Hello Testing

উ প ন্যা স  পর্ব ১

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

এটি কোনো তথাকথিত কথামালা নয়। সম্পূর্ণ অনির্মাণ জাতীয় কথামালা লেখা। এই অনির্মাণ ক্ষয় ও ক্ষরণের কথা আসে। আমরা জানি অধিকাংশ জিনিসের ক্ষয় আছে। ক্ষয় কোনো নতুন শব্দও নয়। একটুকরো বরফ টেবিলে রাখলে বরফটি বরফ থাকে না। জল হয়ে যায়। বরফটির ক্ষয় হয়। তেমনি লোহা কাঠ কাগজ সব কিছুরই ক্ষয় আছে। আবার মানুষেরও ক্ষয় আছে। মানুষের বাহ্যিক যে ক্ষয় হয় সেই ক্ষয় অসুখ জনিত বা বার্ধক্য জনিত। কিন্তু ভিতরে যে ক্ষয়টি হয় সেটি অধিকাংশক্ষেত্রে দেখা যায় মানসিক অশান্তি মানসিক চাপ থেকে। মানসিক চাপ বা মানসিক ক্ষয় ঠিক যেমন একটুকরো বরফ ক্ষয় হতে হতে জল হয়ে যায় তেমন নয়। সেই ক্ষয়ও বিভিন্ন মাত্রায় ঘটে। সবার ক্ষেত্র এক হয় না। মানুষের অভ্যন্তরের ক্ষয়টি যেন শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে। মাথার চাপ যেন শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে যায় তরলের মতন। সেই ক্ষয় ক্ষরণের রূপ নেয়। যেন শিরার ভিতর দিয়ে দিয়ে শরীরের সব জায়গায় ছড়িয়ে চলে। এই ক্ষরণ যার হয় সেই বোঝে। রাতের ঘুম উড়ে যায়। খাওয়া ঠিক মতন হয় না। হাত-পা অবশ অবশ লাগে।

সবে পাতা ঝরা শুরু। শীত গেলেও শীত শীত ভাব। ভালো লাগে না পাখা চালাতে। আবার কখনও ভালোও লাগে। আজ দুপুরের ট্রেনে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ পৌঁছোয় অনি আর দেবা। দেবা শর্ট নাম। দেবাদৃতা। পাঁচ বছরের রিলেশনে থেকে বিয়ে। জানি না ব্রেক হবে কিনা! তবে একটি বিষয়ে দেবা খুব মনমরা। কারণ অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রথম সন্তানটি উদড়ে এসেও আসে না। লোকে বলে গাছের ফল ফুল পুকুরের মাছের হাজার হাজার ডিম থেকেও বাচ্চা হয় না। ফুল হলেই কি গাছে ফল আসে! কে বলে! অনিরা থাকে বাগবাজারে। গোলবাড়ির কষা মাংস খেয়ে বড়ো। অনিদের নিজস্ব জমি নিয়ে দোতলা বাড়ি। পিতামহ নিখিলরঞ্জন শেয়াল ডাকা উত্তর কলকাতায় তিন কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেন। ট্রাম লাইনে ট্রাম ভোরে কি সুন্দর চলে যায়। বাগবাজারে ভোরে গঙ্গায় জাল হয়। সেই জালে ওঠে চোখ ছটফটানি ইলিশ।  বড়ো কাতলা। একেকটির ওজন বাইশ কিলো। নিখিলরঞ্জন ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে ওঠে। এটি তার চিরকালীন নিয়ম। ভোরে উঠে তিনি ঈশ্বরের নাম গান মোটেও করেন না। বাগবাজারের রাস্তা ধরে প্রথমে গঙ্গা-সূর্য দেখবেন। মানে সূর্য যেন গঙ্গা থেকে ওঠে। এই দৃশ্য উনি ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসেন। কেন না নিখিলরঞ্জনের পুত্র অখিলরঞ্জনেরও একই নেশা থাকে। মানে সবই পারিবারিক সূত্রে পাওয়া।

অনি উত্তর কলকাতায় থাকলেও আজও উত্তরের গঙ্গা দেখেনি। জানি না কেন দেখেনি। সাউথ পয়েন্টে পড়া ছাত্র। বাগবাজারের মোড় থেকে বাসে একডালিয়াতে নামত। খুবই সিস্টেমেটিক ছেলে। পড়া টিউশন কোচিং ইত্যাদি। মিল্ক কলোনি নাকি চেনে না। ওই দিক দিয়ে যে লেকটাউন যাওয়া যায় তাও চেনে না। লেকটাউনে ভি আই পি রোড আছে সেটি জানে। কেন না সাউথ পয়েন্ট থেকে পাশ করে যখন মাল্টিমিডিয়া নিয়ে মাস্টার্স করে তখন অনিকে প্রায়ই বেঙ্গালুরুতে যেতে হয়। ফলে কাজের জন্য মোটামুটি অনি গুগল ম্যাপে সবই চেনে। অনির কাছে এখন নিধিলরঞ্জন বা অখিলরঞ্জনের থেকে গুগল অনেক প্রিয়। আপন। বিশ্বাসযোগ্য। ফলে জ্যান্ত ইলিশের স্বাদ নেওয়ার বদলে ক্যারিয়র তৈরী করাই অনির কাছে মূল উদ্দেশ্য। বেঙ্গালুরুতে পেয়িংগেস্ট থেকে মাল্টিমিডিয়ার কোর্সটি অনি অনেক কষ্টে শেষ করে। প্রথম কথা বেঙ্গালুরুতে জলের সমস্যা। ট্রাফিক জ্যাম। আরও অনেক কিছু। সেই ক্লান্ত সময়েই ফেসবুকে দেবাবৃতার সঙ্গে আলাপ। প্রোফাইলে দেখে বেথুন স্কুলের ছাত্রী। পছন্দ ঘুরতে যাওয়া। খাওয়ায় পছন্দ কন্টিনেন্টাল! বয়স বাইশ। বাড়ি বিডন স্ট্রিট। হেদুয়ায় আগের স্টপে।

যোগাযোগ করে দু-জনের প্রথম দেখা শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার কাছে। যেখানে বহুদিন ধরে সুভাষচন্দ্র ঘোড়ার পিঠে বসে। তারপর ওখান থেকে কলকাতা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। জায়গাটি নিরিবিলি। ট্রেন আসে যায়, হাওড়া শিয়ালদার মতন নয়। টিকিট কাউন্টারের সামনে সারিবদ্ধ বসার জায়গা। অনি দেবা দু-জনে বসে গল্প করতে চায়। কেননা দাঁড়িয়ে গল্প করলে পা ব্যথা হয়। কোমড় ব্যথা হয়ে যায়।

দু-জনে চেয়ারে বসে পাক্কা দু-ঘণ্টা গল্প করে। অনি খেয়াল করে দেবার বাঁ দিকে ঠোঁটের কোণায় একটি বিন্দু তিল। কালো। ফেসবুকে তিলটি কিন্তু জ্বলত না। সামনাসামনি কিন্তু বেশ জ্বলজ্বলে। লোভনীয়। সেক্সি। তিলের কাছে একটি গরম চুমু খেতে ইচ্ছে করলেও অনি খায় না। এইসব দিক দিয়ে অনি অনেক সতর্ক। পরিণত। আসলে অনি জানে প্রেম করতে গেলে ছেলেদের পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মনে হল একটু আগে মুর্শিদাবাদের ট্রেনটি স্টেশন থেকে ছেড়ে চলে যায়। কেননা একটি হঠাৎ পুঞ্জিভূত হাওয়া স্টেশন চত্বরে খেলা করে। অনি দেবার হাত ধরে বলে, তুমি কি সত্যিই আমাকে পছন্দ কর? দেবা কপালের উপর থেকে চুল সরাতে সরাতে বলে, জানি না! অনি এই জানি না শব্দটিতেই চমকে ওঠে। কেননা মেয়েরা ‘জানি না’ শব্দ দিয়ে অনেক মানে বানাতে পারে। কেননা তারা গোপনীয়তা পছন্দ করে। রহস্যকে ভালোবাসে। লোকে বলে আজ পর্যন্ত কোনো চিত্রশিল্পী নারীদের সম্পূর্ণ অর্থ নাকি উদ্ধার করতে পারেনি। কোনো নাট্যকার নারীদের সম্পূর্ণ চরিত্র উদঘাটন করতে পারেনি। কোনো কবি নাকি সঠিক ভাষায় নারী বর্ণনাও করতে পারেনি।

                       

অনিকেত মানে অনি আর দেবা বিয়ে করে নতুন ফ্ল্যাটে আসে ছ-বছর আগে। ফ্ল্যাটটি কাছে। গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা অপূর্ব এক কমপ্লেক্স। নাম শান্তিবন। এই শান্তিবনে মোট আটটি টাওয়ার। প্রতিটি পঁচিশ তলা। কমিউনিটি হল খেলার মাঠ সুইমিং পুল চিকিৎসা কেন্দ্র কি নেই! সবই আছে। শুধু ইন্টারকমে যোগাযোগ কর। হাতের কাছে সবই পাওয়া যায়। সুউচ্চ টাওয়ারের প্রতিটি ফ্ল্যাটের বারান্দা গঙ্গামুখী। ভোরের গঙ্গা থেকে উঠে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় এইসব ফ্ল্যাটের মানুষেরা নিজেদের শোধন করে। বারান্দা থেকেই মানুষরা খেয়াল করে রাতের আলো জ্বলা স্টিমার তিরতির করে কেমন একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করে। জেলেরা বিন্দু হয়ে মাছ ধরে। কত শত মানুষ দু-প্রান্তেই স্নান করে। ডিঙ্গি নৌকাগুলি সওয়ারি পেলে কাছেপিঠে ঘুরিয়ে আনে। আর সেই নৌকার ছইয়ের ভিতর সওয়ারীরা কী করে কেনা জানে! ছেলে-মেয়ে হলে তো কথাই নেই! তারা গঙ্গাবক্ষে একটু লুকোচুরি তো খেলবেই। কেননা ভাসমান নৌকায় ঘোরার ভিতর একে রোমাঞ্চ থাকে। ফলে সেই রোমাঞ্চ যুবক-যুবতীরা আরও রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। নতুন ফ্ল্যাটে ছ-ছটা বছর। কি তাড়াতাড়ি কেটে যায়। বিয়ের পর প্রথম দু-বছর তো কেটে গেল যেন দু-মাসে। ভোরের সূর্য থেকে ওঠা গঙ্গাদৃশ্য দেখতে দেখতে দু-জনের কত স্বপ্ন মনে উঁকি মারে। ছেলে হলে কী নাম হতে পারে! বা মেয়ে হলে কী নাম হবে! এই সব রঙিন কথা আর কি!

আজ দোল। পূর্ণিমা। চতুর্দিকে রঙ বাহার। কি মানুষের মনে কি বাইরে! ফাগুয়ার হাওয়াতে এক প্রচণ্ড প্রেম নিবেদন থাকে। মানুষ মানুষকে আজকাল অর্গানিক রঙে মনের মতন সাজায়। পুরুষ হয়ে ওঠে নারী। নারী হয়ে ওঠে পুরুষ। অনি দেবাকে প্রতিবার মারাত্মক অর্গানিক রঙে সাজিয়ে দেয় তেমনি দেবাও। এই রঙ খেলতে খেলতে প্রায় একটা দুটো হয়ে যায়। এই দু-তিন ঘণ্টা রঙ খেলতে খেলতেই অনি দেবা শান্তিবনের তিন-চার জন বাসিন্দার ভিতর বরাবরই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। সময় বুঝে একটু আধটু লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-পিঙ্ক রঙের ড্রিকংসও চলে। মানে সবই ফাগুয়ার কল্যাণে। ফাগুয়ার রঙে। ফাগুয়ার উল্লাসে। এখানকার টাওয়ারে আসার পর দেবা অনি প্রথম বছর দোলে কোনো রঙ খেলেনি। আসলে সবার সঙ্গে তো পরিচয় আলাপই হয়নি। দ্বিতীয় বছর দু-তিনটে ফ্ল্যাটের ভিতর। তারপর ধীরে ধীরে অনেকের সঙ্গে। নতুন কোনো জায়গায় বসত করতে গেলে বসতীদের চিনতে হয়। আলাপ করতে হয়। হাই হ্যালো রপ্ত করতে হয়! ফলে সেই হিসাবে অনি আর দেবার সময় লাগে সকলের সঙ্গে সখ্যতা করতে। আবার না বুঝে সখ্যতাতেও অনেক সমস্যা। কোন মানুষ কেমন! কোন নারী কেমন! যেমন ডি টাওয়ারের চ্যাটার্জিবাবু খুব ভদ্র। সিভিল ইঞ্জিইনয়ার। এখন রিটায়ার্ড। মিমেস চ্যাটার্জিও অত্যন্ত গুণী মহিলা। হাতের কাজ নিয়ে বুটিক নিয়ে থাকে। বিভিন্ন মেলায় চ্যাটার্জিস বলে স্টল দেয়। এ টাওয়ারের মি. দত্তগুপ্ত আরেকজন প্রতিভাবান মানুষ। ওনার বড়ো ড্রইং রুমে প্রতি রবিবার একটি করে স্পেশাল ক্লাস বসে। ক্লাসটির উদ্দেশ্য হল বোকা বাচ্চাদের কিভাবে চতুর বানানো যায়! মি. দত্তগুপ্ত এই বিষয়ে আমেরিকা ইওরোপ জাপান থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসেন। তবে এই সব ট্রেনিং-এ ভিডিও-র উপরই বেশি নজর দেওয়া হয়। কেননা বাচ্চারা তথাকথিত বক্তব্যের বদলে চিত্র-ছবিতেই বেশি মন দেয়। বেশি বুঝতে পারে। তত্ত্বকথায় শিশুরা বিরক্তবোধও করে।

মি. দত্তগুপ্তর সঙ্গে অনি দেবার ভালোই জানশোনা। প্রতি দোলে মি. দত্তগুপ্ত এবং মিসেস দত্তগুপ্তর সঙ্গে ভালোই মজা করে। রং খেলে। এমনকি কোনো কোনোবার দোলের দিন লাঞ্চও করে। মি. দত্তগুপ্ত সফট্ ড্রিঙ্কস পছন্দ করেন। আর মিসেস দত্তগুপ্ত করেন হার্ড ড্রিঙ্কস। আসলে মি. দত্তগুপ্তের সঙ্গে অনি দেবা আলাপ করে নিজেদের স্বার্থেই। দেবা নিজে একটু চালাক যুবতী। কিন্তু অনি মাঝারি টাইপের। সাউথ পয়েন্টে পড়লেও চালাক হওয়া যায় না! তা না হলে উত্তর কলকাতায় গঙ্গা কখনও দেখেনি! এটা বিশ্বাস করতে হয়! হয়। কেননা ছেলেরা যে বাবা ঠাকুরদার মতন হবে এই জিনিস কোনো ধর্ম শাস্ত্রে, জাত শাস্ত্রে বা পরিচয় শাস্ত্রে কোথাও লেখা নেই। থাকেও না। তবুও জানি পিতারা ছেলেকে নিজের চরিত্র অনুযায়ী গঠন করতে চায়। এটি নাকি পিতাদের আদর্শ। আবার অন্য কথাও চালু আছে। মেয়েরা নিজের মেয়েকে নিজের মতন গঠন করতে চায়। এই উদাহরণ আমরাও সর্বত্রই পাই। যেমন— সুচিত্রা সেন মুনমুন সেনকে নিজের মতন গড়তে চায়। আবার অপর্ণা সেনও। কথা হল সবসময় এই নিয়ম খাঁটে কি! খাঁটে না। এইসব নানা কারণেই অনি দেবা মি. দত্তগুপ্তের সঙ্গে বেশি বেশি আলাপ করে। সখ্যতা করে। অনি দেবা ভাবে যদি ছেলে হয় এবং কিছুটা বুদ্ধি কম থাকে তাহলে এই শান্তিবনের মি. দত্তগুপ্তের কাছে সিটিং নিলেই চলবে। আর মেয়ে হলেও হাতের কাছে মি. দত্তগুপ্ত তো আছেই।

                    

পরিষ্কার কাশ ফুল হাওয়ায় দোল খায়। গঙ্গা তীরেও কাশফুল ফোটে! পঁচিশ তলা থেকে অনি আর দেবা দোদুল্যমান কাশফুল দেখে যায়। এখন সকাল সাতটা। গঙ্গার জলে কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। একদমই শান্ত। কখন জোয়ার কখনও ভাটা কিছুই বোধগম্য নয়। অন্তত অনি আর দেবার কাছে। নাতিদীর্ঘ পরে কোনো কোনো চটকলে ভোঁ বেজে ওঠে। যদিও চটকল এখন আর আছে কিনা সন্দেহ! অন্তত দেবার জানা নেই। কেননা দেবা একবার ওর বন্ধুর বিয়ে বাড়িতে চন্দননগরে যায়। বন্ধুটি কৃশ। কৃশ সেন। সেও সাউথ পয়েন্টের ছেলে। চন্দননগরে যাওয়ার সময় দেখে গঙ্গার পাড়ের সমস্ত চটকল কারাখানাগুলি বন্ধ। প্রতিটি কারখানার গেটগুলি গরম তাপে বর্ষার জলে শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় কেমন মরচে পরে ক্ষয় থেকে আরও ক্ষয় হয়ে ঝুরঝুরে হয়ে যায়। গেটগুলির কব্জা নিচের অংশ মরচে পরে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অথচ এই চটকল একসময় কত উত্তেজিত ছিল। চটের ব্যবসা ছিল পৃথিবীর বিশেষ ব্যবসা। আজ শুধুই কারখানাগুলির ভিতর ঘুরে বেড়ায় মেঠো মোটা মোটা ইঁদুর। কিছু ছিঁচকে চোর। আর যারা লোহা-লক্কর কেনে। অথচ কৃশ সমরেশ বসুর নাম জানে। চটকল নিয়ে কী কী গল্প আছে সবই ওর মুখস্থ। কেননা কৃশও কিছুটা প্রতিবাদী ছিল। অন্তত ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত। তারপর পাশ করে কোথায় পড়বে, কী নিয়ে পড়বে, পড়ার পর চাকরি পাবে কিনা এইসব নিয়ে যখন ওর ছোটো মাথাটি এলোমেলো তখন আর সাহিত্য-ফাহিত্য ভালো লাগে না। তা না হলে কৃশ স্কুলে থাকতেই জীবনানন্দ, মানিক এঁদের লেখার ভক্ত। পরে কমলকুমার, জ্যোতিরিন্দ্র, সমরেশে মজে যায়।

কমপিউটার সায়েন্স নিয়ে পাশ করে কৃশ বর্তমানে আই টি সেক্টরে বড়ো কাজ করে। কৃশ বিয়ে করে ন-বছর আগে। ধৃতিকে। ধৃতিও সাউথ পয়েন্টের ছাত্রী। কৃশের থেকে এক ক্লাস নীচে। চন্দননগরের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কর্মক্ষেত্রের সুবিধার জন্য একটি ছোটো ফ্ল্যাট কেনে কৃশ নিউটাউনে। ফ্লাট থেকে নিউটাউনের অফিসে যেতে লাগে মাত্র কুড়ি মিনিট। ধৃতি গৃহিনী। বাচ্চা সামলায়, ঘরের কাজ করে, রান্না করে ইত্যাদি। তবে ফুটফুটে দু-বছরের ছেলেকে নিয়ে সারাদিন কিভাবে কেটে যায় ধৃতি বুঝতেও পারে না। মানে একটি ছোটো সুখী গৃহ। দেবা আর অনি কৃশের নিউটাউনের ফ্ল্যাটে প্রথম যায় তাদের ছেলের অন্নপ্রাশনে। নিউটাউনের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে গাছ গাছালির ভেতর দিয়ে ক্যাবে যেতে যেতে পথই হারিয়ে যায়। তারপর নেটের সমস্যার জন্য লোকেশনে পৌঁছোতে প্রায় এক ঘণ্টা দেরি।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *