Hello Testing

উ প ন্যা স ।  পর্ব ৫

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

এখন যেখানে ঘোড়ার পিঠে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বসে থাকে সেই পাঁচ মাথার শ্যামবাজার কিংবা যেখানে আর জি কর হাসপাতাল বা টালায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল চৌকো জলাধার কিংবা যে রাস্তা সোজা কলেজস্ট্রিট চলে যায় অথবা বিধান সরণীর দিকে কিংবা হুগলি নদীর দিকে সেইসব জায়গাগুলি পাল বংশের শাসনকালে শেষ রাজা মদন পালের (১১৪৩-১১৬২ খ্রিস্টাব্দ) সময় এই অঞ্চলে তখন প্রচুর ঘন ঘন ঘরবাড়ি। ঘরবাড়ি দেখতে মাটির দেওয়াল মাথায় গাছ পালার ছাউনি। তারা এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাতায়াত করে ছাগলের পিঠে অথবা গাধার পিঠে করে। রাস্তাঘাট কাঁচা বর্ষায় প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জল কাঁদা। জীবিকা ছিল চাষ-বাস, জলাভূমিতে মাছ চাষ ইত্যাদি।

এই অঞ্চলে বেশ কিছু টোল পরিবার থাকে। আর থাকে লেটু পরিবার। এরা কিন্তু হিন্দু বাংলা ভাষায় একটু মেদিনীপুরের টানে তাদের কথাবার্তা। আমোদ প্রমোদ। সুখ দুঃখ। ক্ষয় ও ক্ষরণ। জীবন থাকলে ক্ষয় ও ক্ষরণের কথা খুব স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। কেননা মানুষের সুখ থাকলে দুঃখটা আসবেই। দিনের শেষে যেমন রাত। ঠিক এই সরল প্রক্রিয়াতেই। আজ যেখানে আর জি কর হাসপাতাল সেখানে সরু সরু কাঁচা রাস্তার ধারে এক ছিটেবেড়ার দোকানের পাশে এক দোতালা মাটির বাড়িতে এক ঐতিহাসিক থাকতেন। ঐতিহাসিকের নাম ধবল টোল। তিনি মারা যান ১২০১ খ্রিস্টাব্দে। তিনি একখানি পুস্তিকা লেখেন নাম টোল পরিবার। সেই বইটি থেকে জানা যায় টোল পরিবারের ইতিহাস। নানান জীবনের গল্প।

বইটির দ্বিতীয় পর্বে জানতে পারি বিধান সরণির দুই টোল পরিবারের দুঃখের গল্প। ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা। বিনা টোল ছিল বিধবা। স্বামী অনন্ত টোল দুরারোগ্য ব্যধিতে বহু বছর আগেই গত হয়। বিনা টোল মাত্র বাইশ বছরেই বিধবা হয়। বিনা টোল-এর শরীর তখন পূর্ণ যৌবনা। স্বাভাবিকভাবে বিধবা বিনা টোলের কাছে যে মাছি গুনগুন করবে এ আর নতুন কি। কালোর ভিতরে বিনা টোল বেশ সরস। চোখ জোড়া একটু বেশিই কালো। ভাসা ভাসা। তাকালেই মাছি উড়ে আসে। ফলে বিধবা হওয়ার পর অনেক পুরুষই বিনা টোলের সান্নিধ্য পেতে চায়। কিন্তু একমাত্র জগন্নাথ টোলকেই তার মনে ধরে। ফলে বিধবা হওয়ার পর জগন্নাথ টোল কিভাবে যেন বিনা টোলের কাছে বাঁধা পড়ে যায়।

জগন্নাথ টোল থাকে পাইকপাড়ায়। জগন্নাথের মাছের ব্যবসা। বিনা টোলের ডাগর জোড়া চোখ ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে জগন্নাথ টোল আটকে যায়। কিন্তু অল্প বয়সী বিধবাদের কপালে সবসময় এক ধরনের দুর্নাম জড়িয়ে থাকে। শ্যামবাজারের কাছে যে সব টোল পরিবার থাকে তাদের মহিলাদের ভিতর সব সময় চর্চায় থাকে বিনা টোল। বিনা টোল কোন ঘাটে জল আনতে যায় রাস্তার ধারে কার সঙ্গে পিরিতের কথা হয় কোন মরদ ছাউনি দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে বিনা টোলের সিক্ত গোলাকার স্তন যুগলের চিত্র দেখে ঠোঁট চাটে বা সিক্ত নিতম্বের নাচানাচি দেখে কোন মরদ চোখ পাকায় ইত্যাদি নানা ধরনের আলোচনা।

বৈশাখের এক বিকালে পাইকপাড়ায় যেখানে বিশাল বিশাল জামরুল গাছের বন সেইখানে কিছু পুরুষ মানুষ জগন্নাথ টোলকে তাড়া করে। জগন্নাথ টোলের অপরাধ সে কেন নিত্য বিধবা বিনা টোলের বাড়ি যায়! ঘন জামরুল জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে দৌড়িয়ে শেষে বিনাটোলের বাড়িতে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে স্বস্তি পায়। বিনা টোল চোখ কুঁচকে পুরো গল্পটা শুনে মনে খুব ব্যথা পায়। ভালোবাসাতেও মানুষের এত হিংসা! জগন্নাথ টোল একটু জিরিয়ে জল খেয়ে কোনোরকমে নিজেকে শান্ত করে।

অনেকেই বাগবাজারের আম বাগানের আড়ালে বিনা টোল জগন্নাথ টোলকে কাঁচা আম লবণ দিয়ে খেতে দেখে। খেতে খেতে দু-জনের ঘন হয়ে বসে থাকা গল্পগুজবের দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠে। আম বাগানের শেষেও কিছু টোল পরিবারের ঘরবাড়ি। তারাও অনেক সময় বিনা টোল জগন্নাথ টোলকে তাড়া করে। কেননা তারা একজন মরদের এইরকম প্রেম দৃশ্য পছন্দ করে না। করবেও না।

ঐতিহাসিকের ধবল টোলের টোল পরিবার বইয়ের চতুর্থ পর্বে পাওয়া যায় বিনা টোল এবং জগন্নাথ টোলের প্রেমের নিষ্ঠুর নিয়তি। মদন পালের শাসনের সময় প্রেম জিনিসটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। গ্রাম তখন শহর হয়নি। গ্রাম তখন খুবই গ্রাম্য। মানুষের চলাফেরা নজর সবই কেমন সন্দেহে ভরা। সেখানে বিনা টোল এবং জগন্নাথ টোলকে যে মানুষ ভালো চোখে দেখে না এটাই স্বাভাবিক। বিনা টোলের নিজস্ব ঘর থাকা সত্ত্বেও জগন্নাথ টোল বিনাকে নিয়ে বাগানে বাগানে ঘুরতে ভালবাসে। আদর করতে ভালোবাসে। বিনার জোড়া চোখে তাকালে জগন্নাথ কেমন বোকা হয়ে যায়। মাথা ঘাড় পিঠ কেমন অবশ লাগে। চোখজোড়া পাথরের মতো ঠান্ডা মনে হয়।

শোভাবাজারের লিচুবনে একবার জগন্নাথ আর বিনা প্রেম করতে গিয়ে মার খায়। সেদিন ছিল জ্যৈষ্ঠের বিকাল। লিচু বাগানের ছাউনির জন্য বিকালটি বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। জগন্নাথ বিনার হাত ধরে গোলাকার পুরো জোড়া ঠোঁটে কয়েকবার চকাশ চকাশ করে শব্দ করে চুমু খায়। বিনার ঠোঁট জোড়া আদরের চোটে নীলাভ হয়ে ওঠে। আনন্দে কালো জোড়া হাতে জগন্নাথকে জোরে ধরে সেও বেশ কয়েকটি চুমু খায়। লিচুবনের গাছেরা এই চুম্বন দৃশ্যে মুগ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে এই চুম্বন দৃশ্য হয়ে ওঠে অসহ্য। তারা কয়েকজন লিচু গাছের আড়ালে লুকিয়ে বিনা এবং জগন্নাথকে ধরে ফেলে। ধরার পর দু-জনকেই দুটো লিচু গাছের সঙ্গে লতাপাতা দিয়ে চার ঘণ্টা আটকে রাখে। মারধরও করে। শেষে অনেক কাকুতিমিনতি করলে গ্রামের ছোকররা দু-জনকে ছেড়ে দেয়। পাল যুগে খোলাখুলি প্রেম করা একপ্রকার নিষিদ্ধ। কিন্তু বিনা ও জগন্নাথ সেই যুগে ছিল বেশ খোলামেলা। জগন্নাথ বিনার ঘরে যখনই আসে তখনই আশেপাশের লোকেরা খুব চোরা চোখে দু-জনকে ফলো করে। কটূকথা বলে। এমনকি দু-জনের মরনের অভিশাপও দেয়। ফলে দু-জনের প্রেম নিবেদনের স্থান হয়ে ওঠে সীমিত। বিরক্তিকতর। এই সীমিত ও বিরক্তিকরের জন্য দু-জনের দেখা-সাক্ষাৎ কমে যায়। দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়ার জন্য দু-জনের মানসিক অশান্তিও ধীরে ধীরে শুরু হয়। এমনও হয় যে বিগত একমাসেও দু-জন দু-জনের মুখোমুখি হয় না। অথচ দু-জনের বুকে কত কষ্ট অশান্তি দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তার ভিতর দিয়ে জীবন যতই এগিয়ে যায় ততই দু-জনে ভিতরে ভিতরে শেষ হতে থাকে। এমনকি শেষ হতে হতে বিনা টোলের চেহারা হয়ে ওঠে শীর্ণ। রোগাটে। টসটসে চেহারাটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করে। জগন্নাথ কেমন পাগল পাগল হয়ে যায়।

                           

২৫০০ সালের শরতের এক সকাল। কমলা রোদ চারিদিকে গাছের ডালে, পুকুরের ছোটো ছোটো ঢেউ-এ, বাড়ির আনাচে কানাচে। পথে হেঁটে যাওয়া ফড়েদের গালে পিঠে। ব্যর্থ প্রেমিকের কপালে চুলে। অথবা গণিকাদের পশ্চাৎ দেশে। ঘাড়ে। হাওয়াতে কাশফুলের ভেসে আসা ঠান্ডা গন্ধ। অথবা গন্ধহীন এক নরম হাওয়া। নীল আকাশে মেঘের ঘর বাড়ি। বিচিত্র আকৃতির। এই মেঘ দেখলে মানুষের মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। তবে পাশে যদি টলটলে নীল আকাশ থাকে। সমুদ্রের সুগভীর নীল জলের মতো।

২০২৬ সালের বিধাননগর নিউটাউনের রাস্তাঘাট বাড়ি ঘর কোথায় যেন তলিয়ে যায়। শপিংমলের চিত্র এখন আর চোখে পড়ে না। প্রায় চারশ বছরের পুরনো সেই বিধাননগর, বিধাননগর স্টেশন, নিউটাউন সবই ইতিহাস। কোনও পণ্ডিত বা ঐতিহাসিকের বইতে হয়ত এদের বর্ণনা পাওয়া যেতেও পারে। পাওয়া যেতে পারে সেই সময়ের মেট্রো রেলের পরিষেবা। পুরো কলকাতা শহরটাই কেমন মেট্রো জালে মুড়ে ফেলা হয় ইত্যাদি। হয়ত সেই ঐতিহাসিকের বইতে বিগত আর্কিটেক্ট ডি. সি. পলের নামও পাওয়া যেতে পারে। যার কাজের প্রচুর নির্দশন বিধাননগরের বাড়িগুলিতে ছড়িয়ে। কিন্তু এখন সবই ইতিহাস।

২৫০০ সালের শরতের সকালটি বেশ মনোরম। নতুন সভ্যতা নিউটাউন বিধাননগর কেষ্টপুরে মাথা তুলে দাঁড়ায়। কেষ্টপুরের বাড়িগুলি কেমন হলুদ রঙের। বিধাননগরের বাড়ি হালকা সাদা। আর নিউটাউনের বাড়িগুলি কমলা রঙের। শহরে এখন এলাকা বুঝে বাড়ির রঙ হয়। হালকা সাদা বলতে বিধাননগর এবং স্টেশন বোঝায়। হলুদ বলতে কেষ্টপুর। আর কমলা বলতে নিউটাউন। এরকমই এক সাদা বাড়িতে মানে বিধাননগর এলাকায় থাকে অদ্বৈত মল্লবর্ধন। মল্লবর্ধন পরিবার খুবই প্রাচীন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মল্লবর্ধনরা ছিলেন। আছে। থাকবে। অদ্বৈতবাবু পেশায় বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান রক্তে। শিরায় উপশিরায়। পিতামহর জমিতে এখন বসবাস। পিতামহর পিতামহর বাসা ছিল বিধাননগর স্টেশনের কাছে। পিতামহর নাম দেবেন্দ্র মল্লবর্ধন। দেবেন্দ্রবাবু উকিল মানুষ। তিনি নিজের জীবনটাতেও যুক্তি দিয়ে সাজান। সুঠাম চেহারা। গায়ের রং ধবধবে। প্রতিদিন ওকালতি করে বাড়িতে আসার পর দোতলার গ্রীলওয়ালা  বারান্দায় সন্ধ্যার ঠান্ডা কফি চাই। কোন্ড কফিতে নাকি মাথা ঠান্ডা থাকে। মাথায় যুক্তিরজট খুলতে সাহায্যও করে। বাড়ির সামনের সজনে গাছের ঝিরিঝিরি পাতার দোল খাওয়া স্রোতে দেখতে দেখতে প্রায় দিনই চিন্তা করে বাঁচার কথা। বাঁচা মানে নিজের জীবনের কথা। অধিকাংশ দিনই ভাবেন যত দিন বাঁচা যায় ঘোড়ার মতো বাঁচতে হবে। রোগে ভোগে যেন শরীর না ভাঙে। শরীর ভেঙে বিছানায় কাতরে বাঁচার থেকে দৌড় ঝাঁপ করে বাঁচা অনেক সম্মানের। অনেক মধুর। প্রাণবন্তও।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *