Hello Testing

 স্বা স্থ্য

সংহিতা বন্দ্যোপাধ্যায়

sanhita

যৌন নিগ্রহ: কিছু জরুরি তথ্য । পর্ব ২

যৌন নিগ্রহ মানবিক অধিকারের পরিপন্থী তো বটেই, এর প্রভাব মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী। অনেক ক্ষেত্রে এরা বিষয়টি খুলে বলতে কুন্ঠা বোধ করেন। তাই এখানে সাধারণভাবে সেই লক্ষণগুলি দেওয়া হল যা দেখলে বা শুনলে  এই ধরনের সন্দেহ করা যেতে পারে। মনে রাখবেন শিশুরা প্রায় সময় এই ঘটনার শিকার হয়ে বলতে পারেনা, তাই লক্ষণ জানা অত্যন্ত জরুরি।

শারীরিক অসুবিধা বা লক্ষণ

ভীষণ পেটে ব্যাথা।

মূত্র ত্যাগে জ্বালা।

যৌন ক্রিয়ায় অসুবিধা।

সঙ্গম কালীন যন্ত্রণা।

মাসিক অনিয়মিত হওয়া।

মূত্রনালির সংক্রমণ।

অযাচিত গর্ভধারণ।

গর্ভাবস্থায় থাকলে ভ্রূণ নষ্ট।

এইডস বা অন্যান্য যৌন রোগের শিকার হওয়া।

বন্ধাত্ব।

যৌনাঙ্গের ক্ষত বা বিকৃতি।

নিজে যৌনাঙ্গে ক্ষত সৃষ্টি করা মানসিক অবসাদ থেকে।

গোপনে গর্ভপাতের চেষ্টা।

 

মানসিক লক্ষণ

ক) সাময়িক লক্ষণ–

ভয়ভীতি ও বিকার বা শক। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা।

নিজের প্রতি গভীর বিতৃষ্ণা এবং দুর্বলতা।

নিজেকে মূল্যহীন মনে করা। নির্বিকার অবস্থা।

সবার থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা। প্রসঙ্গ অস্বীকার করা।

দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকতার অভাব। অবসাদগ্রস্ততা।

অকারণ কান্না বা রাগ।

 

খ) দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণ–

অবসাদ। উৎকন্ঠা।

নিজেকে অকারণ অরক্ষিত ভাবা। নিজের সংযম ও আত্মবিশ্বাস হারানো।

স্বপ্নে ভয় পাওয়া। অনিদ্রা, আত্মগ্লানি।

অবিশ্বাস, আত্মহত্যার প্রবণতা।

আরও বিভিন্ন সমস্যা।

যৌন নিগ্রহ : যা জানা জরুরি / ডাঃ সংহিতা ব্যানার্জী

 

যৌন নিগ্রহের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব ও প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য :

আগেই বলেছি, এই আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মী একদিকে তার চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দিতে দায়িত্ব প্রাপ্ত, অপরদিকে, প্রমাণ সংগ্রহ করে এবং যথাযোগ্য নথিপত্র তৈরি করে  এই ব্যক্তিকে তার medico legal proceeding, অর্থাৎ চিকিৎসা ও আইনি কার্যক্রমে সম্পূর্ণ সাহায্য করাও এদের কর্তব্যের অন্তর্গত। এই পরীক্ষা পদ্ধতি চলাকালীন Section 164 (A) of Criminal Procedure Code অনুসারে স্বাস্থ্যকর্মীর আইনি দায়িত্ব নিম্নরূপ –

প্রথমত একজন Registered Medical Practitioner সরকারি বা বেসরকারি  হাসপাতালে এই কাজ করবেন।

দ্বিতীয়ত, এই পরীক্ষা বিন্দুমাত্র দেরি না করে সম্পন্ন করে একটি বিস্তারিত নথি বা রিপোর্ট অবিলম্বে তিনি তৈরি করবেন।

তৃতীয়ত, পরীক্ষার আগে, ব্যক্তিকে বিষয়টি বলে তার লিখিত সম্মতি নিতে হবে।

এই পরীক্ষা ঠিক কখন শুরু ও শেষ করা হল তা নথিভুক্ত থাকতে হবে।

এই রিপোর্ট উক্ত RMP যথাসম্ভব শীঘ্র Investigating  Officer-কে পাঠাবেন।

চিকিৎসা দিতে ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে Section 166BIPC অনুসারে এক বছরের কারাদণ্ড থেকে জরিমানা, এমনকী দুটোই হতে পারে।

 

আক্রান্ত বা নিগৃহীত ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ বা  আদানপ্রদানের  সময়  নিম্নলিখিত বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে–

এমন কোনো কথা বলবেন না বা আচরণ করবেন না যাতে ব্যক্তির মনে হয় তাকে অবিশ্বাস করা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে কোনো মতামত দেওয়া বা সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য রাখা  উচিত নয়।

ব্যক্তির আত্মশক্তি ও সাহসের প্রশংসা করে তার আস্থাভাজন হন ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করুন।

তাকে বলুন এই ঘটনার জন্য সে দায়ী নয় বা তার কোনো দোষ নেই ।

তাকে বলুন এটি একটি অপরাধমূলক ঘটনা এবং কোন যৌন আনন্দদায়ক বা আকর্ষণ জনিত লঘু ঘটনা নয়।

তাকে বোঝান, এতে সম্মানহানি, বা তার চরিত্রহানির কোনো প্রসঙ্গ আসে না বরং তার মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং যে এই অপরাধ করেছে লজ্জ্বা তার।

প্রয়োজনে কাউন্সিলার বা মনোবিদের সহায়তা নিন।

বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে কী কী করণীয়– 

যারা সমাজে অন্য কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার, যেমন তাদের লিঙ্গ চেতনা যখন শারীরিক গঠনের সঙ্গে এক না হয়, যে বিষয়ে এই প্রবন্ধের শুরুতেই আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম, অথবা যাদের যৌন জীবন গতানুগতিক নয়, যারা যৌনকর্মী, বা শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী, অথবা ধর্ম বা জাতিগত ভাবে, সমাজে সংখ্যালঘু তালিকাভুক্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটলে, আইন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি না ঘটে, এবং তারা কোনো বৈষম্যের শিকার এক্ষেত্রে না হন তা খেয়াল রাখা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তব্য। ব্যক্তির যৌন জীবনের ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নয়। একজন যৌনকর্মী তিনি পুরুষ বা নারী বা অন্যান্য হলেও তার অধিকার এক্ষেত্রে অন্য যে

কোনো মানুষের থেকে আলাদা নয়। তার যৌন জীবন বা পেশা নিয়ে কোনো মন্তব্য বা ওই বিষয়ের অবতারণা করা আইনত দণ্ডনীয়।

শিশু নিগ্রহ – এক্ষেত্রে সমস্ত বিষয়টি পদ্ধতিগত ভাবে এক হলেও, শিশুর বয়স ১২ বছরের কম হলে তার অভিভাবক তার বদলে পরীক্ষার জন্য লিখিত সম্মতি দেবেন।

মনে রাখতে হবে, এরা প্রায়শই নিকট আত্মীয় বা পরিচিতের দ্বারা নিগৃহীত হয়, এবং অপরাধী স্বয়ং এদের চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসে, এদের পরীক্ষার জন্য।

শিশুরা কিন্তু খুব বিশদভাবে ঘটনার বিবরণ দিতে পারে, তাই এদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত এবং এদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রয়োজনে এদের আস্থাভাজন হতে  হবে। শিশুর বিবরণ বিশ্বাস করা উচিত। প্রচলিত ধারণা আছে এরা কল্পনাপ্রবণ তাই মিথ্যে কথা বলে, এ কথা সত্যি নয়।

নিগৃহীত শিশু অনেক সময় অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে অভিভাবকের কাছে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করে। এগুলি হল –

মূত্র বা মলত্যাগের সময় ব্যথা বা জ্বালা যন্ত্রণা।

পেট বা শরীরে ব্যাথা।

অনিদ্রা, হঠাৎ বন্ধু বা পরিচিতদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।

উৎকন্ঠা, ভয়, দুর্বলতা, অসহায়তা বোধ।

ওজন হ্রাস, খিদে কমে যাওয়া, অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা।

 

আজ এই পর্যন্তই।

পরবর্তী পর্যায়ে আমরা দেখব এই অপরাধের শাস্তি কী এবং যৌন নিগ্রহের থেকে বাঁচার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

[TheChamp-FB-Comments style="background-color:#fff;"]