প্র ব ন্ধ

মা ন স &nbsp চ ক্র ব র্তী

manas

স্বাভিমানবোধ ও বিদ্যাসাগর

“বর্ধমানেশ্বরী শ্রীল শ্রীমতী মহারাজ্ঞী তুলাদান করিয়া কলিকাতাস্থ প্রধান পণ্ডিতগণের নিকট বিদায় প্রেরণ করিয়াছেন, তন্মধ্যে কেবল শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভট্টাচার্য্য মহাশয় উক্ত বিদায় গ্রহণ করেন নাই কহিয়াছেন যে আমি গবর্ণমেণ্টের স্থানে তিন শত টাকা মাসিক বেতন পাইয়াছি তাহাই আমার যথেষ্ট হইয়াছে আর অন্য প্রকারে উপার্জ্জন করিতে বাসনা নাই…”

১৮৫৪ সালের ২২ জুলাই ‘সম্বাদ ভাস্কর’-এ প্রকাশিত একখানা প্রেরিত পত্রের কিয়দংশ উপরে উল্লিখিত হল। বর্দ্ধমানেশ্বরীর দান গ্রহণ না করাটা যে তাঁর অহঙ্কারের প্রকাশ একথার স্পষ্ট উল্লেখ ওই পত্রে করা হয়েছে।

“…বিদ্যাসাগর গবর্ণমেণ্টের অধিক প্রিয়পাত্র হইলেও বর্দ্ধমানেশ্বরীর দান অবজ্ঞা করিয়া ফিরিয়া দেওয়া অতি অসঙ্গত কার্য্য হইয়াছে আমি বোধ করি যদি ঐ দান বিদ্যাসাগর ভট্টাচার্য্য মহাশয় আপন সম্ভ্রম সূচক জ্ঞান করিয়াও গ্রহণ করিতেন তবে তাঁহার নামের উপযুক্ত কার্য্য করা হইত, হায়, আমারদিগের বাঙ্গালি লোকের কুস্বভাব বিদ্যা প্রভাবেও দূর হইতেছে না, অন্যদেশীয় লোকেরা বিদ্যায় বিদ্বান হইলেও বহু সংখ্যক ধনোপার্জ্জন করিতে পারিলেও আপনারদিগের নম্রতা শীলতা সভ্যতা করিতে পারেন না কিন্তু বিদ্যাসাগর বিদ্যাসাগরের বিন্দুমাত্র স্পর্শ করিয়াই ও তিনশত টাকা মাসিক বেতন প্রাপ্ত হওয়াতেই অহঙ্কারে একেবারে চক্ষুঃ কর্ণ উভয়েন্দ্রিয় হারাইয়াছেন…।” ১

এই যুক্তি কি ন্যায় সঙ্গত? ‘এ’ বিদ্যাসাগরের স্বাভিমানবোধ না অহঙ্কার? প্রশ্ন— তিনি কি কখনো বিদায় গ্রহণ করেননি?

কিন্তু রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রূপোর পানপাত্রটি রক্ষিত আছে তা তো তাঁর বিদায় গ্রহণের স্বপক্ষে প্রমাণ দেয়। মাতৃভক্ত গুরুদাস মাতৃশ্রাদ্ধে বিদ্যাসাগরকে যে পানপাত্রটি দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর তা গ্রহণ করেছিলেন। পানপাত্রের একটি শ্লোক এখানে উল্লেখ করি: 

“পান পাত্রমিদং দত্তং বিদ্যাসাগরশর্ম্মণে 

 স্বর্গকামনয়া মাতুর্গুরুদাসেন শ্রদ্ধয়া।” ২

সুতরাং বিদ্যাসাগর যে অহঙ্কার বশত বিদায় অস্বীকার করছেন তা ধোঁপে টিকছে না। এটাই সত্য যে তিনি অহঙ্কারে নয়, বরং অহঙ্কারীর দানই গ্রহণ করতেন না। এটাই বিদ্যাসাগরের বিদ্যাসাগরত্ব।

সংস্কৃত কলেজ থেকে পড়াশোনা করে বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে সেরস্তাদার পদপ্রার্থী হলেন। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সেক্রেটারি তখন মার্শাল সাহেব।

১৮৪১খ্রিস্টাব্দের ২৯ডিসেম্বর বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদার বা প্রথম পণ্ডিত হলেন। বেতন পঞ্চাশ টাকা। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে সাহেবরা পড়তেন। ওদেশ থেকে যারা এদেশে বড়ো চাকরি করতে আসতেন তাদেরকে চাকরিতে বহাল হতে হলে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে শিখতে হত এদেশী ভাষা— যেমন বাংলা, হিন্দি প্রভৃতি। পরীক্ষা দিতে হত এদেশী ভাষায়। পাশ করলে চাকরি না হলে পগার পার— ফিরে যাও স্বস্থানে।

এখানে একটু উল্লেখ করে নিই— মার্শাল সাহেবের অনুরোধে বিদ্যাসাগর এই সময় ভালো করে ইংরেজি আর হিন্দি শিখতে শুরু করেন। হিন্দি শিখেছিলেন একজন হিন্দুস্থানী পণ্ডিতের কাছে। আর ইংরেজি শিখেছেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলমাধব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ গুপ্ত প্রভৃতির কাছে। স্মরণ রাখতে হবে এই ইংরেজি শিক্ষার চর্চা বিদ্যাসাগর পরবর্তীতেও বজায় রেখেছিলেন। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের তথ্য অনুযায়ী রাজা রাধাকান্ত দেবের জামাতাবাবু অমৃতলাল মিত্র ও অপর জামাতাবাবু শ্রীনাথচন্দ্র বসুর নিকট ইংরেজি অনুশীলন করতেন। বিহারীলাল সরকার জানাচ্ছেন বিদ্যাসাগর আনন্দকৃষ্ণ বসুর নিকট সেক্সপীয়র পড়তেন।

সে যাইহোক বিদ্যাসাগরের কাজকর্মে মার্শাল সাহেব বেশ খুশি। কিন্তু লক্ষ্য করলেন একটা ব্যাপারে বিদ্যাসাগর বড়ো নির্দয়। সেটা হলো পরীক্ষা। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পরীক্ষায় যাঁরা কৃতকার্য হতে পারতেন না তাঁদেরকে বিলেতে ফিরে যেতে হত। তাই মার্শাল সাহেব পরীক্ষায় আঁটো সাঁটো ভাবটা একটু কম করতে বললেন। অর্থাৎ যাঁদের পাশ করার যোগ্যতা নেই তাঁদেরকে পাশ করিয়ে দিতে হবে। বিদ্যাসাগর মার্শাল সাহেবকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন ওই কাজটি তাঁর দ্বারা সম্ভব নয়। বরং তিনি চাকরি ছাড়তে রাজি আছেন কিন্তু অন্যায়ের প্রশয় দিতে পারবেন না।

সংস্কৃত কলেজ সম্পর্কে পরিকল্পনা করলেন বিদ্যাসাগর। ১৯৪৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি পরিকল্পনাটি সেক্রেটারি রসময় দত্তের কাছে দাখিল করলেন। কিন্তু রসময় দত্ত সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি ‘কাউন্সিল অফ এডুকেশনে’ না পাঠিয়ে সামান্য একটু অংশ খণ্ডিত করে পাঠালেন। বিদ্যাসাগরের অনুরোধ এক্ষেত্রে গ্রাহ্য হলো না। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রসময় দত্তের মতান্তর শুরু হলো। বিদ্যাসাগর ঠিক করলেন তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেবেন।

সেই অনুসারে বিদ্যাসাগর ১৮৪৭ সালের ৭ এপ্রিল ইস্তফা দিলেন কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারির কাছে। সে ইস্তফাপত্র গৃহিত হল না। বিদ্যাসাগর দ্বিতীয়বার ইস্তফাপত্র দিলেন ২০ এপ্রিল। ইস্তফা গৃহিত হল ১৬ জুলাই। চাকরি ছাড়লেন বিদ্যাসাগর। ১৮৪৭ সালে পঞ্চাশ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

রসময় দত্ত বললেন: “বিদ্যাসাগর চাকরি তো ছেড়ে দিল, কিন্তু খাবে কী?” ৩ যার কাছে শুনলেন তাকে বিদ্যাসাগর বললেন:  দত্তমশায়কে বলো, বিদ্যাসাগর আলু পটল বেচে খাবে, মুদির দোকান করে খাবে, কিন্তু যে চাকরিতে সম্মান নেই সে চাকরি করবে না।” ৪

চাকরি ছাড়ার পর বিদ্যাসাগরের মানসিক স্থিতির পরিচয় নিই। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন লিখলেন: “কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া অগ্রজের কিছুমাত্র মানসিক কষ্ট হইল না। তৎকালে বাসায় নিরুপায় আত্মীয় ও স্বসম্পকীর্য প্রায় ২০টি বালককে অন্নবস্ত্র দিয়া বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করাইতেছিলেন। তন্মধ্যে কাহাকেও বাসা হইতে যাইবার কথা একদিনের জন্যও বলেন না।” ৫

বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক। কোনো এক কারণে বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ কার সাহেবের ঘরে যাওয়ার। অবশ্য তিনি জানিয়েই গিয়েছিলেন। ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন সাহেব জুতো শুদ্ধ পা টেবিলের উপর তুলে বসে আছেন। শুধু কী তাই সাহেব তাঁকে একবারও বসতে বললেন না। বিদ্যাসাগরও ছাড়বার পাত্র নয়। তিনিও সুযোগ খুঁজছিলেন। সেই সুযোগ একদিন এসে গেল। কী একটা কারণে কার সাহেবকে আসতে হল সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের কাছে। বিদ্যাসাগরও ঠিক একইভাবে তাঁর চটিশুদ্ধ পা টেবিলের উপর তুলে তামাক খাচ্ছিলেন। এতে কার সাহেব অত্যন্ত অপমান বোধ করলেন। তিনি বিদ্যাসাগরের নামে শিক্ষা পরিষদের কাছে নালিশ জানালেন। সংস্কৃত কলেজের সম্পাদক নাকি সাধারণ ভদ্রতাও জানেন না। ডঃ মোয়াট বিদ্যাসাগরের কাছে কৈফিয়ৎ তলব করলেন। উত্তরে বিদ্যাসাগর উপযুক্ত জবাবই দিলেন। বললেন: “ My notions of refined manner being thus formed from the conduct of an enlightened and civilised European, I behaved myself as respectfully towards him as he had himself done .”৬

স্বাভিমান বোধের এই ধারা বিদ্যাসাগর চিরদিন মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করে গেছেন। নিচের ঘটনাটি এরই সাক্ষ্য বহন করে।

ইংরাজ প্রশাসন নিজেদের আভিজাত্যের কথা স্মরণ করে কতকগুলি নিয়মের প্রবর্তন করেছিলেন। তারই অন্যতম ছিল গর্ভনরের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রার্থীকে অবশ্যই চোগাচাপকান পরে আসতে হবে। বিদ্যাসাগর কিন্তু তার সেই দেশীয় পরিচ্ছদ ধুতি চাদর পরেই আসতেন। সভাপতি হ্যালিডে সাহেব বিদ্যাসাগরকে এক প্রস্থ পোশাক কিনে দিয়ে ওইগুলি পরে আসতে অনুরোধ করেন। বিদ্যাসাগর তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন না। পরদিন ঐ পোশাক পরেই লাট সাহেবের কাছে গেলেন। সেদিন সভা শেষ হলে বিদায় গ্রহণকালে বিদ্যাসাগর লাট সাহেবকে বললেন, “আজ আপনার কথা রেখেছি। কিন্তু এরপর আর আমার এখানে আসা হবে না।” ৭ হ্যালিডে সাহেব বিস্মিত হয়ে এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর উত্তরে জানালেন— তিনি তাঁর জাতীয় পরিচ্ছদ ত্যাগ করতে পারবেন না এবং আরো জানালেন দরকার পড়লে তিনি চাকরি ছাড়তেও রাজি। সাহেব বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সঙ্গে ভালোমতন পরিচিত ছিলেন। তাই হ্যালিডে সাহেব বললেন, “বেশ আপনার পরিচ্ছদ আপনাকে ছাড়তে হবে না। আপনি যেভাবে চান, সেইভাবেই আমার কাছে আসুন।” ৮

এখানে প্রধান লক্ষণীয় বিষয় এই যে, তিনি নিজের রুটি-রোজগারের প্রধান অবলম্বন ছাড়তে রাজী কিন্তু জাতীয় পরিচ্ছদ বর্জনের কথা ভাবতে পারেন না।

অনুরূপ আর একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি। উত্তর প্রদেশের হিন্দি সাহিত্যিক হরিশচন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সখ্যতা ছিল। তিনি কলকাতায় এলে বিদ্যাসাগর বন্ধু ও বন্ধুপুত্র সুরেন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি ও ভারতীয় জাদুঘর দেখাতে নিয়ে গেলেন। হরিশচন্দ্র ও সুরেন্দ্রনাথের পরনে কেতাদুরস্ত পোশাকই ছিল, কিন্তু বিদ্যাসাগরের পরনে সেই ধুতি-চাদর ও পায়ে তালতলার সেই পরিচিত চটি। হরিশচন্দ্র ও সুরেন্দ্রনাথ অনায়াসেই প্রবেশাধিকার পেলেন। কিন্তু দারোয়ান বিদ্যাসাগরের পথ আটকে দিলেন। দারোয়ান জানায়, ভেতরে যেতে হলে চটি খুলে রাখতে হবে, নইলে হাতে তুলে নিতে হবে। বিদ্যাসাগর সোসাইটির নিয়ম মানতে রাজী হলেন না। ভিতরে ঢোকার আশা ত্যাগ করে পথে অপেক্ষারত গাড়িতে এসে বসলেন।

সুরেন্দ্রনাথের কাছে খবর পেয়ে সোসাইটির সহকারী সম্পাদক প্রতাপচন্দ্র ঘোষ ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদ্যাসাগরকে ভেতরে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। বিদ্যাসাগর সেই অনুরোধ স্বীকার করলেন না। কারণ তাঁর কাছে ব্যক্তিগত মান-সম্মানের চেয়ে বড়ো করে দেখা দিয়েছিল স্বজাতীর প্রতি বিট্রিশ জাতীর অবমাননা ও অমর্যাদা। বিদ্যাসাগর উত্তরে জানিয়েছিলেন, “ইংরাজি জুতো ও ভারতীয় চটির মধ্যেকার এই ভেদনীতি দূর না হ’লে তিনি ভেতরে যাবেন না।”৯ 

শুধু তাই নয় যাদুঘরের অছি পরিষদের সম্পাদক ব্লানফোর্ডের কাছে একটি প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়েছিলেন। প্রতিবাদে তিনি জানিয়েছিলেন: “এ তো শুধু কোনো ব্যক্তি সম্পর্কিত ব্যাপার নয়, এ হল ভারতীয় সমাজের প্রতি ভেদমূলক ব্যবহার।” ১০

বিদ্যাসাগরের প্রতিবাদ এশিয়াটিক সোসাইটি মানেনি। না মানার কারণ সোসাইটির কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা প্রায় সকলেই ইংরাজ। বিদ্যাসাগরও প্রতিবাদের অন্য পথ ধরলেন। ঘটনাটি নিয়ে পত্রিকায় আলোচনা করলেন। হিন্দু পেট্রিয়ট ও ইংলিশম্যান পত্রিকা বিদ্যাসাগরের পক্ষ নিয়ে কলম ধরলেন। ১৮৭৪এর ২জুলাই ইংলিশম্যান লিখল: “ আমরা জানতে পারলাম যে, বিতর্কিত জুতো প্রসঙ্গ আবার সামনে এসে পড়েছে আর এই বিতর্কের কেন্দ্র হ’ল একটি বিশিষ্ট সংগঠক যার নাম এশিয়াটিক সোসাইটি অব্ বেঙ্গল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যাঁর বিদ্যাবত্তা, ভদ্রতাবোধ এবং গুণাবলীর পরিচয় দেশের মধ্যেই শুধু নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশীয় জুতো পরে থাকার জন্য তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। জোন্স্ ও কোলব্রুকের উত্তরাধিকার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের পক্ষে মর্য্যাদাসূচক ব্যবহার হত এই ধরণের সংকীর্ণ রীতিকে পরিত্যাগ করা; যে রীতি সোসাইটির মূল্যকে কমিয়ে দেবে এবং বিদ্যাসাগরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও সোসাইটি ভবনে স্থান দিতে কুণ্ঠিত হবে, সে রীতিগুলি সোসাইটির কর্তৃপক্ষকে উপহাসের পাত্র করে তুলবে।“ ১১ এইভাবে বিদ্যাসাগর বিট্রিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বার বার রুখে দাঁড়িয়েছেন।

একবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মর্ভাণ্ট ওরেন্স সাহেব কোনো একটি জালিয়াতী মামলার রায় প্রদান কালে বলেছিলেন, “বাঙালী মাত্র মিথ্যাবাদী।” কথাটি শোনা মাত্রই বিদ্যাসাগর তীব্র প্রতিবাদ জানাবেন মনস্থির করলেন। সেই মর্মে রাজা রাধাকৃষ্ণদেবের গৃহে একটি সভা আহ্বান করেন। সভায় মর্ভাণ্ট সাহেবের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করে একটি প্রস্তাব আনেন এবং প্রস্তাবের একখানা অনুলিপি পাঠান ভাইসরয়ের হাতে, লণ্ডনে ‘সেক্রেটারী অব ষ্টেট্ ফর ইণ্ডিয়া’-র নামে। বড়লাট ঘটনা অবগত হয়ে সুপ্রিম কের্টের সেই বিচারপতিকে সর্তক করে দেন।

তিনি যে মেট্রোপলিটান ইনস্টিউসন ও কলেজ গড়ে তুলে ছিলেন তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে ইংরেজ শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া, সরকারী অর্থ সাহায্য না নিয়ে একক প্রয়াসে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এম.এ. ক্লাস পর্যন্ত এখানে পড়ানো হত। মেট্রোপলিটনের অধ্যক্ষ ও অপর সকল অধ্যাপকগণ ছিলেন সম্পূর্ণ ভারতীয়। জাতীয় মর্যাদাকে তিনি এভাবেই মান্যতা দিতেন।

তাঁর স্বাজাত্যবোধ যে কত প্রবল ছিল নিচের ঘটনাগুলিতে তার কিছু প্রমাণ রাখব। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ কবিতায় লিখেছেন: “ ইতিহাসের পাতায় তোমরা পড় কেবল মিথ্যে, / বিদেশীরা ভুল বোঝাতে চায় তোমাদের চিত্তে।” বড়ো সত্যি কথা। বিদ্যাসাগর সেই মিথ্যে ইতিহাস, বিকৃত ইতিহাস নতুন করে লেখার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। কিন্তু সে ইচ্ছা সম্পূর্ণ পূর্ণ করার সময় তিনি পাননি। তবু যেটুকু সময় ও সুযোগ তিনি পেয়েছেন তার কিঞ্চিত নমুনা আমরা দেখব।

‘History of Bengal’ বইটি মার্সম্যানের লেখা। কিন্তু সে ইতিহাস ছিল বিজিত জাতীর অহঙ্কার ও প্রভুত্ববোধের। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের জি.টি. মার্শাল বিদ্যাসাগরকে বইটি বাংলায় অনুবাদের ভার দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বইটি সরাসরি অনুবাদ না করে পরিবর্তন ও পরিবর্জনের মাধ্যামে বইটি নতুন করে লিখলেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল যথেষ্ট বুকের পাটার। তা বিদ্যাসাগরের ছিল।

সিরাজদৌল্লার নামে ‘অন্ধকূপ হত্যা’ নামে মিথ্যা কাহিনীর রটনা তাকে কলুষিত করার যে প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল বিদ্যাসাগর তার বিরুদ্ধে লিখলেন: “অন্ধকূপ হত্যা নামে যে অতি ভয়ঙ্কর ব্যাপার প্রসিদ্ধ আছে… এই হত্যার নিমিত্তেই সিরাজদ্দৌল্লার কলিকাতা আক্রমণ শুনিতে এত ভয়ানক হইয়া রহিয়াছে। …এবং সিরাজদ্দৌল্লাও নৃশংস রাক্ষস বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। কিন্তু তিনি ঘটনার পরদিন প্রাতঃকাল পর্যন্ত এই ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানিতেন না।” ১২ 

তরবারির জোরে নবারের সৈন্যদের হারিয়ে যুদ্ধ জয় করেছে এ অহঙ্কার ইংরেজদের ছিল। প্রতিবাদে বিদ্যাসাগর লিখলেন: “যদি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতক না হইতেন, এবং ঈদৃশ সময়ে প্রতারণা না করিতেন তাহা হইলে ক্লাইভের কোনক্রমেই জয়লাভের সম্ভাবনা ছিল না।” ১৩

নন্দকুমারের ফাঁসি সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের বলিষ্ঠ মন্তব্য: “নন্দকুমার দুরাচার ছিলেন যথার্থ বটে, কিন্তু ইম্পি ও হেষ্টিংস তাহা অপেক্ষা অধিক দুরাচার তাহাতে সন্দেহ নাই।”১৪ সন্তোষ কুমার অধিকারী এই প্রসঙ্গে বলেছেন: “ ইম্পি অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইলাইজা ইম্পে সম্পর্কে এই উক্তি Libellous বলে তাঁকে উত্যক্ত করতে পারত গভর্ণমেণ্ট।” খুব সত্য কথা। পরের পংক্তিতেই বিদ্যাসাগর আরওঁ দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছেন। “ধর্মাসনারূঢ় ইম্পি… হেষ্টিংসের পরিতোষার্ধে একেবারেই ধর্মাধর্মজ্ঞান ও ন্যায় অন্যায় বিবেচনায় শূন্য হইয়া নন্দকুমারের প্রাণবধ করিলেন।”১৫ 

এ ধরণের মন্তব্য চূড়ান্ত সাহসিকতার নিদর্শন। বিদ্যাসাগর রাজরোষে পড়তে পারতেন। কিন্তু রাজরোষের ভয়ে বিদ্যাসাগর সত্য প্রকাশে পিছপা হবে এমন মানুষ বিদ্যাসাগর ছিলেন না। বিদ্যাসাগরের এই প্রতিবাদী চরিত্রের মূলে আছে তাঁর প্রচণ্ড স্বাভিমান বোধ।

————————————————————- 

তথ্য প্রাপ্তি: 

১| করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, ইন্দমিত্র, আনন্দ পাবলিশার্স, সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃঃ ৩০-৩১। ২| ঐ, পৃঃ ৩১ ৩| ঐ, পৃঃ ১৩১ ৪| ঐ, পৃঃ ১৩১-১৩২ ৫| ঐ, পৃঃ ১৩২ ৬| প্রসঙ্গ: বিদ্যাসাগর, সম্পাদনা: বিমান বসু, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী, ২৫মে ২০০৮। পৃঃ ১৯৮ ৭| ঐ, পৃঃ ১৯৭ ৮| ঐ, পৃঃ ১৯৭ ৯| ঐ, পৃঃ ১৯৯ ১০| ঐ, পৃঃ ১৯৯ ১১| ঐ, পৃঃ ১৯৯-২০০ ১২| ঐ, পৃঃ ২০১ ১৩| ঐ, পৃঃ ২০১ ১৪| ঐ, পৃঃ ২০১ ১৫| ঐ, পৃঃ ২০১।