গ ল্প

বি ম ল &nbspগ ঙ্গো পা ধ্যা য়

bimal_gongopadhyay

জীবন যখন

সারা রাত অনিদ্রিত অনিকেত, খুব ভোরবেলায় একটি সাদা পাতায় স্পষ্ট অক্ষরে, স্ব স্ব ক্ষেত্রে সেলিব্রিটি এমন পাঁচজন বাঙালী ব্যবসায়ীর নাম লিখল।

১. কে. সি. পাল – ছাতা।

২. দুলালচন্দ্র ভড় – তালমিছরি (ছবি ও সহি সহ এবং ছবি ও সহি ছাড়া)।

৩. নির্মলচন্দ্র দত্ত – নস্য।

৪. প্রিয়গোপাল বিষয়ী – বেনারসী, ছাপা, তাঁত, সিল্ক ইত্যাদি রকমারি শাড়ি।

৫. পি. সি. চন্দ্র – সোনার অলংকার।

পাঁচ বছর হল অনিকেত বি. এ. পাশ করেছে। টাইপ, শর্টহ্যান্ডের যুগ শেষ। সে তাই কম্পিউটার শেখার জন্য স্থানীয় ‘কেয়ার’ নামে একটি শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হয়েছে। দৈনিক কাগজে কর্মখালির বিজ্ঞাপন প্রতিদিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। জমি, বাড়ির দালালী করা বা প্রভাবশালী কোন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হয়ে চাকরি যোগাড় করা, এই দু-য়ের কোনোটিই তার পছন্দ নয়। দালালদের প্রতি মুহূর্তে মিথ্যে কথা বলতে হয়। অজ্ঞ এবং নির্বোধ লোকমাত্রই যে কোনো দালালের পরম কাঙ্খিত ক্লায়েন্ট, এটা ভাবলেই তার নিজেকে একজন কুচক্রী, মতলববাজ ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না। বমি বমি ভাব আসে। যে কোনো দলের রাজনৈতিক কর্মী মানেই, নিজের ইচ্ছা এবং রুচির বিরুদ্ধাচরণ করা। প্রয়োজনে প্রিয়জনকে শত্রুভাবা বা চরম অপছন্দের মানুষটিকে পরম মিত্র বলে বুকে টেনে নেওয়ার মতো কপটতার কথা ভাবলেই, অনিকেত শিউরে ওঠে। সিঁটিয়ে যায়। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য সমস্ত পন্থাগুলি নিয়ে আকাশ পাতাল চিন্তাভাবনার পর, একদিন কোন একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনিকেতের মনে হল, একমাত্র নিজস্ব একটি ব্যবসা করার মধ্যে স্বকীয়তা আছে। বিবেকের সম্মতি আছে। কোনো রকম চাতুরি বা আত্মদহনের গল্প নেই। একমাত্র স্বাধীন ব্যবসাই তার জীবিকা হতে পারে। এমনকি তাতে তার আয়ুও বাড়তে পারে।

অনিকেত বইয়ে পড়েছে, গল্পও শুনেছে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রথম জীবনে হোটেলে থালা বাসন মাজার কাজ করেছেন। মাথায় করে অন্যের মোট বয়েছেন। তারপর অল্পস্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে কীভাবে যেন, একের পর এক সিঁড়ি টপকানোর মতো করে নাম যশ এবং অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের চরমতম শিখরে পৌঁছেছেন। এঁদের মধ্যে অনেকের পিতা মাতা রীতিমত দূরদর্শী ছিলেন। ভবিষ্যতে তাঁদের সন্তান যে প্রভূত সম্পদের অধিকারী হবে এবং সম্পদের গরিমায় যশপ্রাপ্ত হবে, আনন্দ চিত্তে দিনযাপন করবেন, এ ব্যাপারে তাঁরা এতটাই স্থির বিশ্বাসী ছিলেন যে সন্তানের নামকরণ করেছেন ধনপতি-সফল-প্রফুল্ল-নির্মল।

অনিকেতের বাবা এবং মা দুজনেরই দুরদর্শিতায় ঘাটতি আছে। তাঁরা ধরেই নিয়েছেন, পাশ কোর্স গ্র‍্যাজুয়েট তাঁদের একমাত্র পুত্র বড়ো জোর সরকারী বা বেসরকারী কোনো অফিসের কেরাণী হবে। বিবাহের পণের টাকায় দোতলায় নিজের একটি ঘর করবে। বিবাহের পর প্রথম বছরে এবং ওই একবারই, পুরী, খুব বেশি হলে দার্জিলিং বেড়াতে যাবে। চিন্তাভাবনায় অনিকেতের বাবা এখনও মধ্যযুগে পড়ে রয়েছেন। কোনো রকমে খেয়ে পরে দিন কাটিয়ে যাওয়ার মধ্যেই নাকি অপার শান্তি। অধিক অর্থের জোয়ারে নানারকম ভাইসেস এসে জীবনটাকে ছারখার করে দিতে পারে। একথা তিনি প্রায়ই বলেন। যেমন প্রায়ই বলেন, অপ্রবাসী এবং অঋণী ব্যক্তি পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখি মানুষ।

অনিকেত জানে তার বাবা জমানো টাকার সুচিন্তিত বিলি বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। বোনের বিয়ে, তাঁর নিজের অবর্তমানে স্ত্রীর ভরণপোষণ, এই হিসাবের মধ্যে আছে। ব্যবসা করবার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক আনুকূল্য সে যে তার বাবার কাছ থেকে পাবে না, এ বিষয়ে একশ পাঁচ ভাগ নিশ্চিত। সুতরাং প্রয়োজনীয় পুঁজির জন্য সম্ভাব্য সমস্ত রাস্তাগুলির কথা ভাবতে ভাবতে, অনিকেতকে পুরো একটা রাত না ঘুমিয়ে কাটাতে হল। মাঝে বার তিনেক বিছানা থেকে নেমে জল খেল। এক সময় পূবের জানলার দিকে চেয়ে দেখল, ঘরের বাইরের আকাশটাকে ছানাকাটা দুধের মতো দেখাচ্ছে। চড়া নিচু স্বরে পাখিরা ডাকাডাকি করছে।

অনিকেতের মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ সারারাত ধরে ভেবেও অর্থানুসন্ধানের কোনো পথই সে খুঁজে পেল না। প্রতিটি পথের মোড়েই ‘যদি’, ‘কিম্বা’, ‘অথবা’-র থাম পোঁতা রয়েছে।

 

দুই

অনিকেতের বোন অনুসূয়ার বান্ধবী, ফর্সা রোগা রোগা দেখতে শ্রাবণী নামে মেয়েটি এ বাড়িতে প্রায়ই আসে। অনুসূয়ার অজান্তেই শ্রাবণীর সঙ্গে অনিকেতের একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এগ্রিকালচারাল ফার্মের ভেতরের রাস্তাটি ধরে একটি ম্লান বিকেলে দু-জনে পাশাপাশি হাঁটছিল। দুজনের কেউ-ই কথা বলছিল না। দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। দূরে রেল স্টেশন। আবছা অস্পষ্ট চেহারার মানুষের জটলা। আর এই আশ্চর্য নৈঃশব্দের মধ্যে ধূসর রংয়ের একটি পেঁচা উড়ে এসে বসল, ফসল নজরদারির ওয়াচ টাওয়ারের মাথায়। পেঁচাটি তার বড়ো বড়ো দু-চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল অনিকেত এবং শ্রাবণীর দিকে। হয়ত প্রাকৃতিক এমন নৈসর্গিক বিন্যাসের স্পন্দনে অনিকেতের মনে মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত আবেগ সৃষ্টি হল। সে শ্রাবণীর বাঁ হাতের করতলটি নিজের দুহাতে ধরে আকুল গলায় বলল, তুমি আমার ওপর ভরসা রাখো তো, শ্রাবণী?

শ্রাবণী কোন জবাব দিল না। কিন্তু তার দুচোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, গাল বেয়ে, চিবুক বেয়ে। অনিকেতের সেদিন দুটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। নিরুত্তর শ্রাবণীর কান্নায় সম্মতির পূর্ণ প্রকাশ, সে বুঝতে পেরেছিল। দ্বিতীয় অভিজ্ঞতাটি একটু বিজাতীয়। শ্রাবণীর করতল শীতকালের সাপের মতো। শীতল নিঃস্পন্দ। অনিকেতের অমন তীব্র আশ্লেষেও শ্রাবণীকে তার অসম্ভব অবিচলিত মনে হয়েছিল। এই জাতীয় মেয়েরা সুবেদী সংবেদনশীল হয়। অল্পে খুশি হয়। সুখি গৃহকোণে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়।

সেদিন রাতেই অনিকেত স্বাধীন ব্যবসার প্রয়োজনীয় পুঁজির সম্ভাব্য উৎসগুলি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করল। কোনো উপায় খুঁজে না পাওয়ার জন্য, তার মন খারাপ হওয়ার পরেও, সে প্রতিষ্ঠিত পাঁচজন বাঙালী ব্যবসায়ীর নাম সাদা পাতায় লিখল। স্পষ্ট করে বড় বড় অক্ষরে।

সারাদিন অন্যমনস্কতার মধ্যে কাটল অনিকেতের। দৈনিক কাগজে কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখল না ইচ্ছে করেই। বিকালে কম্পিউটার শিক্ষাকেন্দ্রেও গেল না। পরিবর্তে সন্ধ্যার সামান্য পরে একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করে সে শ্রাবণীর বাড়ি হাজির হল।

 

তিন

শ্রাবণীদের পারিবারিক অবস্থা যে এতটা খারাপ, অনিকেতের ধারণা ছিল না। কলোনীর শেষ প্রান্তে নিচু জলা জমিতে ছোট্ট একটি বাড়ি। ইঁটের দেওয়াল। মাথায় টালি!  দরমা ঘেরা রান্নাঘর। বাথরুম বলতে মাথা ফাঁকা চট ঘেরা একটি খোপ।

কিশোরী একটি মেয়ে, বয়সের তুলনায় যার স্বাস্থ্য এতটাই রোগা যে সামান্য দূর থেকে বা পাশ থেকে দেখলে তাকে ছেলে বলে মনে হতে পারে, শ্রাবণীর বোন নিশ্চয়ই, অনুচ্চ গলায় থেমে থেমে বলল, দিদি পড়াতে গেছে। এখুনি আসবে।

অনিকেত ইতস্তত করছে দেখে মেয়েটি এবার অল্প একটু হাসল, আপনি ভেতরে এসে বসুন।

চৌকির ওপর পাতলা একটি বিছানায় অনিকেত বসল পা ঝুলিয়ে। একটু জড়োসড়ো হয়ে। সামান্য পরে শ্রাবণীর বোন এক কাপ চা নিয়ে এল, মা পাঠিয়ে দিল। বলে একটু থেমে আগের কথাটাই আবার বলল, দিদি পড়াতে গেছে। এখুনি আসবে।

চা খাওয়া শেষ করে অনিকেত কাপ ডিসটা কোথায় রাখবে এই ভেবে এদিক ওদিক দেখছে, দরজা জুড়ে একটি ছায়া চেনা গলায় বলল, দাও আমার হাতে।

অনিকেত অবাক হয়ে দেখল তার সামনে শ্রাবণী দাঁড়িয়ে। এতটাই কাছে যে ঘামে ভেজা ব্লাউজের আড়ালে শ্রাবণীর অপুষ্ট বুক দুটি সে আবছা দেখতে পাচ্ছে। তার মানে শ্রাবণীর বোন দিদির অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। এ বাড়ির সবাই তাহলে অনিকেতকে চেনে। চোখে না দেখুক, শ্রাবণীর মুখে তার গল্প শুনেছে।

অনিকেত সামান্য অস্বস্তি বোধ করল। উপযুক্ত কোনো কথা খুঁজে না পেলে মানুষ যেমন বেমক্কা কিছু বলে ফেলে, যার আগাম কোন প্রস্তুতি থাকে না, ঠিক সেই ভাবেই বলল, তোমার বাবা মা সব…! দেওয়ালের পেরেকে কাপড়ের কাঁধ-ব্যাগটি ঝুলিয়ে রাখল শ্রাবণী, বাবার ফিরতে রাত হয়। মাড়োয়ারী গদিতে কাজ কিনা। সময়ের হিসাব নেই। আর মা, সেকেলে মানুষ। এই অব্দি বলে ঘাড় কাত করে শ্রাবণী অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল, এ বাড়ির সবাই তোমাকে চেনে।

অনিকেতের অস্বস্তি তো ছিলই, তার সঙ্গে উদ্বেগ যুক্ত হল। তার মনে হল হঠকারীর মতো শ্রাবণীর বাড়িতে আসাটা, ঠিক কাজ হয়নি। এতে শ্রাবণীর বাড়ির লোকের আশা আকাংখা ইচ্ছেটা আরও একটু দৃঢ় হল। বিশ্বাসযো্গ্য হল।

সে তাড়াতাড়ি বলল, বেরোবে তো?

চলো। শ্রাবণী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।

 

চার

বাড়ির বাইরে এসে অনিকেত একটা সিগারেট ধরাল। তারপর আধো অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ ধরে দুজনে হাঁটতে লাগল। এ অঞ্চলে এখনও রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট নেই। অধিকাংশ বাড়িতে ইলেকট্রিক আলোও নেই। হাঁটতে হাঁটতে তারা অনেকটা পথ চলে এল। দুজনের কেউ কোনো কথা বলছে না। অনিকেতের মনে হল, শ্রাবণী হয়ত তার পারিবারিক দুরবস্থার কথা ভেবে লজ্জা পাচ্ছে। শ্রাবণীর মনে তখন কিন্তু অন্য একটি ধারনা দানা বাঁধছিল। যার মধ্যে আশার কথা, খুশির কথা এবং রোমান্সের মোলায়েম স্পর্শ জড়িয়ে আছে।

কলোনীর রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল তারা। এখানে আলো আছে। সাঁ সাঁ শব্দে বাস-লরি-স্কুটার ছুটে যাচ্ছে। পথচলতি মানুষজন কম। অথচ কটাই বা বাজে! সামান্য দূরে রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, তার বাঁ পাশে বিশাল একটি দিঘি। শ্রাবণী নীচু গলায় আস্তে করে বলল, এখানে একটু বসবে?

‘হ্যাঁ’, ‘না’ কোনো জবাব না দিয়ে অনিকেত পকেট থেকে রুমাল বার করে, সেটা পেতে বসল। দিঘির জল ছুঁই ছুঁই পার ঘেঁসে। শ্রাবণীও বসল, তার পাশটিতে। সামান্য তফাতে। দু-হাঁটু জড়ো করে তার ওপর থুতনিটি রেখে।

প্রেমিক দু-জন মানব-মানবীর এইভাবে বসার দৃশ্যটি পুরনো এবং সুপরিচিত। কিন্তু তাদের কথোপকথন হল চেনা ছকের বাইরে।

অনিকেত বলল, হঠাৎ করে কেন তোমাদের বাড়ি এলাম, জান?

শ্রাবণী ঘাড় দোলাল, না।

স্বাধীন একটা ব্যবসা করার কথা ভাবছিলাম। একটু থেমে বলল, ক্যাপিটাল নেই।

এরপর উত্তরে শ্রাবণীর ইতিবাচক কোনো জবাব থাকতে পারে না। স্বভাবতই সে নিশ্চুপ রইল।

পাঁচজন সেলিব্রিটি বাঙালী ব্যবসায়ীর নাম লিখেছি। এই দেখ। বলে অনিকেত জামার বুক পকেট থেকে সাদা কাগজটি বার করে পড়া মুখস্থ বলার মতো করে বলতে শুরু করল,

কে. সি. পাল – ছাতা,

দুলালচন্দ্র ভড় – তালমিছরি,

নির্মলচন্দ্র দত্ত – নস্য…

অনিকেতের বলার মধ্যে অধৈর্য এবং উত্তেজনা এতটাই প্রকট যে শ্রাবণী বিরক্তি ভরা গলায় বলল, এসব শুনে লাভ কী?

অনিকেত মুহূর্তে চুপসে গেল। ক্লান্ত গলায় বলল, এঁদের মধ্যে কেউ কেউ অতি সামান্য জায়গা থেকে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তারপর কীভাবে কোন পথে যে এগোতে এগোতে…!

অনিকেতকে চমকে দিয়ে শ্রাবণী হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল, যে যার নিজের পথে চলেছে। এদের মধ্যে কাউকে হয়ত লড়াইও করতে হয়েছে। কঠিন লড়াই।

না। আমি ঠিক তা বলতে চাইছি না। এতটুকু বলতে গিয়ে অনিকেতের জিভ জড়িয়ে গেল।

হ্যাঁ। ঠিক তাই। শ্রাবণী দৃঢ় গলায় বলল, সেলিব্রিটিদের নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী বলতো? আমরা তো আমাদের পথে হাঁটব।

শ্রাবণীর মুখে ‘আমরা’ এবং ‘আমাদের’ শব্দ দুটি শুনে মুহূর্তের জন্য হলেও অনিকেত চমকে উঠল। সে খুব গাঢ় গলায় আলতো করে ডাকল, শ্রাবণী ?

শ্রাবণী অপলক অনিকেতের মুখের পানে চেয়ে জবাব দিল, বলো।

একটা কিছু করতে তো হবে। তা না হলে …!

শ্রাবণী ঠোঁট চেপে হাসল একটু। তারপর আচমকা ব্যগ্র গলায় বলে উঠল, অনিকেত। দেখ, দেখ।

কী? বলে অনিকেত সপাটে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, তারা যেখানে বসে রয়েছে, তার সামান্য একটু দূরে একটি ট্যুরিস্ট কোম্পানীর বিশাল বিজ্ঞাপন দুটি লোহার থামের গায়ে আড়াআড়িভাবে আটকানো। দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটি ট্রাকের আলো গিয়ে পড়েছে বিজ্ঞাপনটির ওপর। সাদা বরফে ঢাকা একটি উঁচু পাহাড় চূড়া। পাহাড়টির গা বেয়ে এঁকে বেঁকে সরু একটি পথ উঠে গেছে ওপর দিকে। পথটির পাশে পাশে খরস্রোতা একটি নদী। একজন যুবক পর্যটক পিঠে বিশাল বোঝা নিয়ে সরু পথটি বেয়ে উঠতে উঠেত হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, তার থেকে বেশ খানিকটা নিচে উদ্বিগ্ন মুখে একটি যুবতীকে হাতের ইশারায় ডাকছে তাকে অনুসরণ করার জন্য।

সোঁ সোঁ শব্দে ট্রাকটি পার হয়ে গেল। বিজ্ঞাপনের ছবিটি মুহূর্তে অন্ধকারে তলিয়ে গেল। তখন শ্রাবণী খুব সন্তর্পণে তার রোগা হাত দুটি দিয়ে, অনিকেতের ডান হাতের করতলে আলতো চাপ দিয়ে বলল, আজ থেকে তুমি আমায় ডাকবে অনুসৃতা বলে। আর…! একটু থেমে ফিসফিস করে বলল। আমি তোমার নাম দিলাম সুমেরুশেখর।