ফি চা র
সৌম্য দে
ঋতুপর্ণর সাহিত্যকৃতি
বর্ণময় মানুষদের জীবনে মাঝে-মাঝে তাঁদের কিছু-কিছু পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়, ঋতুপর্ণ ঘোষকে যেমন আমরা জানলাম মূলত কেবল চিত্রপরিচালক হিসেবেই! যদিও, অধিকাংশ বাঙালি তাঁর ছায়াছবির পাশাপাশি, তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির সঙ্গেও নিয়মিত জড়িয়ে ছিলেন বহুদিন৷ হয়তো, আজও আছেন! কিন্তু, তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি শুধু সম্পাদকীয়-র পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সাহিত্যিকসত্ত্বার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপনে, তাঁর কবিতায়, তাঁর গানে, এমনকি তাঁর চিত্রনাট্যেও! সাহিত্যিক ঋতুপর্ণ— প্রান্তিক হয়েও তাঁর জীবনচর্যার মাধ্যমে রচনা করেছেন প্রান্তিকতার নতুন সংজ্ঞা— যা তাঁর উত্তরসূরিদের কাছে পাথেয় হয়ে রয়ে গেছে।
‘টেক ওয়ান’ হোক কিংবা ‘ফার্স্ট পার্সন’— সম্পাদকীয়-র পাতায় আত্মকথনে মগ্ন হয়েছেন ঋতুপর্ণ, কখনো অত্যন্ত সচেতনে আবার কখনো অবচেতনে। একাকী একজন মানুষের নিঃসঙ্গতার উদ্যাপন রয়েছে তাঁর দিনলিপির পাতায় পাতায়, রয়েছে তাঁর মা-বাবার কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা আর মহাভারতের কথা। আমরা শিখেছি সম্পাদকীয়-ও কত মায়াময় হতে পারে, শিখেছি কত স্বল্প পরিসরে কত গভীর কথা বলা যেতে পারে, ঠিক তাঁর ছবির সংলাপের মতো— সাহিত্যগুণে যা কোনো অংশে কম নয়।
ঋতুপর্ণ কোনোদিন ‘লিখিয়ে’ রূপে পরিচিত হতে চাননি। বরং তিনি বলেছেন, যে কথাগুলো অহরহ তাঁর মনের ক্যানভাসে ঘুরপাক খেতে থাকে, সেইসব কথাই লেখা হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়, অধিকাংশ সময়ে হয়তো তাঁর অজান্তেই। ঋতুপর্ণ লিখেছেন, ‘আমি পণ্ডিত নই। প্রতিভাবান নই। চিন্তাবিদ নই। কেবল, নিজের মতো করে যেটুকু ভাবতে পারি, সেটুকুই… আমার আত্মপ্রলাপ।’ তাঁর ব্যক্তিগত অনুভুতির বিচ্ছুরণ ঘটেছে সম্পাদকীয়-র পাতায়, আর সেই আত্মালাপগুলোই হয়ে উঠেছে আমাদের অভ্যেস। মূলত ওই কালনিরপেক্ষ মুহূর্তলিপিগুলোর মাধ্যমেই ঋতুপর্ণ হয়ে উঠেছেন আমাদের অনেকের ধর্ম। কেন? কারণ, ঋতুপর্ণ অসাধারণ হয়েও খুব সাধারণ। তাঁকে পড়তে পড়তে বারংবার মনে হয়েছে তাঁর লেখা যেন আমাদেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি। ওঁর অধিকাংশ লেখা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, ওই কথাগুলো কেবল ওঁর একার কথা তো নয়, আমাদের অনেকের মনের কথা। আশ্চর্য হয়েছি, ঋতুপর্ণ কিভাবে জানলেন? কোন্ জাদুবলে ঢুকে পড়লেন আমাদের মনের অন্দরে?
ঋতুপর্ণ কি কবি ছিলেন? ঋতুপর্ণর গদ্য পড়তে পড়তে বহু সময়ে মনে হয়েছে যেন কবিতার মতো কিছু পড়ছি। ভালোবাসার সংজ্ঞা খুঁজতে খুঁজতে ‘টেক ওয়ান’-এর পাতায় ঋতুপর্ণ লিখেছেন—
‘… প্রেম মানে কী? কোনো আলাদা ভঙ্গি, কোনো অপলক আকুলতা, কোনো বিশেষ চাহনি, কোনো একটা গানের কলি, নাকি অপার্থিব কোনো আলো যাতে মিশে আছে সমস্ত না বলা কথা। নাকি সমস্তটাই আমাদের কল্পনা…
…যাচ্ছি মাদ্রাজে। করমণ্ডল ছাড়ার সামান্যক্ষণ পর— শহর ছাড়িয়ে সবেমাত্র সবুজের মাঝখানে… ক্ষিপ্রগতি ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখলাম রেল লাইনের ধারে ধানক্ষেতে আলের ওপর দাঁড়িয়ে দুই তরুণ-তরুণী। ছেলেটি একটি সাইকেলের ওপর ভর দিয়ে… মেয়েটি একটুকরো কাগজ গুঁজে দিল ছেলেটির হাতে।
ব্যাস, এইটুকুই। কে ছেলেটি, মেয়েটিই বা কে? কী সেই একটুকরো কাগজ? কোনো প্রেমপত্র? কিচ্ছু জানা হল না। ধাবমান ট্রেন থেকে একঝলকের দেখায় এর থেকে বেশি কিছু জানাও যায় না।
তবে, প্রকৃতির আয়োজনও মনে হল যেন কোনো ফিল্ম মেকারের থেকে অনেক বেশি চতুর। তাই, বিকেলের আলো বুঝি অমন সোনালি দেখাল। বাতাস বইল ঠিক ততটাই যাতে এই মুহূর্তের নির্ভেজাল পিওরিটি কোনোভাবেই অবিন্যস্ত না হয়।
পরে মনে হয়েছে অনেকবার, কে জানে, আজ থেকে পাঁচ বছর পরে হয়তো ছেলেটি নর্থ বেঙ্গলে বদলি কোনো চাকরি নিয়ে! মেয়েটি হয়তো অন্য কারোর ঘরণী, ছেলে কোলে বাপের বাড়ি আসে রিক্সা করে এই ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে! কিংবা, হয়তো আসলে ওরা ভাই-বোন, মা পাঠিয়েছেন মেয়েটিকে ছেলের হাতে মাসকাবারি ফর্দটা দিয়ে মুদির দোকানে তাগাদা দেবার কথা মনে করিয়ে দিতে!
কোনটা তাহলে সত্যি? কোনটাকে বিশ্বাস করবো? প্রেম কি সততই এমন ছড়িয়ে আছে আমাদের চারিদিকে? না লুকিয়ে আছে আমাদের মনে, নিত্যনৈমিত্তিকতার বারোমাস্যার থেকে মাঝে মাঝে ছুটি পাবার অপেক্ষায়?’
‘লেখক’ তকমায় ঋতুপর্ণ-র তীব্র আপত্তি ছিল। বলতেন, ‘আমি আবার লেখক নাকি!’ কিন্তু, মনোজ্ঞ পাঠক জানেন, জীবনের কথা তিনি যেভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাঁকে লেখক ছাড়া আর কী বলা যায়?
ঋতুপর্ণ আজীবন নানাভাবে সাহিত্য সাধনার মধ্যেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে লেখার আঙ্গিক— তাঁর সবকিছুই আশ্চর্যভাবে অন্যরকম। বাংলা ‘শব্দ’ নিয়ে তাঁর নিরীক্ষণ, তাঁর চিন্তক মনন আমাদেরও ভাবিয়েছে। ‘ফার্স্ট পার্সন’-এর বেশ কয়েকটি লেখায় তার দৃষ্টান্ত মেলে। শব্দের ব্যঞ্জনা খুঁজতে খুঁজতে ঋতুপর্ণ কখনো কখনো এক বিন্দু থেকে আর এক সিন্ধুতে হারিয়ে গেছেন তার নিদর্শনও ধরা পড়েছে তাঁর আত্মকথনের পাতায়। তিনি লিখেছেন—
‘জেল নামটার কোনো বাংলা হল না। সংস্কৃত ‘কারাগার’ শব্দটা যেন ওই কঠিন লোহার শিকের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে ক্রমশ অশক্ত হয়ে পড়ল।
বহুদিন অবধি শুনতাম আন্দামান বেড়াতে গেলে সেলুলার জেল দেখাটা নাকি অবশ্যকর্তব্য। আমি সত্যিই বুঝিনি, কেন? অনেকগুলো দ্বীপান্তরিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস-তাড়িত একটা বিশাল ইমারতের মধ্যে নতুন করে কী আবিস্কার করেন পর্যটকরা?
অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখেছিলাম, ‘সাজাহানের মৃত্যুশয্যা’। বন্দি সম্রাট অলিন্দের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন সুদূর-সৌধ তাজমহলের দিকে… জেলখানার বাইরেও যে বন্দিদশা হয়, সেই ছবি দেখে বুঝলাম।…
বাবার একটা বন্দিদশা শেষ হল। কাচের গাড়িতে বন্দি হয়ে বাবা রওনা দিল… বন্দি বাবা কেমন করে যেন মুক্তি পেয়ে গেল…
মুক্তি পেয়ে কোথায় চলে গেল? ভাবতে ইচ্ছে করে যে মা-র কাছে।
ধীরে ধীরে আমার সামনে প্রতিনিয়ত গজিয়ে উঠতে থাকছে জেলখানার শিক, যার ভিতরে আমি বন্দি, যার ভিতরে আমার যাবজ্জীবন কারাবাস। যার প্রতিটি শিক এমন শক্ত স্মৃতি দিয়ে গড়া যে সে জেলখানা ভেঙে বেরোয় কার সাধ্যি!’
কোনো এক ‘রোববারের’ সম্পাদকীয়তে ঋতুপর্ণ আশঙ্কিত হয়েছিলেন, ‘সকালে উঠেই এত বিষাদ ভালো লাগার কথা নয়’, লিখেছিলেন, তিনি নিরুপায়, তিনি কেবল চান তাঁর পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে তাঁর সব ভালোলাগা আর খারাপলাগাগুলো ভাগ করে নিতে। তাঁর আনন্দ আর দুঃখগুলোর সঙ্গী হতে হতে আমরাও কিভাবে জানি না তাঁর পথের পথিক হয়ে উঠেছিলাম।
ঋতুপর্ণ-র সাহিত্যানুরাগের ছায়া পড়েছে তাঁর লেখা বিজ্ঞাপনেও। মনে পড়ে, ঋতুপর্ণ লিখেছিলেন— ‘অসুরদলনী বলি পূজি দশভুজা/ সঙ্গে কেন করি তবে অসুরেরও পূজা?’ (মহিষাসুরমর্দিনীর উৎস সন্ধানে), ‘ঐতিহ্যের পুজো, উদ্দীপনার উৎসব’ (এশিয়ান পেন্টস্), ‘তিল তিল সঞ্চয় সারা বৎসরে/ মহাপূজা দিনগুলি আনন্দে ভরে’ (পিয়ারলেস), ‘তোমার সকাল, আমার সকাল’ (ব্রিটানিয়া), ‘উলটে দেখুন, পালটে গেছে’ (আনন্দলোক), ‘বাঙালি ঘটনা হন যখন-তখন, হেডলাইনও হন কখনো-কখনো’ (বাংলা লাইভ ডট কম), ‘দেখতে খারাপ, মাখতে ভালো’ (মার্গো) বা ‘বঙ্গজীবনের অঙ্গ’ (বোরোলিন)। ঋতুপর্ণ-র লেখা বিজ্ঞাপনের কপিতে কবিত্বের ছাপ থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। ঋতুপর্ণ জানতেন, কবিতার মতো দু-চার কথায় বাঙালি মনকে কিভাবে ছুঁতে হয়, যে কারণে পরবর্তীকালে চিত্রনাট্যকাররূপেও তিনি অত্যন্ত সফল হয়েছিলেন।
ঋতুপর্ণ কি সত্যিই কবি ছিলেন? সেই শিরোপাই থেকেই বা তাঁকে বঞ্চিত করি কি করে? ঋতুপর্ণই তো লিখেছিলেন—
কত সুখদুখ কত চেনামুখ
লুকোয় জীবন আড়ালে—
কখন কোথায় কে যে সাড়া দেয়
ঠিক যাদুকাঠি বাড়ালে
মরণের কাছে জিতে যাওয়া
নাকি জীবনের কাছে হার!
পারাপার
…
আরও মনে পড়ে, অপর্ণা সেনের কন্যা ডোনার বিয়ের তত্ত্বে এক-একটা ডালার উপরে ঋতুপর্ণ নিজের হাতে সুন্দর সুন্দর ছড়া লিখে দিয়েছিলেন—
তুঁতে রঙের রাজকোট, তার গোলাপ রঙের পাড়,
রঙ মেলানো ব্লাউজ সাথে, কেমন চমৎকার!
টিপের পাতা সাজিয়ে দিলাম তুঁতে শাড়ীর ভাঁজে,
সারাজীবন করবে আলো দু’টি ভুরুর মাঝে।
অথবা
ঝকঝকে রঙ সোনার বরণ সাজের উপাচার।
হাত আয়না, চিরুণি আর ব্রাশটি চমৎকার।
সাজিয়ে দেওয়া হ’ল সে সব আয়না দেওয়া ট্রেতে
সোনার বরণ উজ্জ্বল রঙ ট্রের হাতলেতে।
‘বাংলা এখন’ চ্যানেলের শীর্ষ সঙ্গীত রচনা করে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। সে গান আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল—
রূপসী বাংলা, সোনার বাংলা,
বাংলা মানে কি বেঙ্গল?
বালুচরী শাড়ি, মিষ্টির হাঁড়ি,
ইলিশ, চিংড়ি, ফুটবল।
বাংলা মানে কি মিটিং, স্লোগান,
মিছিলে হাজার গলা?
বাংলা মানে কি নন্দনে ভিড়,
অ্যাকাডেমী বইমেলা?
বাংলা মানে কি শুধুই অতীত,
কিম্বা চলছে চলবে?
আপনার সাথে ‘বাংলা এখন’
প্রতিদিন কথা বলবে।
গানের কথা যখন উঠলই, সুমন্ত্র মিত্র-র আধুনিক বাংলা গানের সংকলন ‘আপন মনে’-র কথা বলতেই হয়। সুমন্ত্র মিত্র-র সুরে কথা লিখেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। অদ্ভুত সুন্দর মানিয়েছিল সেই যুগলবন্দী। একটি গানের কথা সেই সময়ে খুব মনে ধরেছিল—
…
এখন আর মনকেমন করে না রোদ্দুরে,
বর্ষাকাল, তবু মেঘ জমে না মনজুড়ে।
সেই গলির ক্রিকেটে চোট্টামির রান উঠুক,
প্যান্ডেলে রাত জেগে টলটলে একচুমুক।
দাও ফিরে এ-জীবনে হারানো সে-সুর
মনকেমন মনমেদুর সেই জীবন কি মধুর!
ছবির গানে গীতিকারের ভুমিকাতেও আমরা ঋতুপর্ণকে পেয়েছি। ‘তিতলি’ ছবির ‘মেঘপিওনের ব্যাগের ভেতর মনখারাপের দিস্তা/ মনখারাপ হলে কুয়াশা হয় ব্যাকুল হলে তিস্তা’ বা ‘রেনকোট’ ছবির ‘পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান’ বা ‘মেমরিজ্ ইন মার্চ’ ছবির ‘বহু মনরথী সাজু অভিসারে পেহেলু সুনীল বেশ’ আজ কিংবদন্তী হয়ে গেছে।
ঋতুপর্ণর রবীন্দ্র-অনুরাগের কারণেই সম্ভবত তাঁর রচনা করা অধিকাংশ গানে ব্রজবুলি ও মৈথিলী ভাষার প্রভাব লক্ষণীয়। বাংলার প্রাচীন কাব্যিক ধারার প্রভাবও তাঁর বেশ কয়েকটি গানে দেখতে পাওয়া যায়। গীতিকার ঋতুপর্ণ ততটা আলচিত নন। তবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ছায়াছবির গানের জগতে ঋতুপর্ণ একজন গুরুত্বপূর্ণ গীতিকার।
গান রচনার ক্ষেত্রে ঋতুপর্ণ স্বতন্ত্র ঘারানার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর কলম আমাদের উপহার দিয়েছে বেশ কয়েকটি অভিনব ও ব্যতিক্রমী গান, যে গানে মিশে গেছে কবিতাও! যেমন ‘খেলা’ ছবির এই গানটি—
সুখ পালাচ্ছে, দুখ পালাচ্ছে, কে কার কাছে এসে,
ছায়া পালাচ্ছে, ছবি পালাচ্ছে, ছায়াছবির দেশে।
মেঘ পালাচ্ছে, রোদ পালাচ্ছে, এখন বেগনি বেলা,
কু-ঝিকঝিক কু-ঝিকঝিক পালাচ্ছে ছেলেবেলা।
অথবা ‘মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর’ ছবির এই গানটি—
সন্ধে সকাল হতে চায় ভালোবেসে
সময়টা ঠিক পালটায় অনিমেষে।
হাতে বাঁধা ঘড়িগুলো সব
কেন যেন কি খেয়ালে এক হয়ে যায়— কাছে এসে।
ঋতুপর্ণর অবসরযাপনের অন্যতম সঙ্গী ছিল অনুবাদ। অনুবাদ শিল্পে ঋতুপর্ণর অতুলনীয় পারদর্শিতা ছিল। ঋতুপর্ণ বিশ্বাস করতেন, ভাষা চর্চার উৎকৃষ্টতম মাধ্যম হল অনুবাদ। চরম ব্যস্ততার মধ্যেও তাই সামান্য সময় পেলেই তিনি অনুবাদে মগ্ন দিতেন।
তেমন কোনো অবসরযাপনকালেই রবীন্দ্রনাথের ‘অভিসার’ কবিতাটি অনুবাদ করে ঋতুপর্ণ লিখেছিলেন ‘Upagupta the Young Sage’—
…
The city’s dancer hastened the streets, drunk with youth
Veiled in ropes of dazzling blue anklets ringing sweet and true
Stumbling on the sage withdrew Basabdutta her foot
Raising the lamp she saw his form, his molten golden hue
His tranquil smile, his tender guise, in the wistful rays his blissful eyes
The peace on his forehead vise like drops of moonlit dew
…
ঋতুপর্ণ তাঁর ‘রেনকোট’ ছবিটি বাংলায় লিখেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ ভৈরবী’ কবিতাটি ছবিতে ব্যবহার করার। পরে যখন ছবিটি হিন্দিতে করার সিদ্ধান্ত নিলেন, ভাবলেন ‘আনন্দ ভৈরবী’-র হিন্দি অনুবাদ করলে কেমন হয়! শরণাপন্ন হয়েছিলেন গুলজারের। রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য, সেই সময়, ঋতুপর্ণ ‘আনন্দ ভৈরবী’ কবিতাটি ইংরাজিতে অনুবাদ করে গুলজারকে পাঠিয়েছিলেন। কেমন ছিল সেই ‘কাঁচা ইংরাজি অনুবাদ’?
…
To the same field no cowherd comes today
No magic flute weeps at the Banyan root
The lightning flashes in the cloud dark sky
In the old remembered way.
…
ঋতুপর্ণ তাঁর ছবিতে বারংবার নানাভাবে মানুষের উত্তরণের গল্প বলেছেন। ঋতুপর্ণ বলেছেন তাঁদের কথা যাঁরা নিঃসঙ্গ জীবনে খুঁজে পেয়েছেন নিবিড় কোনো বন্ধুত্ব, গভীর কোনো বন্ধন— অনেকটা ঋতুপর্ণর নিজের মতো। নিঃসঙ্গতার আবহে, বিরহ থেকে মিলনের যে যাত্রাপথ, সে পথের দিশা ঋতুপর্ণ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের থেকেই। ঋতুপর্ণর চিত্রনাট্যেও তাই আমরা রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়া পাই। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দু-ভাবেই আমরা তাঁকে পাই ঋতুপর্ণর সৃষ্টির মধ্যে। ‘দহন’ দেখতে দেখতে যেমন খুব মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’—
‘৯ নম্বর গলফ ক্লাব রোড, এক সময় এটা আমার বাড়ি ছিল। বাড়ির সামনে একটা কদম গাছ আছে, আমার বারান্দা থেকে দেখা যেত। একদিন ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে, মনে আছে, একটা কুকুর তলায় বসে ভিজছিল। চাইলেই রাস্তা পার হয়ে চলে যেতে পারত উল্টো দিকে একটা বাড়ির গাড়িবারান্দার তলায়, কিন্তু রাস্তায় বেরলই না কিছুতেই ভিজে যাওয়ার ভয়ে। কত ভয় আমাদের, সত্যি! বেশ বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম, এটাই আমার বাড়ি। বাপি তাই বলত, আমিও তাই ভেবেছি। তাই, ওদের মুখ চেয়ে ওরা যা বলেছে মেনে নিয়েছি। প্রেস থেকে কথা বলতে এসেছে, দেখা করিনি। কোর্টে গিয়ে মিথ্যে কথা বলেছি। রাতের পর রাত ঘুমের ওষুধ খেয়েছি, ঘুম আসে নি। পলাশ অকাতরে ঘুমিয়েছে, আর আমি বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি সারারাত, কেন? সত্যি কি ভালোবাসা? কনসার্ন? না, ১৪ বাই ১২ ফুটের একটা সিকিওরিটি? আগামী ১৭ই অক্টোবর আমি মন্ট্রিলে পৌঁছচ্ছি, তোর কাছে থাকব ক’দিন। ওখানে কয়েকটা জায়গায় এপ্লাই করেছি, দেখা যাক। আমার বিয়েটা থাকবে না ভেঙে যাবে তাই নিয়ে এক্ষুনি কিছু ভাবছি না, বোধহয় একটা পয়েন্টের পরে সেটা আর ম্যাটারও করে না। আফটার অল, আমরা সবাই বড় একা। আমি, তুই, আমার জা, আমার শাশুড়ি, বাবা, মা, পলাশ, কে জানে হয়তো মেট্রো স্টেশনের ওই ছেলেগুলোও! তাই ভাবলাম, তাহলে আর কোনকিছু ডিস্টার্ব করা কেন? চারিদিকের সম্পর্কগুলো যেমন আছে, থাক না। তাদের ওপর ডিপেন্ড না করলেই হল। এতদিন শুধু একা চলার কষ্টটা ভেবে ভয় পেয়েছি, কিন্তু তার আনন্দটা, সেটা থেকে নিজেকে আর বঞ্চিত করতে চাই না। আমি আসছি রে দিদি, একা। – ইতি রোমি’
ঋতুপর্ণর কথা বলতে বসলে অবধারিতভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা আসে, আসেই। যদি বলি ঋতুপর্ণর ধর্ম ‘রবীন্দ্রনাথ’, অত্যুক্তি হয় না। কারণ জানি, জীবনের ওঠা-পড়ায় রবীন্দ্রনাথের কত কত গান তাঁকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল, জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছিল, যেমন আজও আমাদের শেখায়, ভাবায়। রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরতে চাওয়ার যে প্রবল আকুতি, বিশেষ করে সঙ্কটের মুহূর্তে, তা কেবল তাঁর ছায়াছবিতে বা লেখায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও।
সাহিত্যিক ঋতুপর্ণকে যদি সত্যিই চিনতে হয়, ওঁর লেখা চিরবিদায় বার্তাগুলো আলাদা করে পড়তেই হবে। ওইরকম হৃদয়বিদারক সম্পাদকীয় লেখা খুব সহজে আসে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চলে যাওয়ার পরে ঋতুপর্ণ লিখেছিলেন—
‘… দিকশূন্যপুরের কথা মনে পড়ে। কত রাত তারার আকাশের তলায় পাথুরে মাটির ওপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি নীললোহিতের সঙ্গে। ঘুম না-আসার ভয় কাকে বলে, তাই জানতুম না মোটে।
এখন ঘুমের ওষুধ ফুরিয়ে এলেই কেমন যেন ভয় করে। বেশি করে আনিয়ে রাখি। …
বাড়ির পাশে পুজো। … কত লোকে জগজ্জননীর কাছে কত কী চায়! আমি চাই শুধু প্রতি রাতের নিশ্ছিদ্র মৃত্যু।
তাই বুঝি অঘোরে ঘুমোই অমন? নীললোহিত যে এসেছে বিদায় নিতে, টের পাই নি কেন?
অষ্টমীর রাতে, যখন সন্ধিপুজোর একশো আট-টা প্রদীপের ছটা পিছলে যায় গর্জন তেলের মুখখানির ওপর, আমার জানলার কোন পর্দা একটুখানি ফাঁক করে পালিয়ে যায় নীললোহিত।
আমি কিচ্ছু টের পাই না। সকাল হয়। আলো পড়ে রবি ঠাকুরের ছবিতে। রবি ঠাকুর সব জানে। সাধে কি আর মুনি-ঋষিদের ত্রিকালদর্শী বলে?
রবি ঠাকুর জানে, বোঝে, শেখায়, গান গায়—
সে যে পাশে এসে বসেছিল, তবু জাগিনি।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল হতভাগিনি।।’
ঋতুপর্ণর মনন গঠনের নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঋতুপর্ণ নিজের মতো করে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করেছিলেন। তাঁর কাজের মধ্যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে প্রকৃত অর্থে আত্তীকরণ করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে কোনো ‘ঠাকুর’ ছিলেন না, বরং অনেক বেশি কাছের মানুষ ছিলেন। ঋতুপর্ণর চেতন-অবচেতন জুড়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ঋতুপর্ণ নিজেকে রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথেই গড়ে তুলেছিলেন— যে পথ পরিক্রমা তাঁকে এত সমাদর এনে দিয়েছিল।
সম্পাদকীয়-র মোড়কে ঋতুপর্ণ আত্মকথনে মগ্ন হয়েছেন বারবার, পড়তে পড়তে মনে হয়েছে সে কথন যেন ‘সৌরনীলের মুহূর্তলিপি’! তাঁর লেখা পড়তে পড়তে অবধারিতভাবে রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়েছে। মনে পড়েছে, কাছের মানুষদের হারাতে হারাতে কীভাবে তিনি নিজেকে নিমজ্জিত করেছিলেন সৃষ্টির সাগরে। ঋতুপর্ণর ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটেনি। নইলে তিনি কিভাবে লিখেছেন এমন কথা?
‘আমি যে জ্বলন্ত চুল্লিতে ঢোকানোর সময়, ট্রেনের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ যেভাবে পরিজনকে বিদায় দেয়, তেমন করেই বলেছিলুম— সাবধানে যেও। মা অনেকদিন অপেক্ষা করছে।… সকালের আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়েছে বিছানায়।
কেবল মনে হল, ট্রেনে তো তুলে দিলাম, এখন কোন স্টেশনে পৌঁছোল, চা খেয়েছে কি না, ট্রেন লেট কি না— কিচ্ছুটি তো জানা হল না।’
সম্পাদক ঋতুপর্ণ কেমন ছিলেন? ভাবতে ভালো লাগে, তাঁর নিজের বয়ানেই সেই কথা ধরা রয়েছে—
‘… ছাব্বিশটা সংখ্যা কেটে গেছে। এবং বোধহয় বেশ সফলভাবেই কেটে গেছে। এটা বোধহয় আমার অতি বড় শত্রুও স্বীকার করবেন। যাঁরা আমার হিতৈষী, বাংলা সিনেমার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং বাংলা সংস্কৃতিকে ভালবাসেন, তাঁদের হয়তো আরও অনেক আশা ছিল আমার ওপর যে, আমি সম্পাদক হিসেবে ‘আনন্দলোক’-এর এমন একটা চেহারা দেব যা সম্পূর্ণভাবে কুৎসাবর্জিত, একটি বিশুদ্ধ সংস্কৃতি পত্রিকা। কিছু লোকের আবার ক্ষোভ যে মুখরোচক মসলার ভাগ কমিয়ে এনে কেনই বা ‘আনন্দলোক’-এ ‘জলসাঘর’ বা ‘নান্দনিক’-এর মতো ভারি ভারি অধ্যায়ের প্রবর্তন হবে! কিন্তু আমি যেহেতু মানুষটাই ভীষণ গোলমেলে এবং আমার ছবিগুলো যেহেতু না শৈল্পিক না বাণিজ্যিক, কেবল দর্শকদের প্রিয়, আমার এই নতুন দোআঁশলা ‘আনন্দলোক’-ও হয়তো এইভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে একদিন নিঃসীম ওড়ার ছন্দ খুঁজে পাবে। …’
সম্পাদকীয়গুলোয় তারিখ লেখায় ঋতুপর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন না। কারণ, তিনি মনে করতেন, অধিকাংশ সময়েই তাঁর সম্পাদকীয় এতটাই কালনিরপেক্ষ যে কেবল লেখার নীচে একটা তারিখ লিখে দেওয়া অত্যন্ত অর্থহীন। তাঁর লেখাগুলো কালনিরপেক্ষ তো বটেই, কালোত্তীর্ণও যে সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘টেক ওয়ান’ বা ‘ফার্স্ট পার্সন’ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে যেন তাঁর মুহূর্তলিপি পড়ছি, ‘সৌরনীলের মুহূর্তলিপি’, যার পাতায় পাতায় রয়েছে তাঁর নিজের সঙ্গে নিজের, তাঁর সঙ্গে সিনেমার, তাঁর সঙ্গে সাহিত্যের, তাঁর সঙ্গে সঙ্গীতের, কত আঙ্গিকের কত কথোপকথন! তবে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে, ঋতুপর্ণর লেখা পড়তে পড়তে অনেক সময়েই মনে হয়েছে যেন রবিঠাকুরের ‘গীতবিতান’ পড়ছি। নিছক বিষয়ের বৈচিত্র্যের কারণে নয় বা ব্যাপ্তির কারণেও নয়, তাঁর রচনাকে বরাবর একলা মানুষের একান্ত অবলম্বন মনে হয়েছে। মনে হয়েছে যেন, তাঁর ছায়ায় বসলেই দেখা দিয়েছে অদৃশ্য এক বন্ধুর হাত, আর সে হাত এক নিমেষে সমস্ত গ্লানি মুছিয়ে দিয়ে, মন আলোকিত করে তুলেছে।
🙏🙏🙏শ্রদ্ধা লেখার প্রতি রইলো। অসাধারণ মুগ্ধ হয়ে গেলাম
I know you are many but if we remember, we can meet.