ফ্যা শ ন
পল্লবী মজুমদার
একফোঁটা ইয়ুকসম । পর্ব ২
ইয়ুকসমের পথে ধসের কারণে রাস্তা খুবই খারাপ। পিচ উঠে গিয়ে মাটি বেরিয়ে পড়েছে। তেমনি গর্ত। আর জিলিপির প্যাঁচ তো আছেই। ছ্যাকরা গাড়ির মতো গড়াতে গড়াতে চলল সুবাসচন্দ্রের সুইফট। এদিকে গাড়িতে বসা সওয়ারিদের কোমর খুলে যাবার জোগাড়। বিকেল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছনো গেল জোড়থাং। এখান থেকে রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে যায়। আমাদের ডাইনে যেতে হবে গেজিং হয়ে ইয়ুকসমের পথে। জোড়থাংয়ে রঙ্গিত এসে তিস্তার সঙ্গে মিলেছে। নদী সঙ্গমের অনেক উপরে কংক্রিটের ঝুলন্ত সেতু। আর গোটা সেতু জুড়ে হাজার হাজার রংবেরঙের বৌদ্ধ পতাকা ঝোলানো। চোখ জুড়নো সৌন্দর্য। এ সময়টা সাধারণত সিকিমজুড়েই রোদবৃষ্টির খেলা চলে। আমাদের সমতলভাগ্যে যেমন সবর্দাই কড়া রোদ্দুর, তেমনি পাহাড়ভাগ্যে আবার সর্বদাই বৃষ্টিদিন। টিপটিপ বর্ষায় উড়িয়ে নেওয়া মাতাল করা হাওয়ায় তিস্তা-রঙ্গিতকে হ্যালো বলতে গাড়ি থেকে নেমে ঝুলন্ত সেতুর উপর খানিক হাঁটাচলা ফোটো তোলাতুলি হল। চারপাশে সবুজে সবুজ। সেতুর উপর দিয়ে বড় গাড়ি চলে অবিরাম, আর সেতু জোরে জোরে দোলে। মনে হয় এই বুঝি পড়লাম রঙ্গিতের কনকনে জলে। ভিজে হাওয়া, রঙিন পতাকার পতপত শব্দ, বিষ্টির ফোঁটা আর সেতুর দুলুনি মিলে যেন মায়াদৃশ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি মনে হতে লাগল। চোখ জড়িয়ে আসতে চায় হিমেল ঘূর্ণিতে। খানিক সেখানে ঘোরাঘুরি করে ফের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় নামাওঠা শুরু। ইয়ুকসম পৌঁছতে বেজে গেল সন্ধে সাতটারও বেশি। আর পৌঁছেই দেখা/শোনা গেল দুঃসংবাদ। পাওয়ারকাট। কখন আসবে কেউ জানে না। বাজ বিদ্যুৎ হাওয়া আর বৃষ্টি মানেই সিকিমে পাওয়ার অফ।
হোটেলে ইনভার্টার ছিল। তাই দিয়ে প্রতি ঘরে একখানা করে আলো আর রিসেপশনের আলো জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু আর কিছু করা যাবে না। মোবাইল, ল্যাপটপ চার্জ দেওয়াও যাবে না। হাক্লান্ত শরীরে কোমর খসিয়ে যাত্রা শেষ করে গন্তব্যে পৌঁছেই এহেন সুসংবাদ আমাদের খানিক দমিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু ঘরে পৌঁছে মন ভরে গেল। ইয়াব্বড় ঘর, ভারি ছিমছাম সাজানো। সামনে খোলা বারান্দা। আয়না থেকে আলমারি সবই চকচকে ঝকঝকে। বিছানার পাশেই সিকিমি জানালা, ছোট ছোট কােঠর খোপ কাটা কাটা। খুলতেই বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর হু হু ঠান্ডা হাওয়া পর্দা উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বিছানায় পাতা লাল টুকটুকে নরম কম্বল হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। ঠান্ডা জলেই (কারণ গিজার চলছে না) মুখহাত ধুয়ে কম্বলের নীচে পা মেলতে না মেলতে রাজেশ হাজির। হাতের ট্রে-তে গরমাগরম পেঁয়াজি আর লিকার চা। সিকিমের কাপগুলোর গায়ের নকশা ভারি সুন্দর, একেবারে অন্যরকম। আর সব কাপের উপরেই টি-পটের মতো মুন্ডুওলা ঢাকনা লাগানো। সেই ঢাকনা খুলে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আবার ঢেকে রাখো, ঠান্ডা হবার ভয় নেই। কাজেই এহেন অপূর্ব অভ্যর্থনায় মন মেজাজ কোমরব্যথা নিমেষে শরিফ!
কিন্তু পাওয়ারের দেখা নাই রে পাওয়ারের দেখা নাই। হোটেলের ম্যানেজার যাদবপুরের লিংগুইস্টিক বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, ঝকঝকে তরুণ আকাশ। বাড়ি তার বাংলা। কাজেই ভাই, দিদি, দাদা, মামা পাতাতে দেরি হল না মোটে। সে আমাদের বলল, ‘রাতে কারেন্ট আসার চান্স কম। তোমরা মোবাইলগুলো অন্তত রিসেপশনে চার্জ দিয়ে নাও।’রাতে রাজেশের বানানো ভাত, ডাল, আলুভাজা আর চিকেনের ঝোল দিয়ে জব্বর খাওয়া হল। তারপরেই কম্বল আশ্রয় করা গেল। কিন্তু মুশকিলটা শুরু হল যখন সকালেও পাওয়ার এল না। দাদাবাবু এসেছেন ‘ওয়র্ক ফ্রম মাউন্টেন’ করবার কড়ারে। সকাল থেকে ল্যাপটপ সাজিয়ে না বসলে তাঁর চলবে না। এদিকে চার্জ তো ক্ষীয়মাণ! বাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। আমোদে কিন্তু ফাঁকি নেই। ভোর ভোর উঠে হোটেলের পাঁচতলার ছাতে চড়লুম। সেখানে রয়েছে দুই কালো কুকুর খুশি আর লুসি। যে কেউ ছাতের দরজা খুলে প্রবেশ করলেই তাদের আনন্দ দেখে কে… গায়ে লুটোপুটি, পায়ে চাটাচাটি শুরু। ওদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই দেখা হল সাদা ধবধবে বরফে ঢাকা মাউন্ট কাবরুর সঙ্গে। কাবরুকে কাঞ্চনজঙ্ঘারই মাসতুতো ভাই বলা চলে। কাঞ্চনজঙ্ঘার দক্ষিণে বেশ অনেকটা জুড়ে কাবরুর অবস্থান। উচ্চতা তেইশ হাজার ফুটের কাছাকাছি। রাতে বিষ্টি হয়ে আকাশ এখন ঝকঝকে পরিষ্কার নীল। তাই চারপাশ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। পাহাড়ের রংরূপ দেখে দেখে আশ মেটে না। কতরকমের সবুজ, কখনও তাতে হলুদের আভা, কখনও কালোর ছোপ, কখনও নীলের উঁকি। তবে সূর্যোদয় দেখার মতো পরিষ্কার আকাশ পাওয়া গেল না। সূর্যদেব বেশ কিছুটা উঠে গিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে মিচকি হাসলেন।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে ব্যালকনিতে এসে বসলাম। সিকিমের বাড়িগুলো দার্জিলিং বা কার্শিয়ংয়ের মতো নয়। ছাদ ঢালু হলেও সব ছাদের কিনারে কাঠের নকশা করা। কোথাও কোথাও প্যাগোডার মতো। আর গোটা পাহাড় জুড়ে অর্কিড আর বুনোফুলের বাহার। রং যেন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। উজ্জ্বল বেগুনি, গোলাপি, নীল, কমলা, লাল। ছোট্ট কুঁড়েঘরও রঙে রঙে পাগল করা। আমাদের ঘোরা সাইটসিইং পয়েন্টে টিক দেবার নয়। আমরা চাই এলিয়ে খেলিয়ে ছুটি কাটাতে আর চোখ ভরে পাহাড় দেখতে। তাই দাদাবাবুর কন-কল শুরু হতেই আমি বিছানায় গড়িয়ে পড়লাম। চোখ আটকানো বাইরে। হোটেলের পিছন দিকেই ছোট্ট একটা স্কুল। সেখানে দু’রকম ফুলের বাহারই রয়েছে। রঙিন অচল ফুল আর খুদে খুদে লাল সোয়েটার পরা দৌড়নো ফুল। ছানাপোনারা দিদিমণিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কখনও জল ছোড়াছুড়ি করছে তো কখনও ঘাসফুল তুলছে তো কখনও মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। হোটেলের গাড়িবারান্দায় রোদ পোয়াচ্ছে ইয়াব্বড় তিব্বতি ম্যাস্টিফ বাচ্চু, যার সাত চড়ে রা নেই। আমাদের হিমসাগর হোটেলের উল্টোবাগেই বিলাসবহুল হোটেল ইয়ুকসম রেসিডেন্সি। তার শোভাও কম নয়। নীচেই গুটিকয় দোকান… বিকিকিনি চলছে সকাল থেকেই। ডিমটোস্ট খেয়ে অলস সকাল ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কাটাচ্ছি, উকুলেলে হাতে কংকণের প্রবেশ। ‘কী করব দিদি, কারেন্ট নেই, ল্যাপটপ চালাতে পারছি না, কাজ বন্ধ। চলো গান গাই।’ব্যস, আর পায় কে! একটুকরো যাদবপুর নেমে এলো পাহাড়ে। অঞ্জন-মহীন কু ঝিকঝিক।
সাড়ে বারোটা নাগাদ কারেন্ট এল। হোটেলে তখন সাজো সাজো রব। ঘরে ঘরে গিজার অন। ল্যাপটপ, মোবাইল প্লাগ করে সবাই ফুল চার্জের অপেক্ষায়। আমরাও স্নান খাওয়া সেরে রেডি। দাদাবাবুর কাজ চলবে আড়াইটে তিনটে পর্যন্ত। তারপরে আমরা বেড়াতে বেরব। এদিকে দুটো বাজতে না বাজতেই আকাশ কালো করে এল। ফের বিষ্টি, হাওয়া, বিদ্যুৎ। ম্যানেজারআকাশ অবশ্য ফুল বিনদাস! বলল, ‘আরে কুছ পরোয়া নেই। সব তো হাঁটা ডিসটেন্স। পাহাড়ে বিষ্টি বেশিক্ষণ হয় না। ছাতা লাঠি সব দিয়ে দেব। দিব্যি ঘুরে আসবে।’ হলও তাই। আড়াইটে নাগাদ বগলে ছাতা নিয়ে বেরলুম। হোটেল থেকে বেরিয়ে ডাইনে কিছুটা গেলেই ইয়ুকসমের বিখ্যাত গুপ্তা রেস্টুরেন্ট। সাহেবি খানা খেতে সাহেবরা এখানে বেশ ভিড় জমান। পিৎজা, পাস্তা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মোমো, থুকপা, কফি, চা, পকোড়া সব পাবেন। সঙ্গে চকোলেট, বিস্কুট, কেক, চকো পাই থেকে শুরু করে সিকিমি ফ্রিজ ম্যাগনেটও। গুপ্তা পেরিয়ে কয়েক পা হাঁটলেই সিকিমের বৃহত্তম প্রেয়ার হুইলের ঘর। দানবাকৃতি অনেকগুলো প্রেয়ার হুইল ঘরের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত লাগানো। সেগুলো ঠেলে ঠেলে ঘোরাতে বেশ ভালোই গায়ের জোরের দরকার। ঢুকতে টিকিট নেই। শুধু জুতোজোড়া বাইরে খুলতে হবে। ঘোরানো হল সবগুলো বিপুলাকৃতি প্রার্থনাচক্র।
আরও খানিক এগিয়ে পথ বাঁক নিয়ে চড়াই উঠেছে। রঙিন রেনকোট পরা কচিকাঁচারা কলকল করতে করতে স্কুল থেকে ফিরছে সে পথে। বুড়োবুড়ি পর্যটক হাঁপাচ্ছে দেখে ফিক করে হেসে ‘নমস্তে’ ছুড়ে দিেয় চলে যায়। ডাইনে রাস্তা উঠে গেছে কাথোক গুমফার দিকে। আর তেমাথার মাঝখানে বসানো বিশাল এক সাদা চোর্তেন। চোর্তেন অনেকটা বৌদ্ধ স্তূপের মতোই, তবে গঠনে একটু আলাদা। মাটির ওপর ধাপকাটা উঁচু টেবিলের মতো তৈরি করে তার উপরে স্তূপের মতো বানানো হয়। সবার উপরে থাকে ছোট্ট একটা মিনার। সাধারণত বৌদ্ধ ধর্মগুরু বা গুরুত্বপূর্ণ কারও দেহাবশেষের উপরেই চোর্তেন তৈরি হয়। বৌদ্ধ গুমফায় চোর্তেন বহুলদ্রষ্টব্য। সেই চোর্তেনকে ডাইনে রেখে উপরে উঠে যাই। গন্তব্য – ইয়ুকসমের করোনেশন থ্রোন।
এখানে ইয়ুকসমের ইতিহাস একটু বলতেই হবে। ইয়ুকসম হল সেই জায়গা যেখান থেকে সিকিমের শুরু। ইংরেজিতে বললে The Birthplace of Sikkim। তিব্বতি ভাষায় বোধহয় এর নাম নরবুগ্যাং। তিব্বত থেকে তিন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পাহাড় ডিঙিয়ে ইয়ুকসমে এসে পৌঁছেছিলেন আর সেখানেই পাহাড়চুড়োয় রাজ্যাভিষেক হয়েছিল সিকিমের প্রথম রাজা ফুন্টসোগ নামগিয়ালের। সময়টা সপ্তদশ শতাব্দির মাঝামাঝি। এই করোনেশন থ্রোন হল সেই জায়গা, যেখানে তিন সন্ন্যাসী প্রথম এসে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রধান সন্ন্যাসীর নাম লাৎসুন চেমপো। তাঁর পায়ের ছাপও দেখা যাবে পাথরের গায়ে (অবশ্যই বিশ্বাসীদের জন্য)। তিনিই সিকিমের প্রথম চোগিয়াল (রাজা) হিসেবে দায়িত্ব তুলে দেন ফুন্টসোগের হাতে। সাদা ধবধবে প্যাগোডা প্যাটার্নের লাল-সাদা তোরণ পেরিয়ে অনেকটা চড়াই উঠে দেখতে পাওয়া যাবে শান্ত সেই পর্বতাবাস, যেখানে পাথরের চোর্তেনের গায়ে চারটি সিংহাসন বানানো। তিনটি তিন লামার আর একেবারে ডাইনে চোগিয়ালের। সকলের ছবিও রয়েছে। আর রয়েছে এক আদিম মহাদ্রুম, যার শেষ দেখতে গেলে প্রায় আকাশের দিকে চেয়ে শুয়ে পড়তে হয়। গাছের গায়ে লেখা গাছের নাম— ক্রিপটোমেরিয়া পাইন। অনেকে বলেন, লামাদের হাতের লাঠি থেকে নাকি এই গাছের জন্ম। এছাড়া গোটা সিকিমের সবজায়গা থেকে একটু করে পাথর আর মাটি সংগ্রহ করে নাকি তাই দিয়ে বানানো হয়েছিল এই চোর্তেন।আর ভিতরে পুঁতে রাখা হয়েছিল লাৎসুনের পাওয়া অজস্র উপঢৌকন।একদৃষ্টেতাকিয়ে থাকলে সত্যি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে যায় এসব কথা। চারিদিকে রঙিন পতাকা লম্বা লম্বা লাঠির আগায় সাজানো, জোলো হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে, কেমন যেন জলরঙের ছবির মতো রং চুঁইয়ে পড়ছে চারিপাশে।ফুল আর গাছে ছাওয়া নিশ্চুপ এই নরবুগ্যাং নিঃসন্দেহে ইয়ুকসমের অন্যতম সেরা আকর্ষণ।
এই ‘ওল্ড কমপ্লেক্স’ দেখা শেষ করে নানারকমের ফুলে ঢাকা খিড়কির পথ দিয়ে আমরা নেমে এলুমপাশেই ‘নিউ কমপ্লেক্স’-এ। এখানে রয়েছে তিনতলা একটা সিকিমি ধরনের বাড়ি। একেবারে নীচে বিরাট উপাসনাগৃহ। গুমফার মতোই। তবে ভেতর থেকে বন্ধ। কাচের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে কীরকম গা ছমছম করছিল। যেন স্লিপিং বিউটির দেশ। সবকিছু ঠিক ঠিক জায়গায় গুছিয়ে রাখা, অথচ প্রাণের স্পন্দন নেই কোথাও। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় রেলিংঘেরা বিরাট ফাঁকা বারান্দায় উঠে জুতো খুলে তিনতলায় আসতেই চমক। এটাও চারিদিক খোলা, মাথায় প্যাগোডার মতো ছাতওলা একটা বিশাল চত্বর। তার ছাতে, রেলিংয়ে, মাঝখানের উঁচু টেবিলের মতো জায়গাটায় অসাধারণ উড কার্ভিং আর পেন্টিং করা। আর টেবিলের উপর প্রমাণ সাইজের একটি মূর্তি বাবু হয়ে বসা। গালে সাদা দািড়, চোখ রাগে বিস্ফারিত, হাতে কমণ্ডলু। আমি তো দেখেই বলতে লাগলুম, আমাদের দুর্বাসা মুনির মূর্তি এখানে কেমন করে এলেন? এমনকী হাতে কমণ্ডলুটাও মজুত! কিন্তু খটকা একটাই, চারপাশের এমন মায়াকাড়া রূদ্ধবাক নিসর্গ দেখেও দুর্বাসার রাগ পড়েনি কেন? খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে বেরল নকল দুর্বাসার আসল পরিচয়। ইনি দুর্বাসা নন, চতুর্দশ শতকের একজন তিব্বতি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, নাম থাংটং গ্যালপো। পদ্মসম্ভব বুদ্ধের মানবরূপী এই ব্যক্তি কী না জানতেন— চিকিৎসাশাস্ত্র, স্থাপত্যবিদ্যা, যোগবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা,সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। দেখলুম সিকিমের পর্যটকদের কাছে ইনি বেশ জনপ্রিয়, অর্থাৎ অনেকেই ওঁর নাম জানেন। তবেউনি ‘ম্যাড ম্যান অফ দ্য এম্পটি ভ্যালি’ নামেই বেশি পরিচিত। এবং বেশ সার্থকনামা ব্যক্তি বলতেই হচ্ছে, কারণ সেই চোদ্দো-পনেরো শতকে ভদ্রলোক পায়ে হেঁটে তিব্বত আর ভুটান চষে বেড়িয়েছেন এবং দু’দেশ মিলিয়ে আটান্নটা লোহার শেকলের দেওয়া সেতু নির্মাণ করেছেন, যেগুলো নাকি এখনও ব্যবহার হয়ে চলেছে। আশ্চর্য সব আক্ৃতির স্তূপ বানিয়েছিলেন তিব্বতের অনেক জায়গায়, যেগুলো এখনও পর্যটক-দ্রষ্টব্য। তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুখোশ পরা তিব্বতি অপেরা নাচ-গানের পালা ‘লামো’। যা বুঝলাম, থাংটং এতকিছু করলেও আদতে পরিব্রাজক ধরনের মানুষ ছিলেন। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে ‘নয়নপা’ নামে একধরনের পাগলা বাবার কথা পাওয়া যায়, গ্যাল্পো আদতে সেই পথেরই পথিক। তাঁকে সেই অপরূপ পাহাড়ঘেরা ব্যালকনিতে ছেড়ে নীচে নেমে এসে জুতো টুতো পরে আমরা উৎরাই ভেঙে নামতে লাগলুম নীচে। এবার যাব কাথোক হ্রদ। এদিকে আকাশ ডাকছে গরগর করে, ঠান্ডা ভিজে হাওয়া কেটে বসছে মুখেচোখে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি, আর মাঝে মাঝেই পাহাড়ের ওপর আবছা বিদ্যুৎরেখা।
খুব সাধারণ ছোট্ট এক গেট পেরিয়ে একটা চত্বরে ঢুকলুম। আমরা ছাড়া জনপ্রাণী নেই। পুতুলের সাইজের একটা লজেন্সের দোকানে পুতুলের মতো মুখওলা একজন মহিলা বসে রয়েছেন? ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লেক দেখনেকা? দশ রুপিয়া তিকেত লো।’ নিলুম। আর ক’পা এগিয়েই স্বর্গের মুখোমুখি হলুম। এপ্রিল মাসে জলস্তর কম, তবু কাথোক হ্রদ যেন শঙ্খ ঘোষের কবিতার মতো বুকভরা ঠান্ডা জল নিয়ে ভালোবাসবে বলে অপেক্ষায় শুয়ে। চারিদিকে সবুজ সবুজ সবুজ, চোখে যেন ব্যথা করে। গাছ দিয়ে ঘেরা হ্রদের জলও ছায়ায় ছায়ায় একেবারে সবুজ। বৃষ্টি না থাকলে অনায়াসে গিয়ে পা ভেজানো যায়, অনন্তকাল বসে থাকা যায় লেকের ধারের বড় বোল্ডারগুলোর উপর। নৈঃশব্দ্য এখানে ফিসফিস করে কথা বলে। শক্তি চাটুজ্যের লাইনগুলো একটু বদলে নিয়ে বলতে হয় গাভীর মতো দুপুরচরা মেঘেরা এখানে এসে ডাক দেয় কাথোকের জলকে আর পরাঙ্মুখ সবুজ নলীঘাসেরা দুয়ার খুলে দেয়। আশপাশে রঙিন পতাকার ঝালর আর গাছ এখানেও। সবুজের মধ্যে হাওয়ায় উড়তে থাকা রংয়ের ছিটে। ভিজে হাওয়ায় জল তিরতির করে কাঁপছে, অথচ তার কোনও শব্দ নেই। যেন সবুজ শরবতের উপর সর পড়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। সম্মোহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম খানিকক্ষণ। তারপর ফিরতি পথ। আজকের মতো বেড়ানো সাঙ্গ। হোটেলে ফিরে গিয়ে ফের পাওয়ারকাটের সঙ্গে লড়াই, কারণ হাওয়া আর বিদ্যুৎ শুরু হতেই লাইট বাবাজি ভোকাট্টা।
ক্রমশ