ফি চা র
ধীমান ব্রহ্মচারী
আধুনিকতার বিপরীতে আজও ঐতিহ্যে ভর করে আছে মির্জাপুরের তাঁত ও সিল্ক…
বাংলা ও বাঙালি নারীর সাংস্কৃতিক রুচির অন্যতম শাড়ি। ঐতিহ্য বজায় রেখে সময়ের ক্রম বিবর্তমান পথে এই শাড়ির বিবর্তন হয়েছে ভিন্ন মাত্রায়। বর্তমানে অসংখ্য নামিদামি শাড়ির ভিড়ে আজও বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে উৎপাদিত তাঁত ও সিল্কের শাড়ির চাহিদা ক্রমাগতই বিপরীত স্রোতে হাঁটছে। এখনও বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তাঁতিরা বুনে চলেছে তাদের তাঁতের কাপড়। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বস্ত্রশিল্পের উৎপাদনকে এক ধাক্কায় অনেকটা উপরে তুলেছে, সেখানে হাতে বোনা তাঁত ও সিল্ক কোথাও যেন পিছিয়ে পড়েছে ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতায়। সেখানে মহানগরের আলোর উজ্জ্বল্য, অর্থের প্রাচুর্য, বিজ্ঞাপনের বাহার হয়তো কিছু নেই, রয়েছে ঐতিহ্য আঁকড়ে টিকে থাকার লড়াই। যদিও আমাদের অখণ্ড ভারতবর্ষের তাঁত বস্ত্রের ইতিহাস দীর্ঘ কালের। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস। কেননা, মেহেরগড় ও সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে তুলোর আঁশ ও বয়নশিল্পের প্রাচীনতম প্রমাণ তো পাওয়ায় গেছে। অনেকে মনে করেন সেই সময়কার তন্তুবায়রা অনেকটা যাযাবর প্রকৃতির ছিলেন। তাই পশ্চিম ভারত থেকে পরবর্তীতে এরা পূর্বের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলেও বসবাস শুরু করে, এবং তাঁতের কাজ (মূলত তাঁত বোনার) শুরু করেছিল। ধীরের ধীরে আজকের সমসাময়িক সংস্কৃতি ঘরানার কিছু আগ্রহ চাহিদা বাড়লেও, যন্ত্র সভ্যতার বিপরীতে আজকে অনেকের মাথায় হাত পড়ছে। বাজারে রপ্তানি খানিকটা হলেও অনেক কম। বাজারে ফ্যান্সীর বাণিজ্যিক গতিবিধি এত ওপরে যে, বিপরীতে কোনোভাবে টিকে রয়েছেন মাধব মাসরের মতো মানুষেরা।
তাঁত তৈরি হয় সুতো থেকে। উৎপাদিত সুতো প্রথমে রাসায়নিক ভাবে ধোয়া হয়, তারপর সেগুলি শুকানো হয় রোদে, সেই সুতো সাদা করা হয় আবারও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়। তারপর সেগুলি আবার শুকিয়ে ফুটন্ত রঙিন জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই সুতোয় মাড় দিয়ে সেগুলিকে বাঁশের মধ্যে আরও শক্ত এবং সূক্ষ্ম করার জন্যে বেঁধে রাখা হয়। তাঁত যন্ত্রে সুতো টানাটানি ভাবে আটকে রাখা হয়। বামদিক থেকে ডানদিকে আড়াআড়ি সুতোকে ‘টানা’ আর ওপর থেকে নীচে থাকা সুতোকে ‘পোড়েন’ বলা হয়। তাঁতের শাড়ির আঁচলে বা গোটা গায়ে সাধারণত নকশা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, এই নকশাগুলি তাঁত শিল্পীরাই আঁকেন। একটি তাঁতের শাড়ি বয়ন সম্পূর্ন হতে গড়ে দশ থেকে বারো ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু শাড়ির কাজ যদি শক্ত বা জটিল হয়, সেই কাজ শেষ হতে কখনও কখনও পাঁচ বা ছ’দিন সময় লাগতে পারে।
মুর্শিদাবাদ জেলার মির্জাপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম। সম্প্রতি বেশ কিছু বছর ধরে এই গ্রামের অলিতে গলিতে বর্তমান আধুনিকতার স্রোত এসে ধাক্কা দিয়েছে পোশাক ও পরিচ্ছদ ভাবনায়। ইন্টারনেটের যুগে বড়ো বড়ো শহর ও মহানগরে যে ধরনের তাঁতের শাড়ি অথবা শিল্ক শাড়ির চাহিদা বাড়ছে, তাতে একদিকে যেমন জীবন ধারণের খানিকটা টান পড়েছে অর্থের, আবার অন্যদিকে ঐতিহ্য রক্ষায় নিজেদেরকে এখনও সেভাবেই ধরে রেখেছেন কাজের মধ্যে দিয়ে। করোনার পর বাজারে অত্যধিক হারে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি জাত শাড়ির মার্কেট যেভাবে চড়চড় করে বেড়েছে, সেখানে দেশীয় পদ্ধতিতে এই হাতে বোনা তাঁত ও সিল্ক শাড়ির মর্যাদা সেভাবে দিচ্ছে না আজকের বঙ্গ সংস্কৃতি।
পশ্চিম পাড়ে সূর্য একটু একটু করে ঢলে পড়ছে। চারিদিকে আকাশ কালো হয়ে আসছে। মির্জাপুর বাজারের দোকানিরা দোকানের সামনে জল ছিটিয়ে ঝাঁট দিচ্ছে। সামনেই পুজো। তাঁত শিল্পী মাধব মাসর। বিশ বছর ধরে করছেন এই নিরলস তাঁত বোনার কাজ। এই দীর্ঘ বছর তাঁত বুনতে বুনতে কোথাও যেন এই শিল্পের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। অভাব অনটন থাকলেও কখনও মনে হয় না তাঁর এই তাঁত বয়ন ছেড়ে অন্যদিকে পা বাড়াবেন। এ যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই মদন তাঁতীর গল্প। যন্ত্র সভ্যতায় আজও তাঁর প্রধান অবলম্বন এই তাঁতের মেশিন। বললাম, আপনার এই কাঠের যন্ত্র, যেটাতে আপনি এই কাপড় বুনছেন এর নাম কী? বললেন, জ্যাকার মেশিন। অজস্র সিল্ক সুতো জড়ানো আছে। লাল, নীল, সাদাটে হলুদ রঙের সিল্ক। পাশের লোলি-তে আছে সিল্কের সুতো। বা হাতে মাঝে মাঝে মাকু দিয়ে বুটি ওঠাচ্ছেন আর ডান দিয়ে টান দিচ্ছেন সুতো জড়ানো হাতলে। সিল্ক ঘুরে একটু একটু করে কাপড়ের শরীর নির্মাণ হচ্ছে। গ্রাম বাংলায় ঐতিহ্যশালী তাঁতীর তাঁত বয়নের অপূর্ব দৃশ্য। জিজ্ঞেস করলাম, একটা কাপড় তৈরি করতে কত দিন সময় লাগে? বললেন, পাঁচ থেকে ছয় দিন। পুরো কাপড় তৈরি হয়ে গেলে বাজারে এই কাপড়ের নাম হবে জ্যাকার তাঁত বা জ্যাকার শাড়ি। যার আনুমানিক মূল্য হবে প্রায় ছয় হাজার টাকা। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন কর্পোরেট টেক্সটাইল সংস্থা এই জ্যাকার মেশিনগুলো বহুমূল্যে তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে প্রতি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এই সমস্ত মেশিন দিনেই তৈরি করতে পারে শয়ে শয়ে কাপড়।
সন্ধের আকাশ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। মির্জাপুর ছোট্ট এই জনপদে আজও কান পাতলে শোনা যায় তাঁত বোনার শব্দ। আজকের প্রজন্মের অনেকেই নানা ধরনের ছোটো-খাটো কাজের জন্য গ্রামের বাইরে চলে গেছে। আবার কেউ এই মির্জাপুরেই পনেরো/দশ বছর পর থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে সবকিছু। সারা রাত-দিন জেগে অবশেষে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাঁতের কাপড় তৈরি হচ্ছে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। এখনও অনেকেই সুদিন দেখতে পান। আজও আরও একবার বাংলার চিরাচরিত সিল্ক বা তাঁত বস্ত্রের বিরাট সম্ভাবনার পথ দেখতে পান এরকম কতশত তাঁত শিল্পীরা।