Hello Testing

কে তা বি  ক থা

স্বপন পাণ্ডা

swapan

সোমনাথের গল্প: বাংলা কথাসাহিত্যের তারুণ্য

চাঁদ ভাঙা জল

সোমনাথ ঘোষাল

প্রকাশক: অভিযান পাবলিশার্স

তখন মহামারী-কাল। কী লিখব কেন লিখব, কী থাকবে কী ভেসে যাবে-র চেয়ে এইসব প্রশ্নকীট মাথা জুড়ে চক্কর কাটছে আমি কি আছি, ক’দিন আছি, কী হবে লিখে, মৃত্যুশাসিত এমন প্রহরে শিল্পসাহিত্য কি অর্থহীন নয়? প্রথম মারীপ্লাবন, দ্বিতীয় প্লাবন পার করে যারা রয়ে গেলাম, ভ্যাকসিন-বলে বলীয়ান হয়ে ফের বঙ্গীয় লেখক-জনপদে ভেসে উঠলাম, আবার তাদের মধ্যে লেখালেখির সূত্রে দেখাশোনা শুরু হল। ফিরে এল আবার, বেঁচে থাকার, লিখে যাওয়ার অর্থ। মারী-পরবর্তী এমনই এক অনুষ্ঠানে সোমনাথ, সোমনাথ ঘোষালের সঙ্গে দেখা। তরুণ চলচ্চিত্রকার, কবি ও গদ্যকার সোমনাথ লাজুক হেসে হাতে দিল ‘চাঁদ ভাঙা জল’, সদ্য প্রকাশিত, তার প্রথম গল্পের বই। দু হাজার বাইশে, অভিযান প্রকাশিত বইটিতে আছে, ছোট, অতি ছোট সবমিলিয়ে কুড়িটি গল্প। দুঃসময়ের যবনিকা পাতের পর আমার পাওয়া প্রথম উপহার! শুরুতে, ভূমিকার মতো একটা প্রাক্কথন লিখেছেন, নব্বই দশকের অন্যতম প্রধান আখ্যানকার, আমাদের অতি প্রিয় বন্ধু সুকান্তি দত্ত। গল্প বা উপন্যাসের ভূমিকা আমি পড়ি সাধারণত সব শেষে। সোমনাথের কোনও লেখা কখনও পড়িনি বলেই হয়তো, এক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম ঘটল। প্রথমে ভূমিকা পড়ে, তারপর গল্প, গল্প পড়া শেষ হলে আবার ফিরে এলাম ভূমিকায়। দেখলাম, সুকান্তি, সোমনাথের গল্পে, যে ‘বৈশিষ্ট্য, আশা ও সম্ভাবনা’ দেখতে পেয়েছেন, তা একেবারে যথার্থ। আমি শুধু ওই সূত্রগুলি, কয়েকটি প্রিয় গল্পের আশ্রয়ে, একটু বিস্তারে এখানে পেশ করছি।

     সোমনাথ ছবি তোলে, ছবি বানায়। দৃশ্যের ওপর দৃশ্য, শব্দের পর শব্দের অন্তর্বয়নে যেভাবে ছবি গড়ে ওঠে, সোমনাথ ওই বয়ন-কৌশল তার গল্পে চমৎকার নিয়ে এসেছে। টুকরো টুকরো ছবি সাজিয়ে দিতে দিতে সে একসময় গড়ে তোলে আস্ত একটা গল্প। তার বাক্যবিন্যাস সরল, ছোট। মাত্র একটি শব্দের বাক্যও সে প্রায়ই ব্যবহার করে তার গল্পে, এবং সফলতার সঙ্গে। প্রিয় একটি গল্প ‘দুই শালিক’। এখানে আছে, বন্ধ গ্লাস-কারখানার বাতিল, প্রতিবন্ধী এক শ্রমিক সুবীর। সে, এখন যেখানে থাকে, সেখানে রাস্তা ঘর ‘যেন সবই এক’ “গলি ঘুপচি দিয়ে এগিয়ে গেলে বাসনের শব্দ। ভাতের গন্ধ। কাঁচা মাংস। পায়খানা। বমি। মদ। নেশা।” এই যে একটি-একটি শব্দে বাক্য নির্মাণ ‘পায়খানা’, ‘বমি’ ‘মদ’ ও ‘নেশা’ চারটি বাক্যই, আগের গলি-রাস্তা-ঘরের বাসনের শব্দ, ভাতের গন্ধ, কাঁচা মাংস-র সঙ্গে মিশে গিয়ে পুরো তৃতীয় বিশ্বের ‘লাঞ্ছিত বঞ্চিত’ মানুষের ঠিকানাকে চিহ্নিত করে দেয়। নাগরিক বস্তির বিবরণ থেকে যেই শৈশবের স্মৃতির ভেতর ডুব দেয় সুবীর, সোমনাথের বাক্যনির্মাণ অমনি বদলে যায়, তখন, নরকের মধ্যে পড়ে থাকা ” সুবীর ইছামতীর আলপথ ধরে খেজুরগাছের তলায় ছোট্ট সুবীরকে দেখতে পায়।” তাহলে তারও একটা নদী-গাছপালা-আলপথের শৈশব ছিল। ওই স্মৃতি থেকে তাকে মুক্ত করে এনে আবার লেখক ছুঁড়ে দেন কঠোর বাস্তবের ঘূর্ণিতে। চাকরি নেই তার, বৌ, রাতদিনের কাজে ঢুকে গেছে, ছেলেকেও নিয়ে চলে গেছে সে। পুরনো অভ্যেসে, হুইল চেয়ার নিয়ে বিকেল হলেই সুবীর চলে যায় কারখানায়। অনেকগুলো কাক মিলে দুটো শালিকের বাচ্চাকে মেরে ফেলছিল, উদ্ধার করে আনে সে। ‘নতুন বন্ধু’দের ছাতু দেয়, জল মুড়ি দেয়, যেন তার জীবনে কিছুক্ষণের জন্য ফিরে আসে প্রকৃতির সাহচর্যে কাটানো ইছামতীর দিনগুলি। পয়সা ফুরিয়ে আসে, রোজ বিকেলে কলকাতার নন্দনের সামনে ফুটপাতে চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকে এখন, তার গায়ে বসে থাকে শালিক, পথচলতি মানুষ দেখে ওরা ডেকে ওঠে, লোকজন সেলফি তোলে পয়সা ফেলে, তাতেই জোটে ভাত ডাল ডিম মুড়ি ছেলেকে না দেখে কাকলিকে না দেখে, তাদের আদর করার ব্যর্থ চেষ্টা থেকে বিরত সুবীর ভালোই আছে, কোনোক্রমে টিকে আছে অন্তত। সুকান্তি তার ভূমিকায়

সামগ্রিক ভাবে সুবীর, সুবীরদের কথা বলতে গিয়ে ঠিকই লিখেছে, সোমনাথের গল্পে আমরা পাই, ‘কখনও মায়াময় বিষণ্ণ, কখনও রূঢ়, কর্কশ এক বাস্তবের ছবি। গ্রাম-শহরের গরিব, চালচুলোহীন, কোনোক্রমে টিকে থাকা মানুষের কথাই বেশি।” তবে, ‘নিরুদ্দেশ’ গল্পের বছর পঞ্চাশের লোকটি সম্বন্ধে এমন কোনও সূত্রই যেন খাটে না।

     লোকটি রোজ এসে বসে থাকে রেললাইনের ধারে। লোকে তাকে নানা নামে ডাকে ‘পাগলাচোদা, হেরোসুড্ডা, বাল…’ তার প্রকৃত নাম ঠিকানা পরিচয় কিছুই কারও জানা নেই। তার সামনে কত কত দৃশ্য তৈরি হয়, ভেঙে যায়, কত কথা ভেসে আসে, মিলিয়ে যায়। সে বসে থাকে, বসেই থাকে। বৃষ্টিতে চারপাশ যখন ভেসে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে, তখনও অদম্য লোকটি প্লাস্টিক পেতে বসে থাকে গা গুলিয়ে ওঠা ‘হাগামুতের’ গন্ধের ভেতর, ট্রেন দেখতে থাকে। ট্রেন আসা-যাওয়ার ফাঁকে দেখে তার পাশে একটা লোক কানে ফোন চেপে ‘মুতছে’ আর কথা বলছে ঝাঁঝালো গন্ধের শব্দ-ফোয়ারা ছিটিয়ে :

“হ্যাঁ বাঁড়া বল

…আজকে হবে না

…..বাড়িতেই মাল খাব

…না গাঁজা নেই

তোর কী বাঁড়া

ধুর ল্যাওড়া ফোন রাখ”

গান শুনতে শুনতে একটা ছেলে লাইন ধরে হাঁটছে, পেছন থেকে এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় দু টুকরো হয়ে গেল। চিৎকার চেঁচামেচি লোকজন কান্নাকাটির মধ্যেও সে চুপটি করে বসে থাকে, তার ওই বসে থাকাকে সদ্য ছেলেহারা মা, শোকে ক্রোধে বলে ওঠে ‘ওরে খানকির ছেলে, আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে পারলি না?’ সে নিরুত্তর, জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে ‘কাঁচা খিস্তি মেরে তেড়ে আসে’ বেদম মেরে ফেলে দিয়ে আসে বড় রাস্তার ধারে, তাতেও সে দমে না, একদিন আবার ফিরে আসে মজে যাওয়া পুকুরে পাশে ট্রেন দেখতে রেললাইনের ধারে। এমন অদ্ভুত একটি চরিত্র তৈরি করা সহজ নয়, সোমনাথ এখানে তার আখ্যানশক্তির চূড়ান্ত পরিচয় রেখেছে বলে মনে করি। এমনই সব একলা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে, তাদের আঁকাড়া ভাষায় ভর করে দাঁড়ায় সোমনাথের গল্প।

    ‘ঘুলঘুলি’ গল্পটি পড়তে পড়তে, অদ্ভুত ভাবে, একদিকে নিমগাছের সূত্রে মনে পড়েন বনফুল, অন্যদিকে, সবার থেকে একলা হয়ে গিয়ে নিরাসক্ত ভাবে সবকিছু, এমনকি প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখেও নিস্পৃহ নয়নকে দেখে, নানা ভাবে মনে পড়েন মানিক, জগদীশ থেকে নবারুণ। একটা বহু বহু পুরনো বাড়ি, ‘খুপরি খুপরি ঘর’, কারও সঙ্গে কারও ‘মুখ দেখাদেখি নেই’ উঠোনের নিমগাছ সবকিছু আড়াল করে রাখে। একলা নয়ন। লকডাউনে মাধ্যমিক দিয়েছে, বিড়ি খেতে শিখেছে, সিড়ির চাতালের ঘরে শুয়ে শুধু ‘নিমগাছের মাথায় পড়ন্ত রোদে পাখিদের কথাবার্তা শোনে।’ তার ঠাকুরদাকে ধরেছিল ‘সিনেমার ভূত’, সেও পেয়েছে উত্তরাধিকার। বাস্তবে সিনেমা কেমন বানাতে হয় তার জানা নেই। মরবার আগে ঠাকুরদাই বলে গেছেন, এই বাড়িটাই আসলে সিনেমা, ঘুলঘুলিগুলো ক্যামেরা। ঘুলঘুলি দিয়েই দেখে ঠাকুরদার পড়ে যাওয়া, সে ধরতে যায়নি। সিনেমা দেখছিল। সবাই যখন শ্মশানে, সে দেখে পিসিমা সামনে চেয়ারে দোল খেতে খেতে হাসছে। তার কোনও বন্ধু নেই, দৃশ্যই বন্ধু তার। সে দেখে ফেলে, মা ঘুমিয়ে গেলে রোজ রাতে বাবা চলে যায় পিসির ঘরে। ঠাকুরদা সহ্য করতে পারত না, বলত ‘শয়তান কালনাগিনী’। তাই কি ঠাকুরদা মরে গেলে, পিসি হাসে, যেখানে ঠাকুরদা পড়ে গিয়ে মরে গেল, সেখানে লাথি মারে, থুতু ফেলে! এবং তুমুল পাগল হয়ে একদিন বাথরুমে কারেন্ট লেগে মরে যায়। তার সিনেমায়, ‘ঠাকুরদা

আর বাবা ভিলেন। কোনো নায়ক নায়িকা নেই।’ তার মা আর সে যেন ওই ছাদে পড়ে থাকা কাটা ঘুড়িটার মতো ‘ভোকাট্টা’ অস্তিত্ব বয়ে বয়ে একরকম বেঁচে থাকার অভিনয় করে যায়। নয়ন, পুরনো বাড়ির ঘুলঘুলিকে ক্যমেরা বানিয়ে সবকিছু দেখতে দেখতে নিজেও একটা যন্ত্র হয়ে যায়। গল্প-কল্পনায় সোমনাথ এখানে, বাংলা ছোটগল্পের উত্তরাধিকারকে সাম্প্রতিকে বিস্তার ঘটিয়েছে।

     ‘কুকুরের মা’ গল্পে উত্তরাধিকারের আর এক বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে পড়তে দেখি। সুরমা। পঞ্চাশের ওপর বয়স। সরকারি চাকরি করে, বিয়ে-থা হয়নি, মা নেই বাবা নেই, দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। চাকরি, বই কুকুর বেড়াল পাখি আর গাছ নিয়ে দিন কেটে যায় তার। নিজের অনুভূতি সে লিখে রাখে ডায়েরিতে। ওই ডায়েরি, নিজের লেখা কাঁচা কবিতাগুলি পড়তে পড়তে সে নিজেই অবাক হয়ে যায় ‘এত আবেগ! কার জন্য? তাকে তো চেনে না। জানে না।’ বিষাদে আক্রান্ত হয়ে ভাবে, ‘শূন্যতার কোনো শরীরও নেই। তাহলে একটু জড়িয়ে ধরা যেত।’ অগত্যা তার সব অনুভূতি যেন হঠাৎ সংহত হতে শুরু করে নিজের পোষা কুকুর সীতা গীতা ভুতোদের চলাফেরায় আচার-আচরণে। ভুতো সীতার পেছনে ঘুরে বেড়ায়, একদিন বাড়ি ফিরে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সে দেখে, সীতা আর ভুতো তুমুল সঙ্গমে মত্ত, আর ঈর্য্যা বুকে চেপে গীতা দেখছে গোল গোল ঘুরে ওদের মিলন। ওই ঈর্য্যা পশুর থেকে উঠে এসে এক মানবীকে যখন সংক্রমিত করে দেয়, তখনই গল্প উড়ান দেয় ইলিয়াসের জগতে। টানা বৃষ্টিতে, তুমুল সঙ্গম দেখতে দেখতে ‘চেয়ারের হাতলে হাত ঘষতে থাকে। লাল হয়ে যায় সুরমা।’ যৌনতার অপার রহস্য আর মনস্তত্ত্বের বুননে অনবদ্য গল্প ‘কুকুরের মা।’

    মাকে নিয়ে, মায়েদের নিয়ে দুটি গল্পে সোমনাথ দারুণ ভারসাম্যের খেলা খেলেছেন। বিষাদনিহিত আবেগ আর নিরাবেগ মর্মভেদী অবলোকনের আলোয় দুভাবে মাতৃ-মোটিফ জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘মা, বেড়াল ও আঁশটে গন্ধ’ এবং ‘পলাশের আলোরাত’ গল্পে।

     মাছের বাজারের ‘আঁশটে গন্ধের’র মধ্যে থাকে ‘ভিজে বেড়ালটা’। বাজার, মাছ ও বেড়ালের কথা বলতে বলতে সোমনাথ ক্যামেরা ভিউ থেকে সরে এসে ঢুকে পড়ে মনোবিবরের মধ্যে ‘মাছ ও বেড়াল এই দুজনের মধ্যেই একটা চরম যৌনতা আছে।’ বেড়ালটা মাছ খায় না, শুধু ‘শুঁকে রেখে’ দেয়। ‘মাছের গন্ধ শুকেই বেড়ালটার পেট ভরে যায়। এমনিতে খিদে মেটানোর জন্য নিরামিষ খায়। আসলে মাছের প্রতি বেড়ালটার খুব আসক্তি আছে। খিদে নেই।’ এমন অদ্ভুত আচরণের ইঙ্গিত দিয়েই বেড়ালের সমান্তরালে এবার শুরু হয় মায়ের গল্প। ‘বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা পুরোপুরি নিরামিষ।’ মাঝেমাঝে কথক বেড়ালের সঙ্গে মায়ের মিল পায়। মাছওয়ালাদের রগুড়ে বয়ান “ওর হুলো ওকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই আমিষ খেয়ে কী করবে? লাগাবে কে? বয়স কম তাই গন্ধ শুঁকেই কাটিয়ে দিচ্ছে।” বেড়ালের অদ্ভুত আচরণের সঙ্গে মায়ের মিল পায় কথক, ‘মায়ের বয়স হয়েছে। তাই শুধু নিরামিষ খায়। কোনোকিছুই আর প্রয়োজন হয় না।’ বেড়ালটাকে সে বাড়িতে নিয়ে আসে। ছাদে রাখে, ‘বেড়ালটা মায়ের মতোই’ এক কোণে বসে খেয়ে নেয়। বিধবাদের মত, ‘আড়াল’ করে খায়। বেড়ালকে বার বার ‘মা’ মনে হতে থাকে তার। আমিষ-নিরামিষ, হুলোহীন বেড়াল আর স্বামীহীনা নারী একই অবস্থানে, কিন্তু ‘মায়ের বয়স হয়েছে’, ‘প্রয়োজন হয় না’ —  এই দুটি ইশারাগর্ভ বাক্যবন্ধ, গল্পটিকে ,  ‘কুকুরের মা’ গল্পের যৌনরহস্যের জগতে পৌঁছে দেয়।

      শেষ করব যে-গল্প দিয়ে, সেও মাতৃ-মোটিফের আখ্যান। ‘পলাশের আলোরাত’ “আলো ধরা কি অত সোজা ল্যাওড়া! পলাশ চিৎকার করে দৌড়োতে থাকে। সঙ্গে ছকু আর পঞ্চা। ভূতনাথ মন্দিরের পাশের ঠেক থেকে চার ছিলিম মেরে জেটিঘাটের দিকে। বাগবাজার থেকে নিমতলা ছিলিমের টাকা, বাংলা বোতলের টাকা ‘খিচতে’ ছুটতে হয় তাদের। সারাদিন একটা চাতালে ‘ঝিম মেরে’ পড়ে থাকে পলাশ, বিকেল হলেই চাগিয়ে

ওঠে নেশা। ‘খাবার আর নেশা’র জন্য বেঁচে আছে, আর আছে আলো ধরবার জন্য। শ্মশান থেকে জেটিঘাট তার আলোর দৌড় চলে কারণ ** বহুদিন আগে পলাশের মা গায়ে আগুন লাগিয়ে গঙ্গায় তলিয়ে যায়। তখন অমাবস্যা। আলো আরও স্পষ্ট। পলাশ জলের ওপর আগুন দেখছিল। মা আলোর মতন জ্বলছে।” জেটির পাগলের সঙ্গে বাংলা খেতে খেতে নিজের ভেতরের কষ্ট উপুড় করে দেয় পলাশ : “

কী রে, আলো ধরে কী করবি?

আলোর ভেতর মা আছে।

মা তো অন্ধকারে

না মা আলোতে। আমার মা।’

বহুদিন আগের মায়ের পুড়ে মরে যাওয়া, গঙ্গায় তলিয়ে যাওয়া তার অবচেতনকে বিপর্যস্ত করে দিয়ে গেছে। তার জীবনটাও দুমড়ে মুচড়ে অষ্টাবক্র, তবু আলো ধরবার জন্য বেঁচে ওঠে প্রত্যেক সন্ধ্যায়, ওই আলোতে যে ‘মা আছে’। হঠাৎ মনে পড়ে যায়, ‘সুবর্ণরেখা’র শেষ দৃশ্যে বিনুর সংলাপ, নদীর ওপারে নতুন বাড়ি, সেখানে বাবা আছে, মা আছে, প্রজাপতি উড়ছে অসম্ভব, অবাস্তব স্বপ্নের দেশে পৌঁছতে চায় নিষ্পাপ শিশু বিনু। সোমনাথের গল্পের পর গল্পে, এভাবেই আমাদের সময়ের নির্জন ক্ষতহ্নিগুলি যেমন দৃশ্যমান, তেমনি একলা হয়ে যাওয়া মানুষের গোপন গোপন স্বপ্ন পূরণের জন্য আর্তি জেগে থাকে। সোমনাথের মত তরুণদের লেখা পড়তে পড়তে চেতনায় এমন কত আলোছায়ার খেলা যে অনুভব করি, তার সবটুকু হয়তো বলা হয়ে উঠল না, তবে পাঠক নিশ্চয় অনুমান করতে পারবেন, বাংলা কথাসাহিত্যের তারুণ্য কী প্রবল বেগে বহমান।

[TheChamp-FB-Comments style="background-color:#fff;"]