বি শে ষ র চ না
রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী
শঙ্খ ঘোষের কবিতা: আত্মকেন্দ্রিকতার ভেতর ঘটমান, বহমান সময়ের বক্তব্য
এই লেখার শিরোনাম পড়ে পাঠক ধারণা করে নিতে পারছেন যে লেখাটি কোন বিষয়ে কথা বলতে চায় বা এই ভূমিকা পেরোলে কোথায় পৌঁছাবে সে। শঙ্খ ঘোষের সম্পর্কে কথা বলতে গেলে অন্যতম এবং আবশ্যক যে কথাটি সবাই বলে থাকেন, বা সর্বসম্মত বলে বলা যায়, তা হল তাঁর বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রে বা কথোপকথনের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা। অথচ, তাঁর এই স্বল্প কথার ব্যবহার কখনওই তাঁর বলতে চাওয়া বা বলা কথাগুলিকে খুব সাধারণ বা গুরুত্বহীন করেনি, বরং তুলনামূলকভাবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই থেকেছে আজীবন। মাথায় রাখা উচিত যে, তাঁর এই মিতব্যয়িতা অযথা নয়, বরং বিষয় সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি ও গভীরতা আন্দাজ করার কারণেই। এই নিয়ে অনেক সময় তাঁকে কথা শুনতে হয়নি যে তা নয়, বরং প্রশ্নবাণে যথেষ্ট বিদ্ধ হতে হয়েছে। যাইহোক, যে বিষয়টি নিয়ে লেখাটি কথা বলতে চায়, সেদিকেই নজর দেওয়া ভালো।
লেখাটির শিরোনামে একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে: ‘আত্মকেন্দ্রিকতা’। এই ‘আত্মকেন্দ্রিকতা’ ব্যাপারটা ঠিক কী? এই আত্মকেন্দ্রিকতা কি কেবলই নিজের কথা বলে? আর যদি বলেই থাকে, তাহলেও প্রশ্ন করা যায় না কি এই ‘নিজের’ বলতে কাকে বোঝায়? এই যে নিজ বা সত্ত্বা বা ইংরেজিতে self, তার উৎপত্তি বা অস্তিত্ব কীভাবে? কীভাবে টিকে থাকে ও কীভাবে তার মর্যাদা বাকিদের কাছে? মানে other ones-দের কাছে? আমরা যদি বিষয়টিকে ভাবি, তাহলে সহজ বই কঠিন কখনওই মনে হবে না, কেননা, একজন তার অস্তিত্ব খুঁজে পায় অন্যদের থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া বা অন্যদের সাথে করা মিথষ্ক্রিয়ার ফলেই। সে বুঝতে পারে, তার মধ্যেও physical বা mental বা attitudinal মিল বা অমিল রয়েছে ও সেই কারণে সেও আর আলাদা থাকে না, সেও হয়ে ওঠে তাদেরই একজন। যা কিনা রবীন্দ্রনাথের ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়,/ এই হোক শেষ পরিচয়।’ লাইনগুলি মনে করায়। অর্থাৎ, ব্যক্তি বা নিজ বা নিজের বলতে যা বোঝায়, তা তো নিজেকে নিয়ে নয় কখনওই, বরং ব্যক্তি যে সমাজ বা বিপুল জনগোষ্ঠীর একান্ত কিন্তু স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে উপস্থাপন করে চলা বিভিন্নতা ও চেতনা বা একাধিক চেতনার সমষ্টিকেই বোঝায়। নয় কি?
শঙ্খ ঘোষ ঠিক এই কাজটাই করেছেন তাঁর কবিতায়। হয়তো বা সচেতনে বা হয়তো বা অবচেতনে। তাঁর কবিতা এটাই বলে বা তাঁর কবিতা আসলে একটি স্বরযন্ত্র যার মধ্য দিয়ে তিনি এসব বলেন যা আসলে তাঁর নিজের লেখা যে তাও নয়, বরং ওই সমষ্টির একক উদ্যাপন বা উচ্চারণ।
আর যেটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, সেটি হল— শঙ্খ ঘোষের কবিতা আসলে নাগরিকের কথা। যার মধ্যে তার চেতনা রয়েছে। এই চেতনা বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, একজন নাগরিক সমাজের সচল অংশ, স্পন্দিত এবং অস্তিত্বশীল সত্তা। এর মধ্যে যেমন ব্যক্তির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, প্রতিবেদন রয়েছে, তেমনই সেগুলির সম্পূর্ণতা ও সম্পৃক্ততা রাজনীতি, দৈনিক ব্যস্ততা, কথোপকথন, শূন্যতা, ক্ষয়, সঞ্চয়, গতিশীলতা, মন্থরতা ও অন্যান্য সবকিছু নিয়েই।
শঙ্খবাবুর কবিতা এমন একধরণের কবিতা, যাকে নিয়ে কথা না-বললেও চলে, কেননা, তাঁর কবিতাই প্রয়োজনীয় কথাগুলি বলে ফেলে।
তবুও আমাদের নিয়ন্ত্রণ আর কোথায়? তাই বলে ফেলা। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো— ‘নাগরিক’ বলতে কিন্তু আমাদের কেবলই নগরে বাস করা একজন কেউ এমন ভেবে নিলে চলবে না, বরং এখানে নাগরিক শব্দটিকে বোঝাতে আমরা ‘অধিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার করতে পারি। যে সেই মাটির যাবতীয় গুণের সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছে বা উঠছে বা উঠবে। অর্থাৎ, তিনটি কালের প্রভাব যার মধ্যে বর্তমান, তাকেই নাগরিক বলে ভাবতে হবে।
আজ এই প্রবন্ধে শঙ্খ বাবুর ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করার অভিপ্রায় রয়েছে। এই বই উপরোল্লিখিত উপাদানগুলির সুসংবদ্ধ ও স্পষ্টতর নিদর্শন বলা যেতে পারে। লেখাগুলির মধ্যে যেমন বক্তব্য আছে, প্রকাশ আছে, বিচ্ছুরণ আছে, আঁচড় আছে তেমনই আছে আবেশ, অনুশীলন, মনোনিবেশ এবং আত্মবিশ্লেষণ। কথার চেয়ে এবার কবিতার লাইনে যাওয়াই অধিক বাঞ্ছনীয়।
‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম।/ অন্ধ এই অন্ধকারে শব্দ হলো ফুল/ রক্তমুখী, বুকের উপর দুলছিল তার রং/ ধাতুর মতো, কে আমাকে আনল গুহার তলে।/ পাথরগুলি বিস্ফার চায়, তারার মতো জ্বলে,/ দুয়ের মধ্যে শূন্য আসে বিশ্ব ভুবনজোড়া/ কে আমাকে ডাকল সেই শূন্যে ঝাঁপ দিতে/ রক্তমুখী চূড়ার থেকে সজল পৃথিবীতে!’
১৯৮৭-৯৪ হল এই কাব্যগ্রন্থের রচনাকাল, আর তার প্রবেশক কবিতা হল এটি।
এই লেখাটি বা আরও স্পষ্ট করে বললে এই কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতা সাংকেতিক— যার মধ্যে সংকেত আছে; এখানে পাঠক আবিষ্কারক; তাঁকে দায়িত্ব নিতে হবে অর্থ খোঁজার, খুঁজে পাওয়ার এবং সেই অর্থের সাথে নিজের অস্তিত্বের ও বোধের সমন্বয় ঘটানোর। মানে— এখানে একটি ঘটনা বা বলে যাওয়া বা narration আছে, তার অর্থ বা meaning আছে আর তারও পর আছে underlying meaning— যেটির খোঁজ না পেলে এই প্রয়াস এবং অন্বেষণ অসম্পূর্ণ এবং যথারীতি অসফল থেকে যাবে। উদ্দিষ্ট লেখাটি কী বলে শুরু হল? ‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম’ এটি। লাইনটি পড়ে পাঠকের যে বিষয়টি সবার প্রথমে মস্তিষ্কে আঘাত করবে সেটি হল— consciousness, sub-conciousness এবং awakening-এর দিকগুলি। আবার যদি এখানে প্রশ্ন তোলা যায়, কেন এই কথাগুলোই উঠে এল, তাহলে আমাদের কবিতাটির লাইনগুলোকে পড়ে নিতে হবে, যা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট করে দেবে কবিতাটির মূলভাবটি বা প্রেক্ষিতটি। কবিতায় বক্তা নিজেই তাঁর ব্যাপারে বলছেন। তিনি যেন কারোর ডাকে জেগে উঠলেন। এই জেগে ওঠা স্বাভাবিক একটি অভিপ্রেত ঘটনা হতে পারে, আবার ইঙ্গিতপূর্ণও হতে পারে। কিন্তু জেগে ওঠা কেন? আসলে এই জেগে ওঠা reawakening of the soul— অর্থাৎ, প্রতি মুহূর্তে যে চেতনার বদল ঘটে সেটিকে ইঙ্গিত করে। এই বদল previous state of conscience-এর discard যেমন, তেমনই accept করা new vibrance, new current of ideas-কেও। সেই কারণেই উনি বলছেন ‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম।’— উনি যেন ঘুমন্ত; অথচ ওঁর আত্মা জাগরিত, বিবেক সক্রিয়। সেই কারণেই তাঁর অবচেতন মন হয় শুনতে পায় নিজের অন্তর্গত স্বরের ডাক, অথবা বিশ্ববোধের কোলাহল বা ডাক, যা ব্যক্তি কবিকে অথবা কবিসত্ত্বাকে জাগরিত করে। এই যাত্রা সমগ্র কাব্যগ্রন্থ জুড়েই রয়েছে। যে-কথা শিরোনামে বলতে চাওয়া হয়েছিল— ‘আমি’ শঙ্খ বাবুর লেখায় কখনওই আত্মকেন্দ্রিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমগ্রের সম্মিলিত, অন্তর্গত স্বর।
এতক্ষণ প্রবেশক কবিতাটি নিয়ে কথা হচ্ছিল। এবার বইটির মূল লেখাগুলিতে যাওয়া যাক—
এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির কোনো শিরোনাম নেই, ১-২-৩ এরকম সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত।
১ নং কবিতায় উনি লিখছেন— ‘আমি সর্বনাশ দিয়ে সর্বনাশ বাঁচাতে গিয়েছি’— এই সর্বনাশ আসলে কী? কেবলই ব্যক্তিদোষ? কেবলই গোপন ক্ষয়? না। এ হল এক অধঃপতন, অবক্ষয়, ধ্বংস পেরিয়ে আরেক ধ্বংসের খোঁজ পাওয়া, তুল্যমূল্যের বিচার করা, যেখানে ব্যক্তি কেবলই এক organic এবং little part of the occurrence(s) ছাড়া বিশেষ কিছু নয়। আর সেই কারণে উনি ওঁর কবিতায় চরিত রেখেছেন কিন্তু চরিত্র রাখেননি বেশি। কেবল ‘আমি’ ও ‘তুমি’-র মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ যেন নিজের সাথে নিজের কথা বলা। ‘তুমি’-ও আসলে ‘আমি’-র অংশ, ‘আমি’-ও ‘তুমি’-র প্রকাশ। তবে, এ কেবল ব্যক্তিকথন হয়ে থাকেনি, কবি তা রাখেননি। ‘তুমি’-‘আমি’-র মধ্য দিয়ে মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি, সামাজিকবোধ ফুটিয়েছেন। ফলে মাত্র দুটি চরিত্র বা একটিই, হয়ে উঠেছে গণকন্ঠ— মানে ল্যাটিন ফ্রেজ ব্যবহার করে বললে হয়— vox populi; তাই না?
৪ নং কবিতায় লিখছেন— ‘যদি বলি হাত ধরো, ভয় পাও। সবারই হাতের/ ভিতরে আরেক হাত জেগে ওঠে, আরো আরো হাত/ কোন্ হাত কার কেউ জানে না তা আর,..’ বা ‘তোমার সমস্ত গানে ডানা ভেঙে পড়ে আছে বক/ বিতস্তা বা চন্দ্রভাগা শতদ্রু বিপাশা ইরাবতী/ তার সব স্রোত নিয়ে ধুয়ে দিতে পারেনি সে লাল— / প্রতি রাত্রে মরি তাই, প্রতি দিনে আমি হন্তারক!’
শঙ্খ ঘোষের কবিতা আসলে এক প্রতিচ্ছবি। যে প্রতিচ্ছবি আমাদের, আমাদের চারপাশের ও তার ভৌত অবস্থার। এই যে একের মধ্যে অনেকের অবস্থান, এবং সত্ত্বার প্রকাশ, আমরা নিজেরাই হয়তো জেনে উঠি না, জানতে পারি না আমাদের অসারতা ও অসাড়তার কারণে, তা সহজ অথচ কী গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে লিখলেন কবিতায়। আমাদের মধ্যে যেমন সহজ দিক রয়েছে, তেমনই কাঠিন্য, দয়াহীনতা রয়েছে— এই কবিতার শেষ লাইনটি কী অদ্ভুতভাবে সেই কথাই বলে এবং আমাদের চমকিত করে। যে ‘আরো আরো হাত’ জেগে ওঠার কথা বলা হচ্ছিল, তার ভূমিকা কী? ক্ষত দেওয়া আবার তাকে সরিয়ে তোলাও। তা যেন সময়ের ব্যবধানে পালটে পালটে যায়। সেই ব্যবধান আমাদের পালটে ফেলে, অথবা আমরা ব্যবধানের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ভূমিকা পালন করি। তাই একজন যিনি রাত্রে নিজের অস্তিত্ব ফেলে রেখে মরে যান, যিনি হয়তো প্রকৃত অর্থে মৃতই, তিনিই আগের অস্তিত্বকে ফেলে রেখে, লঘু করে, মিথ্যে প্রমাণ করে ‘প্রতি দিনে… হন্তারক’হয়ে ওঠেন। এই হন্তারক হয়ে ওঠা নিজের কাছে, নিজের মিথ্যে-সত্যের দ্বন্দ্বের কাছে, এই হন্তারক হয়ে ওঠা যাঁদের সাথে নিজের মিশে যাওয়া প্রতিদিন, তাঁদের কাছে। অর্থাৎ, উভয়মুখী এর চলন। আপাতবিরোধে ঠাসা এর অস্তিত্ব। আর সে কারণে কবি ঠিক পরের কবিতার (অর্থাৎ ৫ নং কবিতা) মধ্যে লিখে ফেলছেন ‘কেননা বিনাশ সেও কোষে কোষে উৎস রেখে যায়/ আমাদেরও বুকে আজ জমেছে আগুনভরা জল’ এর মতন লাইন, যা antithetical কিন্তু ধ্রুব-সত্য।
এমন ভাবনায় শুধু antithesis আছে তা-ই নয়, একটা meaningless যে ‘চিরজাগরূক বোধ নিয়ে আসে’, তাকেই বোঝায়। যেন যা হচ্ছে তা কোনও হওয়া নয় আর যা হচ্ছে না তা-ও যে এক হওয়া, তার দিকে ইঙ্গিত করছে। যেমন— ‘দু-একটি কথা শুধু বলে যাব সোজাসুজি চোখে/ ভেবেছি কত-না দিন জপেছি কত-না দিনরাত।/ তুমি জানো কে আমাকে আজকের মুহূর্ত পাব বলে/ ছল বল মিথ্যে দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে মধ্যরাতে/ এবং বলেছে — যাও, অধিকার করে নাও ওকে/ কোনো লজ্জা লজ্জা নয়, কোনো মিথ্যে মিথ্যে নেই আর।’— এই লাইনগুলি কী ভয়ঙ্কর, কী ক্ষুধার্ত, কী ইঙ্গিতপূর্ণ, আলোহীন অন্ধকারের বাতাবরণে মোড়া, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পাঠক নিজেই বুঝতে পারবেন লাইনগুলির পাঠের দ্বারা। নয় কি?
কবিতা এগোয়। যেভাবে জীবন এগোয়। যেভাবে মানুষ বৃদ্ধ হয়। জীবন ক্লান্ত হয়। তেমন করেই— সময় অতিক্রান্ত হয়। আর সেই অতিক্রমণের কারণে যে সারসত্য উঠে আসে, শাশ্বত এক বোধ নতুন আকারে জন্ম হয়, তাকে কবিতায় প্রকাশ করলে হয়তো ‘অবশ শরীর ছুঁয়ে উড়ে যায় সমুদ্রের হাওয়া—/ জীবনে বয়স নয়, বয়সে জীবন জুড়ে যাওয়া।’ এরকম কিছুই হয়।
সময় তো আসলে এক আশ্চর্য ধারণা বা আবিষ্কার। এখানে শঙ্খবাবু কবিতার পর কবিতায় দেখাচ্ছেন বা বলা ভালো বিভিন্নভাবে commentary করছেন যেন কবিতার ভাষায়, ভাবে, ছন্দে, ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে— তিনি দেখাতে চাইছেন, সময়ের ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে ওঠা, প্রাচীনতার দলিল হয়ে ওঠা এবং একইসাথে আমাদের মধ্যে যে তার অস্তিত্ব বা অবস্থান, এবং সেটা আমাদের যে ধারণ করা, সেটা conciously বা unconsciously বা sub-consciouly হতে পারে, তার উদাহরণ বেশ কিছু কবিতার লাইনে পাব আমরা। যার মধ্যে, যাকে আমরা ইতিহাস বলে বা তার চরিত্র বলে জানি, সেসব আছে, আর তার মধ্যে মিশে আছে সমাজ, রাজনীতি, নীতিবোধ, ধর্ম সবই মিশে আছে। ফলে, সেগুলির প্রকৃত অনুধাবন করতে আমাদের বারেবারে চিন্তা করতে হবে ও একইসাথে চিন্তার প্রসারের ওপর জোর দিতে হবে। ধরা যাক ২৫ নং কবিতা— শঙ্খ বাবু লিখছেন, ‘এই রাত্রি, টোডরমল, ভেসে আছে আতুর আলোয়/ আকাশ আভাসমাত্র, স্থল জল বাষ্প হয়ে আছে/ শূন্যের পূর্ণতা নিয়ে ভরে আছে ইবাদতখানা -/ এই রাত্রে মনে হয় স্বপ্ন দেখলে দোষ নেই কোনো।/ একদিন এই দেশে— সুজলা সুফলা এই দেশে/ পাথরে পাথর গেঁথে উঁচু করে বানাব মিনার/ সেখানে দাঁড়িয়ে যারা ছিন্নভিন্ন পক্ষাঘাত থেকে/ চন্দ্রগরিমার দিকে বাড়াবে অশোক হাতগুলি/ তারা কেউ এরা নয়— হিন্দুও না, মুসলমানও নয়,/ জৈন বৌদ্ধ খ্রিস্টানও না, জরথ্রুস্টি নয়, কিন্তু সবই/ একাকার কোনো দীন ইলাহির গোলাপবাগানে/ উৎসের আতর ছুঁয়ে প্রাচী-র প্রান্তর ভরে দেবে।/ আর এই ফতেপুর-ফতেপুর সিক্রি যার নাম/ তারই মর্মমূল থেকে এ জাহান পেয়ে যাবে নূর—/ তখন কোথায় আমি, কোথায়-বা ক্ষত্রবংশী তুমি/ মানুষই তখন গান, মানুষই তখন ত্রুবাদুর।’— এই লেখা নিয়ে ঠিক কোন ব্যাখ্যা চলে? এই লেখার পর আদৌ কি কোনও ব্যাখ্যা চলে? এই কবিতা তো কোনও অর্থে কয়েকটি লাইনের সমাহারে গড়ে ওঠা কবিতা বা poetry নয়, বরং vast history হয়ে উঠছে। এ যেন আমাদের স্বপ্নের দেশ, ঐতিহ্যের আকরখনি ভারতবর্ষ। যেখানে বহুত্ববাদ শতধারায় বিকশিত হয়ে প্রাচীন মানবতার কথা বলে, যা anglicized culture বা westernized mind বা motto-র তুলনায় ঠিক কত প্রাচীন তার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘এই মহামানবের সাগরতীরে’-র সার্থক উত্তরাধিকারী চেতনায় পুষ্ট লাইন। নয় কি? সেই কারণে ‘প্রাচী’ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ‘প্রাচী’ হল প্রাচ্যের হাজার হাজার বছরের লব্ধ, সঞ্চিত, বন্টিত জ্ঞান।
এই লেখাটিতে কবি বেশ কিছু শব্দ বা বলা ভাল term ব্যবহার করেছেন, সেগুলির ওপর আলোকপাত করে অর্থ জেনে নেওয়া ভাল, তাহলে তাদের প্রয়োগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বুঝে নিতে। যদিও সেসব অনেকেরই জানা। বিদ্যালয়জীবনে পাঠ্য ইতিহাস বইতেই পড়েছি আমরা, তাই না?
লেখাটি মূলত আমাদের নিয়ে যায় মধ্যযুগের ভারতে, যখন মুঘলবংশের শাসন চলছে, আকবরের অধীনে। মুঘল শাসনের সময় যে অত্যাচার করা হত সংখ্যাগুরু হিন্দু তথা অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর, তার আধিক্য ও তীব্রতা সবচেয়ে বেশি স্তিমিত হয় আকবরের আমলে। উনি উদারতার দিকে আগ্রহ দেখিয়েছিলন। প্রতিষ্ঠা করতে ও স্থায়ী করতে চেয়েছিলেন এক ধর্মের অন্য ধর্মের প্রতি উদারতা, সহনশীলতা ও গ্রহণের সামর্থ্যকে। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে স্থাপন করেন ‘দীন-ই-ইলাহি’, যার অর্থ ‘ঈশ্বরের ধর্ম’ বা ‘ঐশ্বরিক একেশ্বরবাদ’, যার উদ্দেশ্য ধর্মের বিভাজন, হানাহানি ভুলিয়ে সবাইকে এক করা। কেন না, ঈশ্বর তিনি তো সবার। সেখানে তো কোনও বিভাজন থাকতে পারে না। অর্থাৎ, সহজকথায় ঈশ্বরের ধর্ম মানেই মঙ্গলকামী বা মঙ্গলকারী, সদা কল্যাণময় মানবধর্মই। আর এই একই বার্তা সম্রাট অশোক প্রায় এক হাজার আটশ তেতাল্লিশ বছর পূর্বে প্রচার করেছিলেন বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে, যা ইতিহাস ‘অশোকের ধম্ম’ হিসেবে মনে রেখেছে। আর এই কারণে, এই কবিতায় ব্যবহৃত ‘অশোক হাতগুলি’ শব্দদুটি নজর কাড়ল।
বাকি থেকে গেল একটি চরিত্র। টোডরমল। কে এই টোডরমল? টোডরমল হলেন আকবরের রাজসভার বিশিষ্ট সভাসদ বা ‘নবরত্ন’-দের মধ্যে অন্যতম। যিনি একাধারে ছিলেন ‘ওয়াকিল-উস-সুলতানত’ বা সম্রাটের পরামর্শদাতা, অন্যদিকে ছিলেন ‘দিওয়ান-ই-আশরাফ’ বা অর্থমন্ত্রী, যাঁর হাত ধরে ‘জাবতি’ বা ‘দহশালা’ ব্যবস্থা চালু হয়। এটি হল একটি ভূমি সংস্কার ব্যবস্থা, যেখানে জমির মাপজোপ, সঠিক জরিপ ও ১০ বছরের গড় উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে করা কর প্রবর্তন। এই আইনটি একপ্রকার আধুনিক ব্যবস্থা ও যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছিল তৎকালীন প্রেক্ষাপটে। এছাড়াও টোডরমল-এর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল ১৫৮৫ সালে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণে বিশেষ অবদান ও ভাগবত পুরাণকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা। ফলে, একজন সফল প্রশাসক বা কর্যকর্তার ভূমিকায়ই নয়, বরং ধর্মীয় ক্ষেত্রে সমমনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠা ও তার পালন, এ-ই তো রাষ্ট্রের জন্য হিতকর সুবাতাস নিয়ে আসে, তাই না? আর টোডরমল যেহেতু উভয়ক্ষেত্রেই তাঁর মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাই এই ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দিকে তাকিয়ে তাঁকে স্মরণ করা বা তাঁকে ডেকে নেওয়া ও interact করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ডাক হতে পারে আকবরের, অথবা হতে পারে আজীবনের এই বার্তা বহন করা, সত্ত্বাকে ধারণ করা কবি বা সেই ‘আমি’ ও তার আত্মকেন্দ্রিকতা।
এই একই সুর তাঁর অন্য কবিতাতেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ২৯ নং কবিতায় লিখছেন: ‘ধর্মজিজ্ঞাসার মতো চিহ্ন হয়ে বসে আছো তুমি/ যেন সব ভুলে আছো দীপংকর শ্রীজ্ঞান অতীশ।’— অর্থাৎ, যুগ পালটাচ্ছে, সময় পালটাচ্ছে, পটভূমিকা পালটাচ্ছে কিন্তু কবির জাগরিত চেতনায় ধর্মের অর্থ পালটাচ্ছে না। অবশ্যই সেটি সদর্থক অর্থে। ধর্ম কোনোভাবেই আর religion হয়ে থাকছে না, বরং identity of a man হয়ে উঠছে, practice of humanism হয়ে উঠছে।
কবিতা থেকে কবিতায় এই বোধ ও আরও বহু বহু বোধের উপস্থিতি, উড়ান, পর্যায় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মূল কথাটি একই ও একটি নির্দিষ্ট সুরের তালে বেজে চলেছে সদা। এ যেন আত্মবীক্ষণ। আত্মার উন্মীলন। ‘আমি’ বা অংশ দিয়ে সমগ্রের অস্তিত্বের টের পাওয়া। যেখানে গন্ধর্ব এক রূপক চরিত্র হতে পারে, যার কাজ মূলত ললিতকলায় (সঙ্গীত, নৃত্য, কাব্য, চিত্রাদি) নিজেকে নিয়োজিত রাখা, অথবা, রক্তমাংসের এক মানুষ, যাকে তার পূর্বের অজ্ঞানতার অবস্থা থেকে এক উত্তরণ, এক বিরাট ভারতের সম্মুখে এনে দাঁড় করান কবি ও তাঁর বোধের প্রকাশ, অর্থাৎ, কবিতা।
আর এর সবই উঠে আসে গভীর বোধ থেকে, আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে, যার মধ্যে বর্তমান সময় যেভাবে রয়েছে, তেমনই রয়েছে অতীত অথবা ভবিষ্যতের বার্তাও। এই কাব্যগ্রন্থ ফলত এক আয়না। এক ঘটমান, বহমান সময়ের আয়না। যে-আয়নায় বারেবারে মুখ দেখে নিতে হয় আমাদের। সেই মুখ দেখা আসলে আত্মবিশ্লেষণ, শিখন, পরিমার্জন, সংযোজন এবং উত্তরণ।
আর এভাবেই শঙ্খ ঘোষের ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থটি একটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষার কাব্যজগতে।