Skip to main content

Hello Testing

শ্র দ্ধা  জ্ঞা প ন

মধুসূদন রায়

madhududan

এক প্রাজ্ঞ প্রাণের চিরপ্রস্থান: অরুণাভ চক্রবর্তীর স্মরণে

জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের সময়টুকু অদ্ভুত রহস্যময়। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে মানুষ কত না আকাঙ্ক্ষার জাল বুনে চলে— নাম, যশ, ক্ষমতার মোহ কিংবা আরও একটু বেশি পাওয়ার অন্তহীন লোভ। মানুষ চায় সময়কে মুঠোয় পুরে রাখতে, কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে একদিন সব হিসেব নিকেশ এক নিমিষে ওলটপালট হয়ে যায়। তবুও মানুষের জীবন কেবল কিছু নিশ্বাসের যোগফল নয়; জীবন মানে কিছু না-পাওয়া, কিছু অপূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষা আর কাজের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে থাকার এক চিরন্তন আকুতি। এই নশ্বর পৃথিবীতে কিছু মানুষ আসেন যাঁরা নিজের জন্য বাঁচেন না, বাঁচেন মানুষের জন্য, সৃষ্টির আনন্দে। বর্ধমান শহরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা তেমনই এক বিরল প্রাণপুরুষ ছিলেন অরুণাভ চক্রবর্তী। মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। অথচ আজও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, যাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি এই শহরের ধমনিতে মিশে ছিল, তিনি আজ কেবলই এক অতীত।

১৯৬৭ সালের ২৪ এপ্রিল জন্ম নেওয়া অরুণাভ চক্রবর্তীর জীবনটা ছিল এক বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞ। শিক্ষকতাকে তিনি পেশা হিসেবে নেননি, নিয়েছিলেন ব্রত হিসেবে। ১৯৮৯ সালে বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল স্কুলে শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই দেননি, তরুণদের নিজের করে নেওয়ার এক জাদুকরী ক্ষমতা তাঁর ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির বাইরে সাংস্কৃতিক জগতেও তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। সুদূর ১৯৮৩ সালে ‘অন্বেষা সাংস্কৃতিক সংস্থা’ গঠন করে বিকল্প ধারার থিয়েটার নিয়ে তিনি দশকের পর দশক কাজ করে গেছেন। থিয়েটারের মঞ্চ শুধু তাঁর কাছে অভিনয় বা নিছক বিনোদন ছিল না, জীবনের গভীর সত্যগুলোকে প্রশ্ন করার এবং মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার এক মাধ্যম ছিল নাট্যজীবন। নাটকের সেই শৃঙ্খলা, বোধ ও চরিত্রচেতনা তাঁর সমগ্র জীবনচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, যা তাঁর ব্যক্তিত্বে এনে দিয়েছিল এক অনন্য প্রজ্ঞা।

কবিতা নিয়ে তাঁর বোধ ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ, নির্মোহ ও গভীর। প্রচার ও খ্যাতির আলো থেকে বরাবর শতহস্ত দূরে থাকতে ভালোবেসেও তিনি ছিলেন বর্ধমানের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের মূল স্থপতি। ‘ঘোড়সওয়ার’ নামক পত্রিকার (ট্যাবলয়েড) মধ্য দিয়ে তিনি যে সাহিত্য জাগরণের সূচনা করেছিলেন, তা আজও এই শহরের সাহিত্যাকাশে এক উজ্জ্বল মাইলফলক।

কবিবন্ধু আবির্ভাব ভট্টাচার্যের হাত ধরে বর্ধমানে ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তারপর যত দিন গেছে, মানুষটিকে জেনেছি ততই বিস্মিত হয়েছি। নিজের স্বার্থ বা খ্যাতির কথা তিনি কখনো ভাবেননি; তরুণ কবি, লেখক ও শিল্পীদের সবসময় সামনে এগিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর স্বভাব। ২০১৭ সালে গড়ে ওঠা ‘কবিতা ভবন’ তো কেবল একটি ঘর বা প্রতিষ্ঠান ছিল না, তা ছিল তরুণদের কবিতা, আবৃত্তি আর গানের এক অনন্য তীর্থস্থান। সেই কবিতা ভবনে তিনি তরুণদের শুধু আশ্রয়ই দেননি, পরম যত্নে তাদের লালন করেছেন। নবীন লেখকদের মনের ভেতরে সাহসের বীজ বুনে দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার কারিগর ছিলেন তিনি। তরুণ কবি রেণু খাতুনসহ এমন বহু উদীয়মান লেখকের প্রথম ব‌ই বা সাহিত্যকীর্তি প্রকাশের নেপথ্যে তাঁর নিখাদ অবদান ও অক্লান্ত পরিশ্রম আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন সবাই।

মানুষমাত্রেরই বহু আকাঙ্ক্ষা থাকে, থাকে কিছু না-পাওয়ার বেদনা বা অনাকাঙ্ক্ষার দীর্ঘশ্বাস। প্রবল কাজের চাপ আর বহুমুখী ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর মুখে কখনো বিরক্তির রেখা দেখিনি। মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তাঁর ধর্ম। কে আপন, কে পর—এই ভেদাভেদ তিনি জানতেন না। যাঁর সংস্পর্শে আসতেন, তাঁকেই নিজের করে নিতেন অগাধ স্নেহে। মৃত্যু এসে তাঁর জৈবিক শরীরটাকে ছিনিয়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুই কি জীবনের শেষ কথা? কখনোই না। মানুষ তার মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে তার কাজের মাধ্যমে, তার চিন্তার মাধ্যমে এবং সে মানুষের মনে যে ভালোবাসার জায়গা করে নেয়, তার সুবাদে।

অরুণাভ চক্রবর্তী প্রমাণ করে গেছেন যে, মহৎ প্রাণের কোনো মৃত্যু হয় না। তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর গড়া কবিতা ভবন, তাঁর দীর্ঘ লেখালেখি, বিকল্প থিয়েটার আন্দোলন এবং তরুণদের হৃদয়ে তাঁর অবদানের স্মৃতি চিরকাল জাগরূক থাকবে। জীবন মানেই কিছু অধরা পংক্তি আর অসমাপ্ত কাজ ফেলে রেখে যাওয়ার বেদনা। তা সত্ত্বেও, অরুণাভ চক্রবর্তীর মতো মানুষেরা তো ফুরিয়ে যান না; তাঁরা বাতাসের সুবাসের মতো ছড়িয়ে থাকেন শহরের অলিতে-গলিতে, কবিতার পংক্তিতে আর তরুণদের বুকভরা অনুপ্রেরণায়। ভালো থাকবেন, অরুণাভ চক্রবর্তী। আপনার সৃষ্টি আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আলোয় আমাদের পথচলা চিরকাল আলোকিত থাকবে।

One Response

  1. অরুণাভ চক্রবর্তী ছিলেন সদা হাস্যময় একজন মানুষ। চলে যাওয়ার পর শুনেছি, উনি দীর্ঘকাল ধরেই অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু অসুস্থতা অগ্রাহ্য করেই সাহিত্য সেবা করে গেছেন অবিরত। মধুসূদনের লেখাটা দারুন। অপূর্ব শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *