Hello Testing

বি শে ষ  র চ না

গৌতম মণ্ডল

goutam

দেবদাস আচার্যর প্রয়াণ: একটি যুগের অবসান

নিভে গেল বাংলা কবিতার আলোকবর্তিকা। গতকাল শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ভোর ৪.২০ নাগাদ কৃষ্ণনগরের রাস্তায় প্রয়াত হন বিশিষ্ট কবি দেবদাস আচার্য। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ১৯৪১ সালের অগাস্টে (২৭ শ্রাবণ ) অবিভক্ত বাংলার চুয়াডাঙা মহুকুমার বন্ডবিল গ্ৰামে তিনি জন্মগ্ৰহণ করেন। দেশভাগ হওয়ার পরে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে এসে প্রথমে নদিয়ার বীরনগরের শরণার্থী শিবিরে সপরিবারে আশ্রয় গ্ৰহণ করেন। তারপর নানান প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন। জীবিকার তাগিদে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা স্থগিত রেখে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কৃষ্ণনগরে থেকেই তিনি নাটক, ছোটগল্প ও উপন্যাস লেখা শুরু করেন। পরবর্তীকালে কবি অরুণ বসুর প্রেরণায় কবিতা লেখাতে মন দেন। প্রায় ৭০ বছর গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে একেবারে স্বতন্ত্র ঘরানার কবিতা লিখলেও দেবদাস আচার্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো পুরস্কার পাননি। তবে তিনি, অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, পেয়েছেন পরবর্তী সময়ের কবিদের কাছে অসীম শ্রদ্ধা। ভালবাসা। কিন্তু কেন? কী এমন জাদু‌ রয়েছে তাঁর কবিতায় ? মায়াবী কোনো আলো ? অভিনব ডিকশন ?

 আমার দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, ‘মৃৎশকট’ কাব্যগ্রন্থেই দেবদাস আচার্য একটা নিজস্বতা খুঁজে পান। নিজস্ব ভাষা। ডিকশন। কিন্তু এখন দেবদাস আচার্যর কবিতাসংগ্রহ খণ্ডে খণ্ডে সম্পাদনা করতে গিয়ে নতুন করে তাঁর কবিতা পড়তে হয়। আর নিবিড়ভাবে সেটা করতে গিয়ে এখন আমার মনে হচ্ছে, ‘মৃৎশকট’ কাব্যগ্রন্থে নয়, তার আগেই, ‍১৯৭০ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কালক্রম ও প্রতিধ্বনি’তেই তিনি রচনা করতে পেরেছিলেন নিজস্ব জগৎ। বাংলা কবিতা‌ যে জগতের কথা এতদিন বলতে চায়নি, বলেনি, শ্রমজীবী মানুষের সেই কর্কশ জগৎ, তিনি তাকে অবলীলায় ধারণ করলেন, লিখলেনও। আসলে ছিন্নমূল পরিবারের সন্তান দেবদাস কবিতাকে ড্রয়িংরুম থেকে, রুমের সফিশটিকেশন থেকে নিয়ে আনতে চাইলেন একেবারে মাঠে, সেই মাঠ, যেখানে সাবঅলটার্ন মানুষ ‘নিড়িনি চালায় শস্যে’ আর ‘খুঁট থেকে বিড়ি বার করে’ এবং ‘মধু দিয়ে পান্তাভাত খায়’।

দেবদাস আচার্যর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে । ‘মৃৎশকট’। ‘কালক্রম ও প্রতিধ্বনি’র ক্যানভাস ছিল ছোট, কিন্তু মৃৎশকট-এর ক্যানভাস অনেক বড়। বিরাট। আবহমান সময় ও বিরাটকে স্পর্শ করতে চায় এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। প্রচলিত ছন্দে লেখা নয় ঠিকই, কিন্তু এইসব কবিতাগুলো অনশ্বরকে ধারণ করতে চায়। পাশাপাশি জীবজন্তু এমনকী ভাগাড়ের কৃমিকেও তিনি প্রণাম জানিয়েছেন এই কাব্যগ্রন্থে।

‘মৃৎশকট’-এ আমরা পেয়েছি বিরাটকে, বিরাটের আলো ও আঁধার, কিন্তু ‘মানুষের মূর্তি’তে (১৯৭৮) আমরা দেখব আবার সেই সাবঅলটার্ন মানুষকে। পূর্ববর্তী কাব্যগ্রন্থে যেভাবে দেখেছিলাম, ঠিক সেভাবে নয়। এখানে প্রান্তিক মানুষের অসহায়তার থেকেও বেশি দেখব জীবনের প্রতি তাঁদের গভীর অভিনিবেশ। যাপন। গৌরববোধ। ‘কালক্রম প্রতিধ্বনি’র মানুষ এখানে কিছুটা পরিশীলিত। সংকেতময়। আরও গভীর বোধের আলোয় উজ্জ্বল।

‘মানুষের মূর্তি’র আরও সম্প্রসারিত রূপ ‘ঠুঁটো জগন্নাথ‍’।১৯৮৩ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই রয়েছে প্রান্তিক আমির গৌরবের কথা। গ্লানির কথাও। আছে প্রেম এমনকী যৌনতার প্রসঙ্গও। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন কাব্যগ্রন্থটির প্রিন্টার্স পেজে ইংরেজিতে বইটির নাম লেখা আছে : Handicap God. এর মধ্য দিয়ে কবির তীব্র শ্লেষ দেখতে পাই, যা এ বইটির একটি অন্যতম উপাদান।

ঐতিহাসিক গ্ৰেস কটেজে ( কাজী নজরুল ইসলামের বাসভবন) দেবদাস আচার্য এবং সন্ধ্যা আচার্য

 ‘উৎসবীজ’। দেবদাস আচার্যর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত এই পুস্তিকায় দুটি দীর্ঘ কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ‘উৎসবীজ’ এবং ‘রাজা বিক্রমাদিত্য’। ‘উৎসবীজ’ কবিতায় রয়েছে মহাজাগতিক চেতনা। অপরপক্ষে ‘বিক্রমাদিত্য’ কবিতায় বিক্রমাদিত্য চরিত্রের আড়ালে কবি সুনিপুণভাবে মিশিয়েছেন অতীত ও বর্তমানকে এবং এই অন্ধ যুগে একজন রাজার কর্তব্য ঠিক কীরকম হওয়া প্রয়োজন, সেটাও স্মরণ করতে ভুলে যাননি।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় দেবদাস আচার্যর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ ‘আচার্যর ভদ্রাসন’। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো কি আধ্যাত্মিক কবিতা ? আধ্যাত্মিকতা বলতে সাধারণত যা বোঝায়, বুঝিও, তেমন কিন্তু নয় এই কবিতাগুলো। তবে গভীর উপলব্ধিজাত হওয়ায় সম্ভবত কেউ কেউ এগুলোকে আধ্যাত্মিক কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু তাহলে এই গ্রন্থে উল্লেখিত সিদ্ধাচার্য– তিনি কে? তিনি কি কোনো আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ ? সিদ্ধাচার্য আসলে একজন সাধক। মানবতার সাধক। ভাষার সাধক। আর তাঁর স্ত্রী ? তিনি সিদ্ধাচার্যের সাধনসঙ্গিনী। নৈরাত্মমণি। তাঁকে নিয়ে কাম ও সৌন্দর্যের সাধনায় তিনি মগ্ন । তাঁর এই সৌন্দর্যসাধনার নির্জন আলো দেখি এই কাব্যগ্রন্থে।

‘তর্পণ’ । দু-বছর পরে, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় দেবদাস আচার্যর এই পুস্তিকাটি। কবির বাবা দয়াময় আচার্যর মৃত্যু হয় ১৯৯২ সালে। এরই অভিঘাতে কবিতাগুলো রচিত হয়েছে, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এই পুস্তিকায় ছড়িয়ে আছে কবির মৃত্যুচেতনা।

ঠিক এক বছর প্রকাশিত হয় দেবদাস আচার্যর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ। ‘অনুসূচিত কবিতা’। এটি আসলে কবিতাপুস্তিকাই। এই পুস্তিকায় আবার প্রবল হয়ে ওঠে কবির সাবঅলটার্ন চরিত্র। ফলে সমাজে নিজের স্থানাঙ্ক ও দ্রোহ প্রকাশ‌ করার জন্য বিভিন্ন কবিতায় এমন সব শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন– যা লেখা তো দূরের কথা তথাকথিত ভদ্র সমাজে তা উচ্চারণ করা যায় না।

‘সুভাষিতম’। দেবদাস আচার্যর নবম কাব্যগ্রন্থ। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে একটিই কবিতা আছে, একটি দীর্ঘ কবিতা। এখন প্রশ্ন,১২৬৩ পঙক্তিসংবলিত কবিতাটিকে কি মহাকবিতা বলা যাবে ? এর উত্তর হ্যাঁ, আবার নাও। হ্যাঁ, তার কারণ সমগ্ৰ কাব্যগ্রন্থজুড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো তিনি আত্মঅন্বেষণ করে চলেছেন । আর না, তার কারণ, যে বিশাল প্রেক্ষিত ও মহাকালের কথা মহাকবিতা প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশ উল্লেখ করেছেন তাঁর বিভিন্ন নিবন্ধে ও প্রবন্ধে, তা অনুপস্থিত এই কাব্যগ্রন্থে।

২০০২ সালে প্রকাশিত হয় দেবদাস আচার্যর দশম কাব্যগ্রন্থ ‘রসাতল থেকে ফিরে’ । ‘সুভাষিতম’-এর মতো এই কাব্যগ্রন্থেও রয়েছে একটি কবিতা, একটিই দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটি বন্যাবিধ্বস্ত পৃথিবীর প্রতিবেদন ঠিকই, কিন্তু এর মধ্যে কবিতা নেই তা তা বলা যাবে না। সবচাইতে বড় কথা, কবিতাটির নব্বই শতাংশ জুড়ে অন্ধকারের কথা থাকলেও, মৃত্যুর কথা থাকলেও, এসব থেকে উত্তরণের রাস্তাও তিনি দেখিয়েছেন।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রণীত আমাদের শান্তিনিকেতন গ্রন্থটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করছেন কালীকৃষ্ণ গুহ, দেবদাস আচার্য, অমিয় দেব, গৌতম বসু, সুধীর দত্ত এবং গৌতম চৌধুরী।

 ‘যে আছো অন্তরে’। দেবদাস আচার্যর একাদশতম কাব্যগ্রন্থ। ৪০ টি কবিতাসংবলিত এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এই কাব্যগ্রন্থ থেকে দেবদাস নিজেকে একেবারে বাহুল্যবর্জিত করতে চেয়েছেন। যা কিছু কবিতা নয় সেসবকে নির্দ্ধিধায় কবিতা থেকে বর্জন করেছেন। এর ফলে তাঁর এই গ্ৰন্থের কবিতায় কবিতা ছাড়া অতিরিক্ত কিছু নেই। নাটকীয়তা নেই। চমক নেই। যেসব উপাদান কবিতাকে আমজনতার কাছে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে, তার প্রায় কিছুই নেই এই পর্বের কবিতায়।‌ তাহলে কী আছে ?

‘যে আছো অন্তরে’ কাব্যগ্রন্থের ভেতরে রয়েছে প্রিয়নাথ। প্রিয়নাথ কি কবি নিজেই? নাকি তাঁর অল্টার ইগো ? তিনি যেই হোন এই গ্রন্থের কবিতা পাঠ করে বুঝতে পারি, যে তোলপাড় বিভিন্ন আকৃতি নিয়ে কবি প্রথম দশটি কাব্যগ্রন্থে রচনা করেছেন সেই জগৎ এখন তুলনামূলকভাবে অনেক শান্ত। কোনো কিছুতেই কবির এখন হতাশা নেই, দুঃখ নেই, নেই অনুশোচনা ও ক্লান্তি।

এরপর ২০০৯ ও ২০১০ সালে পরপর প্রকাশিত হয় দুটি কাব্যগ্রন্থ। ‘দুয়ারে রাখা থাক’ এবং ‘তিলকমাটি’ । একসময় দেবদাস আচার্য লিখেছিলেন ‘কবিতা হচ্ছে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে উঠে আসা আলো’। এই আলোই, বলা বাহুল্য, দেবদাস আচার্যর ‘তিলকমাটি’ কাব্যগ্রন্থের প্রধান অবলম্বন। নির্ভার হওয়ার যে প্রক্রিয়াটা ‘যে আছো অন্তরে’ বিকশিত হয়েছিল তা চূড়ান্ত রূপ পায় ‘তিলকমাটি’তে।‌

দেবদাস আচার্যর ‘যে আছো অন্তরে’ ও ‘তিলকমাটি’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় যে ধরন ও ভাষাশৈলী লক্ষ করা যায়, মূলত সেই ধারাতেই পরবর্তী কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। আদম থেকে প্রকাশিত ‘কবিতাসংগ্ৰহ’এর দ্বিতীয় খণ্ডের বাকি যেসব কাব্যগ্রন্থগুলিতে ওইরকম নির্ভার কবিতা পাই সেগুলো হল : ‘ফটিকজল‌'(২০১২) ‍’যা আছে আপনারই’ ( ২০১৪) এবং ‘তারপথ যাব’ ( ২০১৪)।

‘কবিতাসংগ্ৰহ-র ‘ এই খণ্ডটির মধ্যে একেবারে ভিন্ন ঘরানার কাব্যগ্রন্থ বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে তা ‘নাস্তিকের জপতপ’ ( ২০১৩)। কিন্তু কবিতাগুলোর রচনাকাল ১৯৮০-২০০৫ অর্থাৎ দীর্ঘ ২৫ বছর জুড়ে রচিত হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থে। তিনি যে একজন নাস্তিক, আর তাঁর শূন্যবাদ ছড়িয়ে বিভিন্ন কবিতায়– মূলত এটাই কবিতাগুলোর উপজীব্য । এইখানে এসে মনে হতে পারে এই ক্লেদাক্ত পৃথিবীতে নিরীশ্বরবাদী কবি সান্ত্বনা ও শুশ্রূষা পান কোথা থেকে ? এর উত্তর হতে পারে নিসর্গ। মননেন মধুও।

কবিতাসংগ্রহ-র দ্বিতীয় খণ্ড শেষ হয়েছে ‘তারপর যাব’ কাব্যগ্রন্থ দিয়ে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে দেবদাস আচার্যর আরও ৯ টি কাব্যগ্রন্থ। ‘এই যে থাকা তুমিও সুন্দর’ (২০১৬), ‘বিন্দু নয় রেখা নয়’ ( ২০১৮), ‘নেই শব্দে কথা’ (২০২০), ‘করোনা ডায়েরি’ (২০২১), ‘ধুলোপথ’ ( ২০২২), ‘হাওয়া বয়’ (২০২২), ‘দখিন হাওয়া’ (২০২৩), ‘ওঔম’ (২০২৩), এবং ‘কে ডাকে’ ( ২০২৩)। এই কাব্যগ্রন্থগুলি নিয়ে খুব শিগগির আদম থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে দেবদাস আচার্যর কবিতাসংগ্রহ-র তৃতীয় খণ্ড।

এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে অবশ্য একমাত্র ‘করোনা ডায়েরি’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তৎকালীন সময়ের ক্ষয় ও ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া যায় ।বাকি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কমবেশি ‘তিলকমাটি’র যে নির্ভার ঘরানা তাকেই অনুসরণ করেছে।

তবে তৃতীয় খণ্ডেই তাঁর কবিতাযাত্রা শেষ হচ্ছে না। বছর দুয়েক আগে অসুস্থ থাকার সময় কিছুটা ঘোরের মধ্যে লিখেছেন সাত পঙক্তির শিরোনামহীন পাঁচশোটি কবিতা। অপ্রকাশিত এইসব কবিতা এবং কয়েকটি কাব্যনাট্য নিয়ে প্রস্তুত হয়েছে কবিতাসংগ্রহর চতুর্থ খণ্ড। এছাড়াও আদম থেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তো পাওয়া যায়ই গৌতম বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত দেবদাস আচার্যর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র পরিবর্ধিত সংস্করণটিও নতুনভাবে এবারের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতা তো নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখেছেনই, পাশাপাশি দেবদাস আচার্য বিভিন্ন সময়ে প্রচুর প্রবন্ধ, নিবন্ধ এমনকী উপন্যাসও লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে দেবদাসের শৈশবের আত্মজীবনী ‘দেবদাসের জীবনপ্রভাত’ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে । এটির প্রথম অংশটি প্রকাশিত হয়েছিল মণীন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত পরমা পত্রিকায়, ১৯৭৮ সালে।

দেবদাস আচার্যর কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বর্তমান লেখকের লেখা একটি আস্ত আলোচনাগ্রন্থও। ‘আচার্যর কবিতা’ (২০২৩) শীর্ষক এই গ্রন্থে দেবদাস আচার্যর প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থকে নিয়ে পৃথকভাবে নিজস্ব উপলব্ধির কথা বিশ্লেষণ করেছেন এই লেখক।

বাংলা কবিতায় দেবদাস আচার্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আরও একটি কারণে। বিগত শতাব্দীর সাতের দশকে দেবদাস আচার্য ‘ভাইরাস’ নামের একটি মাসিক লিটল ম্যাগাজিন কিছুদিন ধারাবাহিকভাবে সম্পাদনা করেছিলেন। মাত্র চার পাতার একটি কবিতার কাগজ, ১৯৭৫-১৯৭৮ সময়সীমায় সব মিলিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ২৮ টি সংখ্যা কিন্তু এর অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। সত্তরের দশকের প্রধান প্রায় সব কবির উত্থান ঘটেছে এই শীর্ণ কাগজে কবিতা লিখে। ভাইরাস প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থও। জয় গোস্বামীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ক্রীসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’, মল্লিকা সেনগুপ্তর ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’ প্রভৃতি কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ভাইরাস প্রকাশনা থেকে।

রোটারি সদনে দেবদাস আচার্যকে আদমসম্মাননা জ্ঞাপন করছেন শঙ্খ ঘোষ। পাশে রয়েছেন দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কালীকৃষ্ণ গুহ।

২০১৮ সালে কলকাতার রোটারি সদনে আদম পত্রিকা ও প্রকাশনার পক্ষ থেকে আজীবন কবিতাযাপন ও কবিতায় বিশেষ অবদানের জন্য দেবদাস আচার্যকে আদমসম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়। কবির হাতে সম্মাননা ও মানপত্র তুলে দেন বিশিষ্ট কবি ও চিন্তক শঙ্খ ঘোষ। বলা বাহুল্য, এই‌ বিভাগে এযাবৎ যাঁরা আদমসম্মাননা পেয়েছেন তাঁরা হলেন আলোক সরকার, শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়, গীতা চট্টোপাধ্যায়, অরুণ বসু, বীতশোক ভট্টাচার্য, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, কালীকৃষ্ণ গুহ, দেবারতি মিত্র, বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়, গৌতম বসু, জয় গোস্বামী, গৌতম চৌধুরী, একরাম আলি এবং হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

তবে সরকারি স্তরে নানান পুরস্কারের আয়োজন থাকলেও দেবদাস আচার্যর মতো একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিকে ‍ জ্ঞাপন করা হয়েছে বাংলা আকাদেমি প্রদত্ত আলপনা আচার্য স্মৃতি পুরস্কার (২০১২) এবং কবিতা আকাদেমি প্রদত্ত জীবনানন্দ দাশ সম্মান ( ২০১৯)।

দেবদাস আচার্য অবরে-সবরে কলকাতা যেতেন ঠিকই কিন্তু সেটা ডাক্তার দেখাতে।‌ তাঁর ডাক্তার ছিলেন বিশিষ্ট হৃদরোগবিশেষজ্ঞ শুভানন রায়। শুভানন রায় নিজেও একজন কবি এবং দেবদাস আচার্যর কবিতার অনুরাগী পাঠক।

এছাড়া পারতপক্ষে কখনো কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, নানান ভাবে কলকাতা নিজেই এসে উপস্থিত হত কৃষ্ণনগরের একপ্রান্তে থাকা আচার্যর নির্জন বাড়িতে।

ভোট গণনার উত্তেজনায় যখন বাংলা প্রায় আচ্ছন্ন তখন অত্যন্ত নিঃশব্দে ইহলোক ত্যাগ করে অনন্তে চলে গেলেন উত্তর জীবনানন্দ যুগের অন্যতম প্রধান কবি দেবদাস আচার্য।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *