ফি চা র স্টো রি
দেবদত্ত চট্টরাজ
‘গোবিন্দভোগ’ চালের বিশ্ব জয় ও কিছু অজানা তথ্য
‘ভারত আবার জগৎ-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ অতুলপ্রসাদ সেনের লেখা সেই অবিস্মরণীয় গানের পঙ্ক্তিকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে বাংলার পলি-ধোয়া মাটির চিরন্তন সুবাস এবার সগৌরবে প্রতিধ্বনিত হল বিশ্বমানচিত্রে। রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা FAO (Food and Agriculture Organization) পশ্চিমবঙ্গের তিন কালজয়ী সুগন্ধি চাল— ‘গোবিন্দভোগ’, ‘তুলাইপাঞ্জি’ ও ‘কনকচূড়’-কে ‘Food and Culture Heritage’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই আন্তর্জাতিক শিরোপার আধারে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উন্মোচিত হল বাংলার সমৃদ্ধশালী ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতির জয়গান। এই শিরোপা শুধু এই বাংলার কৃষিপণ্যের গুণমানই নয়, একই সঙ্গে এই বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন কৃষি-জ্ঞান, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রাকেও তুলে ধরেছে বিশ্বমঞ্চে। জাতিসংঘের ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’ (FAO)-এর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ চাল উৎপাদক এবং সবচেয়ে বড়ো চাল রপ্তানিকারক দেশ। ভারত প্রায় ১৫০ থেকে ১৫৪ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করে, যা বিশ্বব্যাপী মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া, আন্তর্জাতিক চাল বাণিজ্যে ভারতের একক অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ। বাজার অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতা ও আধুনিক উচ্চফলনশীল কৃষির এই ক্রান্তিলগ্নে, যেখানে উৎপাদনশীলতাই একমাত্র ধ্রুবক হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই অনন্য সম্মাননা যেন ঐতিহ্যের বাতায়ন থেকে বয়ে আসা এক চিলতে স্নিগ্ধ ও সতেজ মলয়-সমীরণ।
বিশ্বের নানা প্রান্তে দ্রুত বদলে যাচ্ছে খাদ্যের চরিত্র। একরকম বীজ, একরকম স্বাদ, একরকম চাষপদ্ধতি ধীরে ধীরে স্থানীয় বৈচিত্র্যকে মুছে দিচ্ছে। সেই সন্ধিক্ষণে বাংলার উর্বর মাটি থেকে উৎসারিত এই চালের দানাগুলো যেন এক নিভৃত অথচ বলিষ্ঠ বার্তাকেই উচ্চকিত করল, ঐতিহ্য আদপে কখনো ম্লান হয়ে যায় না; বরং মহাকালের প্রবহমানতায় তার মহিমা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। আর এই গৌরবময় স্বীকৃতির আঙিনায় যে নামটি বারবার আমাদের বিস্ময় ও কৌতূহলকে সজাগ করে তোলে তা হল সেই রাজকীয় সুগন্ধের আধার— গোবিন্দভোগ। আজ আমরা আমাদের আলোচনা সীমিত রাখব গোবিন্দভোগ চালেই।
গোবিন্দভোগ— এ এমন এক চাল, যার নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির চিরচেনা রান্নাঘরের এক নিভৃত ও মায়াবী বাতায়ন উন্মোচিত হয়। সেখান থেকে ভেসে আসে এক স্নিগ্ধ, মৃদু অথচ রাজকীয় সুবাস। আকারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হলেও এর মহিমা অনন্য। দেবতাকে নিবেদিত পুজোর ভোগ, সুগন্ধি নিরামিষ খিচুড়ি, ঘন ক্ষীরের পায়েস কিংবা কোনো আনন্দ-উৎসবের রাজকীয় পোলাও— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই চালের উপস্থিতি যেন অলিখিত ও অপরিহার্য শ্রদ্ধার অর্ঘ্য।
আর তখনই প্রশ্ন জাগে, এই চালের নাম ‘গোবিন্দভোগ’ কেন? এটি কি কেবল এক অনন্য স্বাদের হাতছানি, নাকি এর নেপথ্যে নিহিত রয়েছে কোনো বিস্মৃতপ্রায় উপাখ্যান?
এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় কয়েক শতাব্দী আগের বঙ্গভূমির এক বিস্মৃতপ্রায় জনপদের ইতিহাসের পাতায়। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, হুগলি জেলার গোবিন্দপুর ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আগত চার বসাক ও এক শেঠ পরিবার নিবিড় অরণ্য পরিষ্কারের সময় এক প্রাচীন ও অলৌকিক ‘গোবিন্দ জিউর মন্দির’ চাক্ষুষ করেন। সেই পুণ্যভূমিই হয়ে ওঠে তাঁদের ভক্তি ও অস্তিত্বের মূল কেন্দ্র। মন্দিরের পার্শ্ববর্তী উর্বর পলি-মৃত্তিকায় তাঁরা এক বিশেষ প্রজাতির ধান রোপণ করেন, যার মায়াবী ও অতুলনীয় সুবাস মুহূর্তেই প্রকৃতিকে সুরভিত করে তোলে। মন্দিরের আরাধ্য দেবতা শ্রীগোবিন্দ জিউর পবিত্র অর্ঘ্য হিসেবে এই সুগন্ধি ধানের চালই ব্যবহার করা শুরু হয়। দেবতার চরণে নিবেদিত সেই ‘ভোগ’-এর মহিমায় সিক্ত হয়েই এই চালটি পরবর্তীকালে লাভ করল তার কালজয়ী রাজকীয় নাম—‘গোবিন্দভোগ’। সময়ের প্রবহমানতায় মন্দিরের সেই শ্রদ্ধার নিবেদনই আজ বাঙালির রসনাতৃপ্তিতে এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য পরম্পরা হয়ে টিকে আছে।
তবে এই নামকরণ নিয়ে আছে আরও কিছু ইতিহাসও। উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণে, ১৮৯৮ সালে খাদ্যবিশারদ প্রণব রায়ের একটি লেখায় এই সুগন্ধি চালটির উল্লেখ আছে ‘খাস’ নামে। ‘খাস’— যার আক্ষরিক অর্থেই মিশে থাকে আভিজাত্য বা শ্রেষ্ঠত্ব। বর্ধমান জনপদের বহু প্রবীণ কৃষক আজও তাঁদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আগলে এই ধানকে ‘খাস ধান’ নামেই সম্বোধন করেন। কালক্রমে সেই ‘খাস ধান’-ই রূপান্তরিত হয়েছে ‘গোবিন্দভোগ’-এ।
গোবিন্দভোগ চালের এই জাদুকরী মহিমার গূঢ় রহস্য নিহিত রয়েছে এই বঙ্গভূমির শস্যশ্যামল কৃষি-সংস্কৃতির অন্তরে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের উর্বর পলি-ধোয়া মাটি, ঋতুচক্রের অমোঘ নিয়মে বয়ে আসা মৌসুমি বৃষ্টি এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা কৃষকদের সযত্ন লালন— এই তিনে মিলেই জন্ম দেয় এই চালের সেই অনন্য ও রাজকীয় সুবাস। কৃষিবিজ্ঞানীদের পরিভাষায় যা ‘টেরোয়ার’, বাঙালির মরমী ভাষায় তাই মাটি ও জলবায়ুর এক অভিন্ন ও মায়াবী রসায়ন; যা গোবিন্দভোগকে বিশ্বের অন্যান্য যাবতীয় সুগন্ধি চাল থেকে এক পৃথক মর্যাদা দান করেছে। তাই হয়তো এই মাটির সীমানা ছাড়িয়ে অন্য কোনো প্রান্তে এই ধানের বীজ রোপিত হলে সেই চিরচেনা ঐতিহ্যের ঘ্রাণ আর পাওয়া যায় না।
কালজয়ী এই ঐতিহ্যের ধারা আজও পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, নদিয়া, বাঁকুড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার উর্বর জনপদগুলিতে এক সীমিত অথচ শ্রদ্ধাময় পরিসরে প্রবহমান। আধুনিক উচ্চফলনশীল শস্যের তুলনায় এর উৎপাদন অপ্রতুল এবং রোপণ থেকে ফলন সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের সযত্ন ও নিবিড় লালন প্রয়োজন। তবু বংশপরম্পরায় বাংলার ভূমিপুত্ররা এই শ্রমসাধ্য কৃষিকর্মকে আঁকড়ে ধরে আছেন— কারণ তাঁদের কাছে গোবিন্দভোগ কেবল এক বৈষয়িক পণ্য নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এক অমূল্য রতন।
বাঙালির মরমী খাদ্যসংস্কৃতির আঙিনায় গোবিন্দভোগ চালের আসনটি পরম একান্তে ও বিশেষ মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত। শারদীয়া দুর্গোৎসবের পবিত্র ভোগ থেকে শুরু করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সশ্রদ্ধ নৈবেদ্য, বাগদেবীর আরাধনায় নিবেদিত ঘন ক্ষীরের পায়েস কিংবা গৌড়ীয় বৈষ্ণবীয় ঘরানার নিরামিষ ব্যঞ্জন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই চাল এক অমোঘ ও অলিখিত বিধানে উপস্থিত থাকে। রন্ধনশৈলীর নিপুণতায় এর প্রতিটি দানা লাবণ্যময় ও নমনীয় হয়ে উঠলেও আপন অবয়ব হারায় না; আর তার সঙ্গে মিশে থাকে এক স্নিগ্ধ মাধুর্য। ফলে আধ্যাত্মিক মহিমার পাশাপাশি রন্ধনশিল্পের ইতিহাসেও এই চাল লাভ করেছে এক অনন্য ও শাশ্বত কৌলীন্য।
বাজার অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতায়, চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল উৎপাদনের কারণে গোবিন্দভোগের মূল্য সর্বদা এক অতি উচ্চতায় আসীন। আর যে কারণে তা যেন সাধারণ উদরপূর্তির উপকরণ নয়, বরং পরমেশ্বরের আরাধনায় সংরক্ষিত এক নিভৃত ও পবিত্র শ্রদ্ধার্ঘ্য। মহাকালের প্রবহমানতায় বহু সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বিলীন হয়ে গেলেও, গোবিন্দভোগ চাল কিন্তু স্বমহিমায় আজও টিকে আছে বাঙালির চিরন্তন অভ্যাস, অটুট বিশ্বাস এবং মরমী রসনাস্মৃতির মণিকোঠায়। এক মুঠো শুভ্র গোবিন্দভোগ চালের ভাত তাই কেবল উদরপূর্তির মাধ্যম নয়, এ যেন সময়ের গর্ভে সঞ্চিত এক প্রবহমান আখ্যান। আর আজ কেবল বাংলার অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বের শাশ্বত খাদ্য-ঐতিহ্যের মানচিত্রে এই গোবিন্দভোগ চাল আপন শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
পরিশেষে এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক আন্তর্জাতিক শিরোপা প্রাপ্ত আরও দুই চাল ‘তুলাইপাঞ্জি’ ও ‘কনকচূড়’-এর দিকে। পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়া যাবে এই চালগুলি নিয়ে–
তুলাইপাঞ্জি
মূলত দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী ধান। এর অনন্য সুবাস ও স্বাদের জন্য এটিও আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত। এই চালও GI স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
কনকচূড়
বর্ধমান ও সংলগ্ন অঞ্চলে উৎপাদিত এই সুগন্ধি চাল বিশেষত মিষ্টান্ন ও উৎসবের রান্নায় ব্যবহৃত হয়। এর সূক্ষ্ম সুবাস বাংলার খাদ্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।