গ ল্প
সুপর্ণশু
ধূসর
‘মাটির দাওয়ায় পড়ে থাকে এখন ধুলোর আস্তরণ, উঠোনের কোণে কোণে ঊর্ণনাভদের সংসার, উস্কোখুস্কো পাতারা, নির্জীব সজনে ফুল, দরজার দুটো কড়াকে একই সহাবস্থানে টেনে নিয়ে ঝুলে থাকা জংধরা একটা তালা… এই ছবিটা নিয়ে বিনোদন এখানে বেঁচে আছে আজও।’
কথাগুলো বলে অমৃত মঙ্গলময় করের দিকে স্থিরভাবে তাকালেন।
মঙ্গলময় বলে উঠলেন ধীরে ধীরে, ‘হ্যাঁ, কিছু মানুষ স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে, ঝাঁকঝাঁক গল্পের মাঝেও কিছু গল্প কখনো পুরনো হয় না, সময়ের সাথে ছায়া হয়ে ঘোরে…’
এমন শুরুয়াতি কথপোকথনের আচ্ছন্নতায় অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। ওরা যেন বর্তমান থেকে অনেকটা দূরে। জোনাকিরাও জ্বলে ওঠে নিয়মমতো দূরের ঝোপেঝাড়ে— যা টের পাননি হয়তো ওদের কেউই!
এদিকে চায়ের গুমটির সামনে মাচায় বসে থাকা ওদের দু-জনের মুখে বাল্বের হলুদ আলো তখন একপেশে হয়ে পড়ছিল, অন্যদিকটাতে অন্ধকারের আঁকিবুকি, ঠিক যেন প্রতিটা জীবনের সাথে সম্পৃক্ত, নিয়তির হাতে করা সুখ-দুঃখের বাস্তব অলংকরণের মতো। স্মৃতিস্নাত কথার পাতাগুলো ওরা উলটেপালটে দেখছে যখন একটার পর একটা— মনখারাপ যেন সন্ধের অন্ধকারে ঝরাপাতার মতো জড়ো হচ্ছে বসন্তের হাওয়ায়…
বছর কুড়ি আগের কথা, বিনোদনের ছোট্ট একটা সংসার ছিল— অন্ধ বাবা, মা আর কাকাকে নিয়ে চারজনের। পাড়াগাঁয়ের বেশিরভাগ লোকজনদের তাদের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন ভালোবাসা ছিল যা অন্যদের ক্ষেত্রে সচরাচর চোখে পড়ত না। ওর গুণ, সততা, ভালো ব্যবহার সকলের মন কেড়ে নিত। তাকে কাজ দিয়ে সাহায্য করত গাঁয়ের লোকজনেরা। কারণ সেই একমাত্র রোজগেরে ছেলে। তার পরিবারের জন্য তাকে কত না কিছু সহ্য করতে হয়েছে সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকেই। তার আগে তার কাকার রোজগারে যা-হোক করে হলেও চলে যেত। কিছু বছর পর কাকা তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে হঠাৎ দূর শহরে চলে গেল নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি নিয়ে। তারপর থেকে সে বেপাত্তা। এই সংসারের কোনো খবরই আর রাখত না। ভাগ্যের পরিহাস হয়তো একেই বলে! কঠিন লড়াই-এর মধ্য দিয়ে সে বড়ো হয়েছে মা, বাবার দায়িত্ব পালন করতে করতে। আজকালকার দিনে এসব কতিপয় সন্তানরাই করে থাকে।
একদিন স্বাভাবিক নিয়মে তার জীবনেও প্রথম প্রেম এল। সেও স্বীকার না করে পারেনি। তার অতলে হারিয়ে সে নিজেকে আবিষ্কারও করেছে অন্যভাবে। এভাবেই দিন অতিবাহিত হতে থাকল। দেখতে দেখতে দশম শ্রেণির পরীক্ষাতেও মোটামুটি ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হল সে। কিন্তু সেই শেষ। আর পড়া হয়নি বিনোদনের। আরও কঠিনভাবে কাঁধে চেপে বসল গোটা সংসারের ভার। সে-সময় পঞ্চায়েতের একজন তাকে সাহায্য করার কথাও বলেছিল। কিন্তু সে আশ্বাসে বিশ্বাস হয়নি সেদিনের বিনোদনের। আসলে ততদিনে সে দেখে ফেলেছে মুখোশ পরা নগ্ন পৃথিবীটাকে।
একজন মেধাবী ছেলের জীবন অনটনের পৃথিবীতে আটকে ধ্বংস হতে দেখেছিলাম যা আজও মস্তিষ্কচ্যুত হয়নি। তখন আমি দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকেই খবর পেলাম, বিনোদনের বাবা নাকি গত হয়েছেন দিন সাতেকের প্রবল জ্বরে। ছুটে গেলাম, আমাকে জড়িয়ে ধরে তার সে কি কান্না! অনুভব করলাম অগোচরে আমার ভেতরে থাকা গোপন পাহাড় ধ্বসে পড়ছে! থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন। খুঁজে পাচ্ছিলাম না সান্ত্বনার উপযোগী কোনো ভাষা। সাধ্যমতো সাহায্য করে ফিরে আসি। অস্বীকার করার জায়গা নেই— ব্যক্তিগত জীবন স্রোতে মত্ত হয়ে তারপর ভুলেও যাই বিনোদনের কথা।
মাস ছয়েক পর এক ঝড়জলের রাতে সহপাঠী অমরের মারফত খবর পেলাম তার মা-ও নাকি আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত হয়েছেন কিছুদিন আগে। আবারও কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। না এবার আর যাওয়া হল ওদের বাড়ি। কিন্তু মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। শুধু মনে হতে থাকল, কিছু মানুষ থাকে যারা লড়াই করতে করতে ভেতর থেকে একসময় ফুরিয়ে আসে… যা একমাত্র সময় আর সেই জানে! বিনোদন ও কী তাদেরই একজন?
জানেন মঙ্গলময়দা, বছর চারেক পর বিনোদনকে আমি শেষবার দেখেছিলাম কথাডাঙার মাঠে। ওখানেই সে ভাগচাষী ছিল কাঞ্চন রুইদাসের বিঘা কয়েক জমির। বিধ্বস্ত লেগেছিল ওকে বেলাশেষের ক্ষীণ আলোর মতো। বলেছিল, ‘দেখ অমৃত, আজ আমি সর্বহারা! বাবা-মা তো কবেই গেছে। তারপর নীতুও চলে গেল অন্যপুরুষের হাত ধরে।’ বলে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল বিনোদন। হ্যাঁ, প্রথম প্রেমের স্বীকৃতি হিসাবে বিনোদনেরও সংসার হয়েছিল নীতু নামের মেয়েটির সঙ্গে কিন্তু মাত্রই কয়েক বছরের জন্য।
নিভে আসা আলোয় সেদিন অদ্ভুত লাগছিল বিনোদনের মুখটা। নতুন করে আবার সংসার বাঁধার কথাও ওকে ভাবতে বলেছিল অনেকে, কিন্তু তা শুনলেই সে কুঁকড়ে যেত রোগগ্রস্ত পাতার মতো। বেনামা বিড়ম্বনার ঘুণ তাকে খেয়ে ফেলেছিল ভেতরে ভেতরে। আমি দেখছিলাম, একজন চেনা মানুষ সময়ের দুষ্ট প্রবাহে ধ্বংসাবশেষ হয়ে ভেসে যাচ্ছে কেমন করে। ওর রোদে পোড়া তামাটে মুখের অজস্র বলিরেখায় দুঃখগুলোই যেন অক্ষরে অক্ষরে লেখা! সে তখন এই নিঃসঙ্গ একখণ্ড পৃথিবীর বিষণ্ণ এক জীব।
তারপরেও শুনেছিলাম, সে নাকি ধীরে ধীরে হয়ে পড়েছিল আনমনা— ভরা গ্রীষ্মের হাওয়ার মতো অপরিমেয় উদাস। নিজেকে সে সরিয়ে নিয়েছিল মানুষের থেকে যোজন দূরত্বে। গাছপালা-প্রকৃতি নিয়েই থাকত কাজের ফাঁকে। সাথে কোনো কোনো রাতে আকণ্ঠ মদ আর জ্যোৎস্না খেয়ে পড়ে থাকত গ্রামের পাশে ছোট্ট নদীর চরে, যাকে লোকে বলে ‘সোঁতা’! তারপর কোনো কোনো অপরাজিতানীল ভোরে টল-মলে শরীরটাকে চর থেকে তুলে, বাড়ির দিকে বয়ে নিয়ে ফিরত বিষাদ… নির্জন রাস্তায় অথবা গলির মুখে হাওয়ায় ভর করে ছড়িয়ে দিত প্রলাপ। যখন ঘরের উঠোনে পা রাখত এই আমলতাস গ্রামের আশেপাশের গাছগাছালির পাখ-পাখালি-পারিয়ারা বুঝে নিত তাদের মানুষ ঘরে ফিরেছে, বিনোদনের এমনি সখ্যতা গড়ে উঠেছিল তাদের সঙ্গে ধীরে ধীরে।
বুঝলেন মঙ্গলময়দা, জীবন আসলে রহস্যময়, অনাকাঙ্ক্ষিত কুয়াশায় মোড়া… আর সেই গূঢ় রহস্যের গভীরেই জীবন জিজ্ঞাসা! সময়ের প্রতিটি বাঁকে কী অপেক্ষা করছে তা কেউই জানি না। সেও জানত না, একদিন কাঞ্চন রুইদাসের রিমি নামে বছর তিরিশের মেয়েটি আবারও নতুন করে তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসবে। আর রিমিও কি জানত, বছর উনচল্লিশের একাকী, বিধ্বস্ত, ভাঙাচোরা যুবক বিনোদনের মনের চোরাকুঠুরিতে সেই আলো আর পৌঁছোবে না কোনোদিন! প্রচ্ছদ পার হয়ে ওদের নতুন গল্পটা শুরু হয়েছিল কাকতালীয়ভাবেই, তবু গল্পটা আর এগোয়নি। অপার শূন্যতায় ঘেরা একাকিত্বের প্রাচীন ঘাটেই হয়তো বাঁধা ছিল তার নোঙর আর অন্য কোথাও নয়। আর তাই ঠোঁটে নিরুত্তরের হাসি এঁকে একদিন বিনোদন তার মতোই তার ভাঙ্গাচোরা সাইকেলটার প্যাডেলে ঘোরাতে ঘোরাতে মিশে গিয়েছিল সন্ধে পার হওয়া কঠিন অন্ধকারে। না, এরপর আর কেউ কোনোদিন কোথাও খুঁজে পায়নি তাকে।
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে চুপ করে যায় অমৃত। বাইরে জ্যোৎস্নায় মেতে উঠেছে বেহায়া হাওয়া, মাঝে মাঝে পথের ধুলোও সঙ্গ দিচ্ছে নির্লজ্জের মতো। মাচায় বসে নিশ্চুপে দেখছে ওরা দু-জনে।
কিছু বলতে চেয়েও আর বলতে পারলো না অমৃত। কথা জড়িয়ে গেল তার। ব্যথায় ভারী হয়ে এসেছে শরীর। চোখের কোণে জলের দাগ। বুঝতে অসুবিধা হয়নি সত্তরোর্ধ্ব অভিজ্ঞ মঙ্গলময়ের। মঙ্গলময় একবার তাকালেন ষাটোর্ধ্ব অমৃতর মুখের দিকে। তারপর দু-জনেই গুমটি ছেড়ে উঠে এসে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন ঘাসহীন ধানকুরির ধূ-ধূ মাঠের দিকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্তব্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন দু-জনে। হঠাৎ অমৃত অস্ফুটে যা বলে উঠলেন মঙ্গলময়ের কান এড়ালো না, আজকের এই জ্যোৎস্নাও কত ধূসর…