সি নে দু নি য়া
অ ভি ষে ক  ঘো ষ
'জোকার ২' : রোমান্সে নায়ক সুন্দর, জোকার ভায়োলেন্সে
রোমান্সে নায়ক সুন্দর, জোকার ভায়োলেন্সে – এমনটাই মনে হচ্ছিল, লেক মলে তৃতীয়ার মর্নিং শো-তে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত জনা চল্লিশ দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে। প্রসঙ্গত যে লেন্স দিয়ে এতকাল আমরা জোকার চরিত্রটিকে দেখে এসেছি ও মূল্যায়ন করে এসেছি, তাতেই দ্বিচারিতা আছে। যে চরিত্র সর্বক্ষণ প্রথা, প্রতিষ্ঠা, বিশ্বাসগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে চলে, যে নিজেই ছকভাঙা এক প্রতিনায়ক; তাকেই আমরা আমাদের চাহিদার অসংগত ছকে ফেলে দিতে চাই… ধরেই নিই, সে সেগুলোই করবে, যা আমরা চাই। আমরা কী চাই? চাই অ্যাকশন! চাই কমেডি! চাই ভায়োলেন্স! আমাদের নিদ্রাবিহীন হতমান দিনগুলিতে আমরা দেখতে চাই স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা পূরণের অমরাবতী। আমাদের চারপাশে যা কিছু, সবই আমাদের অধিকাংশকে সবসময় তাড়া করছে, নিন্দা করছে, হেয় করছে, করে চলেছে উপহাস – এই আমাদের দেশ-কাল-সমাজ। তাই আমরা এই ছবির হার্লি কুইনের মতোই ‘কিলিং জোক্’ দেখতে চাই। দেখতে চাই, ভিতরে জমে থাকা বাসি-পচা-গেঁজিয়ে ওঠা রাগ, উষ্মা আর ক্ষোভের বীভৎস বিস্ফোরণ। মুশকিল হল, আমরা কেউই ভিতরের মানুষটাকে জানতে চাই না। আমরা বুঝতে চাই না আর্থার ফ্লেককে। হার্লি কুইনও কি আসলে বুঝতে চেয়েছিল? কারণ তার হ্যালুসিনেশন, তার পীড়িত শৈশব, পারিপার্শ্বিক উৎপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের কৌতূহল উদ্রেক করে না। আমরা সবাই জোকারকেই চাই, চাই ওই রাগটাকে, চাই তার মুখোশটাকে। কষ্ট আর অবদমন তো আমাদের প্রত্যেকের আমৃত্যু সঙ্গী। আয়নার সামনে দাঁড়াতে তাই আমরা অপছন্দ করি। আমরা চাই আমাদের হয়ে জোকারই ভাঙবে আমাদের আয়নাগুলোকে, যাতে আমাদের বীভৎস মুখগুলো আর না আমাদের দেখতে হয় রোজ। মুখোশই ভালো, মুখোশই সই; কতদিন কাঁদলাম, আজ হাসবই।
কিন্তু এভাবেই আমরা ভুলে গেলাম, ওই জোকারের মুখোশের নীচে একটা মানুষ, একটা বিস্ফোরণের ইতিহাস, একটা স্প্লিট্ পারসোনালিটি, ধীরে ধীরে কীভাবে চাপা পড়ে গেল। টড ফিলিপ্স এই সিনেমায় আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, তিনি মানুষটাকে ভোলেন নি। আর সেই মানুষটা, আর্থার ফ্লেক অবশেষে কোর্টরুমে আমাদের সক্কলকে অস্বীকার করলেন। অস্বীকার করলেন আমাদের ছেলেমানুষী মিথ্যে ভালোবাসাকে। অস্বীকার করলেন নিজেকেও। সেই মুহূর্তেই জোকার মরে গেল। এই সাহসটা যে টড দেখিয়েছেন, এটা বড়ো কম কথা নয়।
“দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।” – এই বলে জোকার আর হার্লি কুইন গথামের নরককুণ্ড ছেড়ে, ভালোবাসার নুড়ি দিয়ে গান গেয়ে গেয়ে পাহাড় বানাচ্ছে… এমন কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষা না তো হার্লি কুইনের নিজের ছিল, না তো ছিল দর্শকের! আর তাই, আমরা সবাই হতাশ হলাম। গল্পে জোর নেই মানছি, কিন্তু পারফরমেন্সে অভিনেতারা ও অন্যান্য কলাকুশলীরা অসম্ভব মনোগ্রাহী কাজ করেছেন। আমার অন্তত এমনটাই মনে হয়েছে। সিনেমাটা মিউজিক্যাল হয়ে উঠতে চেয়েছে, অথচ মিউজিক্যালের কিছু এলিমেন্টকে অস্বীকারও করেছে, সেই অর্থে কোরাসের ব্যবহার রাখে নি। কিন্তু অপূর্ব সিনেমাটোগ্রাফি আর কালার গ্রেডিং গত পর্বের মতো এই পর্বেও চোখে কাজল পরিয়ে দিয়েছে। দুই প্রোটাগনিস্টের কেমিস্ট্রি খুবই ভালো লেগেছে। ইন্টারভ্যালের পর দুটো গান অবশ্যই আরোপিত বলে মনে হয়েছে, না থাকলেই ভালো হতো। বিস্ফোরণও একটা আছে এবং ঠিক সময়েই আছে, আর সেটাই দর্শকের প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারপর দুটো ট্রানজিশন্ গানের মাধ্যমে দেখানো হয়, যার আগের আর পরের কাটস্ যথাযথ নয় বলে মনে হয়েছে… ওইখানেই ধপ্ করে গ্রাফটা পড়ে যায়। গানদুটো ছবির গতি ও বক্তব্যকে ব্যাহত করেছে, এমনটাও মনে হয়েছে। ছবির গল্প সত্যিই তেমন কিছু নয়, কিন্তু ভাবনা ও বক্তব্যে বেশ জোর ছিল। প্রথাগত ভাবনার বাইরে গিয়ে গথামের চির-চেনা চরিত্রদের নিয়ে এমন ছবি বানানো, সহজ ছিল না আগেই বলেছি। হার্ভি ডেন্টের বালক-প্রতিম মুখ, জোকার ও হার্লি কুইনের চরিত্রগুলিকে ভেঙে গড়ে নেওয়া, কুখ্যাত আরখাম অ্যাসাইলামকে অপেক্ষাকৃত সহনীয় ও বাস্তবোচিত করে তোলা, এই সবই আসলে ছকভাঙা। তার উপর গান আর কোর্ট প্রসিডিংস্ – এই দুই মেরুর সমন্বয়! সুতরাং টড ফিলিপ্সের কাজ সহজ ছিল না।
এরপর বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। যাঁরা সিনেমাটি এখনও দেখেন নি, এরপর তাঁদের আর না এগোনোই ভালো। আমরা এবার ‘ছায়া’ নিয়ে কিছু কথা বলব। সেই ছায়া প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক; সেই ছায়া অবয়ব ছেড়ে চলেও যেতে পারে। সেই ছায়া স্বাধীন, তারও ইচ্ছে-অনিচ্ছে আছে। আর এই ছবিতে শুরুতেই সেই ছায়ার শয়তানি দেখানো হয় ডিজনির চিরাচরিত অ্যানিমেশন স্টাইলে। খেয়াল করে দেখুন, গল্প এই ছবিতে আকর্ষণীয় নয়, আকর্ষণীয় চরিত্ররা। তাই বিগ স্ক্রীনে যতবার আমরা জোকারের ক্লোজ আপ দেখি, মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। হোয়াকিন ফিনিক্সের স্ক্রীন প্রেজেন্স, ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং, ডায়লগ ডেলিভারি সব কিছুই গত পর্বের মতোই এই পর্বেও আমাদের বিহ্বল করে রাখে; মনে হয় এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হচ্ছি। তখন এও মনে হয়, এই হল সিনেমা… বিশেষত যখন রাজপথে আর্থারের ইন্টারভিউ লাইভ দেখতে দেখতে আচমকা হার্লি কুইন শো-রুমের কাঁচ ভেঙে বের করে নেয় একটা টেলিভিশন-সেট। বিনোদন যে কেবল অ্যাকশনে নেই, আজ সর্বত্র অ্যাকশন-তাড়িত আম-জনতা তা ভুলতে বসেছে। তারা যা চায়, এই সিনেমা তা সবসময় যুগিয়ে যেতে পারে নি। আসলে যুগিয়ে যেতে চায়ও নি। ডিম্যান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই অর্থাৎ ফ্যান-সার্ভিস নয় এই ছবি। এই ছবি নতুন কিছু, পরিচিত ও বহু ব্যবহারে ক্লিশে চরিত্রগুলিকে নতুন করে গড়ে নেওয়ার চেষ্টা এই ছবি। যদিও এর পরিণতি অনেকের মতো আমারও বিশেষ সন্তোষজনক মনে হয় নি। তারও নানান কারণ আছে, তবে স্পয়লার হয়ে যাওয়ার ভয়ে বিস্তারিত বলা অনুচিত হবে।
যদিও ওই সমাপ্তির একটা ব্যাখ্যা আমরা খুঁজে নিতে পারি। শুরু আর শেষের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য একটা সাঁকো-ও আমরা খুঁজে পেতে পারি এ’ভাবেই। শুরুতে আর্থারকে প্রতারিত করে তার ছায়া, সে স্পষ্টতই অশুভ, এমনকি আর্থারের জন্যও। এরপর গল্প যত এগোতে থাকে, আমরা অনুভব করি, ভক্তদের প্রত্যাশার অসম্ভব চাপ মানসিকভাবে ক্লান্ত আর্থার আর বইতে পারছে না, সে বিধ্বস্ত। এইখানেই সে আরো বেশি করে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে। সে তো আসলেই কোনো অতিমানব নয়। সে স্বীকার করে, ‘জোকার’ বলে কেউ নেই। সুতরাং ওইখানেই তার মুখোশ খসে পড়ে, রয়ে যায় মানুষটা। সমস্যা হল মানুষটাকে কেউ চায় না, তাকে তো ‘আইডল’ বানিয়ে পুজো করা যায় না। তাই এ’বার মানুষটাকে মরতেই হবে আর তখনই দীর্ঘ হয়ে উঠবে অসম্ভব এক অতিমানব ‘জোকার’-এর ছায়া। কিন্তু মানুষটা যে তখন প্রেমে হাবুডুবু! এমন একটা মানুষকে মারবে কে? আরখামের কোনো প্রহরী? তারই কোনো সহবন্দি? নাকি গথামের পুলিশ অথবা উন্মত্ত জনতা? যেই তাকে মারুক, জোকারের ‘ছায়া’ কিন্তু এইবার খুঁজে নিতে পারবে তার পরবর্তী অবলম্বনকে! হয়তো গোটা সিনেমাটাই এমন এক ভাববস্তুকে অবলম্বন করে ডালপালা মেলতে চেয়েছে। কিন্তু ওই যে… চরিত্রটা জোকারের, এমন এক আইকনিক ক্যারেক্টার যা ইতিপূর্বে বিশিষ্ট অভিনেতাদের অভিনয়ে ধন্য, ভক্তদের আবেগে ও ভালোবাসায় স্নাত। তাই স্বভাবতই ভক্তরা অসন্তুষ্ট হতেই পারেন। আরখামে মিউজিক্যাল থেরাপি চলছে, এমন কিছু তো কল্পনাই করা যায় না! তাই সিনেমাটা নিয়ে দর্শকরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন, জোরদার আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে বিশেষ প্রত্যাশা না নিয়ে দেখলে ও খোলা মনে উপভোগ করতে পারলে, এই ছবিও বিনোদন দেয় বই-কি! বরং তার থেকে বেশিই কিছু দেয়।