সি নে দু নি য়া
অভিষেক ঘোষ
তপন সিংহ : জন্ম-শতবর্ষে ফিরে দেখা
১৯8৬ সালে নিউ থিয়েটার্সে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু, ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ড পাড়ি, লন্ডনে পাইনউড স্টুডিওতে চাকরি, চার বছর পর প্রত্যাবর্তন ও ‘অঙ্কুশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ – এ’ভাবেই তপন সিংহর ফিল্ম কেরিয়ারের সূচনা হয়েছিল। প্রখ্যাত অভিনেত্রী অরুন্ধতী দেবী ছিলেন তাঁর স্ত্রী, জনৈক প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি তপন সিংহের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান অনিন্দ্য সিংহ ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী। তপনবাবু নিজেও ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। তাঁর জন্ম ১৯২8 সালে, বেড়ে ওঠা ভাগলপুরে, পরে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে কলকাতায় আগমন। তাঁর দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে ২০০৯ সালে, তাঁর প্রয়াণে।
একদা ‘চলচ্চিত্রের চালচিত্র’ প্রবন্ধে তপন সিংহ স্বয়ং প্রশ্ন তুলেছিলেন, “সাহিত্য থেকে সিনেমা করা কি এতই জরুরি?” ওই প্রবন্ধেই তিনি উল্লেখ করেছেন – “পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ হোমার, শেক্সপিয়ার, ডিকেন্স, গোর্কি, দস্তভয়েস্কি, টলস্টয়, বালজ্যাক, হুগো, মোপাসাঁ প্রভৃতি লেখকের লেখা পড়তে অক্ষম, কিন্তু সিনেমার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় পেয়েছে। এখানেই সিনেমার অহংকার।” (শতবর্ষে চলচ্চিত্র: নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত) অর্থাৎ আলোর শিল্প সিনেমা কোথাও গিয়ে শিল্পের দুর্বোধ্যতাকে হ্রাস করে, জনসংযোগ সহজতর করে, হৃদয়কে অনায়াসে স্পর্শ করে — এমনটাই বিশ্বাস করতেন পরিচালক নিজেও।
ওই একই প্রবন্ধে তপনবাবু লিখেছেন, “আজ ব্যাপকভাবে পৃথিবীর সমস্ত দেশেই অল্পবিস্তর ছবি তৈরি হচ্ছে। বেশির ভাগই সমাজ-সমীক্ষাপ্রধান ছবি। শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ, অন্তহীন অভিযোগ। সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অভিযোগ, ছেলের বাবার ওপর অভিযোগ, মায়ের ছেলের উপর অভিযোগ।” লিখছেন বটে তপনবাবু, কিন্তু অভিযোগ তিনিও করেছেন তাঁর ছবিতে। ‘আদালত ও একটি মেয়ে’, ‘অন্তর্ধান’ -এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্ররা কলকাতা শহরটার বদলে যাওয়া, মানুষের বদলে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপোক্তির সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগও করেছে। ‘অন্তর্ধান’ ছবিটির শুরুতেই কলকাতার টেলিফোন পরিষেবা নিয়ে বিরক্তি ও অভিযোগ দর্শকের মনে থাকবে। তবে পার্থক্য হল, তপনবাবুর চরিত্ররা কেবল বিরক্তি, বিরাগ বা অভিযোগেই থেমে না; তারা কার্যক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয় ও কিছু করে। কেবল মুখে বলে না, করেও দেখায়। যেমন ‘অন্তর্ধান’-এ নিখোঁজ মেয়েটির পিতার চরিত্রটির একার লড়াই।
“আমার ভালো লাগে না ইদানিংকালের ছবি। সে যে দেশের ছবিই হোক। মনের কোনো খোরাক পাই না। শিখবার মন নিয়ে ছবি দেখতে যাই, কিন্তু কিছু শিখতে পারি না। টেকনোলজি মাথার ওপর চেপে বসে আছে। অসামান্য টেকনোলজির অগ্রগতি। কিন্তু অন্তর গেছে হারিয়ে। সুষমার নেই কোন আভাস।” – ওই একই প্রবন্ধে তপনবাবুর এই মন্তব্য পড়ে কী মনে হচ্ছে? ‘অভিযোগ’ নয় কি? যুক্তিও আছে, যেমন ধরুন… “সেকস্ জীবনের একটা অংশ, এই যুক্তি দিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়। যা সুন্দর, যা একান্তভাবে নিজের — যা মাত্র দু’জনের আদান-প্রদানের মধ্যে বিরাজিত, যার মধ্যে একটা পবিত্রতা আছে — তাকে টেনে হাটের মধ্যে আনার পিছনে কোনো যুক্তি মেনে নিতে পারি না।” তপন সিংহের দর্শক মাত্রই জানেন, তাঁর কথার প্রতিফলন তাঁর ছবিতেও কতটা। ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ ছবিতে সমুদ্র-সৈকতে বেশ কিছু মানুষ স্নানরত। অথচ তাদেরই চোখের সামনে চারজন বেপরোয়া পুরুষ, একজন তরুণীর উপর বর্বর অত্যাচার করে। এই দৃশ্য তপনবাবু যেভাবে শিল্পিত ও সংযত প্রক্রিয়ায় ক্যামেরাবন্দি করে, তা আজও বিস্ময়কর। কিন্তু আজও সেই দৃশ্য যে-কোনো দর্শককেই অভিঘাতে শিহরিত ও সন্ত্রস্ত করে।
ভারত তথা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কী কী ঘাটতি, সেই প্রসঙ্গেও তপনবাবু কিছু অভিযোগ করেছেন একই লেখায়। বলাই বাহুল্য, তাঁর নিজের কেরিয়ারে তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন, ওই অভাবগুলি পূরণ করার। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভূতুড়ে সিরিজের কিশোর-উপন্যাস অবলম্বনে ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’ (১৯৯৮), সুনীল গাঙ্গুলীর কাকাবাবু-সন্তুর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি অবলম্বনে ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ (১৯৭৯) বা ‘সফেদ হাতি’-র মতো ছোটোদের উপযোগী ছবি বানিয়েছেন তিনি; সেই তিনিই আবার রবীন্দ্র-কাহিনি অবলম্বনে ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘অতিথি’ নির্মাণ করেছেন। রমাপদ চৌধুরীর কাহিনি অবলম্বনে তপনবাবুর ‘কালামাটি’ (১৯৫৮)-কে বলা হয় কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবন নিয়ে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ‘ঝিন্দের বন্দী’ (১৯৬১) ও একটি উল্লেখযোগ্য ছবি তাঁর কেরিয়ারে। আবার পরের বছরেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ (১৯৬২) সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের ছবি। ‘নির্জন সৈকতে’, ‘জতুগৃহ’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘হাটে বাজারে’, ‘আপনজন’, ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘এখনই’, ‘হারমোনিয়াম’, ‘এক যে ছিল দেশ’, ‘সফেদ হাতি’, ‘বাঞ্ছারামের বাগান’, ‘বৈদূর্য্য রহস্য’, ‘আতঙ্ক’, ‘হুইল চেয়ার’ -এর মতো ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি ও আঙ্গিকের সিনেমা, বাংলা ছবির পাশাপাশি অনেকগুলি হিন্দি ছবির পরিচালনা, বেশ কিছু শর্ট ফিল্ম, টেলি-ফিল্ম ও ডকুমেন্টারি – তপনবাবু তাঁর ৮8 বছরের দীর্ঘ জীবনে সত্যিই বরাবর সৃষ্টিশীল ছিলেন অভিনবত্বে ও বর্ণনায়।
‘অতিথি’ চলচ্চিত্রায়নে তপনবাবু ক্লাসিক টেক্সটের আক্ষরিক অনুসরণ করেও যথেষ্ট সফল হয়েছেন। ‘ধাবমান মেঘ, ছুটন্ত নদী, জোরালো বাতাস’ – এইসব কিছু তাঁর ফিল্ম ও রবি ঠাকুরের গল্পকে একাকার করে দিয়েছিল। আবার ‘কাবুলিওয়ালা’ বানাতে গিয়ে ‘পরিচালককে জুড়তে হল রহমতের বাড়তি সংলাপ, একটি উপকাহিনি এবং মিনি-রাবেয়ার স্মৃতিকে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা।’ এখানে তিনি রবি ঠাকুরের টেক্সটের থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। এভাবে হয়তো মূল গল্পটিকে সাধারণ দর্শকের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। আবহ সঙ্গীতের ব্যবহারও এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ক্যামেরার মুক্তিদাতার ভূমিকা (অর্থাৎ থিয়েট্রিকাল অভিনয়ের বাইরে গিয়ে সিনেমার মুক্তি) -র পাশাপাশি সঙ্গীত পরিচালনাতেও তপন সিংহের যথেষ্ট অবদান ছিল, সে বিষয় নিয়ে অবশ্য কমই কথা হয়।
‘হুইল চেয়ার’ ছবির শুটিংয়ে একটি শট্ নিতে ক্যামেরা-পার্সনকে ফায়ার ব্রিগেডের ক্রেন ব্যবহার করে মাটি থেকে প্রায় পঁচাশি ফুট উপরে বিপজ্জনক উচ্চতায় উঠতে হয় ক্যামেরা নিয়ে। এই সব প্রতিবন্ধকতা নিয়েই যে সে’কালের বাংলা ছবি, এসব কথা আজকাল আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। শোনা যায় ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ (১৯৮০) ফিল্মে নাকি দীপঙ্কর দে অভিনীত জমিদার-চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় মহানায়ক জর্জরিত, তিনি ডেট দিতে পারছিলেন না। এ-জন্য কিছুটা অখুশি নাট্যকার ও নাম-ভূমিকাভিনেতা মনোজ মিত্র ছবির শুরুতে দীপঙ্করের সাথে কয়েক দিন সহজ হতে পারেন নি। অবশ্য এন্ড প্রোডাক্ট যে কী হয়েছিল, তা আমরা সকলেই জানি। একদা শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ‘উপহার’ (১৯৫৫) ছবিটি বানিয়েছিলেন পরিচালক, একটি চরিত্রে উত্তম। তখন থেকেই উভয়ের মধ্যে ছিল সুসম্পর্ক। যদিও তখনও উত্তমকুমার মহানায়ক হন নি। ‘ঝিন্দের বন্দী’-তে অলিম্পিক পদক-জয়ী ম্যাসি টেলরের অস্ত্র চালনা দেখে দেখেই হুবহু তরোয়াল চালিয়ে ছিলেন উত্তম, তাক লেগে গিয়েছিল পরিচালকেরও। সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’ অবলম্বনে সিনেমাটি দু’জনের এক উল্লেখযোগ্য প্রজেক্ট। কিন্তু উভয়ের সুসম্পর্কটি নাকি নষ্ট হয়েছিল ওই ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-কে কেন্দ্র করেই। তাঁকে না জানিয়েই দীপঙ্করবাবুকে কাস্ট করায় মহানায়ক নাকি তপনবাবুর বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলেন।
এবার আসা যাক, তাঁর চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে আমাদের প্রতিক্রিয়ায়। ‘গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমাটা মজার, কিন্তু গোলমালে ভরা আর কিছুটা হলেও ওভাররেটেড! বাঙালি যদি এত সহজেই নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারত, তাহলে আর ভাবনা ছিল না! ছবির সস্তা, লঘু দর্শনে মন ভরতো না, যদি না কমেডি আর অভিনয় খাসা হতো! আপনি যদি হূমায়ুন আহমেদের ‘কুটু মিয়া’ উপন্যাসটি একবার পড়েন, সুলভ সর্বগুণসম্পন্ন সহৃদয় চাকরের সুখস্বপ্নের সুবৃহৎ ফানুসটি, যেটি ছবি দেখে আপনার মস্তিষ্কে লালন করেছেন; সেটি অচিরেই ফুটো হয়ে যাবে! পারিবারিক মূল্যবোধহীনতা ও পারস্পরিক আক্রোশ দু-চারদিনে ওভাবে চলে যাওয়ার নয়। গেলেও, তা ফিরে আসার কথা। কিন্তু ধনঞ্জয় চাকর তো চলে গেল, না বলেই! তাহলে এরপর কী হবে! আসলে পুরো ব্যাপারটাকেই অতি সরলীকরণ করে, “জাগো বাঙালি জাগো” মোডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘কাজে মুক্তি, কাজই শক্তি’ থীমটা ভালো, কিন্তু টিকবে কি! তবে ছবির কিছু জায়গা অত্যন্ত স্মার্ট, সেই স্মার্টনেস আজ বিরল। তবে অনাথ কৃষ্ণার প্রেমিককে চোর তাড়ানোর মতো তাড়া করে মারতে বাকি রাখার পর, অক্লেশে নিয়মিত তাকে বাড়িতে মেনে নেওয়া, অস্বাভাবিক লাগে! গল্পের বেস্ট পার্ট – বুড়ো কর্তার চাঙ্গা হয়ে ওঠা। সেই জায়গায় আশ্চর্য ভারসাম্য রয়েছে বলে, পুরো ব্যাপারটা সামলে নেওয়া গেছে। বড়ো বউয়ের চরিত্রে ছায়া দেবীর অভিনয় দু-এক জায়গায় একটু চড়া, এছাড়া বাকি সবাই সাবলীল ও যথাযথ। ছবির সঙ্গীত গতানুগতিক ও কোনো কোনো জায়গায় গিমিক আক্রান্ত, সব দায়িত্ব পরিচালক একাই নিয়েছেন। সম্পাদনাতেও দু-চার জায়গায় খামতি চোখে পড়ে! অর্থাৎ সিনেমাটা আরো ভালো হতে পারতো! সুতরাং বেশি নম্বর দেওয়া যায় না। তবু মানতেই হয়, বাংলা সিনেমার সুস্থ বিনোদনের জয় এই পথেই!
১৯৬৮ সালের ছবি ‘আপনজন’। ছবিটা সেই সময়ের নিরিখে স্মার্ট। কিন্তু সত্যিই স্মার্ট যেটুকু, সেটা হল নির্মল কুমার ও তার বউ সুমিতা স্যান্যালের চালাকির পর্বটা – যেভাবে তারা ছায়া দেবীকে সুকৌশলে গ্রাম থেকে শহরে আনে, বাচ্চা মানুষের কাজে নিখরচায় আয়া হিসেবে তাঁকে বহাল করে। কলকাতার সমাজ-জীবনে ছায়া দেবীর দেখে শেখা (গৃহ পরিচারিকার মাধ্যমে) ও ঠেকে শেখা – দুইই পরিচালক ক্যামেরায় তুলেছেন ভালো, এ কথা মানতেই হবে। এমনকি শুরুতে তাঁর দাম্পত্য শুরুর দৃশ্যটিও ভালো কমেডির উদাহরণ। কিন্তু তারপরই সমকালের যুবসমাজকে পর্দায় ধরতে গিয়ে ছবিটা বারবার টাল খায়। যদিও সবকিছুতেই ছায়া দেবী আগাগোড়াই ভালো। তাঁর স্মৃতিচারণ এই ছবিতে এতো গুরুত্বপূর্ণ অথচ, প্রতিটা Flashback shot বাজেভাবে শুরু হয়। ‘চারুলতা’ বা ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-র মতো চলচ্চিত্রগুলিতে এসব ক্ষেত্রে ডিজলভ্, রিপল এফেক্টস্, মিউজিকের দারুণ ব্যবহার ভালো লাগে। সেটা এখানে প্রয়োগ না করতে পারলেও একটি ভালো স্বপ্নদৃশ্য আছে। কিন্তু যখন আছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওই দৃশ্যটি আরো আগে আসা উচিত ছিল। স্বরূপ দত্ত রবির চরিত্রের দৃঢ়তা আনতে পারেন নি, তাঁকে বরং কেমন শৌখিন রোম্যান্টিক রাগী লোক মনে হয়। তদুপরি শারীরিক ভাষা বেশ মেয়েলি। তুলনায় রবির ডান হাত হিসেবে মৃণাল ভালো, অনুগত গুন্ডা হিসেবে মানিয়েছে। পার্থ তো প্রচন্ড ন্যাকা, তার দৌড় দেখলে হাসি পায়। ছেনো গুন্ডার চরিত্রে শমিত ভঞ্জ হাতের ছুরিটাও ভালো করে খুলতে পারেন নি ছবির ক্লাইম্যাক্সে। পাড়ার গুন্ডারা রবীন্দ্রসঙ্গীত বা, জাতিয়তাবাদী গান গায়, কবিতা বলে, আবার বোমাও বাঁধে – দুটো ব্যাপার মেলেনি… যেন এদের প্রতি জোর করে সিমপ্যাথি আদায় করতে চাওয়া। তাও বলবো সময়ের নিরিখে ভালো ছবি। তবে যেটুকু গান-বাজনা আছে, কম থাকলেও ক্ষতি ছিল না। প্রচুর গানের ভাঙা-ভাঙা প্রয়োগ আছে। এতো দরকার ছিল না। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সিনেমার গোলমালগুলো বড্ড চোখে পড়ে। গুলিতে ছায়া দেবীর মৃত্যুর পর পুলিশ বেছে-বেছে রবি ও ছেনোর দু-দলের ক’টা ছেলেকেই জিপে তুলল, অথচ দাঙ্গা করছিল দুশো ছেলে। এগুলো চোখে তো পড়বেই। তাই বলি ছবিটা ভালো বটে, তবে নিখুঁত নয়। এই ছবিগুলির ক্ষেত্রে একটি বড়ো সমস্যা হল, এই ছবিগুলির গোত্র নির্দিষ্ট নয়। শুরুর আধঘন্টা কমেডি, সোশ্যাল স্যাটায়ার, তারপর বাকিটা এলোমেলো চলন ও শেষে গিয়ে ট্র্যাজেডি – এভাবেই এই ছবিগুলোতে গোত্র গোলমাল হয়ে যায়। জঁর বা, গোত্র সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এই ছবিগুলোকে কিছুটা হলেও গুরুত্বহীন করে দিয়েছে।
তপনবাবু আধুনিক ছিলেন, এ কথা মানতেই হয়। তপনবাবুর কোনো কোনো সিনেমা আজও অবাক করে, ‘এখনই’ তেমনই। আসলে ওই যে বলে না… যদি কোনো শিল্প তার শরীরে সমকালকে সচেতনভাবে ধারণ করতে পারে, তা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে। তেমনটাই বোধহয়… তাই যে চিন্ময় রায় নিতান্ত এলেবেলে একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন ভেবে শুরু থেকেই দর্শকের মজার খোরাক হতে থাকেন, সিনেমার শেষে গিয়ে তাঁকেই আমরা ভয়ঙ্কর কষ্ট-গেলা সহমর্মিতায় গ্রহণ করতে বাধ্য হই। আসলে গ্রহণ-লাগা সময়কে পর্দায় ধরতে তপনবাবু যতরকম কৌশল ছবিটিতে ব্যবহার করেছেন, সবকটিই প্রায় সার্থক হয়ে ওঠে, তাঁর ওই সহমর্মিতায়, সহানুভূতিতে। তাই যে প্রাণোচ্ছল ঊর্মি (অভিনয়ে অপর্ণা সেন) স্বভাবগুণেই চোখ কেড়ে নেয়, মন কাড়তে পারবে বলে মনে হয় না; সেই সকলকে ভুল প্রমাণ করে শেষ দৃশ্যে! বোকামিতে, ব্যর্থতায়, আত্মিক পরাজয়ে সেই সবার চোখে জল এনে দেয়। যে অরুণ (অভিনয়ের স্বরূপ দত্ত) মায়ের বেদনাকে ধিক্কারে উড়িয়ে দিত, মায়ের মূক অপলক নীরবতা তাকেও টলিয়ে দেয়, দাঁড় করিয়ে দেয় অলকানন্দা ও বহ্নিমান জাহ্নবীর সামনে। একটা সমাজ ও একটা সময়কে এভাবে জীবন্ত করে তুলতে পারার সাথে সাথে, এই মরমী, আন্তরিক জীবনদর্শনের জন্যও তপনবাবুকে কুর্নিশ জানাতে হয়।
‘এক যে ছিল দেশ’ তপনবাবুর এক আশ্চর্য ছবি, এমন ছবি ভারতে খুব কমই তৈরি হয়েছে। শেষের দিকে তাড়াহুড়ো করে ঝপাঝপ ‘কাট্’ প্রয়োগ না করলে, এডিট আরেকটু গোছানো হলে আর গানের ব্যবহারে আরেকটু পরিমিতি ও বাস্তববোধ দেখালে, ছবিটা আরো সুন্দর হতো। এই ছবি সব বাঙালির অন্তত একবার দেখা উচিত।
‘আদালত ও একটি মেয়ে’ সিনেমার গল্প মূলত এক রেপ ভিকটিমের লড়াই নিয়ে, যদিও গল্পের মূল অংশে প্রবেশ করতে নির্মাতারা অনেকখানি সময় নিয়ে নিয়েছেন, যা চিত্রনাট্যকে দুর্বল প্রমাণ করে। সিনেমাতে প্রধান চরিত্র এক স্কুল শিক্ষিকার (অভিনয়ে তনুজা), যিনি তাঁর দুই সহকর্মীর সাথে গোপালপুরে বেড়াতে যান। চার মদ্যপ, লম্পট, বেপরোয়া যুবক যাত্রাপথ থেকেই তাঁদের পিছু ধাওয়া করে চলে। রাতের ট্রেনে সহৃদয় ও সাহসী পুলিশ অফিসার, গোবিন্দবাবু (অফিসার ঠ্যাঙাড়ে গোবিন্দর চরিত্রে সদ্য-প্রয়াত মনোজ মিত্র) একাই চারমূর্তির রোখ রুখে দিলেও, তারা গোপালপুরে একা পেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই শিক্ষিকার উপর। গোপালপুরের সৈকতের কিছু দৃশ্য গোটা সিনেমার সাপেক্ষে বেশ অভিনব ও স্মরণীয়। তিন শিক্ষিকার একটি ‘Silhouette’ শট্, চার অপরাধীর একটি লং-শট্, শিক্ষিকার উপর শারীরিক অত্যাচারের দৃশ্যে ক্যামেরার কারসাজি ভারতীয় চলচ্চিত্রের নিরিখে বেশ বিস্ময়কর। তবে যেটা নিয়ে ছবি, নামকরণেই যার ইঙ্গিত, সেই কোর্টরুম ড্রামা হিসেবে ছবিটা ব্যর্থ। তার প্রধান কারণ সিনেমার বড়ো জোর ১৫% জুড়ে কোর্টরুম। সেখানেও সেই অর্থে সংলাপের জোর কম, অনুসন্ধান বা, police procedural ও দুর্বল। তবে বাবা ও মেয়ের মধ্যে সম্পর্কের চিত্রায়ণের দুর্বলতা তাকেও ম্লান করে দিয়েছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে বাবার লড়াই ছোট্ট দুয়েকটা দৃশ্যে চমৎকার ধরা পড়েছে। অর্থাৎ চিত্রনাট্য আরও ভালো হতে পারতো। মনোজ মিত্র ও আরো দুয়েকজন পার্শ্ব অভিনেতা ছাড়া বাকি অভিনেতাদের অভিনয়ও বেশ সাধারণ (এমনকি তনুজারও), যা তপনবাবুর ছবিতে আশা করা যায় না।
‘আতঙ্ক’ মূলত এক আদর্শবান, কর্মজীবনে অবসরপ্রাপ্ত মাস্টারমশাইয়ের (অভিনয়ে সৌমিত্র) গল্প, যিনি এখনও ছাত্র পড়িয়েই আনন্দ খুঁজে পান। কিন্তু বর্ষার এক রাতে, বাড়ি ফেরার পথে, প্রাক্তন এক ছাত্রকে (সুমন্ত মুখার্জি) কিছুটা দৈব-দুর্বিপাকেই আচমকা দেখে ফেলেন হত্যাকারীর ভূমিকায়। চারজনে মিলে একজনকে মারছে। সেই প্রাক্তন ছাত্র এগিয়ে এসে বলে, “…আপনি কিছুই দেখেন নি মাস্টারমশাই।” কিন্তু বিবেক বড়ো বালাই! সে যে মানে না মানা! ওদিকে ভয়, মানুষটা যেন আতঙ্কে শুকিয়ে যেতে থাকে। ছেলের মার খেয়ে পাঁজর ভাঙে, মেয়ের মুখ ঝলসে যায় অ্যাসিডে; অবশেষে তখন জাগ্রত বিবেক নিয়ে মাস্টারমশাই রুখে দাঁড়ান। অপরাধীরা শাস্তি পাবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই, তবু অসহায় মানুষ যে বিবেকটা আজও বিকিয়ে দেয় নি, সম্ভবত এটাই তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক। শেষ দৃশ্যটি বিশেষভাবে মনে ছাপ ফেলে। নার্সিংহোমে প্রেমিকার (শতাব্দী রায়) অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া মুখ দেখে প্রেমিকের আতঙ্ক (প্রসেনজিৎ) আর তারপর মেয়ে, মেয়ের বাবা ও মেয়ের প্রেমিক – তিনজনের একত্র দৃষ্টি সোজা ক্যামেরার দিকে, ছবি ফ্রিজ হয়ে যায়। ঠিক যেন দর্শকের উদ্দেশ্য প্রশ্ন… আচ্ছা, আপনি থাকলে কী করতেন? এহেন ক্যাথারসিস বাংলা ছবিতে আজ দুর্লভ।
‘অন্তর্ধান’ একটি পরিবারের গল্প। অভিনয়ে সৌমিত্র, মাধবী ও শতাব্দী রায়। কাহিনি সম্পর্কে বলতে গেলে, সিনেমায় প্রাথমিকভাবে একটি পারিবারিক দুর্ঘটনা ঘটে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রটি অর্থাৎ প্রোফেসার সুশোভনবাবুর প্রৌঢ় দাদার মৃত্যু ঘটে প্রথমার্ধেই। কিন্তু সেই মৃত্যু-শোকের মধ্যে নতুন এক দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে। যখন বাবা-মা জানতে পারেন সেই রাতেই তাঁদের বছর আঠেরোর মেয়ে নিরুদ্দিষ্ট। সেই প্রসঙ্গে Advocate চরিত্রে প্রয়াত মনোজ মিত্রের উক্তি – “মৃত্যু একটা ঘোষিত ব্যাপার, সৎকার একটা সংস্কার; ইনা বাড়িতে না ফিরে বুঝিয়ে দিয়েছে, জীবনের দাম অনেক বেশি।” সে কি ইচ্ছে করে চলে গেছে, নাকি কিডন্যাপড, নাকি তার কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে? কেউ তা জানে না। এবং এখান থেকেই আসল গল্পের শুরু। এখান থেকে গল্পটা রহস্যের অলি-গলিতে যেতেই পারতো। কিন্তু আসলে এটা হয়ে উঠতে চেয়েছে ড্রামা। যেখানে জোর দেওয়া হয়েছে উদ্বিগ্ন, ভগ্নহৃদয় বাবা-মায়ের অন্তর্গত কষ্টের উপরে। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি মেয়ে কেমন আছে, সেটিও দেখানো হতে থাকে, ফলে রহস্যের মোড়ক নেই বললেই চলে। তবে কোনো কোনো জায়গায় চমৎকার সাসপেন্স তৈরি করতে পরিচালক সক্ষম হয়েছেন। মেয়েকে উদ্ধারের সংকল্পে বাবা সুশোভনবাবুর দৃঢ়তা ও স্ত্রীকে সাহচর্যদানে তাঁর অঙ্গীকার – এই সবই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। বরুণের চরিত্রে অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তীও বেশ মানানসই। ছবির সংলাপও পরিমিত, সুচিন্তিত। সব মিলিয়ে এটি সত্যিই চমৎকার একটি ছবি, ফ্যামিলি ড্রামা হয়েও যা প্রায় নীরবেই অপরাধ জগতের এক জটিল গোলকধাঁধার হদিশ দেয়।
‘নির্জন সৈকতে’ ছবিটি শুরু হয় এক রেলের কামরায়, লোকজনের ভিড়ে সেখানে কোনোমতে জায়গা করে নেন অনিল চ্যাটার্জি অভিনীত লেখক চরিত্রটি (সিনেমায় যার কোনো নাম নেই)। কলকাতা-নিবাসী চার বিধবার মধ্যে ঠেলেঠুলে স্থান করে নেওয়ায় প্রাথমিক আপত্তি করলেও, লেখকটিকে বাঙালি হিসেবে শনাক্ত করার পরই শুরু হয় তাঁদের অজস্র প্রশ্ন। কিন্তু এই পুরো যাত্রাপথে আলাদা করে যিনি নজর কেড়ে নেন, তিনি রবি ঘোষ, ভারী মজার চরিত্র তাঁর। খুব কম বাংলা ছবিতেই ছোটো-বড়ো সমস্ত চরিত্রকে এতখানি স্পষ্টভাবে জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়, শুধু মাত্র অভিনয়েই এ জিনিস হয় না, পরিচালক-চিত্রনাট্যকার-সিনেমাটোগ্রাফার-এডিটর – সকলের সমবেত প্রয়াসেই এমন ভারসাম্য ও সংহতি তৈরি হয়। এরপর ওই লেখক চরিত্রটির অনুরাগ-বিরাগ, আনন্দ-বিরক্তি – এইসব অনুসরণ করেই এগিয়ে চলে ছবির কাহিনি। সমরেশ বসু তথা কালকূট রচিত এই কাহিনির বড়ো অবলম্বন এর জীবন-দর্শন ও বাঙালির চরিত্র। লেখক-এর চরিত্রটিকে নিজের মতো করে বোঝার জন্য পরিচালক দর্শককে যথেষ্ট অবকাশ দেন। শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত রেণু প্রতারণার শিকার, ঠকে গিয়ে সে মনে মনে হেরে গেছে। কিন্তু লেখক চরিত্রটির সংস্পর্শে এসে সেও যেমন নিজেকে ফিরে পায়, খুঁজে পায় আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস; তেমনি লেখক চরিত্রটিও কম প্রভাবিত হন না। কিন্তু কেবল চরিত্রগুলির আবেগ নির্ভর হলে ছবির মেজাজ বোধহয় ততটা মনকাড়া হত না, যতটা হতে পেরেছে ভ্রমণবৃত্তান্তের স্পর্শে। পুরী, উদয়গিরি, কোণারক; সমুদ্রসৈকত থেকে টিলার অসমান আনাচ-কানাচ – গোটা ছবি জুড়ে আমাদেরও সার্থক ভ্রমণ হয়। জ্যোৎস্নালোকিত কোণারক স্মৃতিতে গেঁথে যায়… মনে হয়, ইস্ এইসব দৃশ্য যদি বড়ো পর্দায় দেখতে পারতাম! আলোর অমন ব্যবহার, তা ক্যামেরায় ধরা – এ যে ক্যামেরা-পার্সনের স্বপ্ন। সঠিক জায়গায় প্রতিধ্বনির প্রয়োগ, গানের সঙ্গতে প্রত্নমূর্তিতে জুম-ইন কৌশলের সার্থক ব্যবহার, পরিমিত সঙ্গীতায়োজন, শেষ দৃশ্য রেণুর লেখকের পদচিহ্ন অনুসরণে না-বলা কত কথা… এই সব কিছু নিয়ে এ এক সার্থক ছায়াছবি, সম্ভবত তপন সিনহার অন্যতম সেরা। প্রেম যে এক চমৎকার বিস্ময়, তা যে আজও শিহরণ-জাগানিয়া, কোথাও গিয়ে যে আজও সেই প্রেমের প্রতি ভরসা রাখা যায়; এই ছবি সেই বার্তাও দেয় এক্কেবারে নীরবে।
‘হারমোনিয়াম’ তপন সিংহের ফিল্মোগ্রাফিতে এক উল্লেখযোগ্য ছবি। এই ছবির শুরুতেই আমরা দেখি, নিলামে উঠেছে একটি Dwarkin -এর হারমোনিয়াম, নীরব ক্রেতাদের ভিড়ের থেকে দূরে, সিঁড়িতে দেখা যায় অরুন্ধতী দেবীকে, তিনি স্মৃতি-সোপানে অতীতে চলে যান। কীভাবে তাঁর জননীহারা শৈশবে ওই হারমোনিয়াম তাঁদের পুরনো জমিদারবাড়িতে এল, আবার কীভাবেই বা তা হাতছাড়া হল এবং কীভাবে তা আবারও একদিন বিগতযৌবনা তাঁরই হাতে ফিরে এল – তাই নিয়েই এই জমজমাট ছবির কাহিনি বুনেছেন পরিচালক। তিনিই কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, সঙ্গীত পরিচালকও বটে। এই ছবি দেখতে বসে একটা সময়ে পৌঁছে দর্শকের মনে দুটি প্রশ্ন জাগতে পারে… এত গানের কি সত্যিই কোনো প্রয়োজন ছিল? এর উত্তর সম্ভবত এই যে, এটাই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। দ্বিতীয় যেটি মনে হতে পারে, ছবিতে এই হারমোনিয়ামের ভূমিকাটা কী! একটু সতর্ক অভিনিবেশে অবশ্য সেটা বোঝা অসম্ভব নয়। একদিন মা-হারা মেয়েকে গান শেখাতে শেখাতেই জমিদার পিতার মৃত্যু হয় অকস্মাৎ। অনাথ মেয়েটির দেখাশোনার ভার তখন পরিচারক বিরজুদার উপর, তাদের সেই হারমোনিয়াম বেচতে হল। কালী ব্যানার্জির পরিবারে গেল সেই হারমোনিয়াম। এবার এখানে পরিচালক একটু কৌশলের সাহায্য নিয়েছেন… নদীপক্ষে নৌকায় ভাসমান অবস্থায় এক গায়ক ও তার সঙ্গিনীকে নৌকায় তুলে নিয়েছিলেন সেই ছোট্ট মেয়েটির জমিদার পিতা। কাহিনির পরবর্তী অংশে জানা যায় যে, ওদেরও একটি মেয়ে আছে যে কিনা বড়ো হয়ে হবে গণিকাপল্লির শ্যামা এবং জমিদার-তনয়ার শৈশবের সেই হারমোনিয়াম তার কাছেও যাবে দুর্ভাগ্য বহন করে। কাহিনির দ্বিতীয় পর্বে কালী ব্যানার্জির বাড়িটি ভারী মজার, প্রতিটি চরিত্র ও সংলাপ অত্যন্ত সুলিখিত। ওই পর্বে হারমোনিয়াম ‘আগুন’ ও ‘ঘি’ – এই দুই পদার্থের মধ্যে অনুঘটকের ভূমিকা নেয়। ফলস্বরূপ কালী ব্যানার্জি ওই হারমোনিয়াম কোলে করে তুলে নিয়ে গিয়ে, বেচে দিয়ে আসেন দোকানে। এইখানেই শুরু হয় কাহিনির তৃতীয় পর্ব, যেখানে একটি গণিকাপল্লির চিত্র তুলে ধরা হয়। কাহিনির এই অংশে শমিত ভঞ্জ হারমোনিয়ামটি কিনে নিয়ে আসে গণিকাপল্লিতে, সেখানে ছায়া দেবী ‘মাসি’ তথা মধুচক্রের কর্ত্রী চরিত্র হিসেবে অসামান্যা। প্রাথমিকভাবে শমিতের চরিত্রটির আগমন ওই হারমোনিয়ামের সাহচর্যে আনন্দময় বলে মনে হলেও পরবর্তীতে দেখা যায় হারমোনিয়ামটিই তার বিয়োগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় অর্থাৎ আবারও ট্র্যাজেডি। শমিতের মৃত্যুর পর শ্যামা ও মাসি ওই হারমোনিয়াম চোখের জল সঙ্গী করে ফের বিক্রি করে দেয়। হারমোনিয়ামটি যেন অনিচ্ছুক হৃদয় নিয়ে একসময়ে জমিদার-তনয়াকে শৈশবে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর থেকেই সে যেখানেই গেছে, নিয়ে গিয়েছে ভাঙন বা বিচ্ছেদ (যদিও কালী ব্যানার্জির পরিবারে এটা খুব যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না, কিছুটা আরোপিত লাগে)! অবশেষে হারমোনিয়াম ফিরে আসে সেই মেয়েটির কাছে; তফাৎ এই যে মেয়েটি আর তখন ছোট্টটি নেই… সে তখন প্রৌঢ়া বিধবা অরুন্ধতী দেবী। এই গল্পে আবার অদ্ভুতভাবে শেষদিকে রয়েছে আর এক মা-হারা মেয়ে; তার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনিল চ্যাটার্জি, যিনি কন্যাকে গান শেখাতে ও প্রায় নিঃসহায়া অরুন্ধতী দেবীকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে সেই অভিশপ্ত হারমোনিয়ামটি কিনে নিয়ে আসেন। স্বভাবতঃ হারমোনিয়ামটি দেখেই অরুন্ধতী দেবীর মনে পড়ে যায় শৈশব-স্মৃতি এবং গানে-গানেই শেষ হয়ে যায় ছবি। সব মিলিয়ে জমজমাট এই ট্র্যাজি-কমেডি গোত্রের ছবিটিতে যা যা কিছুটা খাপছাড়া লেগেছে… অরুন্ধতী দেবীকে তাঁরই অতীত ইতিহাস প্রৌঢ় নায়েব-পুত্রের শুনিয়ে চলা, তাও একপেশে সংলাপে… বেমানান। বারংবার ফুলে-ঢাকা বৃক্ষশাখার প্রেক্ষাপটে নানা চরিত্রকে ধরা একটু হলেও অবাক করে, কারণ নিছক সৌন্দর্যের অভিমান ছাড়া কোনো যুক্তি থাকে না ওই শটগুলোর। এছাড়া স্বরূপ দত্তের চরিত্রটির মুখে বিদঘুটে মেক-আপ বড্ড চড়া ও অস্বস্তিকর, তাঁর দৃশ্যগুলি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় ‘আতঙ্ক’ ছবিতে সৌমিত্রর মুখের অদ্ভুত মেক-আপ। তবে এই ছবি সার্থকভাবেই নির্দেশ করে, গল্প বলায় তপন সিংহ কতখানি দক্ষ ছিলেন!
স্বল্প পরিসর, তাই সব ছবি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাঁর অনেক ছবি আজ পাওয়াও যায় না, প্রিন্ট হারিয়ে গিয়েছে। অথচ কাবুলিওয়ালা, লৌহ-কপাট, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি, আপনজন, হাটে বাজারে, এখনই, আদালত ও একটি মেয়ে, সফেদ হাতি, এক ডক্টর কি মৌত, আদমি আউর আউরত, হুইল চেয়ার – এতগুলি চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন পরিচালক। এর মধ্যে ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘হাটে বাজারে’ ছবি দু’টি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। ‘সফেদ হাতি’ পেয়েছিল শ্রেষ্ঠ শিশু চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার। ১৯৯০ সালে ‘এক ডক্টর কি মৌত’ (অভিনয়ে পঙ্কজ কাপুর, শাবানা আজমি, অনিল চ্যাটার্জি, ইরফান খান) ছবিটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার পান। একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি ১৯৯২ সালে ‘পদ্মশ্রী’, ২০০৬ সালে ‘দাদা সাহেব ফালকে’ সম্মান অর্জন করেছিলেন তপনবাবু। আজ তাঁর জন্ম-শতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই আবেদন জানিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলি এইভাবে হারিয়ে যেতে দেবেন না। অন্তত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যাঁর পক্ষে যেভাবে সম্ভব, তপন সিংহের চলচ্চিত্রগুলির সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন।