মু ক্ত গ দ্য 

কস্তুরী চট্টোপাধ‍্যায়

kasturi_chottopadhyay

মুক্ত হবার দিন…

সব অন্ধকার রাতের নয়। সব পরিযায়ী কৃষ্ণপক্ষে অমানিশার ঘোর থাকে না। কিছু অনাবশ্যক অনাশ্রয়ী সম্পর্কের ঘরবসত মরুপথে অবশেষ খোঁজে। ছায়াপথ বেয়ে নক্ষত্রপুঞ্জ যেমন পথ হারায় অকারণে। কিছু শর্ত জায়গা বদল করে। এখন ওরা অভ্যেস, রোজকার লব্ধি। ওদের ছুঁয়ে থাকি যতক্ষণ না নিরাপদ লাগে। বধ্যভূমিতে যাবার আগে ওরা আসে। একা নদীচর তখন বসে থাকে শোকস্তব্ধ। চরের পাশে জলের স্বর অনেককিছু বলে। দারুণ দহনে হেঁটে আসার পথে সেটাই যেন একমাত্র আশ্রয়। সব প্রয়োজন, সব আয়োজন শেষ হলে একসময় অন্ধকার দীর্ঘতর হবে। তারপর শতাব্দীর শ্বাস নেবে থেমে যাবার আগে। যেমন আমি নেবো। সেদিন হবে আসলে মুক্ত হবার দিন।

      জীবনের তিনভাগ পেরিয়ে এসে মনে হয় কোন এক অন্ধগলিতে হাঁটছি যেন। যার শুরু আছে শেষ নেই। আসলে নিজের বলে কিছু হয় না। অদ্ভুত কিছু অনুভূতি হয় মাঝে মাঝে, তাতে কিছু ভালোর সঙ্গে কিছু মন্দও একসঙ্গে শ্বাস নেয়। কিছু আশার সঙ্গে নিরাশাও মিশে থাকে। কিছু ভুল কিছু মোহ সবাই এক সঙ্গে পথ হাঁটে। কিছু ভালোবাসা কিছু ঘৃণাও। কিছু উৎসাহ কিছু উৎসর্জনও থাকে। থাকে কিছু পাপ কিছু পুণ্যের দুর্বোধ্য দাগও। কার কখন সময় ফুরোবে কেউ জানে না। আজ নিষ্পাপ জ্যোৎস্নার আলো তো কাল গান আসে মনে, ‘ও আমার আঁধার ভালো’।

     মানুষ নিজের ভেবে জীবনে যা কিছু করে প্রবল দায়িত্ব নিয়ে, প্রাণপাত করে, সবটুকু ভালোবেসে, কেউ তা আসলে দেখে না। কারই বা থাকে এত অকারণ নষ্ট সময়? অন্ধকারে রাস্তাগুলো আলগা লাগে একসময়। লাগবেই। যা কিছু গভীর সঞ্চয় জীবনে জমানো থাকে তাও আর ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে না। মুঠোর ভিতর শুধু শূন্য, খুব অচেনা কিছু পড়ে থাকে, অন্ত‍্য যেটুকু থাকে তাতে বাকি ইহজীবন চলে যায় কোনমতে।

সময় হাঁটে। রাস্তা পেরোয়। রোদে পোড়ে। শীতে কাঁপে। শহর ছাড়িয়ে উত্তুরে হাওয়ার খোঁজে নানা অজুহাতে জীবন তবুও হাঁটে। দিনের পর দিন। একটু শান্তির ফুটফুটে প্রলেপ ক্ষতের গায়ে মাখাতে চায়। ক্ষতি কী? এটুকু তো চাওয়াই যায় তাই না? বেঁচে থাকার জন্য খুব প্রয়োজন ওই সামান্য আয়োজনটুকু। কেউ বোঝে কেউ বোঝে না। কেউ ভাবে তোমায় দেব কেন আমার পাওনা থেকে? এই পাওনাটুকু নিয়েই যতো দ্বন্দ্ব। যতো ঝড়। ক্রমাগত গোটা জীবন জুড়ে কেমন যেন অসমান একটা খেলা চলে। যেখানে হারজিত নেই। যা থাকে তা ধার করে কোনমতে অহেতুক বাঁচা। আকাশ ভর্তি বৃষ্টির অপেক্ষায় একসময় ক্লান্তি আসে।

     আমাদের জীবন সময় বিশেষে সবসময় আমাদের থাকে না। বিশেষ করে মেয়েদের। বেশির ভাগ সময়ে অন্য কারো ইচ্ছেতে চলে। অনেকসময় একটা দিকশূন্য দিকে হেঁটে চলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু সেখানেও জানি ফেলে আসা ইহজীবন পিছু ডাকবে। ওই পুরোন শতছিন্ন জীবনটাই। এখানে ওখানে দাগ, কালশিটে, তবুও কী মোহ কী মায়া। হয়তো এই বাঁচাটা তো এখন, এই মুহূর্তের বাঁচা। এটুকুই বেঁচে নিতে হয়। বাকিটুকু তো সকলেরই ‘বাঁচতে হয়েছিল’। পাখির ডানায় উদ্বেগ ছিল, স্বস্তিও তো ছিল। যেটুকু ছিল তাই যথেষ্ট বলে ভেবে নিলেই হয়। যুদ্ধ ছিল লড়াই ছিল দ্বন্দ্ব ছিল প্রশ্ন ছিল হেরে যাওয়া ছিল, আরও কত কিছু ছিল, সঙ্গে কিন্তু বেঁচে থাকবার ইচ্ছেটা ছিল, তপ্ত জীবনে ধারাশ্রাবণও ছিল। অনেক ভালো লাগার মুহূর্তও ছিল। ভালোবাসারও অনেক নিমিষ ছিল। ঝড়ের সংকেত যেমন ছিল কখনও আবার আকাশভরা তারাও তো ছিল। কখনও কখনও। এখন মনে হয় জীবন থাকলে এসব থাকবে। কারও ভাগে কম কারও বেশি। ভালো মন্দ মিশিয়ে গোটা বাঁচাটা। সবটুকুই মন্দ তা কিন্তু নয়। এটা ভাবা অন্যায়। সবাই ভালো থাক, না-হয় আমার কিছুটা আকাশ ধার নিয়ে। আমার বাতাসে শ্বাস নিয়ে।

      দিয়ে দেওয়ার মধ্যে মহত্ব কতোখানি থাকে জানি না তবে বাঁচার মতো রসদটুকু পাওয়া যায়। নইলে ওই নীল আঁচের মতো জ্বলে কিছু। কিছু একটা। সারা জীবন।