ফি চা র স্টো রি
সৌমেশ পাল
জেন আয়ার: এক নারীর প্রতিবাদের গল্প
ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মহারানি ভিক্টোরিয়ার সময়কাল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে আছে। বরাবরই মানুষের সমাজের ইতিহাস সাংঘর্ষিক অর্থাৎ আগের যুগে যা ছিল পরবর্তীতে তার বিপরীতধর্মী একটা প্রবাহ তৈরি হয়েছে। সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে শিল্প সাহিত্যে। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে Victorian Era ভীষণ বর্ণময়। এর সময়কাল ধরা হয় ১৮৩০ থেকে ১৮৯০। এর আগের সময় ছিল রিজেন্ট যুগ; তখন রাজা অসুস্থ হলে রাজপুত্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হত এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করে। ক্ষমতা হাতে পেয়ে রাজপুত্র নিজেই চরম ভোগবাদী জীবনে প্রবেশ করে, রাজ পরিবারে অবাধ যৌনতা ও পরকীয়ার প্রবেশ ঘটে যায়। শিল্পবিপ্লবের পরবর্তী সময়ে, যারা ব্যবসায়িকভাবে ধনী হয়েছিল, তাঁদের দিয়ে নতুন করে এক অভিজাত শ্রেণীর জন্ম হয়। এই অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে অবাধ মেলামেশা, পরকীয়া, বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক প্রকট হয়ে পড়ে। উলটোদিকে সমাজে আর্থিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। অভিজাত শ্রেণীর বাইরে গড়ে ওঠে অজস্র বস্তি— যেখানে নোংরা পরিবেশ, ঘিঞ্জি আবহাওয়া, পতিতাবৃত্তির আধিক্য দেখা দেয়। মজুর এবং হুজুর সম্পর্কের ভয়াবহ কুৎসিত দিকগুলো ফুটতে থাকে। এরই রিভোল্ট রূপ হয় ভিক্টোরিয়ান যুগ। তাই ভিক্টোরিয়া সময়কাল রক্ষণশীলতা ও নৈতিকতার যুগ। পূর্ববর্তী যুগের সঙ্গে সংঘর্ষ করে এই নতুন সময়কাল উঠে আসে। ধর্মীয় বেড়াজালের নিয়মকানুন, ধর্মীয় নৈতিকতা, কঠোর শালীনতা, ভোগবাদের বিরোধিতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সমাজে বেশ আলোচনা হতে থাকে এবং দমনের চেষ্টা হয়। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এগুলো হাস্যকর লাগবে। কিন্তু সেই সময়ে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
এই সময়েই Commercial Enterprising শুরু হয় ইংল্যান্ডে; নগর থেকে শিল্পনগরীর সূচনা হয়। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক দিকে দারুণ পরিবর্তন ঘটে। বেশকিছু চিন্তক অনুধাবন করেন রক্ষনশীল নৈতিকতার নামে মানুষ এবং সমাজকে ঠেসে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। মানুষ কেমন শিল্প সাহিত্য রচনা করবে তার মাপকাঠি কেমন হবে, এগুলো নিয়ে আলোচনা প্রকট হয়। এই সময়ে Pre-Raphaelite আন্দোলন শুরু হয় মূলত কবিতাকে ঘিরে, যেখানে চিন্তকরা ঘোষণা করেন, শিল্পের আসল নৈতিকতা হল শিল্পী কতটা তাঁর শিল্পকর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান— তার উপর ভিত্তি করে। সমাজ সেটাকে কীভাবে গ্রহণ করবে তা নিয়ে ভাবা শিল্পীদের কাজ নয়। এই যুগ এতটাই রক্ষনশীল হয় যেখানে একজন পুরুষ প্রকাশ্যে ধূমপান পর্যন্ত করতেন না, মহিলারা সাইকেল চড়ার কথা ভুলেও ভাবত না। সমাজের চোখে এগুলো ছিল বেয়াদবি। প্রেম, যৌনতা, পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও অনেক লুকোচুরি তৈরি হয়, অর্থাৎ সমাজের কাছে এই গল্প যেন না প্রকাশিত হয়, তা ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলতে থাকে। অবশ্যই আজকের যুগে এগুলো অবিশ্বাস্য লাগবে। চার্চ অফ ইংল্যান্ডের আধিপত্য এবং ধর্মীয় বেড়াজালের নানান দিক ঘিরে নিতে থাকে সবকিছু। এই সময়ে কিছু চিন্তক যুগটাকে চ্যালেঞ্জ করলেন। তিনজন পণ্ডিতের কথা ভীষণ উল্লেখযোগ্য। সমাজভাবনা ও রাজনৈতিক ভাবনা আমূল বদলে দেওয়া চিন্তার জন্ম দিলেন দুইজন, একজন হলেন এডমন্ড স্পেন্সার এবং অপরজন জন স্টুয়ার্ট মিল। ১৮৫৯ সালে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানল একটি ঘটনা। চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অফ স্পিসিস’ বইটি প্রকাশিত হল, প্রচলিত ধ্যানধারণা বিশেষ করে সৃষ্টিতত্ত্ব হিসেবে বাইবেলে যা বর্ণিত ছিল তার ভিত উপড়ে দিলেন তিনি। সাহিত্য জগতেও মারাত্মক প্রতিফলন ঘটতে থাকল— এতকালের নিয়মের বেড়াজালের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখা। সমাজকে বদ্ধ করে দেবার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চলতে লাগল কলম। সেইরকমই এক অমর সাহিত্যকর্ম ‘জেন আয়ার’।
লেখিকা শার্লট ব্রন্টি যখন এই উপন্যাস প্রকাশ করেন তৎকালীন সমালোচকেরা একে রীতিমতো ‘বেহায়া উপন্যাস’ আখ্যা দেন, কারণ সেই যুগের ভাবনাচিন্তা অনুযায়ী তাঁরা বিচার করেছিলেন। ব্রন্টি পরিবারের ছয় সন্তানের মধ্যে এমিলি, অ্যানি এবং শার্লটের নাম বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। এই ছয় সন্তানই স্বল্পায়ু। শার্লট বেঁচেছেন মাত্র ৩৮ বছর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন পাদ্রী। ‘Clergy Daughter School’-এ তিনি তাঁর চার সন্তানকে পাঠিয়ে ছিলেন, এঁরা হলেন— মারিয়া, এলিজাবেথ, শার্লট এবং এমিলি। চার্চের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তানদের পড়ানোর জন্য এই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। চরম রক্ষনশীল পরিবেশ এবং ধর্মীয় বেড়াজালের মধ্যে এখানে লেখাপড়া শেখানো হত। মনে করা হত কষ্টসহিষ্ণুতাই খ্রীষ্টীয় জীবনের মোক্ষ। ফলে তীব্র শীতে পর্যাপ্ত জামাকাপড় দেওয়া হত না, পর্যাপ্ত জ্বালানি কাঠ দেওয়া হত না, খাবারের গুণগতমান ভালো ছিল না, গরম জল দেওয়া হত না— এইভাবে কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়ে তাদের জীবন-যাপন অভ্যাস করানো হত। এতে মাঝে মাঝেই রোগের আধিক্য ঘটত। বিশেষ করে যক্ষ্মা এবং নিউমোনিয়া দেখা দিত। চার বোনের মধ্যে প্রথমে মারিয়া, পরে এলিজাবেথ এই স্কুলে যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এই ঘটনা শার্লটকে ভীষণ প্রভাবিত করে যার প্রতিফলন ‘জেন আয়ার’ উপন্যাসে লক্ষ্য করা যায়।
মূল চরিত্র জেন আয়ার অনাথ মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠেছিল মিসেস রিড নামে আত্মীয়র বাড়িতে। এখানে সে কোনোদিন আদর যত্ন ভালোবাসা পায়নি। প্রতি নিয়ত খারাপ ব্যবহারের শিকার হয়েছে। এরপর তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় Lowood School-এ। এই স্কুল শার্লট আর তার তিন বোনের সেই স্কুলের আদলে দেখানো হয়েছে। রক্ষণশীলতার চরম বেড়াজালে আবদ্ধ সেই স্কুলেও সীমাহীন কষ্ট, অত্যাচার সহ্য করেছে জেন আয়ার। এখানে পরিচয় হয় হেলেন বার্নসের সঙ্গে। হেলেনের চরিত্রের আসল রূপ শার্লটের দিদি মারিয়া। হেলেন গভীর ধর্মবিশ্বাসী, কষ্টের জীবন সহজে মেনে নিতে চেষ্টা করেছে এবং পার্থিব কষ্ট উপেক্ষা করে মৃত্যুর পর স্বর্গীয় জীবনের প্রত্যাশী সে। রোগাক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। জেন এখানে সংগ্রাম করে বড়ো হয়। ছোটোবেলা থেকে বই পড়ুয়া এবং চিন্তাশীল হিসেবে তার মনে প্রচলিত ধারণার প্রতি বিরূপ চিন্তার জন্ম হয়। পরে সে শিক্ষিকা হয়। সে ধর্মে অবিশ্বাস করে না, কিন্তু রক্ষণশীলতা, আবদ্ধতার প্রতি বিরূপ থেকেছে এবং সেই যুগের নারী হয়েও দারুণ আত্মসচেতন হয়েছে। ধর্মীয়ভাবে বা প্রথাগতভাবে চাপানো রক্ষনশীলতা না মানলেও নিজের আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতার প্রশ্নে অবিচল থেকেছে। বিবেকের ডাকে সে চলেছে। এরপর সে এসেছে গভর্নেস হিসেবে থর্নফিল্ড হলে। এর মালিক মিস্টার রচেষ্টার আভিজাত্য অহংকারে পূর্ণ হলেও জেন তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই যুগের মেয়ে হয়েও জেন নিজের মর্যাদা ধরে রেখেছে। সে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে সত্যিকারের ভালোবাসা মানে শুধু আবেগ নয়, বরং নৈতিকতা, সম্মান এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। রচেষ্টারের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হবার পর বিয়ের দিন যখন জেন জেনেছে তিনি ইতিমধ্যেই বিবাহিত এবং তাঁর স্ত্রী এক মানসিক রোগী, যাকে তিনি লুকিয়ে রেখেছেন। জেন তৎক্ষণাৎ বিয়েতে নারাজ হন এবং রচেষ্টারকে ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়ান। রচেষ্টারের অর্থ, আভিজাত্য তাকে আটকাতে পারেনি। সে নির্দ্বিধায় ঘোষণা করেছে, Do you think I am an automaton! অর্থাৎ শুধুমাত্র নারী বলেই সে কোনো প্রেমের বস্তু নয়, সেও একজন মানুষ। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার মুখে এটা ছিল এক চরম চড়।
এরপর নিঃস্ব অবস্থায় জেন জন রিভারের পরিবারে আশ্রয় নেয় সে। পরবর্তীতে এক উত্তরাধিকার মারফত সম্পত্তির অধিকারী হয়। এখানে জেন ধনী হয়ে ওঠে। জন রিভার মিশনারী হিসেবে ভারতে যেতে চায় তখন জেনকে মিশনারী স্ত্রী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু জেন তাকে বিয়ে করেনি। কারণ পার্থিব প্রেমের গুরুত্ব জন বোঝে না। একমাত্র ধর্মপ্রচারের কাজকে সে দায়িত্ব মনে করে। শুধু প্রয়োজনীয়তার খাতিরে জেনকে সে চেয়েছে। জেন এখানে পার্থিব ভালোবাসা, প্রেমের তাৎপর্য বুঝতে পেরেছে, ধর্মান্ধ মতবাদ বর্জন করেছে। এই সময়ে জেন হঠাৎ স্বপ্ন দেখে রচেষ্টার তাকে ডাকছেন! সে আবার ফিরে আসে। এসে দেখতে পায় রচেষ্টারের বাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে, আগের স্ত্রী মৃত এবং এই দুর্ঘটনায় রচেষ্টার নিজের দৃষ্টিশক্তি এবং এক হাত হারিয়েছেন। সেই আগের রচেষ্টার আর নেই। সেসময় জেন পাশে দাঁড়িয়ে প্রেমকে স্বীকৃতি দেয় এবং রচেষ্টারকে বিয়ে করে। এই বিয়ে যখন ঘটে তখন জেন সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত, সেও তখন ধনী। জেন নিজের সীমাহীন জীবনসংগ্রামের মাধ্যমে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়ে, নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে, কখনও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপোষ না করে, নারী হিসেবে নিজেকে গৃহে আবদ্ধ না করে, কারোর উপর নির্ভরশীল না হয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনে অনেক এগিয়ে গেছে এবং উত্তরাধিকার মারফত ধনী হবার পর প্রেমিককে বিয়ে করেছে।
উপন্যাসের গল্প নিজেই বর্ণনা করেছে জেন। দেখানো হয়েছে জেনই যেন উপন্যাসটা রচনা করেছে। একদম শেষ অংশে এসে পাঠকের কাছে সে বলেছে, Reader, I married him; সেই যুগের প্রেক্ষাপটে কী ভয়াবহ কথা! তখনও পর্যন্ত পুরুষ নারীকে পছন্দ করে, প্রেমে আবদ্ধ হয়, বিয়ে করে অর্থাৎ সবকিছুই ঘটে পুরুষের সিদ্ধান্তে। সেখানে এক নারী সগর্বে পাঠকের কাছে ঘোষণা দিচ্ছে, তার প্রেমিক তাকে বিয়ে করেনি, সেইই বরং প্রেমিককে বিয়ে করেছে। আরেকটি দিক, জেন প্রেমের সম্পর্কে থেকেছে এক বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে, যদিও না জেনে এবং পরবর্তীতে বিপত্নীক সেই পুরুষকে বিয়ে করেছে। ভিক্টোরিয়ান রক্ষনশীল বেড়াজাল বেষ্টিত নৈতিকতার মাপকাঠিতে এটি তো চরম ঘৃন্য! এইরকম এক প্লট দিয়ে যে লেখিকা লিখলেন, সেই সময়ের সমালোচনা তার জন্য কেমন হতে পারে! তখন কিন্তু কেউ ভাবেনি যে এই উপন্যাস একদিন কালজয়ী হবে। বরং পদে পদে রক্ষনশীল চিন্তাকে যেভাবে আঘাত করে গেছে এই উপন্যাস, তাতে একে ‘বেহায়া’ বলাই ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক। কিন্তু জেন আয়ারের প্রতিবাদ আজও ধ্বনিত হয়ে চলেছে সাহিত্যের ইতিহাসের পাতায় পাতায়।
ভালো লাগলো পড়ে
অসাধারণ একটা বই সম্পর্কে জানতে পারলাম।
পাঠপ্রতিক্রিয়ার এমন সুন্দর লেখাটির জন্য সৌমেশকে ধন্যবাদ।
নিঃসন্দেহে খুব ভালো উপন্যাস। পাঠ প্রতিক্রিয়া বেশ উপভোগ্য।