বি শে ষ র চ না
হিন্দোল ভট্টাচার্য
তথ্যযুদ্ধের গোলোকধাঁধাঁয়
সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে যখন আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইজরায়েল— এই তিন শক্তির মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও সম্ভাব্য যুদ্ধের সংবাদ দেখি, তখন আমাদের চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে সামরিক শক্তির প্রদর্শন, মিসাইল, ড্রোন, কূটনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধজাহাজের চলাচল। কিন্তু এই দৃশ্যমান যুদ্ধের আড়ালে, আরও গভীর এবং অনেক বেশি বিস্তৃত একটি যুদ্ধ সমান তীব্রতায় চলতে থাকে— তথ্যের যুদ্ধ, বা বলা ভালো “ন্যারেটিভের যুদ্ধ”। আধুনিক যুগে, বিশেষত “পোস্ট-ট্রুথ” সময়পর্বে, এই তথ্যযুদ্ধ প্রায়শই বাস্তব যুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করে মানুষের চেতনায়, রাজনৈতিক অবস্থানে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথে। “পোস্ট-ট্রুথ” শব্দটি ২০১৬ সালে Oxford Dictionaries কর্তৃক বছরের সেরা শব্দ হিসেবে ঘোষিত হয়। এর দ্বারা বোঝানো হয় এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে মানুষের আবেগ, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত মতামত জনমত গঠনে বেশি প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে, যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মধ্যেও। ফলে, কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিকৃত, আর কোনটি সম্পূর্ণ মিথ্যা— এই পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রথা নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে Cold War— প্রতিটি বড় সংঘর্ষেই প্রচার (propaganda) ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রচারের চরিত্র বদলে গেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, ইন্টারনেট এবং বিশেষত সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার তথ্যপ্রবাহকে করেছে তীব্র, দ্রুত এবং প্রায় অনিয়ন্ত্রিত। Facebook, X (formerly Twitter), YouTube— এই সব প্ল্যাটফর্ম এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মতামত নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র। এই তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “ডিসইনফরমেশন” এবং “মিসইনফরমেশন”— অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষের সময় প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন ভিডিও বা ছবি, যা অন্য কোনও ঘটনার, অন্য কোনও সময়ের, কিন্তু তা বর্তমান সংঘর্ষের প্রমাণ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কখনও রাষ্ট্রীয় স্তরে, কখনও সংগঠিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে, আবার কখনও সাধারণ ব্যবহারকারীদের অজান্তেই এই ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, এবং সেই বিভ্রান্তি রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল “অ্যালগরিদমিক বায়াস”— অর্থাৎ সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টই বেশি দেখায়, যা ব্যবহারকারীর আগের পছন্দ বা বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে একটি “ইকো চেম্বার”-এর মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে, যেখানে ভিন্নমত বা বিপরীত তথ্য প্রায় পৌঁছয় না। এর ফলে সত্যের বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়, এবং একপাক্ষিক বয়ানই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।দেখা যাক, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে তথ্যযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে, কীভাবে রাষ্ট্র, কর্পোরেশন এবং সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, এবং কীভাবে এই “পোস্ট-ট্রুথ” বাস্তবতা আমাদের সত্যবোধ, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। আমরা ঐতিহাসিক উদাহরণ, সমসাময়িক কেস স্টাডি, এবং বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে এই জটিল বাস্তবতাকে বুঝতে চেষ্টা করব।
অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ
তথ্যযুদ্ধ— এই শব্দবন্ধটি আজ যতটা পরিচিত, তার শিকড় কিন্তু বহু পুরোনো। যুদ্ধ মানেই কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয়; বরং শুরু থেকেই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানুষের মন জয় করা। এই মন জয় করার প্রক্রিয়াই ক্রমে “প্রচার” (propaganda), “মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ” (psychological warfare), এবং আধুনিক পরিভাষায় “ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার”-এ পরিণত হয়েছে। ফলে, তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিকৃত করা বা নতুনভাবে নির্মাণ করা— এই সবই যুদ্ধের কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই রাষ্ট্রগুলি বুঝতে শুরু করে যে, যুদ্ধ জেতার জন্য শুধু শত্রুপক্ষকে পরাজিত করাই যথেষ্ট নয়; নিজেদের দেশের নাগরিকদের মনোবল ধরে রাখা এবং শত্রুর মনোবল ভেঙে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে প্রচারযুদ্ধ তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। পোস্টার, পত্রিকা, রেডিও সম্প্রচার— সবকিছুর মাধ্যমে এমন এক বাস্তবতা নির্মাণ করা হতো, যা জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে চালিত করত। পরবর্তীকালে Cold War-এর সময় এই তথ্যযুদ্ধ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন— এই দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ না থাকলেও, আদর্শগত লড়াই ছিল প্রবল। এই লড়াইয়ে সংবাদমাধ্যম, সিনেমা, সাহিত্য, এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও হয়ে ওঠে মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম। CIA এবং KGB— এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলি গোপনে বিভিন্ন দেশে তথ্যপ্রচার, ভুয়ো খবর ছড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কাজে যুক্ত ছিল। তবে এই ঐতিহ্যবাহী তথ্যযুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তথ্যযুদ্ধের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আগে তথ্যপ্রবাহ ছিল মূলত “টপ-ডাউন”— অর্থাৎ রাষ্ট্র বা বড় মিডিয়া সংস্থা থেকে সাধারণ মানুষের দিকে। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ “ডিসেন্ট্রালাইজড”— যেখানে যে কেউ তথ্য তৈরি করতে পারে, শেয়ার করতে পারে, এবং তা মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যম। Facebook, X (formerly Twitter), YouTube, WhatsApp— এই প্ল্যাটফর্মগুলি তথ্যপ্রবাহকে যেমন গণতান্ত্রিক করেছে, তেমনি তা নিয়ন্ত্রণহীনও করে তুলেছে। এখন আর তথ্য যাচাইয়ের জন্য সম্পাদক বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না; ফলে সত্য, অর্ধসত্য এবং মিথ্যা— সব একসঙ্গে মিশে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে “ডিসইনফরমেশন” (ইচ্ছাকৃত ভ্রান্ত তথ্য) এবং “মিসইনফরমেশন” (অনিচ্ছাকৃত ভুল তথ্য) একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষ সংক্রান্ত নানা ভিডিও বা ছবি, যা অনেক সময় পুরোনো বা ভিন্ন প্রসঙ্গের হলেও নতুন সংঘর্ষের প্রমাণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের তথ্য শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করে না, বরং তা মানুষের আবেগকে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “ন্যারেটিভ কন্ট্রোল”— অর্থাৎ কোন গল্পটি সামনে আসবে, কোনটি আড়ালে থাকবে, তা নির্ধারণ করা। ইজরায়েল, ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র— প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেদের অবস্থানকে বৈধ এবং নৈতিক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। এর জন্য তারা বিভিন্ন ভাষ্য নির্মাণ করে— কখনও “আত্মরক্ষা”, কখনও “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান”, কখনও বা “মানবাধিকারের রক্ষা” ইত্যাদি শব্দবন্ধ ব্যবহার করে। এই ভাষ্যগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এগুলো জনমত গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার।
এই তথ্যযুদ্ধের আরেকটি স্তর হল “সাইবার ওয়ারফেয়ার”— যেখানে হ্যাকিং, ডেটা চুরি, এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে আক্রমণ করার মাধ্যমে তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদিও এটি সরাসরি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু এর প্রভাব গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। সব মিলিয়ে, তথ্যযুদ্ধ আজ এমন এক জটিল বাস্তবতা, যেখানে সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই অধ্যায়ে আমরা দেখলাম, কীভাবে তথ্যযুদ্ধের ধারণা ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে আজকের ডিজিটাল যুগে এক নতুন রূপ নিয়েছে।
অ্যালগরিদম— দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম
ডিজিটাল যুগে তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র যদি কোথাও হয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে সামাজিক মাধ্যম। Facebook, X (formerly Twitter), YouTube, WhatsApp— এই প্ল্যাটফর্মগুলি আজ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তথ্যের উৎপাদন, বিতরণ এবং গ্রহণ— এই তিনটি স্তরকেই একত্রে ধারণ করে। ফলে, তথ্যযুদ্ধ এখন আর সীমাবদ্ধ নয় রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্রে; বরং তা প্রতিটি ব্যবহারকারীর হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী শক্তি— অ্যালগরিদম। অ্যালগরিদম মূলত একটি গাণিতিক নির্দেশনা, যা নির্ধারণ করে কোন ব্যবহারকারী কোন ধরনের কনটেন্ট বেশি দেখবে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি “ফিল্টারিং মেকানিজম”, যা আমাদের সামনে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতা নির্মাণ করে। আমরা ভাবি আমরা স্বাধীনভাবে তথ্য বেছে নিচ্ছি, অথচ বাস্তবে আমাদের সামনে যে তথ্যগুলি আসছে, তার বড় অংশই পূর্বনির্ধারিত।
এই প্রক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় “ইকো চেম্বার”— একটি ভার্চুয়াল পরিসর, যেখানে মানুষ শুধুমাত্র সেই মতামতই শুনতে পায়, যা তার নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। এর ফলে ভিন্নমত বা বিপরীত তথ্য ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষে একটি নির্দিষ্ট দেশের পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে অ্যালগরিদম তাকে সেই সম্পর্কিত আরও একই ধরনের কনটেন্ট দেখাতে থাকবে। ফলে তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে, কিন্তু একই সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে “পোস্ট-ট্রুথ” বাস্তবতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ এখানে সত্য আর মিথ্যার লড়াই নয়; বরং একাধিক “সত্য”-এর সহাবস্থান ঘটে। প্রত্যেকটি গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি আলাদা বাস্তবতা নির্মাণ করে। ফলে, একই ঘটনাকে বিভিন্ন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপলব্ধি করে। এই পরিস্থিতিতে আবেগ একটি বড় ভূমিকা নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যে তথ্য মানুষের আবেগকে স্পর্শ করে— যেমন ভয়, রাগ, সহানুভূতি— তা অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে, তথ্যযুদ্ধের কৌশল হিসেবে আবেগকে ব্যবহার করা একটি সাধারণ পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বিভীষিকাময় ছবি, একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও, বা একটি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য— এই সবই মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, এবং তাদের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
এখানে “ভাইরালিটি” একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। একটি তথ্য কত দ্রুত এবং কত দূর পর্যন্ত ছড়াবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনার উপর। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার জন্য তথ্যের সত্য হওয়া জরুরি নয়; বরং তা আকর্ষণীয়, চমকপ্রদ বা আবেগপ্রবণ হলেই যথেষ্ট। ফলে, মিথ্যা তথ্য অনেক সময় সত্য তথ্যের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “বট” এবং “ট্রোল ফার্ম”-এর ব্যবহার। বিভিন্ন রাষ্ট্র বা সংগঠন স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট (bot) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট বার্তা বারবার প্রচার করে, যাতে তা জনপ্রিয় বলে মনে হয়। একইভাবে, ট্রোল ফার্ম ব্যবহার করে বিরোধী মতামতকে আক্রমণ করা হয়, যাতে ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ সংকুচিত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া জনমতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করে।
Cambridge Analytica কেলেঙ্কারি এই প্রসঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। লক্ষ লক্ষ Facebook ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবহার করে তাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, এবং সেই অনুযায়ী তাদের সামনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছিল। এটি দেখায়, তথ্যযুদ্ধ এখন কেবল জনসমষ্টিকে লক্ষ্য করে নয়; বরং ব্যক্তিগত স্তরেও পরিচালিত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষের ক্ষেত্রেও আমরা একই প্রবণতা দেখতে পাই। ইজরায়েল, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র— প্রতিটি পক্ষই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। সরকারি বিবৃতি, ভিডিও ফুটেজ, স্যাটেলাইট ছবি, এমনকি সাধারণ নাগরিকদের পোস্ট— সবই এই তথ্যযুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠে। অ্যালগরিদম এবং সামাজিক মাধ্যম তথ্যযুদ্ধকে শুধু তীব্রই করেনি, বরং তাকে আরও সূক্ষ্ম এবং জটিল করে তুলেছে। এখানে যুদ্ধক্ষেত্র আর কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং তা বিস্তৃত হয়েছে প্রতিটি মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে। ফলে, এই যুদ্ধে আমরা প্রত্যেকেই একদিকে দর্শক, অন্যদিকে অংশগ্রহণকারী।
যত সত্য, তত সত্য
পোস্ট-ট্রুথ যুগে এসে “সত্য” শব্দটির অর্থ যেন ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় সাংবাদিকতা এবং তথ্যপ্রবাহের মূল ভিত্তি ছিল বস্তুনিষ্ঠতা— ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা। কিন্তু আজকের তথ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই বস্তুনিষ্ঠতা নিজেই প্রশ্নের মুখে। কারণ, যখন একই ঘটনার একাধিক পরস্পরবিরোধী বয়ান সমান শক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন “সত্য” আর একটি স্থির ধারণা হিসেবে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে বিতর্কের বিষয়।
ঐতিহ্যগতভাবে সংবাদমাধ্যমকে বলা হতো “চতুর্থ স্তম্ভ”— গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। BBC, The New York Times, Al Jazeera— এই ধরনের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে তাদের অবস্থানও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ, এখন তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আর তাদের হাতে নেই; বরং অসংখ্য বিকল্প উৎস, ব্লগ, ইউটিউব চ্যানেল, এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট সেই জায়গা ভাগ করে নিয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক সংকট তৈরি হয়েছে— বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। যখন মানুষ একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে ভিন্ন তথ্য পায়, তখন তারা কাকে বিশ্বাস করবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই নিজেদের বিশ্বাস বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যকেই “সত্য” হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে, সংবাদমাধ্যমের উপর আস্থা কমে যায়, এবং “ফেক নিউজ” শব্দটি একটি সাধারণ অভিযোগে পরিণত হয়। এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— সাংবাদিকতার নৈতিকতা কি এখনও সম্ভব? আদর্শগতভাবে সাংবাদিকতার কাজ হল সত্য অনুসন্ধান করা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এই কাজটি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ, সংবাদমাধ্যমগুলি এখন কেবল তথ্য পরিবেশন করে না; তারা একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারের অংশ, যেখানে দর্শকসংখ্যা (TRP), ক্লিক, এবং বিজ্ঞাপন আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, অনেক সময় সংবাদের গুণগত মানের চেয়ে তার আকর্ষণীয়তা বেশি গুরুত্ব পায়। এই প্রবণতাকে বলা হয় “সেন্সেশনালিজম”— অর্থাৎ সংবাদকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে তা বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর ফলে জটিল বাস্তবতা সরলীকৃত হয়ে যায়, এবং অনেক সময় অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যুদ্ধ বা সংঘর্ষের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি দেখা যায়, কারণ এখানে আবেগের ভূমিকা অত্যন্ত প্রবল।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। ইজরায়েল-এর পক্ষে থাকা একটি সংবাদমাধ্যম একটি আক্রমণকে “আত্মরক্ষার পদক্ষেপ” হিসেবে তুলে ধরতে পারে, যেখানে ইরান-এর পক্ষে থাকা অন্য একটি মাধ্যম সেটিকে “আগ্রাসন” হিসেবে বর্ণনা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-এর অবস্থানও এই বয়ানগুলিকে প্রভাবিত করে। ফলে, দর্শক বা পাঠক যে উৎসটি বেছে নেয়, তার উপর নির্ভর করে তার বাস্তবতা নির্মিত হয়। এই পরিস্থিতিতে “ফ্যাক্ট-চেকিং” একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিভিন্ন স্বাধীন সংস্থা এখন তথ্য যাচাই করার কাজ করছে, যাতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য চিহ্নিত করা যায়। তবে এখানেও একটি সমস্যা রয়েছে— যারা ইতিমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট বয়ানে বিশ্বাস করে, তারা অনেক সময় ফ্যাক্ট-চেককেও পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে। ফলে, সত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা সাংবাদিকরা সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকেন, কিন্তু তথ্যযুদ্ধের যুগে এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এখন শুধু শারীরিক আক্রমণ নয়, অনলাইন হুমকি, ট্রোলিং, এবং চরিত্রহননের মতো সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়। ফলে, স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং সত্য তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্ত প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— আমরা কি এখনও সত্যে পৌঁছাতে পারি? নাকি আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি, যেখানে সত্য চিরকাল বিতর্কিত থাকবে? সম্ভবত উত্তরটি সরল নয়। তবে এটুকু বলা যায়, সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দাবি রাখে।
ম্যাট্রিক্স
তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ঘটে মানুষের মনের ভেতরে— তার চিন্তাভাবনায়, তার বিশ্বাসে, এবং তার সামাজিক আচরণে। যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংস চোখে দেখা যায়, কিন্তু তথ্যযুদ্ধের ধ্বংস প্রায়শই অদৃশ্য— তবুও তা আরও গভীর, আরও স্থায়ী। পোস্ট-ট্রুথ যুগে এসে এই প্রভাব এতটাই তীব্র হয়েছে যে, তা শুধু রাজনীতি নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক এবং সামাজিক কাঠামোকেও নতুনভাবে গড়ে তুলছে। প্রথমত, তথ্যযুদ্ধ মানুষের মধ্যে “পোলারাইজেশন” বা বিভাজনকে তীব্র করে তোলে। যখন একজন ব্যক্তি বারবার শুধুমাত্র তার নিজের মতামতকে সমর্থন করে এমন তথ্যই দেখতে পায়— যা Facebook বা X (formerly Twitter)-এর অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত— তখন তার বিশ্বাস আরও কঠোর হয়ে ওঠে। সে অন্য মতামতকে শুধু অস্বীকারই করে না, বরং তা শত্রুতা হিসেবেও দেখতে শুরু করে। এর ফলে সমাজে মতবিরোধ আর স্বাভাবিক মতবিনিময়ের জায়গায় থাকে না; বরং তা রূপ নেয় সংঘাতে। এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, বন্ধুত্ব, এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেও। একসময় যে বিষয়গুলি নিয়ে মানুষ নির্ভারভাবে আলোচনা করতে পারত, এখন তা নিয়ে কথা বলাই কঠিন হয়ে যায়। একটি ভিন্ন মতামত প্রকাশ করা মানেই অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি। ফলে, সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, তথ্যযুদ্ধ মানুষের মধ্যে “অবিশ্বাস” বা distrust-এর পরিবেশ তৈরি করে। যখন মানুষ বারবার ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা পরস্পরবিরোধী বয়ানের মুখোমুখি হয়, তখন তারা ধীরে ধীরে কোনও তথ্যকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। এই অবিশ্বাস শুধু সংবাদমাধ্যমের প্রতি নয়; তা ছড়িয়ে পড়ে সরকার, প্রতিষ্ঠান, এমনকি একে অপরের প্রতিও। এর ফলে সমাজে একটি স্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যেখানে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, তথ্যযুদ্ধ মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে— বিশেষ করে ভয়, রাগ এবং ঘৃণার মতো নেতিবাচক আবেগকে। একটি ভয়াবহ ছবি, একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও, বা একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম মুহূর্তের মধ্যে মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এই আবেগগুলি আবার আরও বেশি তথ্য শেয়ার করতে মানুষকে উৎসাহিত করে, ফলে একটি চক্র তৈরি হয়— যেখানে আবেগ তথ্যকে ছড়ায়, আর তথ্য আবার আবেগকে বাড়িয়ে তোলে। এই প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় “confirmation bias” বলা হয়— অর্থাৎ মানুষ এমন তথ্যই গ্রহণ করতে চায়, যা তার পূর্বধারণাকে সমর্থন করে। তথ্যযুদ্ধ এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে, মানুষ নতুন তথ্যকে খোলা মনে গ্রহণ করার বদলে, তা নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। এতে করে জ্ঞানের পরিসর সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। চতুর্থত, তথ্যযুদ্ধ গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর গভীর প্রভাব ফেলে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হল সচেতন নাগরিক এবং মুক্ত তথ্যপ্রবাহ। কিন্তু যখন তথ্যই বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, তখন নাগরিকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। নির্বাচনের সময় ভুয়ো খবর বা বিভ্রান্তিকর প্রচার ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। Cambridge Analytica-এর ঘটনাটি দেখিয়েছে, কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে মানুষের রাজনৈতিক মতামতকে প্রভাবিত করা সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষের ক্ষেত্রেও আমরা এই সামাজিক ও মানসিক প্রভাব দেখতে পাই। ইজরায়েল, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র— এই দেশগুলিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বয়ান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে। কেউ এক পক্ষকে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত মনে করছে, কেউ অন্য পক্ষকে— এবং এই মতবিরোধ অনেক সময় তীব্র আবেগে রূপ নিচ্ছে। তথ্যযুদ্ধ মানুষের মধ্যে এক ধরনের “ক্লান্তি” বা fatigue তৈরি করে। এত বেশি তথ্য, এত বেশি বিরোধী বয়ান, এত বেশি উত্তেজনা— সব মিলিয়ে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে তথ্য থেকে দূরে সরে যেতে চায়। তারা আর কোনও খবর অনুসরণ করতে চায় না, কারণ তা মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। এই প্রবণতা আবার একটি নতুন সমস্যা তৈরি করে— যেখানে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার: তথ্যযুদ্ধ কোনও একক শক্তি চালায় না। এটি একটি মাল্টি-লেয়ার্ড ইকোসিস্টেম, যেখানে একাধিক শক্তি— রাষ্ট্র, কর্পোরেশন, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, রাজনৈতিক গোষ্ঠী, এমনকি সাধারণ মানুষ— সবাই কোনও না কোনওভাবে অংশ নেয়।
প্রথম স্তরটি হল রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইজরায়েল, রাশিয়া, চীন— প্রতিটি রাষ্ট্রই তথ্যকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা নিজেদের অবস্থানকে বৈধ ও নৈতিক হিসেবে তুলে ধরতে চায়, শত্রুপক্ষকে দুর্বল বা অবিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সরকারি মিডিয়া, কূটনৈতিক বিবৃতি, সাইবার অপারেশন— সবই এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় স্তরে আছে কর্পোরেশন, বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি— Meta, Google, X Corp। এরা সরাসরি “তথ্যযুদ্ধ চালায়” এমন নয়, কিন্তু এদের প্ল্যাটফর্মই যুদ্ধক্ষেত্র। এদের অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে কোন তথ্য বেশি ছড়াবে, কোনটি চাপা পড়ে যাবে। তাদের মূল লক্ষ্য লাভ (profit), কিন্তু সেই লাভের মডেল— attention economy— তথ্যযুদ্ধকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ উত্তেজক, বিভাজনমূলক কনটেন্ট বেশি engagement আনে।তৃতীয় স্তরটি আরও সূক্ষ্ম— ডেটা অ্যানালিটিক্স ও রাজনৈতিক কনসালটিং সংস্থা, যেমন Cambridge Analytica। তারা মানুষের আচরণ, মনস্তত্ত্ব ও ডেটা বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যভিত্তিক বার্তা তৈরি করে। অর্থাৎ, তথ্যযুদ্ধ এখন “মাস প্রোপাগান্ডা” থেকে “মাইক্রো-টার্গেটিং”-এ পৌঁছে গেছে— একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ আলাদা আলাদা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। চতুর্থ স্তর— নন-স্টেট অ্যাক্টর। রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, এমনকি সংগঠিত ট্রোল নেটওয়ার্ক। এরা প্রায়ই বট, ফেক অ্যাকাউন্ট, এবং সমন্বিত ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করে। কখনও রাষ্ট্র এদের সমর্থন করে, কখনও এরা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। আর পঞ্চম স্তর— সবচেয়ে অস্বস্তিকর— আমরা নিজেরা। সাধারণ ব্যবহারকারী। আমরা যখন যাচাই না করে কোনও পোস্ট শেয়ার করি, আবেগে প্রতিক্রিয়া দিই, বা নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যই শুধু গ্রহণ করি— তখন আমরাও এই তথ্যযুদ্ধের অংশ হয়ে যাই। অ্যালগরিদম আমাদের আচরণ থেকেই শেখে, এবং সেই অনুযায়ী আরও কনটেন্ট তৈরি করে। তাহলে কি বহুজাতিক সংস্থাগুলি ক্ষমতাশালী? নিঃসন্দেহে। কিন্তু তারা এককভাবে “বিশ্ব চালাচ্ছে”— এমনটা বলা অতিরঞ্জন হবে। বরং বলা ভালো, তারা একটি শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি করেছে, যার ভেতরে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজ নিজেদের লড়াই চালায়।
এই পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য একটি উপমা দেওয়া যায়: ধরা যাক, একটি বিশাল মঞ্চ।
মঞ্চটি বানিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলি। নাটক লিখছে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলি। অভিনয় করছে নানা গোষ্ঠী। আর দর্শক?— আমরা। কিন্তু কখনও কখনও দর্শকরাও মঞ্চে উঠে পড়ে।
চমস্কি, ফুকো এবং তথ্যযুদ্ধ
আধুনিক তথ্যযুদ্ধকে বোঝার জন্য শুধু প্রযুক্তি বা রাজনীতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গভীর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই জায়গায় Noam Chomsky এবং Michel Foucault— এই দুই চিন্তাবিদের ভাবনা আমাদের একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণী কাঠামো দেয়। তাঁরা ভিন্ন পথ দিয়ে চললেও, দু’জনেই দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষমতা (power) এবং জ্ঞান (knowledge) একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, এবং কীভাবে সেই সম্পর্কের মধ্য দিয়েই “সত্য” নির্মিত হয়। চমস্কির কাজের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল তাঁর এবং Edward S. Herman-এর যৌথ গ্রন্থ Manufacturing Consent। এখানে তাঁরা দেখিয়েছেন, গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না; বরং তা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকে “সম্মতি উৎপাদন” (manufacture consent) করে। অর্থাৎ, মিডিয়া এমনভাবে খবর নির্বাচন ও উপস্থাপন করে, যাতে জনমত ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পক্ষে গড়ে ওঠে।
চমস্কির “প্রোপাগান্ডা মডেল” অনুযায়ী, মিডিয়া পাঁচটি প্রধান ফিল্টারের মাধ্যমে কাজ করে— মালিকানা (ownership), বিজ্ঞাপন (advertising), সংবাদ উৎস (sourcing), ফ্ল্যাক (flak), এবং মতাদর্শ (ideology)। এই ফিল্টারগুলি নির্ধারণ করে কোন খবর সামনে আসবে, কোনটি আড়ালে থাকবে, এবং কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা হবে। আধুনিক তথ্যযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই মডেল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ আজও আমরা দেখি, বড় মিডিয়া কর্পোরেশনগুলি প্রায়শই রাষ্ট্রীয় বা কর্পোরেট স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বয়ান তৈরি করে। অন্যদিকে, ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গি আরও সূক্ষ্ম এবং গভীর। তিনি সরাসরি “মিডিয়া” নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি, কিন্তু তাঁর “power/knowledge” ধারণা তথ্যযুদ্ধকে বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। ফুকোর মতে, ক্ষমতা কেবল দমন করে না; বরং তা জ্ঞান উৎপাদন করে। এবং সেই জ্ঞানই আবার ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়। অর্থাৎ, “সত্য” কোনও নিরপেক্ষ, চিরস্থায়ী সত্তা নয়; বরং তা নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত।
ফুকো “regime of truth” কথাটি ব্যবহার করেছিলেন— যার দ্বারা বোঝানো হয়, একটি সমাজে কোনটি সত্য বলে গণ্য হবে, তা নির্ধারণ করে ক্ষমতার কাঠামো। এই ধারণাটি আজকের পোস্ট-ট্রুথ যুগে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা দেখি, একই ঘটনাকে ঘিরে একাধিক “সত্য” তৈরি হচ্ছে— প্রতিটি নিজস্ব ক্ষমতাকাঠামোর দ্বারা সমর্থিত।
উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘর্ষকে ধরা যেতে পারে। ইজরায়েল, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র— প্রতিটি পক্ষই নিজেদের “সত্য” নির্মাণ করছে। কেউ বলছে এটি আত্মরক্ষা, কেউ বলছে এটি আগ্রাসন। এই ভিন্ন ভিন্ন বয়ান শুধু তথ্যের পার্থক্য নয়; বরং তা ক্ষমতার পার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, এবং রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন। চমস্কি এবং ফুকোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। চমস্কি তুলনামূলকভাবে একটি কাঠামোগত (structural) বিশ্লেষণ দেন— তিনি দেখান কীভাবে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক শক্তি মিডিয়াকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, ফুকো দেখান ক্ষমতা কীভাবে ছড়িয়ে থাকে— তা কোনও একক কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয় না; বরং তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন সম্পর্কের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়: তথ্যযুদ্ধ কোনও একক ষড়যন্ত্র নয়, আবার তা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলও নয়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কাঠামো এবং ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতা— দু’টিই কাজ করে। আজকের ডিজিটাল যুগে Meta বা Google-এর মতো সংস্থাগুলি একদিকে চমস্কির “মালিকানা” ও “বিজ্ঞাপন” ফিল্টারের উদাহরণ, অন্যদিকে ফুকোর ভাষায় তারা নতুন “জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্র”— যেখানে অ্যালগরিদম ঠিক করে কোন তথ্য দৃশ্যমান হবে। চমস্কি আমাদের শেখান— সন্দেহ করতে, প্রশ্ন করতে, এবং দেখতে যে মিডিয়া কীভাবে মতামত তৈরি করে। ফুকো আমাদের শেখান— বোঝতে যে সত্য নিজেই একটি নির্মাণ, এবং সেই নির্মাণের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে ব্যবহার করলে আমরা আধুনিক তথ্যযুদ্ধকে শুধু একটি রাজনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি গভীর দার্শনিক এবং সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে পারি।
তথ্যযুদ্ধের এই জটিল, বহুমাত্রিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে— ব্যক্তি হিসেবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমরা কি কেবল এই যুদ্ধের নিষ্ক্রিয় দর্শক, নাকি সক্রিয় অংশগ্রহণকারী? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কি কোনওভাবে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি? প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, আধুনিক তথ্যযুদ্ধ এমনভাবে নির্মিত যে, তা আমাদের অজান্তেই আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। আমরা যখন Facebook বা WhatsApp-এ কোনও পোস্ট শেয়ার করি, লাইক দিই, বা মন্তব্য করি— তখন আমরা শুধু প্রতিক্রিয়া জানাই না; আমরা অ্যালগরিদমকে তথ্য দিই। সেই তথ্য আবার আমাদের সামনে নতুন কনটেন্ট এনে দেয়, যা আমাদের আচরণকে আরও প্রভাবিত করে। এই চক্রটি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না আমরা কীভাবে একটি বৃহত্তর তথ্যযুদ্ধের অংশ হয়ে উঠছি। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম প্রতিরোধের জায়গা হল সচেতনতা। তথ্যকে সরলভাবে গ্রহণ না করে, তার উৎস, প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা— এটাই প্রথম ধাপ। একটি খবর বা ভিডিও দেখেই তা শেয়ার করার আগে একটু থামা, ভাবা— এটি কোথা থেকে এসেছে? এর পেছনে কোনও নির্দিষ্ট স্বার্থ আছে কি? এটি কি যাচাইযোগ্য? এই ছোট ছোট প্রশ্নই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন মিডিয়া লিটারেসি— অর্থাৎ তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা। সব তথ্য সমান নয়; কিছু তথ্য নির্ভরযোগ্য, কিছু বিভ্রান্তিকর, কিছু সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই পার্থক্য বোঝার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অভ্যাস এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা। অনেক দেশেই এখন স্কুল স্তর থেকেই মিডিয়া লিটারেসি শেখানো হচ্ছে, কারণ এটি গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, আমাদের নিজেদের confirmation bias সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা স্বাভাবিকভাবেই এমন তথ্য খুঁজি, যা আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে। কিন্তু যদি আমরা সচেতনভাবে ভিন্ন মতামত পড়ি, শুনি, এবং বোঝার চেষ্টা করি, তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও সমৃদ্ধ হবে। এটি সহজ নয়— কারণ ভিন্ন মতামত অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়— কিন্তু এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চতুর্থত, প্রয়োজন ডিজিটাল সংযম। সব খবর, সব তথ্য, সব বিতর্কের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। কখনও কখনও তথ্য থেকে সাময়িক দূরত্ব নেওয়া— ডিজিটাল ডিটক্স— আমাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে করে আমরা আরও পরিষ্কারভাবে ভাবতে পারি, এবং আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার বদলে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে পারি। পঞ্চমত, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের একটি নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। আমরা কী শেয়ার করছি, কী বলছি, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি— এই সবই একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব ফেলে। একটি মিথ্যা তথ্য শেয়ার করা শুধু একটি ভুল নয়; তা অন্যদের বিভ্রান্ত করতে পারে, এমনকি ক্ষতিও করতে পারে। তাই তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা একটি নৈতিক প্রশ্নও। এই প্রসঙ্গে আবার Noam Chomsky-এর কথাই মনে পড়ে— তিনি বারবার বলেছেন, “intellectual self-defense” অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ, আমাদের নিজেদের চিন্তাকে রক্ষা করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে Michel Foucault আমাদের মনে করিয়ে দেন, ক্ষমতা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে— তাই প্রতিরোধও সম্ভব সর্বত্র, প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে, প্রতিটি কথোপকথনের মধ্যে।
বিকৃত বাস্তবতা এবং বাস্তবতা
আমরা কি এখনও বাস্তবের মধ্যে বাস করছি, নাকি আমরা এমন এক বিকৃত বাস্তবতার ভেতরে আটকে গেছি, যেখানে অসংখ্য ন্যারেটিভ আমাদের ঘিরে রেখেছে? এই প্রশ্নটি কেবল দার্শনিক নয়; এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি অস্তিত্বগত প্রশ্নগুলির একটি। কারণ আজ আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেখানে তথ্য আর কেবল তথ্য নয়— তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, অস্ত্র, এবং নির্মাণের উপাদান।
একসময় বাস্তবকে ভাবা হতো একটি নিরপেক্ষ, স্থির সত্তা হিসেবে— যা আমাদের উপলব্ধির বাইরে স্বাধীনভাবে বিদ্যমান। কিন্তু আধুনিক যুগ, বিশেষত ডিজিটাল যুগ, এই ধারণাকে গভীরভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আজ আমরা যে “বাস্তব” দেখি, তা অনেকাংশেই মিডিয়া, প্রযুক্তি এবং ন্যারেটিভ দ্বারা নির্মিত। ফলে প্রশ্ন ওঠে— আমরা কি বাস্তবকে দেখছি, নাকি বাস্তবের একটি সংস্করণ? এই প্রসঙ্গে Jean Baudrillard-এর “hyperreality” ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোদ্রিয়ার বলেন, আধুনিক সমাজে আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে চিহ্ন (sign) এবং প্রতীক (symbol) বাস্তবকে প্রতিস্থাপন করেছে। অর্থাৎ, আমরা যে জিনিসটিকে বাস্তব ভাবছি, তা আসলে একটি নির্মিত চিত্র— যার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সংবাদ, বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যম— সব মিলিয়ে আমরা একটি “simulation”-এর মধ্যে বাস করছি। এই ধারণাটি আজকের তথ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যখন একটি যুদ্ধের ছবি, ভিডিও, বা খবর আমাদের সামনে আসে, তখন আমরা ভাবি আমরা বাস্তবকে দেখছি। কিন্তু সেই ছবি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা, কোন অংশটি দেখানো হচ্ছে, কোন অংশটি বাদ দেওয়া হচ্ছে— এই সবকিছুই আমাদের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। ফলে আমরা যে বাস্তব দেখি, তা একটি “curated reality”— একটি বাছাই করা বাস্তব। এখানেই আসে ন্যারেটিভের প্রশ্ন। প্রতিটি ঘটনা একাধিকভাবে বলা যায়, এবং প্রতিটি বয়ানই একটি আলাদা বাস্তব তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইজরায়েল— এই দেশগুলির মধ্যে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের মতো করে গল্প বলছে। কেউ নিজেকে রক্ষাকারী হিসেবে দেখায়, কেউ নিজেকে নিপীড়িত হিসেবে। এই সব বয়ান মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তব তৈরি হয়, যেখানে একক সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সামাজিক মাধ্যম। Facebook, X (formerly Twitter), YouTube— এই প্ল্যাটফর্মগুলি তথ্যকে গণতান্ত্রিক করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তা নিয়ন্ত্রণহীনও করে তুলেছে। এখন যে কেউ তথ্য তৈরি করতে পারে, এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে, সত্য, অর্ধসত্য এবং মিথ্যা— সব একসঙ্গে মিশে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে “ডিস্টর্টেড রিয়ালিটি” বা বিকৃত বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হয়ে ওঠে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়; বরং আংশিক সত্য, যা নির্দিষ্টভাবে সাজানো। উদাহরণস্বরূপ, একটি ঘটনার একটি অংশ দেখানো হচ্ছে, কিন্তু অন্য অংশটি গোপন রাখা হচ্ছে। ফলে দর্শক একটি অসম্পূর্ণ চিত্র পায়, যা তার উপলব্ধিকে বিকৃত করে।এই বিকৃত বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ভূমিকা পালন করে আবেগ। মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে, যে তথ্য আমাদের ভয়, রাগ বা সহানুভূতি জাগায়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই আবেগপ্রবণ তথ্যই অনেক সময় বাস্তবের জায়গা দখল করে নেয়। তাহলে কি বাস্তব সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে গেছে? সম্ভবত না। বাস্তব এখনও আছে, কিন্তু তা আড়ালে। সমস্যা হল, সেই বাস্তবে পৌঁছানো কঠিন হয়ে গেছে। কারণ আমাদের চারপাশে এত বেশি তথ্য, এত বেশি বয়ান, এত বেশি শব্দ— যে তার মধ্যে থেকে সত্যকে আলাদা করা কঠিন। এই প্রসঙ্গে Noam Chomsky-এর “manufacturing consent” ধারণাটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মিডিয়া এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করে, যাতে একটি নির্দিষ্ট মতামত গড়ে ওঠে। অন্যদিকে Michel Foucault আমাদের মনে করিয়ে দেন, সত্য নিজেই ক্ষমতার দ্বারা নির্মিত। তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের একটি বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে— যেখানে আমরা ভাবতে শুরু করি, “কিছুই সত্য নয়”। এই অবস্থানটি যতটা দার্শনিকভাবে আকর্ষণীয়, ততটাই সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ যদি কিছুই সত্য না হয়, তবে সবকিছুই সমান— এবং তখন মিথ্যাও সত্যের সমান গুরুত্ব পায়। তাই প্রয়োজন একটি মধ্যপন্থা— যেখানে আমরা স্বীকার করি যে বাস্তব জটিল, বহুমাত্রিক, এবং কখনও কখনও বিকৃত; কিন্তু একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করি যে সত্যের অনুসন্ধান সম্ভব। এই অনুসন্ধান সহজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তা, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, এবং তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা। বাস্তবকে বোঝার জন্য আমাদের একাধিক উৎস থেকে তথ্য নিতে হবে, ভিন্ন ভিন্ন মতামত শুনতে হবে, এবং নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, প্রতিটি তথ্যের একটি প্রেক্ষাপট আছে, একটি উদ্দেশ্য আছে। এই বোঝাপড়াই আমাদের বিকৃত বাস্তবতার মধ্যে থেকেও সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যেখানে বাস্তব এবং বিকৃত বাস্তব একসঙ্গে সহাবস্থান করছে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। বরং এই পার্থক্য করার ক্ষমতাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— এবং সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
বিকৃত বাস্তবতা (distorted reality) শুধু তথ্যযুদ্ধের একটি উপাদান নয়— এটি তার কেন্দ্রীয় কৌশল। আগে আমরা দেখেছি, কীভাবে নির্বাচন, ফ্রেমিং এবং পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি হয়। এখন এই প্রক্রিয়াটিকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিকৃত বাস্তবতা আসলে তিনটি স্তরে মানুষের চেতনায় কাজ করে— উপলব্ধি (perception), ব্যাখ্যা (interpretation), এবং স্মৃতি (memory)।
প্রথম স্তর: উপলব্ধি নিয়ন্ত্রণ
আমরা যা দেখি, তা-ই আমরা সত্য বলে মনে করি। কিন্তু আমরা কী দেখব, সেটিই যদি নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে আমাদের সত্যবোধও নিয়ন্ত্রিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি সংঘর্ষের সময় যদি কেবল ধ্বংসস্তূপ, আহত শিশু বা কান্নার দৃশ্য বারবার দেখানো হয়, তবে দর্শকের মনে একটি নির্দিষ্ট আবেগ তৈরি হবে। কিন্তু সেই সংঘর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ঐতিহাসিক কারণ বা আগের ঘটনাগুলি যদি না দেখানো হয়, তবে সেই আবেগ একপাক্ষিক হয়ে উঠবে। এইভাবেই “দেখা” নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় স্তর: ব্যাখ্যার কাঠামো
একই ছবি বা ভিডিও ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পেতে পারে। এখানেই ফ্রেমিং কাজ করে। একটি আক্রমণকে “প্রতিরক্ষা” বলা হলে তার নৈতিক মানে বদলে যায়; আবার একই ঘটনাকে “আগ্রাসন” বলা হলে তা সম্পূর্ণ অন্য অর্থ নেয়।এই প্রসঙ্গে Michel Foucault-এর “discourse” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ— যেখানে ভাষা নিজেই ক্ষমতার একটি হাতিয়ার। শব্দের নির্বাচনই বাস্তবের অর্থ নির্ধারণ করে।
তৃতীয় স্তর: স্মৃতি নির্মাণ
তথ্যযুদ্ধ কেবল বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে না; তা ভবিষ্যতের স্মৃতিকেও প্রভাবিত করে। একটি ঘটনার যে সংস্করণটি বারবার প্রচারিত হয়, সেটিই ধীরে ধীরে “ঐতিহাসিক সত্য” হয়ে ওঠে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনও যুদ্ধের পর দশ বছর পরে মানুষ সেই যুদ্ধকে যেমনভাবে মনে রাখে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তখনকার মিডিয়া ও ন্যারেটিভের উপর। অর্থাৎ, বিকৃত বাস্তবতা শুধু তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে না; তা দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসকেও রূপ দেয়। এখন প্রশ্ন আসে— এই বিকৃত বাস্তবতা এত কার্যকর কেন?
প্রথম কারণ: এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়
সম্পূর্ণ মিথ্যা সহজে ধরা পড়ে, কিন্তু আংশিক সত্যকে ধরা কঠিন। বিকৃত বাস্তবতা সত্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সেই সত্যকে অসম্পূর্ণ করে তোলে। ফলে তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
দ্বিতীয় কারণ: এটি আবেগকে ব্যবহার করে
মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ভয়, রাগ, সহানুভূতি— এই আবেগগুলি তথ্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। একটি ভিডিও যদি আপনাকে কাঁদায় বা ক্ষুব্ধ করে, আপনি সেটি শেয়ার করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এইভাবেই বিকৃত বাস্তবতা ভাইরাল হয়।
তৃতীয় কারণ: অ্যালগরিদমিক বৃদ্ধি
YouTube বা X (formerly Twitter)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে যে কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া আনে, সেটিই বেশি ছড়ায়। ফলে, যে বয়ান যত বেশি উত্তেজক, তা তত বেশি দৃশ্যমান হয়। এই প্রক্রিয়া বিকৃত বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করে।
চতুর্থ কারণ: ন্যারেটিভের সরলতা
বাস্তব সাধারণত জটিল। কিন্তু বিকৃত বাস্তবতা সেই জটিলতাকে সরল করে দেয়— “ভাল বনাম খারাপ”, “আমরা বনাম তারা”— এই ধরনের দ্বৈত কাঠামো তৈরি করে। এই সরলতা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, কারণ তা বোঝা সহজ।
এখন আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসি— বিকৃত বাস্তবতা কি ইচ্ছাকৃত?
অনেক ক্ষেত্রে হ্যাঁ। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সংগঠিত নেটওয়ার্ক সচেতনভাবে এই কৌশল ব্যবহার করে। কিন্তু সবসময় নয়। অনেক সময় সাধারণ মানুষও অজান্তে এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়— যখন তারা যাচাই না করে তথ্য শেয়ার করে, বা নিজেদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যকেই গুরুত্ব দেয়। এই প্রসঙ্গে Noam Chomsky-এর ধারণা মনে রাখা যায়— মিডিয়া এমনভাবে কাজ করে, যাতে মানুষ নিজের অজান্তেই একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে গ্রহণ করে। অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রণ সবসময় সরাসরি নয়; তা অনেক সময় সূক্ষ্ম, অদৃশ্য। বিকৃত বাস্তবতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল— এটি আমাদের সত্যের ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়। যখন আমরা বারবার ভিন্ন ভিন্ন বয়ান দেখি, তখন আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। ধীরে ধীরে আমরা ভাবতে শুরু করি— “কিছুই নিশ্চিত নয়”। এই অবস্থাকে বলা যায় epistemic crisis— জ্ঞানসংক্রান্ত সংকট।
এবং এই সংকটই তথ্যযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ যখন মানুষ নিশ্চিত সত্যে বিশ্বাস হারায়, তখন তাকে প্রভাবিত করা সহজ হয়ে যায়। তবে এখানেই শেষ কথা নয়। এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেও একটি সম্ভাবনা রয়ে যায়— সচেতনতার সম্ভাবনা। যদি আমরা বুঝতে পারি কীভাবে বিকৃত বাস্তবতা কাজ করে, তবে আমরা তার প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত থাকতে পারি। অতএব, তথ্যযুদ্ধে বিকৃত বাস্তবতা শুধু একটি কৌশল নয়; এটি একটি মানসিক পরিসর, যেখানে বাস্তব ধীরে ধীরে বদলে যায়, এবং আমরা সেই বদলের ভেতরেই নিজেদের নতুন করে চিনতে বাধ্য হই।