Hello Testing

উ প ন্যা স  পর্ব ২

তীর্থঙ্কর নন্দী

tirthankar

ক্ষয় ও ক্ষরণের কথামালা

সুন্দর গোছানো ফ্ল্যাট দেখে অনি দেবা এতই মুগ্ধ হল যে সেদিন রাতে তারা ডিনারে নিল হাঁসের মাংস, তন্দুরি রুটি আর আইসক্রিম। আইসক্রিম দেবা আর ধৃতির দু-জনেরই দারুণ পছন্দের আইটেম। দু-বছরের ছোটো ছেলে ধৃতি কোলে বসে যেন সকলের আনন্দ উপভোগ করে। আজকালকার ছেলে-মেয়েরা কি বেশি সচেতন! সেই বাচ্চা যদি সিজারে হয়! অথবা নর্মালে! তবে গাইনিরা বলেন সিজারের বাচ্চারা বেশি ছটফটে বুদ্ধিমত্তা হয়। ওদের ব্রেন খুব ধারাল এবং সজাগ থাকে। তবে কি নর্মাল বেবিরা একটু কম বুদ্ধিমত্তা কম সজাগের হয়! ধৃতির বাচ্চা সিজারের। ওর গাইনি থাকে নিউটাউনেই। অত্যন্ত ভদ্র সচেতন একজন গাইনি। চেকআপ দারুণ করেন।

অথচ অনি আর দেবার প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময় অনির পুরনো বাড়ির কাছে মানে বাগবাজারের যে গাইনি ডাক্তারকে দেখায় উনি তিন সপ্তাহের মাথায় বলেন দেবার বাচ্চা যে কারণেই হোক নষ্ট হয়ে গেছে। অনি জানতে চাইলে ডাক্তার বলেন সব গাছেই কি ফুল ফুটলেই ফল আসে! ধরুন আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই উদাহরণ খাটে। বাগবাজারের গাইনির কথা শুনে সে রাতে দেবার চোখে ঘন কালো অমাবস্যা নেমে আসে। অথচ সেদিনও জোৎস্না রাতের আলোয় গঙ্গার জল কত চকচকে। জলের প্রতিটি ছোটো-বড়ো ঢেউ কি চমৎকারভাবে একদিক থেকে অন্যদিকে বয়ে যায়। ডাক্তারের কথা শুনে অনি দেবাকে কিছুই বলতে পারেনি। গাছে ফল না হওয়ার জন্য কি শুধু দেবাই দায়ী! ক্যাবে করে দেবার মাথাটি নিজের কাঁধে নিয়ে বি. টি. রোডের শান্তিবনে আসতে রাত এগারোটা বেজে যায়। বি. টি. রোডে যদিও বিভিন্ন গাড়ির জ্যাম তবুও অনি একদম মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের মোবাইলে দেবাকে ব্যান্ডের গান শোনায়। বিভিন্ন ব্যান্ডের। ক্যাকটাস ফসিল চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদি। বিভিন্ন গান শুনতে শুনতে দেবা কখনও মাথা সোজা করে। ক্যাবের সামনে তাকায়। পথ কোথায় এল! পথ আরও কতটা বাকি! আমার কেন ফল হবে না! ইত্যাদি ইত্যাদি।

উবের থেকে নামার সময় দরজায় কেমন ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হয়। অনি প্রথমে মনে করে কোনো শিশু বিড়ালের কান্না। তারপর মোবাইলের আলোয় দেখে দরজাটি বেশ পুরনো। কব্জায় মরচে পরে এই শব্দ। দরজাটি দু-তিনবার পেইন্ট করা হয়। কিন্তু কব্জা গুলি ক্ষয়ে ক্ষয়ে আর জীবন্ত নেই। যে কোনো দিন দরজাটি খুলে যেতে পারে। মালিক তো ড্রাইভারের কাছ থেকে টাকা গুনেই খালাস। মালিক জেনেও জানে না এইসব ক্ষয় কত মারাত্মক। যে কোনো সময় প্যাসেঞ্জার দরজা খুলে মাটিতে পড়ে যেতে পারে। চলন্ত গাড়ি থেকে মানুষ পড়ে গেলে কি বিভৎস দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সেই জিনিস মালিক কল্পনাও করতে পারে না। মালিক শুধু জানে চাকা ঘুরুক। পয়সা আসুক। নিজের মদ্যপান চলুক। মাগিবাজী চলুক ইত্যাদি ইত্যাদি।

মন খারাপের জন্য দেবা রাতে না খেয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ে। ক্লান্তি ও ধকলের জন্য তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েও যায়। অনি হালকা রাতের খাওয়া শেষ করে। বারান্দায় বেতের মোড়ায় বসে সিগারেট ধরায়। চোখের সামনে খোলা গঙ্গার জলছবি ভেসে আসে। রাত এখন মাত্র এগারোটা। স্কুলে পড়ার সময় শুধু বাড়ি আর সাউথ পয়েন্ট আর কোচিং। গঙ্গা দেখার সুযোগই হল না। আজ মনমরা অবস্থায় অনি বারান্দা থেকে অনেকদূর গঙ্গাকে দেখে। দু-পাড়ে বিন্দু বিন্দু আলো। একদিকে বেলুড় অন্যদিকে দক্ষিণেশ্বর। জলের হাওয়ায় এই রাত এগারোটাতেও এখন সন্ধ্যা আরতির ধূপধুনোর গন্ধ বাতাসে। পবিত্র এই গন্ধে অনির চোখ মন জড়িয়ে যায়। দুটি রাত-পেঁচা ডাকতে ডাকতে বেলুড়ের দিকে চলে গেল। অনি রাতের গঙ্গার ছায়াছবি দেখতে দেখতে দেবার মনের কষ্টটা বেশ ভালই উপলব্ধি করতে পারে। একজন মেয়ের অহংকারের জায়গাই হল মাতৃত্বের স্বাদ। মাতৃত্বের স্বাদ থেকে যারা বঞ্চিত হয় তারা মনে করে বেঁচে থাকাটাই পাপ। অর্থহীন। ফলে যারা মনে করে অর্থহীন তাদের মনে অর্থ ফিরিয়ে আনাও একটি মূল্যবান কাজ। অন্তত অনি তাই মনে করে। ঠিক বারোটার সময় বিছানায় ফিরে এসে দেবার কপালে হাত বোলাতে বোলাতে অনি ঘুমিয়ে পড়ে।

বসন্ত ঋতুটি চমৎকার! কিন্তু এই ঋতুটি এতই ক্ষণস্থায়ী যে ভালভাবে উপলব্ধি করার আগেই কেমন হারিয়ে যায়। ঝুপ করে গরমকাল চলে আসে। শৈশবে অনির দোলের সময় রঙ খেলার সময় কেমন বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগত। তারপর রঙ খেলার পর শরীরের যাবতীয় বৈচিত্রপূর্ণ রঙ তোলার জন্য রাস্তার কলে স্নান করত তখনই যেন গরমকাল এসে যেত। আর উত্তর কলকাতায় রঙ খেলা হয় বীভৎসভাবে। দোলের দিন ছেলে মেয়ে আলাদা করে চেনা খুবই মুসকিল। দেবার নাকি রঙে অ্যালার্জি দেবা কোনোদিন দোলে বাড়ি থেকে বেরত না। নিজের স্টাডি রুমে বসে গল্পের বইতে ডুবে যেত।

দুপুরে বসন্তের আবহাওয়াতে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ যেন বিউটি কুইন। এই নাম কে রাখেন! কিছু কি দ্বিমত আছে! লোকে বলে আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাক ক্লাস্কি। ভারতে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চলে। দেখতে লম্বা। উচ্চতা ছ ফুট তিন ইঞ্চি। গায়ের রঙ স্বাভাবিকভাবেই ফর্সা। ট্রেন থেকে নেমে অনি আর দেবা চলে যায় একটি হোম স্টেতে। এই হোম স্টে বেশিদিনের নয়। খুবই নতুন। গত চার বছর আগে হবে। কিংবা আরও আগে। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ছোটো পাহাড়ি জায়গা। লোকে বলে ছোটো ইংল্যান্ড। আসলে ইংরেজদের দুশো বছরের গায়ের গন্ধ কি চট করে মুছে যেতে পারে।

বিমর্ষ ক্ষত বিক্ষত দেবাকে নিয়ে এই পাহাড়ি শহরে যে ঘুরতে আসবে অনি সেটি আগেই ঠিক করে। গত জুনে বাগবাজারের গাইনি যখন বলেন সব গাছে ফুল এলেও ফল হয় না ঠিক তখনই। নিজে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে। অ্যাকাউন্টসে। অনি সাউথ পয়েন্ট থেকে কর্মাস নিয়ে পাশ করে মাস্টার্স করেই একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে ঢুকে পড়ে। ঢোকার সময় স্যালারি কম থাকলেও এখন অভিজ্ঞতার দৌলতে মোটামুটি ভালই। অনি বুঝতে পারে সেদিনই যেদিন বাগবাজারের গাইনি বলেন সব গাছে ফুল এলেও ফল হয় না। অনি তখনই দেবার মনের অবস্থাটি মাপতে থাকে! অনি জানে একজন মেয়ে মাতৃত্বের স্বাদ না পেলে কিভাবে ভেঙে যেতে পারে। সেই ভাঙা সাঙ্ঘাতিক। সেই ক্ষয় মারাত্মক। আর সেই ক্ষয়ের জন্য একজন মেয়ের শরীর কি সাঙ্ঘাতিকভাবে ভাঙতে থাকে। সর্বক্ষণ সেই ক্ষয় রক্তক্ষরণের মতন শিরা উপশিরা দিয়ে চুঁইতে থাকে। ফলে মানুষটি আর নর্মাল মানুষ থাকে না। দেবাও থাকে নি। হোম স্টে-তে যখন প্রবেশ করে তখন দুপুর দুটো। দেবা প্রথমেই ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে যায়। বলে একেবারে স্নান করে বেরবে। অনি হোম স্টে-র বারান্দায় বসে লাল-নীল-বেগুনি-সবুজ ফুল বাহার দেখে। মনে মনে ভাবে এই ছোটো পাহাড়ি শহর পূর্বে আরও কত সুন্দর ছিল! ইংরেজরা যত্ন জিনিসটি ভালভাবেই শেখাতে পারে। বিশেষ করে ডিসিপ্লিন। পরাধীনতা আমাদের ভারতবাসীদের ভালো লাগেনি। লাগার কথাও নয়। এটি আত্মসম্মানের বিষয়। মানুষ আত্মসম্মান নিয়েই বাঁচতে চায়। তবুও ইংরেজদের ডিসিপ্লিন আমাদের মনে গেঁথে আছে। কারোর সঙ্গে ঠোক্কর খেলেই বলি স্যরি। প্রত্যূষে কারোর সঙ্গে দেখা হলেই বলি, গুড মনিং। ঘুম থেকে উঠলে প্রতিবেশী কারোর সঙ্গে দেখা হলেই বলি হাই! অনেকদিন বাদে নিকট কোনো আত্মীয় বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে দেখা হলেই বলি, সি ইউ এগেন। ইত্যাদি।

সকালটি বেশ ঝরঝরে। হোম স্টে-র লাগোয়া বাগানে দুটো কাঠের চেয়ারে অনি আর দেবা। সামনে গরম চা। কিছু স্ন্যাকস। চোখের সামনে শাল মহুয়ার গাছ। একটি ছোটো পাহাড়ি ঝর্না জল সামনের একটি পোড়ো বাড়ির পাশ দিয়ে দূরে কোথায় চলে যায়। দীর্ঘদিনের ঝর্নাজলের আঘাতে আঘাতে বাড়িটির একতলার দেওয়াল কেমন খসে ইট বেরিয়ে আসে। যদিও এই ছোটো ঝর্নার জলের বেগ খুবই নগণ্য। তথাপি একটা মৃদু চাপ থাকেই। দেওয়ালটি ক্ষয় হতে হতে ইটগুলি কেমন ফাঁকা হাঁ হয়ে আছে। অনি বেশিক্ষণ সেই ক্ষয়ে যাওয়া বাড়িটির দেওয়াল না দেখে চোখ সরিয়ে দেবার দিকে মুখ ঘোরায়। ইদানিং দেবাকে দেখলেও ওর মন খারাপ হয়ে যায়। অনি জানে দেবা কখনও মা হতে পারবে না। আবার দেবাও জানে অনি কখনও বাবা হতে পারবে না। কিন্তু অতি বাস্তব বিষয়টি হল অনির তুলনায় দেবা বেশ ভেঙ্গে যায়। শত হলেও সে মেয়ে। আজ এক বছরের ভিতর দু-দুবার অনি দেবাকে নিয়ে এই ছোটো পাহাড়ি শহরে আসে। কেননা ম্যাকলাস্কিগঞ্জে প্রথমবার আসার পর দেবা একটু ফ্রেশ হয়ে কলকাতায় ফেরে। যদিও সেই ফ্রেশ ভাবটি বেশিদিন টেকেনি। বড়োজোর দুমাস। আবার সেই মনমরা। কম খাওয়া। কি এক কষ্ট যেন দিন দিন দেবাকে শেষ করে দেয়। চোখ মুখ দেখলে বোঝা যায় সর্বক্ষণ এক যন্ত্রণা কষ্ট শিরা উপশিরার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ক্ষরণ যেন রক্তক্ষরণের থেকেও বীভৎস। বাইরের রক্তক্ষরণ তাও বিশেষ চিকিৎসায় বন্ধ করা যায়। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণার ক্ষরণ! দেবার এই ক্ষরণ বন্ধ করার জন্য অনি অনেক চেষ্টা করে। সেই চেষ্টার জন্যই দ্বিতীয়বার এই পাহাড়ি শহরে আসা।

যতই প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময় বাগবাজারের গাইনি ডাক্তার বলুক যে দেবার পক্ষে মা হওয়া অসম্ভব তবুও দেবাকে আরও তিনজন গাইনিকে পুরো রিপোর্ট এবং মতামত নেয়। অবশ্য প্রতি গাইনিই একই মন্তব্য করেন। দেবার কোথায় গণ্ডগোল অবশ্য ডাক্তাররা খুলে কিছু বলেননি। তার মানে কি জন্ম মৃত্যু বিবাহ এই তিনকথা কি আজও রহস্যময়! এই যে এত এত অর্থ খরচ করা হচ্ছে মহাবিশ্বের রহস্য জানার জন্য তবুও কেন আজও অধরা জন্ম মৃত্যু বিবাহ! মানুষের মৃত্যু হলে মানুষ কোথায় যায়! কেন মানুষ বা প্রাণ জাতীয়রা জন্ম নেয়! মৃত্যু হয়! অথচ জড় পদার্থেরও ক্ষয় আছে। ক্ষয় হয়। যেমন ম্যাকলক্সিগঞ্জের এই পুরনো বাড়িটির! ঝর্না জলের আঘাতে আঘাতে কেমন বাড়িটি বিবর্ণ। ইট দিয়ে গাঁথা বাড়িটি জলের ক্ষয়ে হাঁ হয়ে আছে। কিন্তু জড় পদার্থের প্রাণ থাকে না। তাদের জন্ম হয় না মৃত্যু হয় না। তাদের বংশ বৃদ্ধি হয় না। ফলে তাদের ক্ষয় হয়। কিন্তু ক্ষরণ হয় না।

বিকালের দিকে অনি আর দেবা গতবারের সেই ছোটো বাজারটিতে বেড়াতে যায়। আজ যদিও পূর্ণিমা! তাই ঝর্না শাল মহুয়া পাহাড়ের মাথা কেমন এক মায়াময় আলোয় নিমজ্জিত। অনি বারবার এইসব দৃশ্য দেবাকে দেখার জন্য অনুরোধ করে। করে যদি ওর মন মনন ক্ষয় ক্ষরণের ভিতর বিন্দুমাত্র বদল হয়। মননের সঙ্গে ক্ষরণেরও ঘনিষ্ঠ মিল আছে। দেবা সবই দেখে ফ্যাকাসে চোখে। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে প্রাণ থাকে না। যেন দেখতে হয় তাই দেখা। দেখার ভিতর যে এক ধরণের প্রাণোচ্ছাস প্রাণসঞ্চার সেই অনুভূতি চোখে পড়ে না। বাজারের কাছে এসে এবারও একটি পাহাড়ি মুরগি কেনে। যে মুরগি দৌড়োয় বেশি। ছোটে বেশি। খায় বেশি। ঝিমোয় কম। ছটফটে লাল মুরগিটি অনি পছন্দ করে। দোকানদারকে বলে কেটে পরিষ্কার করে দিতে হবে। দোকানদার গলায় ছুরি চালাতেই গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। দোকানদার এক হাতে সেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করলে দেবা ফ্যাকাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কেননা দেবা এই ক্ষরণ দেখতে চায় না। সে নিজেই এক ক্ষরণের রুগি। নতুন ক্ষরণ আর কেন দেখবে!

ক্ষয়ের কথা আরও আছে। যেমন অনিদের বাগবাজারের পুরনো বাড়িটির কথাই ধরা যাক। বহুদিন অনি যায় না। কিন্তু পিতা পিতামহর এই পুরনো বাড়িটি কেমন জীর্ণ। প্রতিটি বারান্দার কোণে কোণে গোলা পায়রার বাসা। আশে পাশের বাড়ির লোকেরা পুণ্যের জন্য গোলা পায়রাদের দানা প্রতি উষায় ছড়ায়। ফলে সেই দানা খেয়ে গোলা পায়রার সংখ্যা আজ দু-হাজার। প্রতিটি পায়রা যেখানে বসে সেখানে তাদের পায়ের চাপে বাড়ির পলেস্তারা ধীরে ধীরে কেমন হয়ে যায়। বাড়িটির আনাচে কানাচে বর্ষায় কচি বট গাছ জন্মায়। সেই গাছ যখন বড়ো হয় তখন বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরে। দেওয়ালেরও ক্ষয় হয়। একসময় ক্ষয় হতে হতে দেখা যায় দেওয়াল পড়ে যায় মাটিতে।

বাড়িটির দুটে প্রধান ফটক। ঢালাই লোহা দিয়ে নির্মাণ। অনি স্কুলে থাকতেই দেখে কি মজবুত ফটকগুলি। পিতা পিতামহ যদিও প্রতি বছর রং করায় তবুও কলেজে পড়ার সময় অনি টের পায় গেটগুলির করুণ অবস্থা। কব্জার খাঁজে খাঁজে মরচে পরে গেটগুলিকে কেমন দুর্বল প্রাণহীন মনে হত। অথচ পিতা পিতামহ যদিও লোহার মিস্ত্রিদের ডেকে মাঝে মধ্যেই ঠিক করিয়ে নিত তবুও ফটকগুলি আগের মতো শক্ত হয় না। মোটামুটি কাজ চলে। একটু ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ হয় সবসময়ই। সেই শব্দে পিতা পিতামহ অভ্যস্থ। সমস্যা হচ্ছে জড় পদার্থের ক্ষয় আছে। কিন্তু ক্ষরণ নেই। কোনো বস্তুর ক্ষয় হতে হতে যদি শেষ হয়েও যায় সেইখানে সেই বস্তুর বিকল্প ব্যবস্থা আছে। যেমন দুটি প্রধান ফটক যদি একদমই অচল হয়ে পড়ে সেইখানে দুটি ফটকই পালটানো যায়। নতুন হতে পারে। কিন্তু জড় পদার্থ ছাড়া! তাদের বিকল্প কিছু কি আছে! দেবার বিকল্প কি হতে পারে! দেবার বিকল্প অনি কি ভাবতে পারে! অনি নিশ্চয়ই এ বিষয়ে তলিয়ে দেখেনি! দেখলে কি আর দ্বিতীয়বারের মতো এই পাহাড়ি শহরে আসত। অনি চায় দেবা দেবার মতো থাকুক। বিকল্প নয়। পুরনো দেবা। আগের দেবা। বিবাহিত সেই দেবা। যে দেবাকে সে ভালবেসে বিয়ে করে!

(চলবে)

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *