খে লা ই ডো স্কো প
সুপর্ণশু
ভারতীয় ফুটবলের জনক: নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী
কলকাতা হল ভারতীয় ফুটবলের মক্কা— এ-কথা আমাদের প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু জানেন কি— ভারতীয় ফুটবলের পথ চলা শুরু হয়েছিল এক বাঙ্গালীর হাত ধরেই? তাঁর নাম নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। একাধারে তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, ক্রীড়া প্রশাসক, বাংলার অদ্বিতীয় সেন্টার ফরওয়ার্ড এবং ভারতীয় ফুটবলের অগ্রদূত। মূলতঃ তাঁর উদ্যোগেই ভারতীয়দের মধ্যে ফুটবল খেলা জনপ্রিয়তা লাভ করে।
নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী তখন নিতান্তই ১০ বছরের বালক। হেয়ার স্কুলের ছাত্র। বালক নগেন্দ্রপ্রসাদ ছুটির দিনে প্রায়ই ঘোড়ায় টানা এক্কাগাড়ি চড়ে বাবার সঙ্গে হওয়া খেতে যেত ময়দানে। সেখানেই তাঁর চোখে পড়ে এক দল গোরা সৈন্য নিজেদের মধ্যে একটি বড়ো গোলাকার বল নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো একটি খেলা খেলছে। বলাবাহুল্য তা ছিল নিতান্তই তাদের নিজেদের বিনোদনের জন্য। কিন্তু খেলাটি বালক নগেন্দ্রপ্রসাদকে দারুণ ভাবে আকর্ষিত করে। ১০ বছরের মুগ্ধ বালককে বাবাই জানান খেলাটির নাম ‘ফুটবল’। মুগ্ধতাতেই আটকে রইলেন না বালক নগেন্দ্রপ্রসাদ। স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের নিয়ে দল গড়ে শুরু হল তাঁর ফুটবল খেলা। বউবাজারের মেসার্স ম্যানটন অ্যান্ড কোং থেকে কেনা হল বল। পড়াশোনার সাথে সাথে চুটিয়ে চলতে থাকল ফুটবল চর্চা।
স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে নগেন্দ্রপ্রসাদ ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক মিঃ স্ট্যাক তাঁর ফুটবল খেলার উৎসাহ দেখে নিজের উদ্যোগেই ব্যবস্থা করলেন সঠিক প্রশিক্ষণের। খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন বাংলার অদ্বিতীয় সেন্টার ফরওয়ার্ড।
শুরু হল বাঙালীর ফুটবল খেলা। বিভিন্ন জেলায় ক্লাব সংগঠনের কাজে মন দিলেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা ‘ওয়েলিংটন ক্লাব’ গড়ের মাঠে দেশীয় ব্যক্তিদের প্রথম খেলার তাঁবু। ইতিমধ্যে ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে গোরা সৈন্যরা ময়দানে ফুটবল খেলা শুরু করেছিল। তিনি আরও কিছু ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেমন— বয়েজ ক্লাব (ভারতের প্রথম ফুটবল সংগঠন), ফ্রেন্ডস ক্লাব, হাওড়া স্পোর্টিং ক্লাব, প্রেসিডেন্সি ক্লাব প্রভৃতি। এইসমস্ত ক্লাবে জাতিধর্মনির্বিশেষে সবাই খেলতে পারত। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী ভারতীয়দের নিয়ে কলকাতায় বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত শোভাবাজার ক্লাবের তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি হাওড়াতে বন্ধু বামাচরণ কুণ্ডুর সাথে ভারতের প্রথম ফুটবল প্রতিযোগিতা ‘ট্রেডস কাপ’ আয়োজন করেন। আই.এফ.এ শিল্ড গঠনে উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র ভারতীয়। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে শোভাবাজার ক্লাব সমস্ত ইউরোপীয় ক্লাবকে পরাজিত করে ‘ট্রেডস কাপ’ জিতে নেয়। ১৯১১ সালে মোহনবাগান শিল্ড জয় করার আগে এটাই বাঙালি ক্লাবের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল। ১৮৯৩ সালে আই.এফ.এ শিল্ডে ‘শোভাবাজার ক্লাব’ একমাত্র ভারতীয় দল হিসেবে অংশগ্রহণ করে। ১৮৭৭ থেকে ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ অবধি তিনি ৭০০-র বেশি ম্যাচ খেলেছিলেন। শুধু ফুটবলই নয় ক্রিকেট, রাগবি, হকি ও টেনিসেও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তৎকালীন সময়ে বাঙালি ফুটবলাররা খালি পায়ে খেললেও তিনি বুট পরে খেলতেন।
নগেন্দ্রপ্রসাদের আদি নিবাস ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার রাধানগরে। তবে তাঁর জন্ম কলকাতায়। তাঁর পিতার নাম সূর্যকুমার সর্বাধিকারী, তিনি ‘ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিন’-এর প্রথম ভারতীয় ডিন ছিলেন। মাতা হেমলতা দেবী। শোভাবাজারের রাজা আনন্দকৃষ্ণ দেবের মেয়ে কৃষ্ণকমলিনীর সঙ্গে। ১৯৪০ সালের ১৭ই জানুয়ারি, ৭০ বছর বয়সে পরোলোকগমন করেন তিনি।
ব্রিটিশ শাসনকালে ব্রিটিশরা বাঙালিদের ভীতু, কাপুরুষ ও অকর্মণ্য ভাবত। এর জবাব ব্রিটিশদের মুখের ওপর পায়ের মাধ্যমে দিয়েছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর খেলার জীবন প্রসঙ্গে মন্মথনাথ বসু একবার বলেছিলেন, ‘ইউরোপীয়ানদের নগেন্দ্রপ্রসাদ বেশ ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে বাঙালিরা বুদ্ধিতে ও জ্ঞানে কোনো অংশেই তাদের চেয়ে কম যায় না। আর খেলার মাঠে যারা নগেনের কনু-এর গুঁতো খেয়েছে তাঁকে আর কিছু বোঝাবার দরকার হত না, ব্রিটিশদের তিনিই প্রথম হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেন যে বাঙালির খালিপায়ে লাথি বুটপরা লাথির চেয়ে অধিক শ্রেষ্ঠ।’
তাঁর কাছে খেলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, শরীর ও মন দুইয়ের শক্তিবৃদ্ধির মাধ্যম ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘দুর্বল হলে ব্রিটিশদের সঙ্গে ফুটবলেও জেতা যাবে না, পাওয়া যাবে না স্বাধীনতাও।’ ইউরোপীয়ান ক্লাবের সাথে নগেন্দ্রপ্রসাদের খেলার খবর শুনে স্বয়ং বিবেকানন্দ মাঠে হাজির হয়েছিলেন খেলা দেখতে। শিকাগো কাঁপিয়ে বিবেকানন্দ সেই সময় সদ্য দেশে ফিরেছেন৷ গোটা কলকাতা আপ্লুত৷ শোভাবাজার রাজবাড়ির সংবর্ধনাসভায় তিনি নগেন্দ্রপ্রসাদকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ওঁর মতো মানুষ, ওই রকম মরদ চাই।’ অতি সম্প্রতি তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে, ধ্রুব ব্যানার্জী পরিচালিত এবং শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস দ্বারা প্রযোজিত ‘গোলন্দাজ’ নামে একটি বাংলা জীবনীমূলক চলচ্চিত্র, ১০ অক্টোবর, ২০২১-এ মুক্তি পায়। নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীকে ভারতীয় ফুটবলের জনক বলা হয়।