প্র ব ন্ধ

রাজীব চক্রবর্তী

rajib2

ঋত্বিকচর্চা ও কবিতা

❝ভাঙার সঠিক পদ্ধতি না জানলে, ভাঙার বিজ্ঞান ভবিষ্যতে থুতু দেবে।❞
শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ঘটনার বাহুল্যে ভাবনারা উদ্দামহীন হয়ে পড়ে। ঋত্বিকের ধারনা ছিল শিল্প যে ‘এক্সট্রাডায়াজেটিক’ ধারার মধ্যে পতিত হয়, তাতে আর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়। আর্টের ভাবনা শুধুমাত্র কিম্বা একমাত্র সাধারনের জন্য নয়,বরং তার ব্যপ্তি সর্বদাই তাড়িত করবে সামাজিক বোধসম্পন্ন মানুষজনকে। আর্থ রাজনৈতিক পরিভাষায় যাদের ‘পেটিবুর্জোয়া ইন্টালেকচুয়াল ক্লাস’ বলা যায়। অর্থাৎ তাঁরা শিল্পের মাধ্যমেই খুঁজে পাবেন বহুমাত্রিক বৌদ্ধিক পরিভাষা।ঋত্বিক তাঁর সিনেমায় যেভাবে আর্কিওটাইপাল মাদার কাল্ট থটকে সামনে রেখে তাঁর ভাবনার বলয়কে পূর্ণতা কিম্বা পূর্ন থেকে নতুন অপূর্ণতার দিকে যাত্রা করেছেন সেখানে তাঁর শেষজীবনকে যেন আচ্ছন্ন করেছিল মাতৃতান্ত্রিকতার এক নতুন সাংস্কৃতিক আবহ।

ঋত্বিকের যে জীবনী ভাবনা তার মূলত দুটি মেরু কিন্তু তাকে সমান্তরাল কিম্বা ইকুইলিব্রিয়াম বলা সঙ্গত নয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঋত্বিকের অবস্থান কিম্বা আস্থা জ্ঞাপন প্রথম জীবনে অবশ্যই ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও তার মধ্যেকার সাংস্কৃতিক ভাবনায়, যাকে ঋত্বিক তাঁর বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে চেয়েছিলেন। তারই সবল প্রত্যয় হল কোমলগান্ধার। এই পর্বে তিনি ছুঁতে চাইছেন যাবতীয় খর্বতাকে একটি বিশেষ আদলে। হয়তো এইপর্বেই লেনিনের ধারণা “Down with supermen literatures. Literature must become a component part of the organized, planned, United socialist party work.” যাবতীয় সামাজিক ক্ষুদ্রত্বকে দূর করার দৃপ্ত তাদিগকে একটি সম্মিলিত বন্ধনির চর্চার ভৌম প্রক্রিয়া করেই হয়ত এগোচ্ছিলেন তরুণ ঋত্বিক। ক্রমাগত অযান্ত্রিক কিম্বা সুবর্ণরেখার যে ব্যপ্তি ও প্রতিঘাত তাতে গা ভাসিয়ে তিনি বড় বেশি বাঁক দেখেছেন ; দেখছেন নিয়মিত আর্থিক যন্ত্রণা ও বাস্তবিক ব্যর্থতার দৈন্য। তার সাথে সাথেই হয়ত তিনি আঁন্দ্রে বাজাঁ-র স্মরণীয় উক্তিকেও নিজের মত ও পথের সাথে অনুরণিত করে সমমেল সৃষ্টি করতে পারছেন যেখানে বাঁজা বলছেন, “In the theatre we Were merely spectators; through the cinema cocteau makes each of us a voyeur.” অর্থাৎ খুব স্পষ্ট করে বললে উঠে আসে সেই মতবাদ যেখানে তিনি বুঝছেন মানুষ সিনেমা অর্থে মূলত বিনোদনই বোঝে- নবতরঙ্গ, যার শিরা-উপশিরা দিয়ে প্রভাবিত হয়ে এদেশীয় মানুষজন বিশেষত বৌদ্ধিক অংশকে প্রভাবিত ও প্রবাহিত করতে পারে তাঁদের ছুঁয়ে ফেলে সাংস্কৃতিক চেতাবনি হয়ত তাঁর সিনেমার ভাষায় মানুষ নিতে পারছে না। জোর দিয়ে তার দর্শককে ‘ফ্লপ’ বলে উল্লেখ করলেও তিনি হয়ত ভালোই বুঝতেন যে জনগন ও তাঁর ভাবনার মধ্যে কালিক নয় বরং উভয়ের সীমার দূরত্ব হয়ত যোজন যোজন পথ। তাকে ছু্ঁয়ে ফেলার মত মানস ‘ভবা’ ব্যতিত অন্তত সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে তখনও পয়দা হয় নি- আর এখানেই তিনি সংবুদ্ধ।

❝The real Marxist must not to be a good Marxist. ….His duty is to break the rules.❞
পাওলো পাসোলিনি

মার্কসীয় দৃষ্টিতে মানবিক দৃঢ়তার ও বিশ্বভাতৃত্ববোধের যে দৃপ্ততা,তাতে অবশ্যই এক নতুন প্যরাডাইম গত শতকের বিভিন্ন পর্বে স্পষ্ট হয়েছে- কিন্তু এই প্রচার প্রক্রিয়ার ঢাক এতটাই প্রবল যে সেখানে তলায় তলায় ফাটল চওড়া হলেও তাকে বোধ করার মত কোনো ধারণা স্তালিনীয় পার্টিকালচারে প্রস্তুত হয় নি। সেখানে গৌন থেকেছে সরলবর্গীয় কিন্তু বহুমাতৃক মৃন্ময় সংস্কৃতি বোধ। উদ্ধতিঃ- ‘লোকায়ত’ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, পৃ-৮১-৮২। ঋত্বিকের প্রতিবাদ ও এখানেই। স্পষ্টতই তিনি দশেন্দ্রিয়ে অনুভব করেছেন প্রোটো-আর্কিটাইপাল মাদার কাল্টকে – তার গুরুত্ব ও শক্তিকে।

ঋত্বিকের আত্মজীবনীর সূচনাংশ যদি কোমলগান্ধার হয় শেষাংশ তবে অবশ্যই ‘যুক্তি-তক্কো-গপ্পো’। তথাকথিত উন্মার্গগামীতার মধ্যচ্ছেদে শ্যুট করা তাঁর এই চলচ্ছবি ঋত্বিকভাবনার শেষ ও মূল অংশ হিসাবে তাকে স্পষ্ট করে দিতে পারে। প্রচলিত মতবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে ‘ বামপন্থী ছেলেমানুষি ও পেটিবুর্জোয়া বিশৃঙ্খলা থেকে যাবতীয় হঠকারিতাকে সমালোচনা করেও ‘অতিবাম’ ব্যক্তিহত্যার প্রবণতাকে তিনি যেমন নিজস্ব বর্মাবৃত করার চেষ্টা করছেন- পাশাপাশি তাঁদের ত্যাগ ও তিতিক্ষাকে অ্যকনলেজমেন্ট জানিয়ে দিচ্ছেন মুক্ত কন্ঠে।

এ যেমন তাঁর বৌদ্ধিক অবস্থান ও তেমনি যেন আমরা পাই বামপথের প্রতি আস্থার এই মূর্তিমান অতিমারীর পচনশীলতার বিরোধ ঘোষনা, কিন্তু এটুকুই বললে হয়ত তা্র বিষয়ে বলা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

সিনেমার জগতে উত্তাল পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকের যে আপাত স্থিতি কিম্বা যান্ত্রিকভাবে সমাজতন্ত্র নামক সোভিয়েতের মতন এক ভূপতিত শ্রমিক রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের জয়জয়কারের যে হিড়িক, ‘বিকল্প’ চৈনিক মুক্তিসেনাদের যে হুঙ্কার তার দ্বন্দের ফাঁক গলে ঋত্বিক যেন ফিরতে চাইছেন মাটির দিকে- মানুষের দিকে- তাই বঙ্গবালা, তাই সৌম্যকান্তি গ্রাম তাই ছৌনাচ এবং চিরপরিচিত দেবতাবেশী বহুরূপী। এখানেই তিনি ফিরিয়ে আনতে চাইছেন রবীন্দ্রভাবনার প্রচ্ছায়া যেন “ জলদাও, জলদাও মূলে”। ফিরে যেতে চাইছেন মাটির ভিতরকার কুলগামিনী ভার্জিন জলধারার কাছে – যা মানুষের তৃষ্ণা ও ক্লান্তি দূর করে দোষিকে নয় দোষকে মুক্ত করতে পারে, এ যেন এক নবআঙ্গিকের সংগ্রাম। এখানেই আমরা স্মরণ করব বার্গম্যানের ‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং ’ এর শেষদৃষ্যের কথা, যেখানে অপাপবিদ্ধা ষোড়ষির মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের স্থানথেকেই পবিত্র জলধারার প্রকাশ ঘটবে। অর্থাৎ মৃত্যু নয় জীবন, ষড়যন্ত্র নয় স্বাভাবিকত্ব, পাপ নয় পূতঃসলীলা ধরাই আমাদের যান্ত্রিক ক্ষমগুলো থেকে এক নাগরিক অবক্ষয়ের রোধ ঘটাতে সক্ষম হবে। তাই তো ঋত্বিকও বঙ্গবালার মত এক নারী যে কিনা এই বাংলাদেশের সারল্যের প্রতিভূ, তার সাথে শ্বাসের গাম্ভীর্যে নাগরিক শিক্ষায় শিক্ষিত যৌক্তিক নচিকেতার মিলন ঘটান – অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা করেন বৈপরিত্বের সমন্বয়।

বুদ্ধিবৃত্তি ও মনীষা গঠনে ঋত্বিক তাঁর আজীবনের অর্জন যা তিনি পার্থিব মৃত্যুর পূর্বেই একটি স্তরে পুঞ্জিভূত করেন- সেখানে ঋত্বিক সম্পূর্ণ উজার করেদেন তাঁর শেষ সিনেমায়। হেগেলের ভাবনায় বারংবার মানুষ যে ধাচঁ প্রস্তুত করে সে নিজেই তাকে তাঁর দাসে পরিণত করে, আবার একই সাথে সেই ধাঁচের দাসেও পরিণত হয়। এই অপার্থিব দ্বন্দের শরিক একমাত্র মানুষ। এবং এভাবেই যেন মানুষ তার পূর্বতন অবস্থান ভেদ করে উত্তীর্ণ হয় নতুন কাঠামোয়…..উপনিত হয় নতুন দ্বন্দ্বে। ঋত্বিক তাঁর ভাবনায় ইন্টেলেক্ট ও ভাবের মিশ্রণে যে নবপ্রবাহ এনেছিলেন তাঁর এই অনুভূতি তাঁকে নিয়ে গিয়েছে মূলের দিকে- এখানেই যেন তাঁর ভাবনায় আলোকিত হয়েছেন বার্গম্যান। হ্যাঁ ঋত্বিকের অযুত-নিযুত ‘ কনফিউসড’ অবস্থান সত্ত্বেও তিনি ভবিষ্যতের জন্য যেন তৈরী করে গিয়েছেন একটা দাড়াঁবার জায়গা- ভাবনার খোরাক। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর জয় করার, নতুনকে স্বাগত জানাবার বীক্ষনই তো ঋত্বিক ঘটক। সেটাই তাঁর কাব্যিক অবস্থান ও যৌক্তিক পরিসর।।