Hello Testing

ভ্র ম ণ

রিক্তা দাস মহাপাত্র

rikta

লখনউয়ের শাহী গোলাপ ‘কাইজরবাগ’

একটা নরম ঘন কুয়াশা মাখা ভোরে লখনউ চারবাগ স্টেশনে নেমে আমরা প্রথমেই রহিমের দোকানে প্রাতঃরাশ করতে চলে গেলাম। কুয়াশা সরিয়ে সরিয়ে অটো যাচ্ছে আকবরী গেটের দিকে। চোখ বন্ধ বাকি সব সোয়েটার আর টুপি দিয়ে ঢাকা, তাই বাইরের দৃশ্য দেখা হয়নি। তবে ভোরে এত ঠান্ডায় রাস্তাঘাট জনশূন্য ছিল না। আকবরী গেটে নেমে একটু হেঁটেই দোকানের সামনে পৌঁছোলাম। একদিকে আদা-চা ফুটছে, অন্যদিকে দোকান সদ্য তার দরজা খুলেছে। আর আমরাই প্রথম অতিথি। নিহারী আর কুলচা অর্ডার দিয়ে উনুনের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। নরম কাঁচা কুলচাকে অল্প দুধের ছোঁয়া দিয়ে ভাটিতে রেখে দেওয়া হল। কুলচা লালচে রঙে সেজে নিহারির সাথে আমাদের টেবিলে চলে এল। সেই মখমলে প্রাতঃরাশ আর অবাধ্য ঠাণ্ডার যুগলবন্দীর সাথে গণেশগঞ্জে হোটেলে এসে পৌঁছোলাম।

মুশিরজাদীর সমাধি

তারপর সেজেগুজে তৈরি হয়ে মোড় থেকে টোটোয় উঠে পড়লাম। ‘আওয়াধ’ কথাটা সংস্কৃত শব্দ ‘অযোধ্যা’ থেকে এসেছে। উর্বর মাটির জন্য আওয়াধ ভারতের শস্যাগার হিসেবে পরিচিত। দিল্লিতে মুঘলদের সূর্যাস্তের পর আওয়াধ মুসলিম নবাবদের ছত্রছায়ায় উত্তর ভারতের সঙ্গীত, স্থাপত্য, শিল্প, ধর্মীয় পীঠস্থান হয়ে ওঠে। অযোধ্যা, লখনউ, ফইজাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলগুলো আওয়াধের সীমানায় পড়ে। পরবর্তীকালে লখনউতে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয়। সময় বয়েছে তার সাথে আওয়াধে দিল্লি সুলতান, শর্কি সুলতান, মুঘল প্রমুখদের পতাকা উড়েছে।

লখনউয়ের স্থাপত্যশৈলী অপূর্ব। আওয়াধের নবাবরা মুঘল স্থাপত্যকে বজায় রেখে তাঁদের নতুন নতুন ভাবনা দিয়ে লখনউয়ের স্থাপত্যকে সাজিয়েছেন। লখনউয়ের ক্যানভাস জুড়ে তাই ইন্দো-ইসলামিক ও ইউরোপীয়ান ছোঁয়া দেখা যায়।            

আওয়াধের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর তৈরি আওয়াধের সুন্দর একটা টুকরো হল এই কাইজরবাগ। ১৮৫৮ তে সিপাহী বিদ্রোহের সময়কালে উন্মত্ত ব্রিটিশ বাহিনী যেভাবে কাইজরবাগ লুট করেছিল তা নিয়ে আইরিশ সাংবাদিক William Howard Russell একটি তথ্যপূর্ণ বিবরণ লিখেছেন। গাড়ির আওয়াজে ব্যস্ত কাইজরবাগে টোটো এসে দাঁড়ালো। এবার আমাদের নবাব ও কাবাবের শহর লখনউ দেখা শুরু হল। এই পর্বে শুধু কাইজরবাগ নিয়েই লিখব।

নবাব সাদাত আলি খানের মকবারা

টোটো থেকে নেমে চারিদিকে শুধু কালো কোর্ট-এর ভিড় দেখলাম। পরে বুঝলাম লখনউ ডিস্ট্রিক্ট এবং সেশন কোর্ট, লখনউ হাইকোর্ট (fire), সিভিলকোর্ট সব এখানেই আছে। তাই চারিদিকে এত উকিলদের ভিড়। রাস্তার ধারে অনেক রকমের খাবার দোকান রয়েছে। কাইজরবাগের প্রেক্ষাপট স্বাভাবিকভাবেই সাদামাটা নয়। দুটো সুন্দর গেট আছে কাইজরবাগ পশ্চিমী গেট আর পূর্ব গেট। লাখি গেট বা কাইজরবাগ পশ্চিমী গেট রয়েছে প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য।

পুরো লখনউ জুড়ে যেটা আমার নজর কেড়েছে তা হল নবাবদের এই গেটগুলোর কারুকার্য সাথে জোড়া মাছের ব্যবহার। মাছ ছিল আওয়াধের রাজ প্রতীক। তাছাড়া লখনউয়ের স্থাপত্যশৈলীতে মাছ, ছত্রী, লাখৌরি ইঁট প্রভৃতির ব্যবহার দেখা যায়। গেট সম্পর্কে তথ্য পাথরের একটা ফলকে এপিঠে-ওপিঠে হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা। লখনউয়ের সব ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই এই বর্ণনামূলক ফলক রয়েছে। তাই তথ্য জানতে অসুবিধে হয় না। ইন্দো-সারসেনিক ও আওধী স্থাপত্য শিল্পের আকর্ষণীয় নিদর্শন এই লাখি গেট এক লাখ মূল্যে ১৮৪৭ থেকে ১৮৫০ এর মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে ওয়াজেদ আলী শাহের বৈভবের সময় প্রতিফলিত হয়।

লাখি গেট পেরিয়ে কাইজরবাগ চত্বরটা পুরো ঘুরে নিলাম। প্রথমেই একটা সুন্দর পার্ক নজরে এল সাথে তার গা লাগোয়া একটা সুন্দর বাড়ি। কিন্তু পার্কের ভিতরে গিয়ে দেখলাম ওই বাড়িটা পার্কের বাইরে আছে। সেইমতো ঘুরপথে গিয়ে বাড়িটার গেটের সামনে দাঁড়ালাম। বাড়িটা হল ১৯২৬ সালে পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে দ্বারা নির্মিত ‘সঙ্গীত স্কুল ভাতখন্ডে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়’। যার পূর্ববর্তী নাম ছিল ‘Marris College of Hindustani Music’. ভিতরে প্রবেশ করা যায়নি। বাইরে থেকে দেখে আমরা সফেদ বারাদরীর কাছে গেলাম। কাইজরবাগের শ্বেতবর্ণের এই প্রাসাদ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ ১৮৫০-এ ‘শোকের প্রাসাদ’ হিসেবে তৈরি করেছিলেন এবং নাম দিয়েছিলেন ‘Qasr-ul-Aza’. প্রথমদিকে এই বিল্ডিংকে ইমামবাড়া রূপে ব্যবহার করা হত। মহরমের সময় কারবালাতে নিহত ইমাম হুসেইন ও তাঁর অনুগামীদের জন্য শোকপ্রকাশ বা Azadaari করা হত।

ছাদ থেকে মকবরা

১৮৫৬-তে আওয়াধ দখলের পর ব্রিটিশরা এটিকে পিটিশনের জন্য ব্যবহার করেছে। বারাদরীর ভিতরের মেইন হলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন অফ আওয়াধের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা মান সিং ও দিগ্বিজয় সিং-এর স্ট্যাচু রয়েছে। বারাদরী দেখে রাস্তা পার হয়ে কাইজরবাগের পূর্বদিকের গেটটা দেখলাম। পশ্চিম গেটের মতোই তার সাজ। কাইজরবাগে গেটের এইদিকের রাস্তাঘাট খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সবুজ পরিবেশ। হাঁটতে হাঁটতে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের নির্মিত ‘পরীখানা’ পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। ১৮৫৭ র বিদ্রোহে পরীখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৮৬৭-তে জন লরেন্স এটিকে মহলে রূপান্তরিত করেন। পরে এখানে রাজকীয় পুরাতত্ত্ব সংগ্রহালয় ও ভাতখন্ডে সঙ্গীত বিদ্যালয়ের স্থাপনা হয়।

          কিছুটা হাঁটার পরে দূর থেকে দেখলাম আওয়াধের ষষ্ঠ নবাব সাদাত আলী খানের মকবারার চূড়া উঁকি দিচ্ছে। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করল। লখনউ ভ্রমণে এটা দেখার জন্য খুব উৎসুক ছিলাম। ডানদিকে ঘুরে সমাধির সামনে এলাম। কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। সবুজ এক ফালি বাগানের মাঝে নবাবের সমাধি। রোদের আলোয় ধুয়ে সমাধি তার ধুলোয় মাখা জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি দেখাচ্ছিল। গেট থেকে সেই সৌন্দর্য্য দেখে চোখে-মনে শুধুই মুগ্ধতা ফুটে উঠল। Archeological Survey of India-র অধীনে থাকা এই সমাধির ব্যাপারে বলতে হয় যে সাদাত আলী খানের (শাসনকাল ১৭৯৮-১৮১৪) ছেলে নবাব গাজীউদ্দিন হায়দার এই সমাধিটি তৈরি করেছিলেন। এই স্থানেই গাজীউদ্দিন রাজকুমার রূপে থাকতেন। নবাবের এই সমাধি ‘লাখৌরি’ নামের একপ্রকারের সরু ইঁট দিয়ে তৈরি। গোলাকৃতি দোতলা গম্বুজের এই সমাধির স্থাপত্য ভিতরে প্রবেশ না করলে বোঝা যাবে না কি আশ্চর্য রকমের সুন্দর এর নির্মাণ শৈলী। স্বল্পমূল্যে একজন গাইড নিয়ে আমরা সমাধির ভিতরে গেলাম। তখন ওখানে আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটক ছিল না। খুব বেশী পর্যটকের ভীড় যে হয় তা নয়। মাথার ওপর বিশাল নকশী কাটা গোল গম্বুজের ছাদ, দরজার অপূর্ব কারুকার্য, সাদা-কালো চৌখুপী মেঝে দেখে তাক লেগে যাবে। হল ঘরের মাঝে একটা সবুজ রঙের কাঠামো রাখা। ঠিক এর নীচের ভল্টে রয়েছে নবাবের চিরনিদ্রা সজ্জা।

কাইজরবাগ পশ্চিমী গেট

একতলা দেখে সরু সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে চারিদিকের দৃশ্যটা মোহিত করে দিয়েছিল। ছাদটা খুব সুন্দর। উনি বললেন ভিতরে যাতায়াতের জন্য এখন একটা রাস্তাই খোলা রাখা হয়েছে বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পরে দেখলামও। ওপরে পৌঁছে একটা ঘেরা জায়গায় শব্দ প্রতিধ্বনির খেলা দেখলাম। বুঝলাম নীচের গম্বুজের ঠিক মাথায় আমরা রয়েছি। গাইড কাহিনিগুলো বলছিল, ওখানে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে তারপর শুনতে শুনতে মাটির নীচের ঘরে নেমে এলাম।

খুব অন্ধকার তাই মোবাইলের আলো জ্বেলে নিলাম। এবার নবাবের সমাধি দেখব। গাইড দাদা সব খুঁটিনাটি বলছিলেন। কিভাবে দিনের নির্দিষ্ট একটা সময়ে ছোটো ছোটো খুপড়ি দিয়ে এই অন্ধকারে সূর্যের আলো আসে। আমরাও সেটা দেখলাম। তখনকার গুণী স্থপতিদের দক্ষ বুদ্ধি, বিদ্যা ভাবনা দেখে অবাক হচ্ছিলাম। ওই গাঢ় অন্ধকারে নবাবের উপস্থিতি ভয় দেখাচ্ছিল না বরং একটা শীতল শান্তি ছিল। এখানে মোট তিনটি সমাধি আছে। মাঝখানে নবাব ও দুপাশে তাঁর ভাইরা আছেন। আর এর ওপরে নবাবের পরিবারের পাঁচটি সমাধি রয়েছে। আমরা ওপরে এসে সমাধির বাইরে চলে এলাম।

এবার ডানদিকে নবাবের স্ত্রী মুশিরজাদীর সমাধির দিকে গেলাম। কাঠ গোলাপের ছায়ায়, পায়রাদের ডানার হাওয়ায় এই সমাধির স্থাপত্যও চমৎকার। গাজীউদ্দিন হায়দার চার অষ্টকোণ টাওয়ার আর গম্বুজ যুক্ত তাঁর মায়ের এই সমাধিটি তৈরি করেছিলেন। মেইন হলের প্রতিদিকে বারান্দা রয়েছে। এই সমাধি বন্ধ ছিল। সমাধির বাইরের বোর্ডে পড়লাম এই সমাধিতেও মাটির নিচের ঘরে, সেখানে বেগম ও তাঁর মেয়ে ঘুমিয়ে আছেন। ছোটো ছোটো মিনার আর গম্বুজ নিয়ে দুটো সমাধির স্থাপত্যই মনোমুগ্ধকর। কাইজরবাগের এই দুই সমাধি লখনউ ভ্রমণের তালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত। সমাধি দেখে বেরিয়ে আসার পথে কিছু বাঙালি পর্যটকদের দেখতে পেলাম।

জেনারেল কোঠি

নাহ্, কাইজরবাগ দেখা এখনও শেষ হয়নি। গোমতী নদীর কাছে এবার লখনউয়ের কিছু বিখ্যাত ‘কোঠি’ দেখার পালা। আমরা এবার ম্যাপ অন করে কোঠি অভিযানে শামিল হলাম। সেদিন কোঠি দর্শন বিলাস (বাদশাহ নাসিরউদ্দিন হায়দার তাঁর প্রিয়তমা কুদসিয়া মহলের জন্য ফরাসি স্থাপত্যের দ্বারা ১৮৩২-এ তৈরি করেছিলেন), গুলিস্তান-ই-ইরাম (বাদশাহ নাসিরউদ্দিন হায়দার ১৯ শতকে ইউরোপীয় স্থাপত্যের আদলে বানানো হয়েছিল), জেনারেল কোঠি (নবাব সাদাত আলী খানের আমলে জেনারেলের থাকার জন্য এই নির্মাণ করা হয়েছিল), ফারহত বক্স কোঠি (মার্টিন ভিলা নামে পরিচিত এই কোঠি ১৭৪১-এ ফরাসি জেনারেল ক্লাউড মার্টিন ইন্দো ফ্রেঞ্চ শৈলীতে তৈরি করেছিলেন), ছাতর মঞ্জিল (গোমতী নদীর তীরে নবাবী ইউরোপীয়ান স্থাপত্যের উদাহরণ এই কোঠি নবাব সাদাত আলী খান তাঁর মা ছাতর কুঁওয়ারের স্মৃতিতে তৈরি করা শুরু করেছিলেন।) দেখে Institute of Toxicology, লাল বরাদারী যেটি বর্তমানে ‘রাজ্য ললিত কলা অ্যাকাডেমি’ পেরিয়ে আবার কাইজরবাগ বাস স্ট্যান্ডে এসে হাজির হলাম।

            আমার মনে হল কাইজরবাগ লখনউয়ের শাহী গোলাপ। যতটুকু সম্ভব হয়েছে কাইজরবাগ ঘুরে দেখেছি। আরও অনেককিছু হয়তো বাকি থেকে গেল। তবে যতটুকু দেখেছি তাতে ইতিহাসের ছাত্রী হিসেবে এবং ভ্রমণপ্রিয় বাঙালি হিসেবে অভিজ্ঞতার ও পরবর্তী স্মৃতি রোমন্থনের ডায়েরি অনেকটাই পূর্ণ হয়ে গেছে। যা দেখা বাকি থাকল সেটা ইচ্ছে-তাকে তুলে রাখলাম। কোনো একদিন নিশ্চয়ই পূরণ হবে। শুধু নবাবদের সময়ের বৈভব বা কাবাব-বিরিয়ানির কাহিনি নয় শহরের প্রতিটা গলি, বাড়ি, দরজা, টোটোর ভেঁপু, আতরের সুবাস, চিকনের সুতোর টান, পলকে রাখা আদাব, মাক্ষণ মালাইয়ের স্বাদ, মানুষজনের আতিথেয়তা, উর্দুর মিঠে বুলি, হজরতগঞ্জের সাদা কালো ব্যানার সব এই শহরটার প্রেমে পড়তে বাধ্য করবে। একবার লখনউকে দেখে নিলে, তার আলতো ছোঁয়া পেয়ে গেলে এই শহরটার একটা টুকরো সবসময় আপনার সাথে থাকবে। আলাদা করা কঠিন। সবাই বলে এই শহরটা জাদু জানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *