Hello Testing

মু ক্ত গ দ্য

শুভ রায়চৌধুরী

SUBHA_ROYCHOWDHURY

বাক্সবন্দি ঘাসফড়িং

ইরা, এখানে শুধু মাথার ওপর ওই নীলাভ নিষ্প্রভ আলোটা… চোখ খুললেই মুখের দিকে চেয়ে থাকে অনিমেষ দৃষ্টিতে। জানালা নেই। কিভাবে পড়ি বলতো?

একটা বড় সিন্দুকের মতো এই ঘরটা। স্থির ছাদটা শরীরের ওপর চেপে বসেছে। বিছানায় শুয়ে থাকি। একভাবে। বলো, কী করে যাব তোমার কাছে?

এখন হয়তো সকাল; হয়তো-বা রাত। কিংবা সবটাই স্বপ্ন। যেন স্বপ্নে এসেছি এখানে… কিন্তু আমি কে? আমি কি নিজেই একটা স্বপ্ন?

আমি কে, ইরা? এই বাঁধনগুলো কি বলতে পারে আমি কে?

কব্জি এবং গোড়ালিতে বাঁধনের অসহ্য চাপ কি একধরনের প্রমাণ হতে পারে? হাত দুটো মাথার উপরে সোজা করে বাঁধা। পা দুটোও। আমার জীবনের আর কী প্রমাণ আছে? যে-পথ আমাকে এই ঘরে নিয়ে এসেছে, সেই পথ ধরে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারব?

আমি এখানে এক অরণ্যশীলার মতো পড়ে আছি। মানব-সংস্পর্শ থেকে দূরে; চেনা সব উদ্দীপনা থেকে দূরে। ঘড়ি নেই। এমন কিছু নেই যা আমাকে তারিখ বলতে পারে। কোনো পাখির কিচিরমিচির নেই। আমার নামে চিঠি আসা নেই। সময়কে উষ্ণ করে তোলার জন্য তোমার হাতটাও নেই।

আচ্ছা ইরা, তুমি থাকলে কি আমি তোমাকে আগের মতো ছুঁতে পারতাম?

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমার মতো উন্মাদরা সমস্ত বাঁধনের বিরুদ্ধে ছটফট করেছে। সভ্যরা ভাবে, এই সব বাঁধন নাকি পাগলামির আপাত বিপদ থেকে ওদের রক্ষা করে। আর এদিকে আমরা ইট-প্লাস্টারের ফিকে রঙচটা দেয়ালের দিকে চিৎকার করেছি বারবার। ওই দেওয়াল কি সত্যি মন শান্ত করতে পারে?

কে দেখেছে আমার দেহটাকে মাকড়সার জালে পড়া পতঙ্গের মতো ছটফট করতে? কে শুনেছে আমার শেষ আর্তনাদ যা ক্রমশ পরিণত হয়েছিল গোঙানিতে? একজন উন্মাদ কত জোরে চিৎকার করলে তবে সে মুক্তি পায়?

ইরা, আমি বিছানার চাদরে এঁকে রেখেছি সমস্ত প্রত্যাখ্যান।

আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো নষ্ট যন্ত্রের মতো। কখনো কখনো হাত-পা এদিক-ওদিক সামান্য কেঁপে ওঠে। কয়েক ইঞ্চি নড়াচড়াতেও কষ্ট হয়, বাঁধন টানটান হয়ে আরও বেশি আঁকড়ে ধরে। এই অবিরাম ঘষা লেগে চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সত্ত্বেও আমি চেষ্টা চালিয়ে যাই এটা দেখতে যে, কোনো বাঁধন কি আলগা হল? অন্তত একটি অঙ্গ যদি শিকল মুক্ত হয়ে অবাধ বাতাসের স্পর্শ অনুভব করতে পারত!

ইরা, যদি কখনো বন্দিদশার এই দিনগুলি শেষ হয়, তখন কী অবশিষ্ট থাকবে আমার? চাদরের ভাঁজগুলোকে কি সহজেই ধুয়ে ফেলা যাবে? আমি কল্পনা করি, দেখি, অ্যামোনিয়ার গন্ধের মধ্যে শুকনো তুলোর খসখস শব্দে একটি পালতোলা নৌকার মতো সাদা কাপড় বাতাসে উড়ছে… উড়ছে… উড়ছে… উড়ছে… কিন্তু কোনো দিকেই যাচ্ছে না।

 একাকি বন্দিজীবনে কোনো মেটাফোর কাজ করে না। মেটাফোরের মূল ব্যুৎপত্তি হল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া, এক অর্থ থেকে অন্য অর্থে বয়ে নিয়ে যাওয়া। সাহিত্যকে কি ভীষণ দুর্বল মনে হয় আজকাল!

‘একাকি বন্দিজীবন’ এই শব্দবন্ধটা ভুল, কারাগার এবং তার শাস্তির জগৎ থেকে ধার করা। একজন রোগীও  একাকি এবং বন্দি— কিন্তু সাধারণ চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় না। ‘নিভৃতবাস’ শব্দটি শুনলে একজন হয়তো কোনো হোটেল বা রিসর্টের ছবি কল্পনা করতে পারেন, যেন কেউ দশদিনের জন্য বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে শান্তি আর নিভৃতবাস উপভোগ করেছিল।

ইরা, এসো তোমাকে কিছু শব্দ শেখাই, ‘নিভৃতবাস’ ছাড়া মানসিক চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ— বিচ্ছিন্নতা, অ্যাকিউট ওয়ার্ড, বন্ধ কক্ষ, শান্ত কক্ষ, আসবাববিহীন কক্ষ, সুরক্ষা কক্ষ, রিহ্যাব, পৃথকীকরণ ইউনিট, প্যাডেড সেল! এই শব্দগুলো সব, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে মাথার ওপরের ওই নিষ্প্রভ আলোটার মতোই।

একটি লেখা কেমন হবে যদি তা এ ঘরেই আটকে থাকে যেখানে কোনো রোদ নেই, কোনো গাছ নেই, কোনো পত্রিকা নেই, কোনো বই নেই, কোনো সমাজ বা সম্পর্ক নেই, কোনো কথোপকথন বা চলাচল নেই; যেখানে শুধু আছে বাঁধা হাত-পায়ের সামান্য বিদ্রোহী নড়াচড়া? কিছুই ঘটে না এখানে। আমার মনটাও আর আমার নেই, ইঞ্জেকশনের প্রভাবে অসাড় হয়ে গিয়েছে। ঘটনাহীন এই স্থবিরতাও যেন সুস্থ মানুষদের জন্য যথেষ্ট নয়!

ইরা, আমার এই নিভৃতবাসের অনুভূতি, অভিজ্ঞতার কথা কখনো কি কেউ জানবে? (‘নিভৃতবাস’ শব্দটা ব্যবহার করে নিজেকে আপাত সুখ দিলাম।)

এখানে সংযমের অর্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাধীনতাকে মুছে ফেলা। সংযম আর নিভৃতবাস। একজন রোগীকে বিছানায় বাঁধো আর বিচ্ছিন্ন করে রাখো, এই তো মাত্র! এক বাক্যে একসঙ্গে থাকে শব্দ দুটো। এখন মাঝে-মাঝে ভাষাকেও ভীষণ অসহায় মনে হয়!

ইরা, তুমি কি সাক্ষী থাকবে আমার এই অনির্দিষ্টকালের বন্দিজীবনের? আমার শরীরটাকে এভাবে স্থির রাখা হয়েছে; অথচ এমনটা থাকার কথা ছিল না। একজন মানুষের ইচ্ছাকে চাইলেই কী অবলীলায় আটক করা যায়, নৈঃশব্দে মুড়ে ফেলা যায়! একজন সুস্থ মানুষ যাতে বিরক্ত না হন, একটা সমাজ যাতে স্বাভাবিক ছন্দে থাকে, তাই এই ব্যবস্থা, আমার সংযোগহীন আখ্যান-শুয়োর!

একাকি। লিখছি। দেওয়ালে।

একাকি। বিচ্ছিন্ন। শূন্যগর্ভে।

ঘরের বাইরে কোথাও একটি হাত করিডরের আলো বন্ধ করতে এগোলে, আমাকে চোখ বন্ধ করতে হয়। কিন্তু তাতে কী আসে-যায়? চোখ খোলা বা বন্ধ, সাদা দেওয়াল বা কালো দেওয়াল, দিন বা রাত, মিনিট বা ঘণ্টা— দেখার মতো কিছুই নেই… সকাল, দুপুর এবং সন্ধ্যা জুড়ে ঘুম গড়িয়ে যায়।

ইরা, তোমার মুখটা যদি আমার চোখের সামনে থাকত, তবে আমি ঠিক বুঝে নিতাম সময়ের দোলাচল।

ওষুধ, ইঞ্জেকশন, শিকল—স্মৃতির ভাস্কর্য ভেঙে দেয়। ওষুধের ভার হত্যা করে আমার অনির্ণেয় সময়।

এখন অনেক কিছু আবছা হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই কতগুলো বিন্দু, কতগুলো রেখা, কতগুলো জ্যামিতিক আকার, সব চলমান, সব রঙিন… সে-সব কি মানুষের চলাচল, গাড়ির চলাচল নাকি পাখিদের?

তারা কি সত্যিই একদিন আমার সামনে রোদের শহরে ছিল?

আমার এই স্থির-বর্গক্ষেত্রে সংযম নিয়ন্ত্রিত হয় দু-ভাবে— যান্ত্রিক এবং রাসায়নিক। যান্ত্রিকভাবে বলতে শারীরের বাইরের সরঞ্জামগুলো, অর্থাৎ শিকল, চিকিৎসাযন্ত্র, নিরাপত্তা কর্মী বা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। রাসায়নিকভাবে বলতে সমস্ত ওষুধ। এই দুই প্রক্রিয়াতে আমার অবশিষ্ট কার্যকলাপ বশ্যতাস্বীকার করে।

আমার বন্ধুরা এখন কোথায়, ইরা? বাড়িতে? নাকি কাজে? রাত কি অনেক হয়েছে?

এক গ্লাস জলের জন্য কাউকে ডাকতে কি দেরি করে ফেলেছি? সবাই কি অনেক দূরে চলে গেছে? এক গ্লাস জল দিয়ে আমি বুঝি সময়ের দৈর্ঘ্য। এক চুমুক, দুই চুমুক… এভাবে তৈরি হয় আমার নিজস্ব ঘড়ি।

বাঁ হাতে অসাড়তা। কাঁধের স্নায়ুতে ঝিঁঝিঁ ধরা অনুভূতি। দীর্ঘ বিকৃতির কারণে লিগামেন্ট অনমনীয়। ব্যথা মোচড় দিয়ে পেশীর গভীরে বাসা বাঁধে।

ইরা, কেন লিখছি এ কথাগুলো? এসব লেখালিখির আদৌ কি কোনো মানে আছে? ক্ষয়, নিরতিশয় ক্লান্তি আর মৃত্যু-আকাঙ্ক্ষার নিশ্চয়তা শুধুমাত্র… এই জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। ধূলিস্যাৎ করে দিতে চাই এই শরীর, যেটা একটু-একটু করে মানব-অবয়ব পেয়েছিল। আমি মানুষ হয়েছি, না-বুঝেই উন্মাদ হয়েছি। এই দুনিয়ায় কেউ নিজের ইচ্ছেমতো কিছু পেয়েছে কি?

আমার শরীরে এক অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের বসবাস। তাকে অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে আসতে বলি। জানি সে কী করতে চায়, ভালোমতোই জানি। তুমি যদি ওকে ভালো করে দেখো, বুঝতে পারবে ওর ভেতরে, সর্বত্র, প্রতিহিংসা অধিমাংসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ও রোগমুক্ত হতে চায়। অন্যকে আঘাত করে নিজেকে বাঁচাতে চায়। আমার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুড়িয়ে ফেলতে চায়। ওর চোখে কাপুরুষোচিত দৃষ্টি।

কে শোনাবে ওর শৈশবের সুর? কে খুঁজে দেবে ওর খেলনাগুলো?

ইরা, তুমি পারো না?

কৈশোরে আমি ‘শোক’-এর অর্থ বুঝতে শিখেছিলাম। এখানে এসে কিভাবে যেন বুঝে গেলাম ‘আবর্জনা’-র অন্তর্নিহিত বিরহ! ইরা, জেনো, কাউকে দূরে ঠেলে পরিত্যক্ত করে সুস্থ করে তোলা যায় না।

দেওয়াল-জুড়ে আমার লিখে চলাটা এক অন্তহীন প্রক্রিয়া। আমার হাত দুটো, আঙুলগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। এত এত শব্দ, লিখিত বাক্য সব হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবটা অ্যাবস্ট্রাক্‌ট পেইন্টিং— আঁকছি এবং অলক্ষ্যে কেউ সেটা পড়ছে। কিন্তু যা লিখতে পারছি না, সে-কথা যদি কেউ পড়ে ফেলতে সক্ষম হয়? এই সব শব্দ, এই সব বাক্য তবে কার ইরা?

অন্ধকারে আমি তোমার মুখ খুঁজি। আঙুলের হালকা স্পর্শে আদর করি। অনুভব করার চেষ্টা করি তোমার মুখটা… কিন্তু আমাকে তুমি শুনতে পাও না, আমার নৈঃশব্দ তোমার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করো না। কেন ডুবতে চাও না আমার অতলে?

বোঝা ও জানার মাঝে থেকে যায় একটা অপরিমিত দূরত্ব, একটা মুখ থেকে অন্য মুখের ব্যবধান কমাতে পারি না কিছুতেই। আমি হারিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ, যেভাবে হারিয়ে ফেলেছি চরিত্রগুলোকে।

আমার সব সংলাপ প্রতিনিয়ত নিক্ষিপ্ত হচ্ছে নৈঃশব্দে। আমি উন্মাদের মতো এগুলো লিখে চলেছি, কারণ যা লিখতে চাই তা এখনো লিখতে পারিনি। এটা শুধুমাত্র একটা প্রস্তাবনা। আমার জীবনের এই অংশে এমন একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে যার গিঁট খুলতে পারছি না। কিন্তু এখানে আমি শুধু মৃত-ভাষা বুনে লিখছি আর লিখছি… ঠোঁট খুলে শব্দ গুনতে গুনতে— এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট… আর শুধুই সৃষ্টি হচ্ছে বাক্যের মাঝে শূন্যতা… জেগে রয়েছে শুধুমাত্র একটা অর্থহীন ক্ষ…

এখানে আমার জৈবিক সময় ঘন হয়ে জমাট বাঁধছে ক্রমশ, যেভাবে কাদা শুকিয়ে যায়। আমার কান্নায় কেউ সাড়া না-দেওয়ায় চরম ভয় গ্রাস করছে। কেউ নেই, কোনো চিহ্ন নেই, ছাতিমফুলের গন্ধের ঘোর নেই, কাশফুলের বাহুডোরে শিশির-ভেজা ঘাস নেই।

মৃতরাও বাঁচতে চায়। আমি কি একবার ফিরে পেতে পারি না মহুয়া-মাদলের সেই বন-জ্যোৎস্নার রাত? একবার কি দেখতে পারি না নীল ব্যালেরিনার নাচ?

এই ইরা, ইরা… এই… শুনছ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *