Skip to main content

Hello Testing

উ প ন্যা স ।  পর্ব ৭

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

ধর্মতলা থেকে পর্ণালি একটি ছ্যাকড়া সরকারি বাস ধরে। এখন সকাল দশটা। হেমন্তের সকাল। চারিদিকে মিষ্টি রোদ— কে. সি দাশের শো কেসে, এম. জে আকবরআলির দরজার কাঁচে, স্টেটসম্যান বিল্ডিং-এর আসে-পাশে, রাস্তায় আর ট্রামলাইনে। বাসটি যাবে মৌলালি হয়ে সিআইটি রোড ধরে পার্কসার্কাসে। পর্ণালির নামার কথা চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের স্টপে। নেমে সোজা লেডি ব্রেবোর্ন। পর্ণালির সবে দু-বছর হয় কলেজে পড়ায়। বাংলায় এমএ অর্নাস। কলেজে বাংলাই পড়ায়। পর্ণালির চেহারার গড়ন ঠিক তন্বী না। তন্বীর পরের স্টেজ। একটু সুঠাম। কোমড়ে সামান্য ভাঁজ। নিতম্ব বেশ হালকা গোলাকার। চুল ঘাড় পর্যন্ত স্টেপ কাট। মানে একজন কলেজ লেকচারারের যেমন চেহারা হয়। চোখে হালকা বাদামি ফ্রেমের চশমা। চশমার ভিতরে একজোড়া রোমান্টিক মায়াবি চোখ। চোখের তারা একটু বেশিই কালো। দুই ভুরুর মাঝে বিন্দুর মতো মেরুন টিপ।

শ্রীরামপুরে ছায়াঘেরা এক ছিমছাম বাড়িতে পর্ণালীরা থাকে। বাড়িতে মা-বাবা-ছোটোভাই আর পর্ণালী। বাবা বাড়ি করে রির্টায়ারের পর, আগে থাকত শ্রীরামপুরেই ভাড়া বাড়িতে। পর্ণালীর বাবার বয়স এখন পঁয়ষট্টি। অত্যন্ত ভদ্র মিষ্টি স্বভাবের এই ভদ্রলোক বাড়ি করে যখন নতুন গৃহে প্রবেশ করে তখন আসে-পাশের অনেকেই নিমন্ত্রিত থাকেন এবং প্রথম আলাপেই অভ্র সেনকে সকলে আপন করে নেয়। অভ্র সেন কম কথা বলার মানুষ। যতটুকু বলে বুঝে-সুঝে বলে। গত পাঁচ বছরে শ্রীরামপুরের এই তল্লাটে অভ্র সেনের কোনো শত্রু নেই। সকালে চা খাওয়া, সংবাদপত্রে চোখ বোলানো, সপ্তাহে তিনদিন বাজার যাওয়া, বিকালে আধঘণ্টা হাঁটা সময় হলে, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে গল্প করা এই নিয়েই জীবন। জীবনে কখনো মদ ছোঁয়নি। অন্য নারীর শরীরের গন্ধ শোঁকেনি। অত্যন্ত সাত্ত্বিক জীবন। বত্রিশে বিয়ে। পঁয়ত্রিশে পর্ণালী। বিয়াল্লিশে ছেলে আদি। ছিমছাম জীবনের পরিষ্কার এক স্থির চিত্র। দীর্ঘ এই পঁয়ষট্টি বছরে অভ্র সেনের মাথায় কোনো বিশাল তেমন চিন্তা ছিল না। শুধু গত এক বছর ধরে একটি ক্ষুদ্র চিন্তা মাথায় ভিতর ঘুনপোকা হয়ে ঢুকে পড়ে। পোকাটি নড়াচড়া করে। কামড়ায়। ডানা মেলে উড়তে চায়। মাথা তখন মৃদু ঝিম হয়ে পড়ে। এই ঝিম হয়ে যাওয়া মানে পর্ণালীর বিয়ের ব্যাপারটি।

অভ্র সেন জানে পর্ণালী শিক্ষিত এক নারী। সে কখনো ভুল পথে হাঁটবে না। কেন না তার শিক্ষা তার রুচি তার জীবনে বড়ো হয়ে ওঠায় চরিত্রে কোনো দূষিত বস্তু নেই। যে দূষিত বস্তুর মাধ্যমে সে ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। পর্ণালী যেমন তার মা স্বরার সঙ্গে খোলামেলা তেমনি বাবা অভ্র সেনের সঙ্গেও খোলামেলা। দু-জনেই তার দুই বন্ধু বিশেষ। মাকে যেমন খোলামেলা ভাবে সব বলা যায় বাবাকেও তেমনি। পর্ণালীর এই তিরিশ বছরের জীবনে কখনো কোনো যুবক গাঢ় ভাবে আসে কিনা কেউ এখনও জানে না। জানে না মানে পর্ণালী কখনো মাকে বা বাবাকে কিছু বলে না। বলেনি। ফলে পঁয়ষট্টির অভ্র সেনকে একটি ঘুনপোকা ইদানিং অল্পবিস্তর বিরক্ত করে। মাঝে মাঝে পর্ণালীর কথা ভেবে সময় কাটে অত্যন্ত বোরিং ও অলসভাবে। ভাবে মেয়েটি কি কাউকেই পছন্দ করে না! কতদিন ‍‌তো স্বরা ওকে পরিষ্কার জিজ্ঞাসা করে ছেলে দেখবে কিনা! কিন্তু পর্ণালী না করে। নিজেও কাউকে পছন্দ করে কিনা বলে না। আবার স্বরা যদি ছেলে দেখার কথা তোলে তখন না বলে! বয়সও এগিয়ে চলে। মেয়েদের সাংসারিক জীবনে বয়স নাকি খুবই বড়ো প্রশ্ন। এখনও মানুষ মনে করে মেয়েদের বেশি বয়সে বিয়ে করা একদম ভালো না। তবে আজকাল একটি মেয়ের স্কুল-কলেজ ডিঙিয়ে নিজের কেরিয়ার তৈরি করতে করতেই তিরিশ হয়ে যায়। পর্ণালী তো আঠাশেই চাকরি পায়। তা হলে আর কেন দেরি!

দু-বছরের আগের এক সকাল। শীতের সকাল। হালকা উত্তরের হাওয়ায় শেডের নীচে শ্রীরামপুরে ডাউন স্টেশনে পর্ণালী। কলকাতার দিকে। একটি দূরে ঈর্ষ দাঁড়িয়ে। ঈর্ষ দত্ত। ঈর্ষও শ্রীরামপুরের ছেলে। সেও দাঁড়িয়ে কলকাতার দিকে। নিত্য সকাল আটটায় ডাউন স্টেশনে ঈর্ষকে দেখতে দেখতে আলাপ। পরিচয়। ভালোলাগার গল্প। ভালোবাসার গল্প ইত্যাদি। পর্ণালীর জীবনে ঈর্ষই প্রথম পুরুষ। প্রথম অজানা জগৎ। নিজের সঙ্গে অন্য এক মানুষের জড়িয়ে থাকায় গল্প। শীতের এই সকালটি পর্ণালীর কাছে বিশেষ এক দিন। লিখে রাখার মতো দিন। পর্ণালী রোমান্টিক। কিন্তু ডাইরি লেখে না। তা না হলে শীতের এই সকালটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লিখে রেখে দিত। অধিকাংশ দিন উবের করে দু-জনে হাওড়া থেকে কলকাতায় আসে। পার্কসার্কাসে পর্ণালী নামে। ঈর্ষ চলে যায় সেক্টর ফাইভ। আইটি অফিসে। ফলে অধিকাংশ দিন গাড়িতে মৃদু-মন্দ গল্প প্রেম-ভালোবাসার ছোঁয়া লেগেই থাকে। স্পেশাল গিফ্‌ট নতুন পারফিউম, চকোলেট আরও কত কি!

পর্ণালী কিন্তু বাড়িতে এই প্রেমপর্ব নিয়ে কখনো কারোর সঙ্গে আলোচনা করে না। করে না আসলে দুটি কারণে। এক, এই সম্পর্কের মেয়াদ কত দিন থাকবে জানে না। দুই, বাড়িতে জানিয়ে বাবা, মা, ভাই কাউকেই দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না। পর্ণালীর দিক থেকে প্রেমটি যতই খাঁটি থাকুক ঈর্ষর দিক থেকে কতটা খাঁটি পর্ণালী সেটা এই একবছরেও জানতে পারে না। একটি সম্পর্ক যদি ঠিক মতো না টেঁকে তা হলে তো সেটা নিয়ে বাড়িতে বলা মানে বোকামি। কারণ রির্টায়ারের পর বাবা যেন মা এবং ভাইকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ছাড়া জীবন কাটাতে পারে পর্ণালী সেটাই চায়। ফলে পর্ণালীর সঙ্গে ঈর্ষর প্রেম চলে নিরবে। অজানা ভাবে। একবছরের প্রেমে পর্ণালী আর ঈর্ষ অনেকবার কাছাকাছি আসতে চায়। কাছাকাছি মানে মানসিকভাবে ও শারীরিক ভাবে। আসলে পর্ণালীর ইচ্ছা ঈর্ষকে খুব কাছ থেকে জেনে নেওয়া। বুঝে নেওয়া। পা বাড়ানো। তেমনি ঈর্ষরও।

ঝাড়গ্রামের প্রথম রাত। রবিবার তেইশে অক্টোবর ২০২৪-এ পর্ণালী আর ঈর্ষ প্রথম একসঙ্গে কাছাকাছি আসে। পর্ণালী বাড়িতে বলে বন্ধুর বাড়িতে দু-দিনের জন্য থাকার ইচ্ছা। স্কুল এবং কলেজের বন্ধু। রেনি। রেনিকে পর্ণালীদের বাড়ির সবাই বহুদিন ধরে চেনে। ফলে রেনির কথা আসায় কেউ কিছু বলেনি। আর বলবেই বা কেন! পর্ণালীর এখন বয়স আঠাশ বেশ বড়ো। অ্যাডাল্ট। শিক্ষিত। রুচিশীল। খুব একটা অনিচ্ছায় ঈর্ষর সঙ্গে ঝাড়গ্রামে আসেনি। বরং ভালোই সম্মতি নিয়ে আসে। এই আসার পিছনে পর্ণালীর যুক্তিও বেশ পরিণত। পরিণত কারণ যদি ঈর্ষর সঙ্গে সম্পর্ক টিকে যায় তাহলে তো ঈর্ষকেই বিয়ে করতে হয়। বন্ধুদের মতো শুধু সম্পর্ক তৈরি করা আর ভেঙে ফেলা পর্ণালী সেই চরিত্রের নয়। বরং প্রথম সম্পর্ক নিয়ে তার অনেক আশা, অনেক কৌতুহল। তেইশে অক্টোবরের সকালে এসে ঝাড়গ্রামে নামে। ওঠে স্টেশন থেকে অল্প দূরে এক নিরিবিলি প্রকৃতি ঘেরা হোটেলে। পর্ণালী জানে এই ঝাড়গ্রামে দু-জনে কাছাকাছি আসা মানেই দু-জনের মনের স্বাধীনতা খুলে রাখা। আরও ঘন হওয়া। একে অপরকে চেনার সুবর্ণ সুযোগ করে নেওয়া। এই সুবর্ণ সুযোগে শুধু মনের স্বাধীনতাই থাকে না, শারীরিক স্বাধীনতাও এক বড়ো পাওনা। কেননা পর্ণালী আর ঈর্ষ শুধু মনের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাসী না। শারীরিক স্বাধীনতাও অঙ্গাঙ্গীভাবে প্রেমে যুক্ত থাকতে বাধ্য। তবেই সেই প্রেম পূর্ণ।

সকালে বেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় পর্ণালী আর ঈর্ষ হোটেলে ফেরার পথে ডিয়ার পার্ক ডুলুং নদীর ধারে কনক মন্দির রাজবাড়ি দেখে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফেরে। পর্ণালী ফিরে ফ্রেশ হয়। স্নান করে। ঈর্ষও স্নান করে। তারপর কালো কফিতে সোফায় শরীর ছেড়ে সারাদিনের ঘোরাঘুরির গল্প করে। ল্যাপটপে কিছু বিদেশি গান শোনে। গান শুনতে শুনতে ঈর্ষ তিন-চারবার গোলাপি চুমু পর্ণালীর গালে ঠোঁটে এঁকে দেয়। আসলে ঈর্ষ যে ঝাড়গ্রামে এইসব করবে বাইরে ঘুরতে আসা তো এইসবের জন্যই। ঘোরাঘুরি শরীর ছুঁয়ে কথা বলা কফি খেতে খেতে মিষ্টি চুমু উভয় উভয়কে উপহার দেওয়া আরও পারলে ঘনিষ্ঠ হওয়া সব কিছু মিলেই একটি নাম প্রেম। সঙ্গে বিশ্বাস। সম্মান দেওয়া। দু-জনের দু-জনের কাছে সৎ থাকা সবই। সবকিছু মিলেমিশে সম্পৃক্ত হলেই একটি আদর্শ প্রেম, একটি আদর্শ সম্পর্ক নির্মাণ হওয়া সম্ভব। পর্ণালী অন্তত তাই জানে। ঈর্ষর কাছে সম্পর্ক বা প্রেমের সংজ্ঞা নিশ্চয়ই একইরকম! অর্থাৎ শরীর মন বিশ্বাস সম্মান দেওয়া নেওয়া দু-জন দু-জনকে ভরসা করা ইত্যাদি সব কিছুই।

জানলার বাইরে হালকা বৃষ্টির রেখা। কাঁচের জানলায় জলের মিহি লম্বা দাগ। রাত প্রায় বারোটা। ডিনার শেষে ঘরে হালকা আলোর নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে দু-জনে বিছানায়। বাইরে বৃষ্টির জলের ঝিন ঝিন শব্দ। আবহাওয়া একটু ঠান্ডা। পর্ণালী ডিনার শেষে দুটি পিল খেয়ে বিছানায় আসে। এই পিল গর্ভনিরোধকের ওষুধ। পর্ণালী তার বিচক্ষণ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েই আসার সময় এই ওষুধ আনে এবং ইচ্ছাকৃত ভাবেই। পর্ণালী তার শিক্ষা রুচি অনুযায়ী কল্পনা করতে বাধ্য হয় যে যখন দু-জন পুরুষ মহিলা বাইরে যায় তখন প্রেম যেমন ঘন হতে থাকে তেমনি শারীরিক ক্ষুধাও বাড়তে বাধ্য। ফলে দুর্বল কোনো মুহূর্ত যদি আসেও বা তাতে যেন বিপদ না হয়। কেননা এই বয়সে অবিবাহিত অবস্থায় বিপদ ডেকে আনা মানে বাবা-মাকে বিড়ম্বনায় ফেলে দেওয়া। আর সেই বিড়ম্বনায় দুটি বয়স্ক মানুষ লজ্জায় ক্ষোভে শরীরে যে ক্ষত তৈরি হবে পর্ণালী সেটা ভালোই জানে।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *