ফি চা র
রাজীব চক্রবর্তী
শেষ ট্রাম মুছে গেছে
এক অদ্ভুত সমাপতন। কলকাতার রাস্তায় বন্ধ করা হল ট্রাম। ট্রামের বয়স এই শহরে হয়েছিল একশ একান্ন। আর এবছরেই কবি জীবনানন্দের মৃত্যু বয়স হয়েছে সত্তর। এই কবি যে গাড়িকে দার্শনিকের সঙ্গে তুলনা করেন সেই ‘দার্শনিকের গাড়ি’-র অপমৃত্যু আমরা তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছি। আমাদের শহর, আমাদের প্রজন্ম এর কিন্তু বিচার চায় না। এই যানের মৃত্যু কি এই শহরকে গৌরবান্বিত করবে? এই শহর— এই পৃথিবী বারবার পায় নাকো তারে… বারবার সত্যিই তাকে পাওয়া যায় না। জয় গোস্বামীর ‘সূর্য পোড়া ছাই’ যেমন বারবার পাওয়া যাবে না, যা লেখা হয়েছিল একটা গোটা ট্রাম সফরে। অথচ, এই হত্যার কি খুব প্রয়োজন ছিল! ট্রামের সাথে যে শহরের এবং একটি শহরের সাথে যে ট্রামের আদিগন্ত মধ্যস্থতার সম্পর্ক, তার শ্লথতা তো আমাদের চেনা— আমরা এই শহরবাসী— এই মহানগরবাসী এই বাহনের ধীরলয়তাকে আপন করে নিয়েছিলাম। কারণ এর সাথে এই শহরের সৌন্দর্য্য, অব্যস্ততা, অদূষণ, নিজস্বতার অন্বয় জুড়ে আছে। জুড়ে আছে এর প্রমিত ঘন্টাধ্বনি যাতে কোনো ধর্ম নেই, বলা ভালো ট্রামের ঘন্টাধ্বনি আদিগন্ত বিধর্ম জড়িত। তার শরীর জুড়ে মাখানো আছে ঘাস, কমলালেবু, কবি ও কবিতার স্বীকৃত গন্ধ, শীতের কুয়াশা। এই অযান্ত্রিক ট্রামের কোনো দাবী ছিল না শহরের রাস্তায়, মাথা ঝুঁকিয়ে নিজস্ব গতিতে নিজের মতো চলাচলের একক ও এক নিজস্ব দ্রাঘিমা তৈরি করেছিল। এই দ্রাঘিমায় ছিল সূর্যের আলো আর তারা ভরা আকাশের কথা। কবির মৃত্যু, হা-হুতাশ।
২
তাকানো যাক ইতিহাসের পাতায়। ১৮৭৩ সালের এক অন্তর্বর্তী পর্যায়ে যখন (তার প্রায় কুড়ি বছর আগে কলকাতায় হাওড়া ও শিয়ালদা স্টেশন প্রতিষ্ঠা হল) দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে সাহেবি কল্যাণে নানান দ্রব্যের সম্ভার এই শহরের নাগরালিকে ‘চারচাঁদ’ লাগাতে আনা হতে থাকে, স্টেশন চত্বর থেকে সেই পণ্যগুলিকে শহরের অন্তর্বর্তী অংশে আনার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল এই ট্রাম, যাদের টানত নানান আকৃতির ঘোড়া। ঘোড়াকে জলখাওয়াতে রাস্তার পাশে গঙ্গাজলের কল বসানো হল। টুংটাং শব্দে এ শহরে যেন নতুন সাজ। খতির বোঝা বয়েও ট্রাম চলল শহরের বিভিন্ন দিকে। মুটের বোঝা আর কিইবা বইবে।
এরপর ট্রাম যখন ক্রমশ বড়ো হল, চিনতে থাকল একের পর এক রাস্তা-ঘাট, লোকজন, তখনই শুরু হল মানুষের সাথে তার গল্প। শুরু হল ঘাটের কথা, রাজপথের কথা, মানুষজনও বিভিন্ন কারণে ট্রামকে আপন করল। আর সেই থেকেই এই পর্যন্ত ট্রামের সাথে এই নাগরিক সমাজের বন্ধুতা। কিন্তু কলকাতা শহরের আঁকাবাঁকা পথঘাটের মতোই তার চলার পথেও এলো বাঁক। ক্রমাগত আজকের দ্রুতগামী জীবনের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছুতেই আর এঁটে উঠতে পারছিল না সে। এ কথা যেমন সত্যি— তেমন একথাও ঠিক যে ট্রাম কোনোদিনই দ্রুততার সাথে নিজের প্রতিযোগিতা করতেই চায়নি। ট্রাম বেছে নিয়েছে শহরের মধ্যেকার নিজস্ব রাস্তা। বরং এক রাস্তা না বলে ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ বলাটাই বোধয় বেশি সঠিক হবে।
তবে তার এই নিজস্ব দার্শনিকতা সবসময়ই যে একরকম ভাবেই কেটেছে এমনটা কিন্তু নয়। যখন বয়স ছিল ট্রামের তাকে এই শহর দেখেছে মিছিলে— ট্রাম শ্রমিকের মিছিল। গুলি চলেছে তাতে। শহীদ হন শ্রমিক। তবু মিছিল চলে। বারবার এ শহরে ট্রাম নামে। সবটা দেখে সে সচক্ষে— দেখতে দেখতে তার কথা বলার ইচ্ছেটা হয়ত সম্পূর্ণই লুপ্ত হয়েছিল, যেমনটা ঘটেছে কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর ক্ষেত্রে। অথচ, সেই ট্রামই কিনা তার ‘দার্শনিকতা’ ভুলে কবিকেও রেয়াত করেনি।
৩
১৯৩৩ সালে লেখা এক গল্পে কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর গল্পের এক চরিত্রকে রাস্তায় তাড়াহুড়ো করতে না করেন, যেন সে ট্রামে চাপা না পড়ে। তিনি কি বিশ্বাস করতেন তার ‘ফিলোসফারর্স কার’ সত্যিই কাউকে আঘাত দিতে পারে? কেউ হারাতে পারে তার প্রাণ? তিনি তো জানতেন জীবনের বস্তুতই কোনো শেষ গন্তব্য নেই। ট্রামের মতোই শান্ত এক জীবনের গাতায়াত চলে অবিরাম এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে; মাঝে খানিক বিশ্রাম। তারপরে পুনরায় ফিরে আসা। তাঁর এই ভাবনার আবহমান শরীক ছিলেন ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তয়েভ্স্কি। ট্রাম কবির কাছে এক দার্শনিক সত্ত্বা বিশেষ। যার অবশ্যই গতিময়তা আছে তবে তাতে আর পাঁচটি যানের মতো কোনো জানান দেওয়া নেই। তিনি লিখেছেন, ‘কয়েকটি আদিম সর্পিনীর সহোদরার মতো এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে/পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে বিষাক্ত বিস্বাদ স্পর্শে/অনুভব করে হাঁটছি আমি।’ কবির দার্শনিকতার অমোঘ সঙ্গী তাঁর ট্রাম— বোধ।
তবুও ট্রামের আঘাতে কবিকে চলে যেতে হল। নিজস্ব স্বীকারোক্তিতে তিনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায় বন্ধু অজিত ঘোষকে ‘ট্রাম’ দুর্ঘটনার কথাই জানান। জানান ট্রামের গতি আন্দাজ করতে পারার ব্যর্থতার কথা, কবি ট্রামকে দোষারোপ করেননি। অবসান করে গেছেন তাঁর মৃত্যু বিষয়ক হত্যা-আত্মহত্যা-দুর্ঘটনার ইকির মিকির তত্ত্বকে। জানা যায় যে ট্রাম চাপা পড়েন কবি, তার ড্রাইভারের ১৬/১৭ বছরের সন্তানটি ওঁর কবিতাই পড়ত, ভালোবাসত। লুকিয়ে পড়ত সে ওই কবিতা। সেদিন দুর্ঘটনার পরে বাড়ি ফিরে নাকি ভদ্রলোক তার মনের কষ্ট লাঘব করেছিলেন নিজের ছেলের কাছে জীবনানন্দের কবিতার বই ও কবিতার শব্দগুলিতে চোখ রেখে। কবির মৃত্যু সংবাদ ওই ড্রাইভার ভদ্রলোকটিকে ভাসিয়েছিল দুঃখের সাগরে। অথচ কবির জীবদ্দশায় তাঁর কবিতা ওই ড্রাইভার ভদ্রলোকের ছিল ঘোরোতোর নাপসন্দ বিষয়।
এভাবেই জীবনানন্দ দাশ আর ট্রামের মধ্যে এক আমৃত্যু মৃত্যুহীন সম্পর্কের বাঁধন তৈরি হয়েছে, যা বাস্তবিকই বিস্মিত করে কবির অনুগামী, বিশেষত বাঙালীকে। কারণ ট্রাম ও জীবনানন্দ দু্ইই তো বৈশ্বিক— বাঙালীর একান্ত নিজের, নিজস্ব অভিজ্ঞান।
৪
বাঙালীর এই নিজস্ব পরিচিতি— তার ট্রামের অন্তিম যাত্রাধ্বনি সূচিত হয়েছে প্রাক-হেমন্তে। জানা যাচ্ছে ট্রামের যা কিছু সম্পদ সবটাই বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। ট্রাম ডিপোর নির্জন অন্তরমহলে গজিয়ে তোলার ব্যবস্থা হচ্ছে নির্লজ্জ হাইরাইস। সিন্ডিকেট-তোলাবাজি-ইট-বালি ইত্যাদিতে নাকি ঢেকে ফেলা হবে চলমান এক ইতিহাসকে। ফড়িঙের-দোয়েলের জীবনে মানুষ আসে না, তাকে দেখা যায় না। কোথাও কি কোনো দূরতর নক্ষত্রের খসে পড়া শীতল আলোয় কালের যাত্রাপথে এই গ্রহে এভাবে এক জাতির অভিজ্ঞান ক্রমশ ধ্বংস হতে দেখে উচ্চারিত হচ্ছে—
‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন
জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথে…’