ড থিয়েটারের অভিনয় পদ্ধতিগুলি হল—

১। এখানে নির্দিষ্টভাবে ব্যক্তিচরিত্র থাকে না। যে কোনো সময় একটা চরিত্র যে কেউ করবে।

২। এখানে কোনো মঞ্চোপকরণ থাকে না। সেইজন্য ব্যবহার করা হয় কাপড়, দড়ি, লাঠি ইত্যাদি। এগুলিকে ব্যবহার করেই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যাওয়া হয়।

৩। পোশাক-আশাক একদম সাধারণ হয়।

৪। হাতে পায়ে বিষয়ানুসারে ঘুঙুর, চামর, রুমাল ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘ভুল রাস্তা’ নাটকে একখানা রুমাল ব্যবহার করতেন বাদল সরকার।

৫। আবহসংগীত হিসেবে ব্যবহার হয় হাত তালি, লাঠি বাজানো, মুখের মাধ্যমে বিভিন্ন শব্দ করা (পাখির ডাক, মেশিন, জল পড়া ইত্যাদি)।

৬। শরীর দিয়ে প্রপস বানানো। দরজা, পাহার, চেয়ার, গাছ ইত্যাদি সমস্ত কিছু শরীর দিয়ে গড়ে তোলা হয়।

গ্রামপরিক্রমা:

‘শতাব্দী’, ‘পথসেনা’, ‘ঋতম’, ‘হালিশহর সাংস্কৃতিক সংস্থা’, ‘এরিনা থিয়েটার গ্রুপ’, ‘তীরন্দাজ’, পিপলস আর্ট থিয়েটার অশোকনগর’, ‘ঠাকুরনগর সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এই আটটি দলের সদস্যরা একত্রিত হয়ে ১৯৮৬ সালে ২৮, ২৯, ৩০ মার্চ তিনদিনব্যাপী প্রথম গ্রাম পরিক্রমা শুরু করেছিলেন। এই পরিক্রমার মধ্যেও ছিল বিশেষ রাজনীতির ধারণা। কেননা, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও নাট্যগোষ্ঠীর সদস্যরা রাতের অন্ধকারে, ধান ওঠা আলপথ মাড়িয়ে, গান গাইতে গাইতে গ্রাম পরিক্রমা করেছিলেন। এই পরিক্রমার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতবর্ষের অর্থনীতি, সমস্ত কাঠামো এবং বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক মানুষদের কাছে যাবার এবং তাদের বুঝে নেবার প্রচেষ্টা।

এই গ্রাম পরিক্রমার প্রয়োজনটাও খুব তীব্র হয়ে উঠেছিল। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ একথা আগেই উল্লেখ করেছি। ফলে এ দেশের কৃষিজীবী মানুষ গ্রামে বাস করেন। আর থিয়েটার শিল্প হোক বা যে কোনো শিল্প তা গ্রামের মানুষদের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার। বাদল সরকার লিখেছেন—

“…আমাদের থিয়েটারেও লোক কমে যাচ্ছে। গন্ডি যখন প্রথম নামে, তখন গণ্ডি-র আগামী দুটো শো ফুললি বুকড হয়ে যেত, সেদিন আমাদের নেই।…আমরা ১৩-১৪ বছর পরে কলকাতা থেকে রেগুলার থিয়েটার তুলে দিলাম। আমরা পদ্ধতি বদলালাম।…মোটামুটি অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল, এই সময়টা, প্রতি রবিবার যেদিন আমাদের সকলের ছুটি, আমরা কোথাও না কোথাও অভিনয় করবো। এবং সেখানে গ্রামের নিমন্ত্রণকে তো বরাবরই আমরা প্রাইঅরিটি দিয়েছি, এখনও দেব।…”২  

 

নাট্য-উৎসব:

থার্ড থিয়েটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নাট্য-উৎসব। এই উৎসবের ফলেও অনেক মানুষ নাটকগুলি দেখার পায়। কীভাবে কোথায় এই উৎসব শুরু হল তার একটা ধারাবাহিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

১। ১৯৭৭ সালে ২৯ অক্টোবর সুরেন্দ্রনাথ পার্ক নাট্যসংসদ গঠন হয় এবং প্রথম সেখানে নাট্য-উৎসব শুরু হয়।

২। পরের বছর মধ্যমগ্রামে ১৯৭৮ সালের ২১-২৩ জানুয়ারি নাট্য-উৎসব হয়।

৩। ১৯৮৯, ১৫ মার্চ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রেসিডেন্সি কলেজ বেকার হলে মৃত্যু বিরোধী নাট্য-উৎসব হয়।

৪। ১৯৮৯, ১৫ জুলাই ‘আয়না’ নাট্যগোষ্ঠীর উদ্যোগে সরসুনা বেহালা সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলে ধারাবাহিক ভ্রাম্যমাণ নাট্য-উৎসব হয়।

৫। ১৯৯২, ১৪-২০ জানুয়ারি পর্যন্ত কলকাতা অথ্যকেন্দ্রে অঙ্গনমঞ্চ নাট্য-উৎসব হয়।

৬। ১৯৯৫, ২২ জানুয়ারি কলকাতায় একাডেমির সামনে ফুটপাতে নাট্য-উৎসব হয়।

৭। ১৯৯৫, ২৬ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রসদনে নন্দন চত্বরে বাংলা আকাদেমির সামনে প্রতি মাসের প্রথম ও তৃ্তীয় রবিবার ধারাবাহিকভাবে নাট্য-উৎসব হয়। ২০২০তেও তার ছেদ পড়েনি।

সুতরাং একথা বলেই শেষ করতে হয় যে, বাদল সরকার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে যেভাবে থার্ড থিয়েটার চলে আসে সেভাবে কিন্তু এই থিয়েটারের ভিতরের কথা উঠে আসেনা। সব আলোচনাতেই উপরে উপরে একটা দর্শন এর কথা প্রকাশ পেতে দেখা যায়। যে কারণে বর্তমানে থার্ড থিয়েটার করে বলে যে দলগুলো নিজেদের ঘোষণা করে তারা কেউই থার্ড থিয়েটার করেনা। কারণ তারা কেউই বাদল সরকারের মতো নির্মাণ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নাটক নির্মাণ করেনা। তাই বর্তমানে আর থার্ড থিয়েটার বলে কোনও থিয়েটার যে নেই সেকথা স্বীকার নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

 

তথ্যসূত্র:

১। বাদল সরকার, ‘এ এক অনন্ত ওয়ার্কশপ’, নাট্যমুখ নাট্যপত্র, ক্রোড়পত্র: বাদল সরকার, বিশেষ উৎসব সংখ্যা, সংখ্যা ২০, নাট্যমুখ প্রকাশনী, ১৮৬/৫ অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগণা, ৭৪৩২২২, মার্চ ২০১২, পৃ: ২৯।

২। বাদল সরকার, ‘প্রসঙ্গ: পরিক্রমা’, পরিক্রমা তিন দশক, সম্পাদক দেবাশিস চক্রবর্তী, মীরা প্রকাশনা, ৪২২, গড়ফা মেন রোড, কলকাতা ৭০০০৭৫, দ্বিতীয় সংস্করণ সেপ্টেম্বর ২০১৮, পৃ: ১৬।