ভ্র ম ণ
ফাল্গুনী ঘোষ
ভূ-স্বর্গের ডাকে । পর্ব ৫ । স্বর্গীয় উপত্যকা
স্বর্গীয় উপত্যকা ৮
এখনও ঢেকুর উঠছে। কিন্তু গড়াপিটার ছাড়পত্র নেই। আরেকপ্রস্থ সাজ পোশাকে সব সেজে উঠেছে। বাঙালি যেমন হুজুগে তেমন বিপরীত বৈশিষ্ঠ্যে আলসেও। সুতরাং “আপনারা দেরী করলে আপনারাই পাবেন না দেখতে। হজরতবাল, শালিমারবাগ, নিশাতবাগ, চশমে শাহী শঙ্করাচার্য—এই কটা তো দেখতে চান! নাকি!” – এই ম্যাজিকেই বাধ্য ছেলেপিলের মতো যে যার সিটে। ডাললেকের পূর্ব পারে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্থান হজরতবাল মসজিদ। প্রফেট হজরত মহম্মদের চুল এখানে রক্ষিত আছে এমনই বিশ্বাসে হাজার নরনারী নিজেদের আত্মাশান্তির উদ্দেশ্যে ছুটে আসেন বোধহয় এখানে। এদিকে গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দূরে পাহাড়ের চুড়োয় সাদা সাদা ওটা কি? বরফ! বরফ! ধ্বনিময় হয়ে উঠল গাড়ির অলিন্দ, জানলা, দরজা। ও তো ‘সোনমার্গ আছে’। আহা কি মধুবর্ষী কটি শব্দ।
মধু বহুদিনের পুরোনো হলে যেমন তলায় সাদা বালি ধরা পলি পড়ে স্বাদ গন্ধের চোদ্দটা বাজায়, বরফচূড়োর মধুতে সেরকমই পচা গন্ধের বালি ছেটানো হল। কোথায় মসজিদ! কোথায় বরফ! পবিত্রতার পরিবর্তে চিরপরিচিত ভারতবর্ষের নোংরামাখা রাস্তার আহ্বান! মেজাজ গেল খিঁচে! এখানে নেমে নাকি হাঁটতে হবে! কেন? সেটা হাঁটতে শুরু করেই বুঝেছিলাম। শুরু হল অলিগলির কাশ্মীরকে চেনার পালা। কলকাতার বড়বাজারের প্রকৃতির কথা মনে করুন। আসলে মানুষের রঙ চেহারার সাজসজ্জা যেমনই হোক, ভেতরে তো সেই হাড়, রক্ত, মজ্জার কাঠামো। পথচলতি পসরা, কেনাকাটা, জেতাহারা নিয়েই লড়াই স্বামী-স্ত্রী, ক্রেতা-খদ্দেরের। ব্যস্ত অগোছালো মায়ের সন্তানের আবদার পূরণ। শুধু শাড়ির আঁচলের বদলে মাথা ঢাকা ওড়নার খুঁটে বাঁধা সন্তানস্নেহ। গোটা পৃথিবীতে ‘মা’দের একটাই জাত, সম্প্রদায়, পরিচয় ‘মা’।
চলতে চলতে চোখ আটকালো রাস্তার পাশের সাদা, পাতলা, নরম হালকা কাপড়ের দিকে। যে মানুষটির হাতে ছিল, তার কিন্তু কোনও ব্যস্ততার দিকে তাকানোর সময় নেই। প্রাণপণে দুহাত দিয়ে টেনেই চলেছে। দু-একটা ফুটোও হয়ে গেলো। কি আশ্চর্য! আরও আশ্চর্য একটা ধোঁয়া ওঠা কড়ায়ে ফেলে দিল কাপড়ের টুকরোটা। সাথে সাথে অভিমানিনী কাপড় ফুলে ফেঁপে হয়ে উঠল খাস্তা তিন ফুট ডায়ামিটারের গরমাগরম পরাঠা। চারজন মিলে গোল হয়ে খেতে শুরু করা যায় অনায়াসেই। সাথে ঘি চুপচুপে পেস্তা, আখরোট, চেরি সাজানো সুজির হালুয়ার খোশবাই।
উদাসীন, স্মিতহাস্য বৃদ্ধ, আধাবয়সী বিক্রেতা আর পিলপিলে ক্রেতার মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী খাবারের রাশি। এদের স্ট্রিট ফুডে দেখলাম লালের আধিক্য। কোন কমরেডের শিক্ষা জানা নেই। তবে নদরু ভাজা(Fried lotus stem), মাছ ভাজা(fried fish in butter), যে কোনও ভাজা, মিষ্টি যাই হোক না কেন, চড়া লাল, মাঝারি লাল, হালকা লালের পরত। সে ‘লাল’কে গলাধঃকরণ করতে কলজের জোর লাগে আক্ষরিক অর্থেই। তবে শাকাহারী, মাষাহারী যাই হোন না কেন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন নির্দ্বিধায়। মিষ্টিপ্রেমী হলে টপাটপ মুখে পুড়ুন গজা, মিষ্টি, চালের তৈরী দানা(লায়েহ), স্পঞ্জি লালা শানগ্রাম মুখের লালায় গলে গলে পড়বে। সব রেসিপিই উনিশ বিশ। ময়দা, চালের গুঁড়ো, চিনির সিরা, ঘি। সর্বোচ্চ স্থানে শ্রীনগরের ডেলিকেসি বাসরাখ (ময়দা, ঘি বেক করে চিনির সিরায় ফেলে ড্রাইফ্রুট ছেটানো)।
কিন্তু যাদের প্রকৃতি অত্যন্ত মিষ্টি আর কলজের জোর কম, তারা মশলা ছেটানো গম আর বিন সেদ্ধই খান। মাসাল(lavasa) নামে পরিচিত। আমাদের ট্রেনে বাসে পেঁয়াজ, লঙ্কাকুচি মাখা মশলা ছোলার স্বাদের কথাটি মনে করে দেখুন একবার—সব মন খারাপ দূর হয়ে যাবে। এদিকে খাবারের গন্ধে জিভের জল টানতে টানতে মসজিদের সিং দরজায় উপস্থিত হয়েও গেলাম।
স্বর্গীয় উপত্যকা ৯
জাফরির টুকরো দিয়ে চোখে পড়ল শয়ে শয়ে পায়রা’র উড়ান। এরা শান্তির দূত। ‘শ্রদ্ধেয় জায়গা’য় (হজতরবাল শব্দটির অর্থ) পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেও পায়রাগুলি নিঃশঙ্কচিত্ত। ডাললেকের নীল জলের সঙ্গে সাদা মার্বেলের রঙমিলান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে এক সমাহিত সৌধ। দৈর্ঘে- প্রস্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অদ্ভূত নিঃস্তব্ধতা। আড্ডাবাজ, কলকলে বাঙালিদেরও সেখানে কথা কইতে মনের মানা! দুপুরের রোদ এক পা এগিয়ে বিকেলের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে এরকম সময় সদলবলে মসজিদে প্রবেশ করলে অন্দরমহলে পুরুষদের অবারিত দ্বার। মানুষকে ঘুমন্ত ও ঈশ্বর উপাসনার মুহূর্তে দেখলে বোধহয় তার সাদগি ধরা পড়ে বাইরের চোখে। তখন আসরের নামাজ আদায় চলছিল।
কিন্তু এই মন্থর অবকাশ সবার জন্য নয়। সুতরাং মসজিদ থেকে বেরিয়ে ডাললেকের তীরে পার্কের মনোরম পরিবেশে উদ্দাম সেলফির উল্লাস। ১৬৩৫ সালে বিজাপুরে সৈয়দ আবদুল্লার আমদানি করা হজরত মহম্মদের ‘পবিত্র চুল’(মতান্তরে দাড়ি) হাতবদল হয়ে ব্যবসাদার নুরুউদ্দীনের হাতে এসে পড়ে। কিন্তু ঔরঙ্গজেবও ছিলেন মোগল সম্রাট। সম্রাটের অহমিকার কাছে ব্যবসাদারি কম পড়ল। তিনি নিজের আয়ত্বে নিয়ে এলেন মহামূল্যবান এই বস্তুটিকে। পরবর্তীতে নাকি নিজের ভুল বুঝতে পেরে নুরুউদ্দীনকে মুক্ত করে দেন ঔরঙ্গজেব। সেই মূল্যবান বস্তুটি যেখানে সংরক্ষিত থাকে সেটাই আজকের হজরতবাল মসজিদ।
ইতিহাস এখানেই শেষ হতে পারত । কিন্তু লাটাই ছিল আসরে নামাজ আদায় করা এক বৃদ্ধের হাতে। অল্প খোঁড়াচ্ছিলেন সে মানুষটি। প্রার্থনা সেরে বেরিয়ে আসতেই মসজিদের চাতালে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হল। না, আমার মত বাঙালিকে বলবার জন্য তিনি বসেননি যদিও। ধর্মপ্রাণ বলা ভালো কাশ্মিরপ্রাণ কিছু নরনারীর কৌতূহল মেটাচ্ছিলেন তিনি—
“উনিশ শ তেরানব্বুই কে সময় থে। ঠান্ড কি মসম আনে হি বালা থা! দোপহর কে ওয়াক্ত থে কুছ। বিজবেহারা পাতা হ্যায় না আপলোগোকো…”
ঘুরতে আসার আগে গুগলিয়ে নেওয়ার অভ্যাস জানান দিয়েছিল হজরতবাল মসজিদ জঙ্গীদের কব্জায় ছিল একসময়।
“…ওঁহিপে আর্মিলোগ আম আদমিকে উপর গোলি চালায়েথে…”
অবশ্য পুলিশের দাবি ছিল বিজবেহারার মিছিলে জঙ্গী আছে সেঁধিয়ে। সেদিন ‘অপারেশন সাকসেসফুল’।
“…পর হামলোগো কা রাতোকা নিন্দ হারাম হুয়া উস দিন সে…”
মেশিনগানের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধের পা প্রমাণ স্বরূপ উপস্থিত চোখের সামনে। কত গুলি চলেছিল?
“… ঘরমে লাশোকে ঢের লাগে হুয়ে থে…” নর্দমায় রক্তস্রোত বয়ে গেছিল। “…সেনালোগ আরামসে চলে গ্যায়ে। কিসিকো হাসপাতাল ভি নেহি লে গ্যায়ে। আয়সে কি আয়সে পরহে হুয়ে থে। হামলোগ আম আদমি হ্যায় না! ভারত হাম কাশ্মিরবালোকো কুছ নেহি দিয়া…”
ক্ষোভ আর যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে যায়, গলা বুজে আসে বৃদ্ধের। অসহায় আমি মাথা নীচু করে পালিয়ে বাঁচি। কারণ এই কথোপকথনে পাকিস্থান প্রেমের গন্ধ I আমার আপনার মতো বোকা দুনিয়ায় দুটো নেই। আম কাশ্মিরির চোখে–
“…পাকিস্তান খুদ এক আওয়ারা দেশ হ্যায়! তালিবানকা হাথোকা পুতলা উও দেশ! দানা নেহি, ঠিকসে পানি নেহি, পঢ়াই নেহি বাচ্চেলোগোকা । কাশ্মির পাকিস্তানকে সাথ জুড়না নেহি চাহতা…”
১৯৪৭ সালে মহারাজা হরি সিং-এর অধ্যায়ের রেশ রাখে বৃদ্ধের এই বাস্তব কাহিনী, তথা কাশ্মিরিদের মনোভাব। পুঞ্চের বিদ্রোহীরা সেদিন ‘আজাদ কাশ্মির’ চেয়েচিলেন। তাঁরা চাননি ভারত বা পাকিস্থানের টুকরো হয়ে উঠতে। উচ্ছিষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে। কিন্তু তৎকালীন রাজনীতি অন্য কথা বলেছিল ইতিহাস তার সাক্ষী।
আজ আর হজরতবাল মসজিদের সাদা পাথরে কোনও রক্তের দাগ নেই। শ্রীনগরের নাগরিক আকাশে নিঝুম শান্তি নিয়ে সে দাঁড়িয়ে। সেই শান্তির বার্তা বয়ে বেড়াচ্ছে “উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা”। কিন্তু ‘…জুম্মাকে আজান ভি উও হাদসা নেহি ভুলা সাকতে!’ ইতিহাস খুঁড়িয়ে দূরে মিলিয়ে যায় বৃদ্ধের সাথে। পায়রার ডানার ঝটপটানি সাথে ড্রাইভারের হুড়ো চোখের সামনে নাটকের যবনিকা পতন ঘটায়।
স্বর্গীয় উপত্যকা ১০
খবরের কাগজ, টিভি খুললে কাশ্মির, কাশ্মিরের কোনও না কোনও অঞ্চল অধিকাংশ দিন হট টকে। আবার আমাদের মতো আম বাঙালির রোমান্স, স্বপ্ন কাশ্মিরের সৌন্দর্যে। উৎকণ্ঠা, ভয় আর সোন্দর্যের টাগ অফ ওয়ার চলছে অনবরত। শ্রীনগরের মুঘল গার্ডেনগুলোর সৌজন্যে আমার মস্তিষ্কের ঘুলঘুলিতে আবার ফুরফুরে বাতাস বইল। এই বাতাসেও ইতিহাসের সঙ্গে আছে মাখনের মতো প্রেম।
ডাল লেককে সঙ্গী করে ফরশোর রোডে (foreshore) চলতে চলতে চোখে পড়ল পীর পঞ্জালের খাড়াই বরফ বিছানো পথে সারি বেঁধে খচ্চর ঘোড়ার পাল হাঁকিয়ে লটবহর নিয়ে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয়তমা পত্নীসহ পা রাখলেন ভূস্বর্গের দ্বারে। শিল্প সংস্কৃতির ধারক বাহক বেশি অর্থে প্রেমিক জাহাঙ্গীর। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারা, সবুজ গালিচাপাতা বরফচূড়ায় সেদিন ‘জান্নাত মুনাসিব’ হল নূরের। পাগল মজনু জাহাঙ্গীর আদেশ দিলেন – “ এঁহি পর প্রেমকুঞ্জ বানায়া যায়ে।“ পাহাড়ের সানুদেশ থেকে যতটা উচ্চতায় পৌঁছানো যায় ঠিক ততটাই গিয়ে পাহাড়ি জলধারাকে সাক্ষী রেখে নূরজাহান জাহাঙ্গীর জুটির প্রেমতরী ভেসে চলল।
আর হবে নাই বা কেন, ‘শালিমার’-এর সংস্কৃত নাকি ‘প্রেমালয়’। ভারতে ২য় শতাব্দীতে প্রবরসেনা নামক কোনো রাজা সে প্রেমালয় গড়েছিলেন। তাঁর রাজধানী থেকে দূরবর্তী সুকারামস্বামী সন্তের কাছে নিয়মিত সাক্ষাৎকালের যাত্রাবিরতি ছিল শালিমার। তবে এ তথ্য নেহাতই গবেষণাযোগ্য। আপাতত মোঘল সাম্রাজ্যে শাসনব্যবস্থার বেহাল দশা। জাহাঙ্গীরের ফারহাবক্সে (The delightful, শালিমার বাগের অন্য নাম) বসন্তে, শরতে চিনার গাছের সারির রঙ বদল বুঁদ করে রেখেছে ইতিহাসখ্যাত প্রেমিক জুটিকে। সুতরাং জাহাঙ্গীরের ‘আম’ দরবার বসল (দেওয়ান-ই –আম)। আম- জনতার দরবার শুনবেন সম্রাট কিন্তু খোশ গল্পেরও মানুষজন চাই। কালো মার্বেলের সিংহাসন সহ পানপাত্রে মশগুল হওয়ার ‘খাস’ মহাল (‘দেওয়ান-ই-খাস’)। — “আরে ! সম্রাট ইতনা শয়তানি মাত করো! পানিমে গির যাওগে!” এইরকম করে বকে দেওয়া নূরজাহান ছাড়া কারই বা সাহস হবে! কিন্তু না!!! শালিমার বাগের গুলবাগিচায় এখন পিলপিলে কালো মাথার ভিড়ে জিন্স টি শার্ট পরিহিত সম্রাট হুটোপাটি করে বেড়াচ্ছেন। সম্রাটের মা পিচ্ছিল ফোয়ারার পাশ থেকে কান ধরে হিড়হিড়িয়ে টেনে আনছে সম্রাটকে।
তবে পশ্চিম আকাশে গোধূলির রঙ ধরলে বাগিচার ‘চিনিখানায়’ সম্রাটের যাওয়ার সময়। চিনিখানার খোপে অসংখ্য তেলের প্রদীপ জ্বললে জ্যোৎস্না মাটির বুকে পা রাখে। ঝরনার জলে প্রতিবিম্বিত হয়ে নুপূরের ছন্দে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মূর্ছনায় সে এক স্বর্গীয় আমেজ। রাজা বাদশার ব্যাপারে হারেমখানাও উপস্থিত। কিন্তু হারেমে সম্রাটের অনুমতি ব্যাতীত প্রবেশ নিষিদ্ধ।
১৬১৯ সালে তৈরি হওয়া শালিমারবাগের কাশ্মিরপ্রীতি চাড়িয়ে গেল জাহাঙ্গীরের পরিবারে। পৃথিবীর অধীশ্বর যার নামের মধ্যেই (শাহজাহান), এদিকে অর্থপ্রাচুর্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি কোনও দিকেই কমতি নেই যখন, তখন ‘বসন্ত’কে আবাহন করলেন স্বয়ং সম্রাট, চশমে শাহীবাগে(The royal spring)। বড় পুত্র দারা শিকোহর আব্দার না মেটালে সম্রাট পিতার শান, মান কিছুই থাকে না। আলি মর্দান কোমর বেঁধে লেগে পড়লেন প্রভুর আজ্ঞা পালনে। সন্তানকে দিলেন মনোরম শিক্ষার পরিবেশ। পাশেই পরীমহলে জ্যোতিষ চর্চার আসর বসল। কাশ্মিরি পন্ডিত রূপ ভবানীর আবিষ্কৃত স্বাদু জলের উৎস ঘিরে তৈরী হল চির বসন্তের গান (১৬৩২)। জলের ওষধি গুন হবে হয়ত! নাহলে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই জলাকর্ষিত ছিলেন। তিন ধাপে তৈরি সর্বাধিক ছোটো বাগ, কিন্তু স্থাপত্য অনবদ্য।
ঠিক পরের বছর সাম্রাজ্ঞী নূরজাহানের আব্দারে দাদা আসিফ খান শালিমারবাগের কাছাকছি তৈরি করলেন নিশাত বাগ (উৎফুল্লতার বাগান)। বাগ নির্মাণের সঙ্গেই শুরু হলো পারিবারিক মন কষাকষি। আসিফ খান (আরজুমান্দ বানু বেগমের পিতা) বাগান তৈরি করে জামাই শাহজাহানকে ডেকেছেন। সে ওরকম বাড়িঘর বানিয়ে আমরা নিজেদের লোককে ডেকেডুকে দেখাই বৈকি! অন্যের তৈরি বাড়ি বা ফার্নিচার এক্ষেত্রে বেশি সুন্দর ঠেকে আমাদের চর্মচোখে। শাহজাহান রাজা উজির হতে পারেন কিন্তু ক্ষুদ্র মনুষ্য বৈ নয়! নিশাতবাগের উপর লোভ গেল, সাথে দুর্বার আশা — “আমি তো রাজার জামাই! সুতরাং ঠিক উপহারস্বরূপ নিশাতবাগ হস্তগত হবে!” ওদিকে আসিফ খান দেবার নামটিও উচ্চারণ করেন না। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে শাহজাহান শালিমার বাগ থেকে জল সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন। (শালিমার বাগ থেকে নিশাত বাগে জল সরবরাহ হয়) শ্বশুর বেচারি কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকে! জামাই যখন ভারত সম্রাট শাহজাহান!
না, না, সেরকম কোনো গৃহযুদ্ধ বা ইতিহাস লেখার মতো ঘটনা ঘটেনি। সামান্য ভৃত্যের দৌত্যে সে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটল। তাছাড়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি এখন জনগণের। রাগ পুষেই বা কি হবে। কি জানি কবর থেকে উঠেই বা আসে কিনা বিদেহী আত্মা প্রিয় জায়াগাগুলির সন্ধানে। তবে সবুজ ঘাসের গালিচায় , চিনারের সারিতে নাম জানা, অজানা ফুলের সম্ভারে, বাগের জলধারা আর ফোয়ারায় পা ভিজিয়ে দূরে বরফচূড়া পাহাড়ের দিকে চাইলে মন বলে উঠবেই—
“আগর ফিরদউস বর রু-এ জমিন অস্ত
হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত-ও।“
সেখান থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এসে গাড়িতে বসা বড় বেদনাদায়ক। মৃত্যুশয্যায় শায়িত জাহাঙ্গীরের শেষ ইচ্ছা—“ Kashmir , the rest is worthless.”- উপলব্ধির এই সূচনা। কিন্তু ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ হল না। যেহেতু হরি পর্বতে পায়ে হেঁটে চড়তে হয়, দিনের আলো কমে আসার কারণে শঙ্করাচার্য বাতিল তালিকায় রয়ে গেলেন।