অভিষেক ঘোষ
‘বাকিটা ব্যক্তিগত’: ঘ্রাণে ও স্মরণে
প্রমিত রায় প্রেম খুঁজছে। নিজের জন্য নাকি তার তথ্যচিত্রের জন্য? তা সে জানে না! সে কনফিউজড্! তার এই ‘Confusion’ (বিভ্রান্তি) এক্কেবারে আজকের প্রজন্মের কনফিউশন। কিন্তু কেবলমাত্র এই প্রজন্মই কি এমন বিভ্রান্তির শিকার? তাই যদি হয়, তাহলে মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ (১৯৮১) ছবির নায়ক দীপু (অভিনয়ে ছিলেন – অঞ্জন দত্ত) কেমন ছিল? ‘Cynical’ নাকি শুধুই স্বার্থপর? সংবাদপত্রের অফিসে একটা চাকরির জন্য দীপুর প্রয়োজন ছিল একটা বা, কয়েকটা ঘটনার, যা কাগজের পাঠকে ‘খাবে’। ঘটনা খুঁজতে খুঁজতে সে খুঁজে পায় কোলকাতার ধোঁয়া-ভরা রাস্তার পাশে এক হাত-দেখায় ব্যস্ত জ্যোতিষীকে। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবির নায়ক প্রমিত (অভিনয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী)-ও প্রেম খুঁজতে খুঁজতে, খুঁজে পায় এক জ্যোতিষীকে! কাকতালীয়, তাই না! অদ্ভুত সমাপতন! ঠিক যেমন এই ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিটা আর প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’— এই দুয়ের পাশাপাশি চলনটা অদ্ভুত কাকতালীয়! দুটো লাইন ঠিক সমান্তরালও নয়, আবার কাটাকুটিও হচ্ছে না, কিন্তু দুটোই যেন পাশাপাশি আছে! খুব কাছাকাছি, কিন্তু কেউ কারোর হাতে হাত রাখছে না, অথবা মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে না। সে যাই হোক, দীপু ও প্রমিত উভয়েই জ্যোতিষীর বাড়িতে যায়, উভয়েই অনাস্থা ও অবিশ্বাস দেখায়। শেষ পর্যন্ত ‘চালচিত্র’-র স্বার্থপর, সিনিক্যাল দীপু রূঢ়ভাবে বৃদ্ধ জ্যোতিষীকে নাকচ করে, মুখের উপর অপমান ছুঁড়ে দিয়ে চলে এসেছিল। প্রমিত তা পারে নি। সে মানুষ হিসেবেও বড্ড ভালো। আমাদের অনেকের মতোই, প্রেমের বড়ো দরকার তার জীবনে। তাছাড়া ওখানেই সে একটা ভরসা খুঁজে পেয়েছিল। তাকে দেখে মনে হয়, ‘কনফিউশন’ কখনও কখনও ভালো, কারণ তেমন তেমন মেঘলা দিনে, তাতেই জীবনটা আশ্চর্য কোনো ‘ফিউসন’-এর হদিশ পায়! একটা কিছু ঘটে যায় তখন, প্রমিতের জীবনেও তেমনই ঘটে।
প্রদীপ্তবাবুর ছবিতে একটা অদ্ভুত পাগলামি আছে। যেন সিনেমা বানানোটা খুব সহজ। খুব ক্যাজুয়াল ব্যাপার এই কাজটা! প্রমিত চরিত্রে ঋত্বিকের পাগলামি, মোহিনী গ্রামে গিয়ে অদ্ভুত নাচা-কোঁদা, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি, ছবিতে ওই পাগলামিটা এনে দেয়। কিন্তু সঙ্গীতের বোধের মতোই অদ্ভুত পরিমিতিবোধ পরিচালকের, কারণ তিনি এই পাগলামিটাকে কিছুতেই লাইন ক্রস করতে দেন না। ভারসাম্যটা ছবিতে ঠিকই থাকে, গভীর মুহূর্তগুলো আসে খুব হালকা চালে। যেমন অদ্ভুত গ্রাম মোহিনীতে গিয়েই সকলে প্রেমে পড়ে যায়। সেখানকার মানুষও অভাবে, সংকটে কখনও প্রেম ভোলে না। আধপেটা খেয়ে, ‘হাপু’ খেলা দেখানো লোকটাও সহজেই বলে ওঠে, “দু-বেলা দু-মুঠো পেট ভরে খেতে পাই নাকো!” তাও লোকটা নির্দ্বিধায় জানায় “প্রেম না করলে থাকতে পারব নাকো।” এরকম আরো কত! কোলকাতার জ্যোতিষীর দ্বিতীয়া স্ত্রী সহসা হয়ে ওঠে মোহিনী গ্রামের শম্পা। ওদিকে রাজু নামে যে ছেলেটি প্রমিতকে অনুরোধ করেছিল, শম্পাকে ছেড়ে দিতে, কারণ সে শম্পাকে ভালোবাসে… দোল ও ঝুলনের দিনে (রহস্যময় মোহিনীতে দুটি উৎসব একই দিনে হয়), সেই রাজু কৃষ্ণ সেজে ঝুলন দোলায় বসে থাকে, আর শম্পা রাধা সেজে। সেখানে প্রমিত ও ক্যামেরা-সহ অমিত পৌঁছানো মাত্রই গান শুরু হয়। “হাতে লইয়া দরপণ, দেখো দেখো চাঁদবদন…”, আর ঠিক তখনই কৃষ্ণের বেশে রাজুর শুকনো ও ব্যথিত মুখটা দেখানো হয়। চমৎকার ভাবনা। অতঃপর এ যুগের রাধা, কৃষ্ণকে ভুলে, উঠে গিয়ে, বেলালুম দোল উৎসবে মাতে প্রমিতের সাথে। এই যে ‘ফিউসন’ ঘটে গেল! আর ছবির নানা ধরণের গান নিয়ে তো রীতিমতো গবেষণা করা যায়। বৈষ্ণব পদ অবলম্বনে গান, বোলান গান, হাপুর গান, সংকীর্তন, লালনগীতি থেকে প্রচলিত নানা ধরণের গানের আশ্চর্য ফিউসন তথা সমন্বয় চলে ছবিতে। আর এই সব কিছুর মাঝে কয়েকটা মুখ, কয়েকজন মানুষ স্মরণীয় হয়ে থাকেন। মল্লিকা সাহার চরিত্রে চূর্ণী গাঙ্গুলী, জ্যোতিষীর প্রথমা স্ত্রীর চরিত্রে সুদীপা বসু, এছাড়া মাধবী মুখার্জী (এও কাকতালীয় যে, মাধবী ‘স্বপ্ন নিয়ে’ ছবিতে ছিলেন, যে ফিল্মটি কিনা ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ অবলম্বনে নির্মিত), মনু মুখার্জী, গোটা ছবিতে ক্যামেরা হাতে অমিত সাহা আমাদের মনে দাগ কেটে যান।
রাত যে পথ চোখের সামনে বিছিয়ে দিয়ে যায়, দিনের আলো এসে যেন তা মুছে মুছে উধাও করে দেয়। এমনই সেই আশ্চর্য গ্রাম মোহিনী-তে পৌঁছানোর পথ। যেন চলে গিয়ে ফিরে এলে, ভুগোল বইয়ের মানচিত্র থেকেই দেশটা উধাও হয়ে যায়। যারা সে গ্রামের সন্ধান দিয়েছিল, তারাও মুছে যায়, কাউকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রেম ও তেমনই নয় কি? প্রেম আসে, চলে যায়। আসে, কিছুদিন থাকে, তারপর প্রেম জীবন থেকে হারিয়ে যায়। যতক্ষণ বিরহটুকুও টিকে আছে, ততক্ষণ ও কিন্তু প্রেমটা আছে। কিন্তু প্রেমে উপনীত হওয়ার তো কোনো রুটম্যাপ হয় না, হয় না কোনো স্থির মানচিত্র। ব্যাপারটা অদ্ভুত, তবু তো চিরন্তন! কিন্তু প্রদীপ্তবাবু তো কমেডি বানাতে চেয়েছেন। বিরহ অথবা, ‘আরবান এসকেপিজম্’ তাঁর গন্তব্য নয়। তাঁর নায়ক পূর্বে উল্লিখিত বিজন বা, প্রেমেন মিত্তিরের গল্পের সুভাষের মতো নয়। তাই প্রমিত রায় কোলকাতা থেকে ছুটে যায়, আবার মোহিনী গ্রামটা খুঁজতে। খুঁজে পায় না। অপেক্ষারত অমিত, প্রমিতদের জন্য কোনো ভবেন (যিনি পুরুষানুক্রমে ভ্যানচালক) ভ্যান নিয়ে আসেন না। এইভাবে মোহিনী তাদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়! কিন্তু তাও প্রমিত হাল ছাড়ে না। শপথ নেয়, সে আবার ফিরবে। এবং প্রেম ফেরে তার জীবনে… এই আশার বাণীতেই ভরসা রাখেন পরিচালক.. কারণ কোলকাতার রাস্তাতেই আধুনিকার সাজে, প্রমিত খুঁজে পায় শম্পাকে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রেম জিনিসটা, ‘আজব জিনিস বটে, চিবোলেই চটচটে’! কিন্তু শুভঙ্কর ভড়ের ক্যামেরা (বৈষ্ণব পদের সাথে ছবির শেষদিকে গ্রামের ধানক্ষেত ও চরাচর-জুড়ে ঝড়-বৃষ্টির দৃশ্য অপূর্ব) অনিন্দ্য সুন্দর চক্রবর্তীর সঙ্গীতায়োজন ও স্বয়ং পরিচালকের কুশলী সম্পাদনা ওই ‘চটচটে’ ব্যাপারটা থেকে দর্শকের মনটাকে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতির জগতে ঠেলে দেয় এই ছবিতে। গ্রামের এই এতগুলো মানুষের এতরকম জীবনে প্রেম যেন নৈমিত্তিক একটা ব্যাপার, আলাদা কিছু নয়। ওই জায়গাটাই অমন, যেখানে লোক-সংস্কৃতি আঁকড়ে বাঁচে মানুষ, প্রেমের মতোই। সংকীর্ণতা নেই, মোবাইল ফোনের বালাই নেই। অমিতের ভিডিও ক্যামেরাটাও সেখানে এক বেমানান জিনিস।
এবার তাহলে উপসংহার টানা যাক্। ‘চালচিত্র’ ছবির নায়কের মতো জ্যোতিষীর খপ্পরে পড়ে তার বাড়ি যায় প্রমিত রায় ও তার তথ্যচিত্রের ক্যামেরাধারী অমিত। প্রমিতের প্রশ্ন: প্রেম কোথা পাই? জ্যোতিষী হদিশ দিল; প্রথমে তাকে ভন্ড বলে ভাবলেও তার হদিশেই মোহিনী ধরা দিল। মায়ায় জড়িয়ে পড়ল দু’জন। ‘গুগাবাবা’-র মতো হাতে হাতে তালি দিয়ে বাড়ি থেকে ধর্মতলা পৌঁছে গেল দু-জনে (যদিও হাতে তালি দেওয়ার সময়ে বলেছিল, মোহিনী, সুতরাং এটা একটা গোলমাল)! ধর্মতলা থেকে নদিয়ার শিকারপুরের বাস ধরতে হবে, মল্লিকা দেবী বলেছিলেন। নাজিরপুর বলে একটা জায়গায় নামতে হবে, করিমপুরের আগে। নেমেছিল দু’জনে, অপেক্ষাও করেছিল। — বাসযাত্রা ও অপেক্ষার এই জায়গাটা ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের মতো। কিন্তু তারপর ভ্যানচালক ভবেনই ভরসা। ‘নবীগঞ্জের দৈত্য’ অবলম্বনে নির্মিত ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’ ছায়াছবির সেই ভূতে পাওয়া লোকটার মতো দেবেশ রায় চৌধুরী হাজির হন, তিনিই এই ছবির ভ্যানওলা ভবেন। প্রমিত ও অমিত – দুজনেই প্রেমে পড়ে, গ্রামের ও মানুষের, যথাক্রমে শম্পা ও পলি-র। ‘বোলান গান’ -এর লোকায়ত কথায় ও সুরে গ্রামীণ অশ্লীলতা মিহি হয়ে মিলিয়ে যায়, গ্রাম্য মহিলাদের লজ্জায় জিভ কেটে নীরব হাসিতে। ইংরেজদের দেশ ছাড়া আর কংগ্রেসের নির্বাচনে পরাজয় পিঠোপিঠি গানের কথায় উঠে আসে অনায়াসে। আর এভাবেই যেন নির্মিত হয়, ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের দৃঢ়পিনদ্ধ ভাষাগত বন্ধনের একটা কাউন্টার কালচার। হয়তো প্রদীপ্তবাবু এটা সজ্ঞানে করেন না, কিন্তু আজ ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ বানালে যে গল্পটা এই ভাবেই বলা উচিত, সেটাও যেন ছবিটা দেখতে দেখতেই কয়েকবার মনে হয়। প্রেমের মিত্তিরের কাহিনির মতো এই ছবিতে কোনো যামিনী নেই; যামিনীর মায়ের মতো কোনো নিরঞ্জনের জন্য অধীর অপেক্ষাও নেই। মোহিনীর জল-হাওয়াই যে আলাদা। সেখানকার ভ্যানওলা ভবেন ব্যাখ্যা করে গুহ্য কথা : কোনো মানুষের প্রেমের বয়স পেরিয়ে যেতে বসেছে, অথচ প্রেম হয়নি, এমনটা হলেই গ্রামের লোকে বুঝে যায়… এবার গ্রামে কোনো অতিথি আসার সময় হয়েছে। মানে ঠিক যেন প্রয়োজন হলে তবেই কোথায় একটা ‘পোর্টাল’ খুলে যায়, প্রেম-গ্রহের পোর্টাল! আহা এমন দিকশূন্যপুরের খোঁজ আমাদের কেন কেউ দেয় না? ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র নায়ক ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’-এর নায়কের মতো এসকেপিস্ট নয়, হলে প্রমিত রায় কখনোই প্রেম খুঁজতে একটা অদ্ভূতুড়ে গ্রামে চলে যেত না, আবার প্রত্যাবর্তনও ঘটতো না তার। নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য ও ভাসতে ভাসতে আঁকড়ে ধরা গাছের ডাল খুঁজে ফেরার জন্যও হিম্মত লাগে। প্রমিত রায় এখানেই ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের নায়কের চেয়ে আলাদা, গল্পটাও তেমনি আলাদা লেখকের নিজস্ব দর্শনে। কিন্তু ওই যে, দর্শকের মনই আসলে মিলন-সন্ধানী, কার যে কীসে ভালোলাগে, তাহা কি তুমি-আমি জানি? জানি না, আর জানি না বলেই এই ছবির জার্নিটা ভারি মজার লাগে, বিচিত্র এক ব্যাপার ঘটে মনের মধ্যে। তেলেনাপোতা আর মোহিনী মনের বাঁধা ঘাটে একই সঙ্গে মুখ ডুবিয়ে জল খায়, পাশাপাশি, তারপর যার যেদিকে চোখ চলে যায়। আর ফিরে তাকায় না। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পের কথা-বিশ্বে ফিরে আসা যাক, “মনে হবে এই ধ্বংসপুরীর অতল নিদ্রা থেকে একটি স্বপ্নের বুদবুদ ক্ষণিকের জন্য জীবনের জগতে ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে গেছে।”-এর সাথে মেলে না, ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-ছবির দর্শন। উপসংহার টানা যাক এইভাবে, “একবার ক্ষণিকের জন্য আবিষ্কৃত হয়ে তেলেনাপোতা আবার চিরন্তন রাত্রির অতলতায় নিমগ্ন হয়ে যাবে।” ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ (২০১৩) ছবিতেও তেমনি প্রেমেন মিত্তিরের কাহিনি কোথাও কোথাও ভুস করে ভেসে উঠে, ফের মিলিয়ে যায়, একান্তভাবেই আমাদের স্মৃতির মহিমায়।
ফিল্ম: ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ (২০১৩)
কাহিনি, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও পরিচালনা: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য্য
সঙ্গীত: অনিন্দ্যসুন্দর চক্রবর্তী
চিত্রগ্রাহক: শুভঙ্কর ভড়
অভিনয়ে: ঋত্বিক চক্রবর্তী, অপরাজিতা ঘোষ দাস, মাধবী মুখোপাধ্যায়, মনু মুখোপাধ্যায়, অমিত সাহা, দেবেশ রায় চৌধুরী, সুপ্রিয় দত্ত, চূর্ণী গাঙ্গুলি, সুদীপা বসু প্রমুখ
ভাষা: বাংলা
লেখক পরিচিতি : পেশায় শিক্ষক, নেশায় কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক। প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শব্দের অভিযান’, উপন্যাস ‘পরজীবী’ ও গল্প সংকলন ‘৬৯ঙ’।